প্যারিসের রূপ-লাবণ্য-রহস্য এত দ্রুত ফুরিয়ে গেল? এক মৌসুম গড়ানোর আগেই? স্পেনের দৈনিক মুন্ডো দেপোর্তিভোর খবরটাকে ধর্তব্যে নিলে কথাটাকে সত্যি বলেই মানতে হবে। ব্রাজিলিয়ান সুপারস্টার নেইমার নাকি আবার ফিরতে চাইছেন পুরনো ডেরায়, এমনটাই জানিয়েছে পত্রিকাটি। মুন্ডো দেপোর্তিভো’ বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোও এই খবর প্রকাশ করেছে। যদিও নেইমার বা বার্সেলোনা, কোন পক্ষের তরফ থেকেই এই খবরের সত্যি-মিথ্যা কোনকিছু দাবী করা হয়নি।

অনেক জল ঘোলা করে বার্সেলোনা থেকে রেকর্ডে ট্রান্সফার অ্যামাউন্টে মৌসুমের শুরুতে নেইমার যোগ দিয়েছিলেন ফ্রেঞ্চ জায়ান্ট পিএসজিতে। কাতারের ধনকুবের নাসের আল খেলাইফি প্রায় একগুঁয়ে হয়েই দলে ভিড়িয়েছিলেন নেইমারকে। বার্সেলোনা ক্লাব কিংবা কোচ-সতীর্থ কারো অনুরোধেই তখন মন গলেনি নেইমারের। তল্পিতল্পা গুটিয়ে স্পেন ছেড়েছিলেন তিনি। কিন্ত মুণ্ডোর প্রতিবেদন বলছে, মৌসুম শেষ হবার আগেই ফ্রান্সের এই দলটার ওপর থেকে মন উঠে গেছে নেইমারের!

নেইমারের বার্সেলোনার ছাড়ার পক্ষে-বিপক্ষে নানা মত উঠে এসেছিল অনেকের কণ্ঠে। মেসির ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে বিশ্বসেরা হবার কথাটাই শোনা গিয়েছিল সবচেয়ে জোরালোভাবে। পিএসজিতে নেইমারের পারফরম্যান্সও মন্দ ছিল না, লীগ ওয়ান জেতার পথে দারুণভাবেই এগিয়ে যাচ্ছে প্যারিস সেন্ট জার্মেইন। কিন্ত লীগ শিরোপা তো নেইমারকে ছাড়াও জিতেছে পিএসজি, ইউরোপসেরার তকমাটা নিজেদের গায়ে জড়ানোর লক্ষ্য থেকেই, সেই লক্ষ্যে এই মৌসুমে দারুণভাবে ব্যার্থ এই ফ্রেঞ্চ ক্লাবটা, ব্যর্থ নেইমারও।

রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে চ্যাম্পিয়ন্স লীগের দুই লেগেই হেরেছে পিএসজি, বিদায় নিয়েছে টুর্নামেন্ট থেকে। প্রথম লেগেই মারাত্নক এক ট্যাকেলের শিকার হয়েছিলেন নেইমার, ইনজুরিতে আক্রান্ত হয়ে চলে যেতে হয়েছিল মাঠের বাইরে। সার্জারী করাতে হবে পায়ে, দর্শক হয়েই তিনি দেখেছেন দ্বিতীয় লেগে ঘরের মাঠে দলের হার। ইউরোপের মঞ্চে পরাশক্তি হয়ে ওঠা, কিংবা বিগ ম্যাচের প্রেশার নেয়ার জায়গাটা থেকে পিএসজি এখনও অনেকখানি দূরে, সেটা নেইমারও নাকি বুঝতে পারছেন। আর একারণেই তার মনে হচ্ছে, যে উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি বার্সেলোনা ছেড়েছিলেন, সেটা পিএসজিতে সহসাই পূরণ করা সম্ভব নয়।

মুন্ডো দেপোর্তিভো জানিয়েছে, বার্সেলোনা ছাড়ার সিদ্ধান্তটাকে এখন ‘ভুল’ হিসেবেই বিবেচনা করছেন ব্রাজিলিয়ান এই সেনসেশন। তিনি মিস করছেন তার সাবেক সতীর্থদের। সূত্রের উল্লেখ না করে পত্রিকাটি লিখেছে, নেইমার নাকি ইতিমধ্যে বার্সেলোনার সঙ্গে যোগাযোগও করেছেন এই ব্যপারে। পুরনো সতীর্থদের সঙ্গে তার যোগাযোগটা দারুণ, বোঝাপড়াটাও চমৎকার। তাই সেখানেই আবার ফেরার ইচ্ছেটা প্রকাশ করেছেন নেইমার।

