ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

থার্টি ফার্স্ট নাইটে কেন এই রক্ষণশীলতার চর্চা?

রক্ষণশীলতা একধরণের সামাজিক প্রতিবন্ধকতা। রক্ষণশীল মানুষ মানুষের স্বত:স্ফূর্ত আনন্দ উচ্ছ্বাসকে সব সময় নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে। তারা এক ধরণের ইনসিকিউরিটিতে ভোগে। তারা একটা নির্ধারিত ফরম্যাটের ভেতর বাস করে। এর বাইরে কিছু হলেই তাদের অস্বস্তি হয়।

মেডিকেল কলেজে আমাদের কোন কোন স্যার ছিলেন ক্যাম্পাসে নববর্ষ উদযাপন করতে দিতেন না। তারা রাত বারোটায় এসে ক্যাম্পাসে হানা দিতেন। আমাদের সমস্ত আনন্দ আয়োজন পণ্ড করে দিয়ে তারা বীরদর্পে ঘরে ফিরতেন।

কোন কোন গার্জেন আছেন এরকম। ছেলেমেয়েদের কোন আনন্দ ফুর্তি করতে দেবেন না। একবার এক গার্জেন এসেছিলেন চেম্বারে তার ১৪ বছরের মেয়েকে নিয়ে। তিন দিন ধরে মেয়ে কিছু খায়না, কথা বলে না। শুধু শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। ইতিহাস নিয়ে যা জানলাম তা একটু জটিল। মেয়েটি একটি নামকরা ব্যায়বহুল স্কুলে পড়ে। তার কিছু বন্ধু বান্ধব আছে যাদেরকে তার বাবা পছন্দ করে না। বন্ধুদের একজনের বার্থডে পার্টি ছিল ম্যাংগো ক্যাফে তে। মেয়েটি এক সন্ধ্যায় সেই পার্টিতে গিয়েছিল। জানতে পেরে বাবা বন্ধুদের সামনে মেয়েটিকে কান ধরে টানতে টানতে বাসায় নিয়ে আসে। রাগে, দু:খে অপমানে মেয়েটি তিনদিন যাবত নিশ্চুপ হয়ে আছে। মেয়ের মা খুব বেদনাহত তার স্বামীর আচরণে। আবার মেয়েকে নিয়েও বিব্রত। স্বামীর উপর তার অনেক রাগ, অনেক অভিমান। ভদ্রলোক বাচ্চাদের সময় দেয়না। কিন্তু কড়া শাসনে রাখে। আবার মেয়ে নামাজ-কালাম-হিজাব পরেনা এই নিয়েও কষ্টে আছে। জটিল পরিস্থিতি। মেয়ের বাবার যুক্তি হলো টাকার পয়সার যোগান তো আমিই দেই। সবচেয়ে নামী কলেজে পড়াচ্ছি। কোন জিনিসের অভাব আছে? মজার ব্যাপার হলো এই মানুষটি নিজের ব্যক্তিগত জীবনে আবার একধরণের অসংযমী, ভোগবাদের জীবনযাপন করে। ভদ্রমহিলার সাথে আলাদা করে কথা বলার সময় জানতে পারি। বিস্তারিত বললাম না। উনার ভাষায় সোসাইটি মেইনটেইন করেন।

*******

আমাদের বাসার ছাদে বাচ্চারা ড্যান্স পার্টির আয়োজন করেছে। লালনীল আলোকসজ্জাও আছে। আয়োজক বিল্ডিং এর ১৫+ ছেলেরা। আশেপাশের কয়েকটা ছেলেও জুটেছে। হালকা মিউজিক চলছে। তবে কষ্টের কথা হলো ওরা ত্রিপল দিয়ে নাচের জায়গাটা ঘিরে দিয়েছে যাতে বাইরে থেকে বুঝা না যায়। পুলিশ ঝামেলা করবে। আমাদের গার্জেনদের দুই একজন উপস্থিত থেকে এই পর্দানশীন নিউ ইয়ারের তদারক করছেন।

*******

রাত বারোটা বাজতেই দেখলাম ডিওএইচএস থেকে ফটকা, তারাবাতির ঝলকানি। আমার ধারণা ফ্যালকন, সেনাকুঞ্জ, রাওয়া ক্লাবে আজকে বিরাট পার্টি হবে। বড় বড় কনসার্ট হবে। পুলিশ কনভেনশন হলেও হবে। ওয়েস্টিন, লা ভিঞ্চিতে তো হচ্ছেই। রক্ষণশীল সমাজের বৈশিষ্ট্যই এটা। এখানে ছোট ছোট পকেট থাকে। অনেকটা ছিটমহলের মত। যেমন আরবদের আছে দুবাই।

পৃথিবীর কোন রক্ষণশীল সমাজ কারো কাছেই কাম্য বা আদর্শ হয়ে উঠতি পারেনি। তারপরও মানুষ এই রক্ষণশীলতার চর্চা করে। করে একধরণের ইন্সিকিউরিটি থেকে। এটা সম্পদের ইন্সিকিউরিটি হতে পারে, ক্ষমতার ইন্সকিউরিটিও হতে পারে। এমনকি আদর্শগত ইনসিকিউরিটিও হতে পারে। সারাক্ষণ স্খলনের ভয়।

একটা ভয়হীন মুক্ত সমাজে বেড়ে উঠুক আমাদের সন্তানেরা। নির্দোষ আনন্দে, যেখানে বাধা থাকবে না। শুভ নববর্ষ।

লেখক- গুলজার হোসাইন উজ্জ্বল

ইংরেজী নববর্ষ, ইংরেজী নববর্ষের অনুষ্ঠান, ডিএমপি, পুলিশি বাধা, রক্ষণশীল সমাজ

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close