ছেলেটির নাম জন। একদিন সে ঠিক করল, ঈশ্বরের সাথে দেখা করবে। কিন্তু ঈশ্বর কোথায় থাকে তা তার জানা নেই। তবে এটুকু সে জানে যে ঈশ্বর থাকে অনেক দূরে কোথাও, অন্তত তাদের গাঁয়ে তো নয়ই। তাই সচরাচর তার দেখা পাওয়া যায় না।

জন বুঝতে পারল, অনেক লম্বা একটা ভ্রমণ হতে চলেছে এটি। তাই নিজের ব্যাকপ্যাকে কিছু খাবার ভরে নিল সে — দুই বোতল ফলের রস আর চার টুকরো পাউরুটি, যা সে মায়ের অগোচরে রান্নাঘর থেকে সরিয়ে এনেছে।

তো এই বিশাল খাদ্য রসদ নিয়ে বেরিয়ে পড়ল জন ঈশ্বরের সন্ধানে। তাদের বাসার সামনের বিশাল মাঠটা পেরোল প্রথমে। এরপর আসল গহীন জঙ্গল। একটু ভয় ভয় করতে লাগল জনের। কিন্তু সে জানে, ঈশ্বরের সন্ধান করা মহৎ কাজ। যারা মহৎ কাজ করে, তাদের বিপদ আপদ হয় না। তাই নির্ভীকচিত্তে জঙ্গল পার হল সে।

জঙ্গলের ও প্রান্তে একটা পার্ক। শিশুরা খেলাধূলা করে। অনেক হইচই সেখানে। ইতোমধ্যে জনের একটু একটু খিদে আর পিপাসা পেয়েছে। সে ঠিক করল একটু ফলের রস দিয়ে গলা ভেজাবে আর এক টুকরো পাউরুটি খেয়ে ক্ষুধা নিবারণ করবে।

একটা বেঞ্চিতে বসে, ব্যাকপ্যাক থেকে ফলের রস আর পাউরুটি বের করে যেই না মুখে দিতে গিয়েছে জন, দেখতে পেল এক অতিশয় বৃদ্ধ মহিলা তার দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছে। মাত্র পাঁচ বছর বয়স হলেও জন বেশ বুঝতে পারে, এ দৃষ্টি ক্ষুধা ও তৃষ্ণার। তাই সে তার হাতের ফলের রস আর পাউরুটির টুকরোটা তুলে দিল বৃদ্ধার হাতে।

বৃদ্ধা তো এই অযাচিত খাদ্য লাভে খুবই খুশি। কৃতজ্ঞচিত্তে খাবারটুকু খেয়ে নিল সে। তারপর জনের দিকে তাকিয়ে খুব মিষ্টি করে হেসে দিল। ফোকলা বুড়ি, সামনের দিকে একটাও দাঁত নেই। তবু সেই হাসি দেখে জনের মনে হল, এত সুন্দর হাসি সে কখনো দেখেনি।

এই হাসি আরও একবার দেখতে চায় সে। তাই ব্যাকপ্যাক থেকে অবশিষ্ট খাবারটুকুও বের করে বৃদ্ধার হাতে তুলে দিল সে। বোঝাই যায় বৃদ্ধা খুবই ক্ষুধার্ত, কয়দিন ভাল করে খেতে পায় না কে জানে। তাই এবারও জনের দেয়া খাবারটুকু খুশি মনে খেয়ে নিল সে। আর তারপর তার হাসিটাও আগের চেয়ে অনেক চওড়া হল। সেই হাসি দেখে আবারও এক অনাবিল প্রশান্তিতে ভরে গেল জনের মন।

ইতোমধ্যে অন্ধকার হতে শুরু করেছে। যেকোন সময় টুপ করে সন্ধ্যা নেমে আসবে পৃথিবীর বুকে। তাই জন সিদ্ধান্ত নিল আজকের মত বাসায় ফিরে যাবে সে। কয়েক পা গিয়ে আবার ফিরে এল সে। জড়িয়ে ধরল বৃদ্ধাকে। বৃদ্ধাও এই আকস্মিক আলিঙ্গনের আতিশয্যে উদ্বেলিত হয়ে পড়ল। দিনের সবচেয়ে বড় হাসিটা আছড়ে পড়ল তার মুখ থেকে। একই সাথে চোখের কোণা থেকে বেরিয়ে এল কয়েক ফোঁটা অশ্রুও, যাকে বলে আনন্দাশ্রু।

বাসায় ফিরে এল জন। তাকে দেখতে পেয়েই তার মা চিৎকার করে উঠল, ‘এতক্ষণ কোথায় ছিলি হতচ্ছাড়া? রান্নাঘর থেকে ফলের রস আর পাউরুটিই বা কে সরিয়েছে? দাঁড়া আজ তোর একদিন কি আমার একদিন!’ মায়ের এমন ভয়াল মূর্তি দেখেও আজ ডরাল না জন। ছুটে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘জানো মা, আজ আমি ঈশ্বরকে দেখেছি। সে এক ফোকলা বুড়ি। কিন্তু তার কাছে আছে একটা অমূল্য সম্পদ — পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর হাসি।’

ওদিকে সারাদিন পার্কের বেঞ্চিতে বসে থেকে রাতে নিজের ছোট্ট কুঁড়ে ঘরে ফিরে এসেছে বৃদ্ধা। তাকে দেখে তার বৃদ্ধ ও শয্যাশায়ী স্বামী কর্কশ কন্ঠে বলে উঠল, ‘সারাদিন কই ছিলি হতভাগী বুড়ি?’ কিন্তু বৃদ্ধা সে কথায় ভ্রূক্ষেপ করল না। নিজের মনে বলল, ‘জানো, আজ আমার ঈশ্বর দর্শন হল। সে কিন্তু মোটেই অনেক বড় কেউ নয়। সে ছোট্ট একটা বাচ্চা ছেলে, কিন্তু তার মনটা পৃথিবীর যেকোন কিছুর চাইতে বড়।’

শেষকথা: ঈশ্বর সর্বত্রই বিদ্যমান। আমাদের শুধু নিজেদের আনন্দটাকে অন্যের সাথে ভাগ করে নিতে হবে, অন্যের মুখে হাসি ফোটাতে হবে। তবেই সাক্ষাৎ পাওয়া যাবে ঈশ্বরের। তাই আসুন, নতুন বছরে আমাদের প্রতিজ্ঞা হোক যেন আমরা আমাদের চারপাশের সকলের মুখে হাসি ফোটাতে পারি, আর তার বিনিময়ে বছরভর নিজেদের মুখেও চওড়া হাসি বজায় রাখতে পারি।

Comments
Spread the love