নেইমার, পিএসজি, বার্সেলোনা, রিয়াল মাদ্রিদ, নাসের আল খেলাইফি

আবার মুদ্রার উল্টোপিঠেও কথা আছে। মাদ্রিদভিত্তিক পত্রিকা এএস জানিয়েছে, নেইমার নাকি যেতে চাইছেন রিয়াল মাদ্রিদে। রিয়ালও তাকে কিনতে আগ্রহী। রোনালদোর বয়স হয়েছে, হয়তো এক-দুই মৌসুম পরে আর সিআর-সেভেনের সেরা ফর্মটা পাওয়া যাবে না বার্নাব্যুতে। সেই অভাবটা নেইমারকে দিয়েই পূরণ করতে চায় লস ব্লাঙ্কোসরা। এএস দাবী করেছে, নেইমারের এজেন্ট হিসেবে তার বাবা নাকি রিয়ালের প্রেসিডেন্ট ফ্লোরেন্তিনো পেরেজের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন। পিএসজি নেইমারকে ছাড়ার বিনিময়ে চারশো মিলিয়ন ইউরো চায় বলেও লিখেছে পত্রিকাটি। আবার রিয়ালও সেটি দিতে নাকি রাজী!

সংবাদ সম্মেলনে রিয়ালের কোচ জিনেদিন জিদানকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল মাদ্রিদে নেইমারের আসার সম্ভাবনা নিয়ে। জিদান বলেছেন- “আমার দলে নেই, এমন কাউকে নিয়ে কথা বলাটা আসলে উচিত নয়। তারা(পিএসজি) ওকে কিনেছে ২২৬ মিলিয়ন দিয়ে, আমাদের কাছে নিশ্চয়ই সস্তায় তাকে দেবে না। আপনারা যেটা বলছেন(৪০০ মিলিয়ন) সেটা মোটামুটি অবিশ্বাস্য। একজন খেলোয়াড়ের জন্যে এত টাকা খরচ করাটা বাজে রকমের বিলাসিতা। তবুও যদি কারো সামর্থ্য থাকে এটা খরচ করার, সে করতেই পারে।”

বার্সেলোনাভিত্তিক অনেকগুলো স্প্যানিশ দৈনিক অবশ্য নেইমারের বার্সেলোনায় যোগদানের পুরো খবরটাকেই গুজব বলছে। তাদের বক্তব্য- এটা একটা বিজনেস ট্যাকটিকস ছাড়া আর কিছুই নয়, পুরো ব্যপারটাই ধাপ্পা। নেইমার আসলে মাদ্রিদে যেতে চান, পিএসজিও তাকে ছাড়তে রাজী। মাঝে দলবদলের টাকার অঙ্কটা বাড়ানোর জন্যেই বার্সেলোনার নাম ভাঙিয়ে বাজারে এই গুজবটা চালু করা হয়েছে বলে দাবী করছে পত্রিকাগুলো, এমনকি যে মুন্ডো দেপোর্তিভো নেইমারের বার্সেলোনায় যোগদানের রিপোর্টটা প্রকাশ করেছে, তারাও ছোট্ট একটা অনুচ্ছেদে এই সম্ভাবনাটার কথা লিখেছে।। ন্যু-ক্যাম্পে নেইমারের ফেরার কোন সম্ভাবনা নেই বলেও জোর গলায় বলছে বেশীরভাগ কাতালান গণমাধ্যম। নেইমারের বার্সেলোনা ছেড়ে যাওয়াটা ভালোভাবে নিতে পারেনি তারা।

শেষমেশ যাই হোক, নেইমার যেখানেই যান কিংবা থাকুন না কেন, দলবদলের বাজারে তার নামটা বিশেষ কিছুই। অজস্র গুজব আর সম্ভাবনার ডালপালা মেলে নেইমারের নামে, ক্লাব ট্রান্সফারের ইতিহাসে এরচেয়ে আকর্ষণীয় আর বহুরূপী চরিত্র এর আগে কেউ ছিলেন বলে মনে হয় না!

তথ্যসূত্র- এল মুন্ডো, ডেইলিমেইল, দ্য সান, এক্সপ্রেস ডট ইউকে।

Comments
Spread the love