এই তো মাত্র সেদিন শুরু হয়েছিল ২০১৭। কিন্তু দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেছে এগারোটি মাস। ডিসেম্বরেরও এক চতুর্থাংশ ইতিমধ্যেই শেষ। আর মাত্র কয়েকদিন পরই উল্টে যাবে ক্যালেন্ডারের পাতা। ২০১৭-কে বিদায় জানিয়ে নতুন বছর ২০১৮-কে সাদরে অভ্যর্থনা জানাবে, আলিঙ্গন করে নেবে বিশ্ববাসী।

বর্তমান বিশ্বের প্রায় অধিকাংশ দেশই অনুসরণ করে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার। এর নাম গ্রেগরিয়ান হবার কারণ হলো এটির প্রবর্তন করেন পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরি। এর আগে যে ক্যালেন্ডারটি ব্যবহৃত হতো সেটির নাম ছিল জুলিয়ান ক্যালেন্ডার। এই দুই ক্যালেন্ডারের মধ্যে বর্তমানে তফাৎ ১৩ দিনের, এবং প্রতি ৪০০ বছরে এই ব্যবধান বাড়ে ৩ দিন করে। ইতিহাস বলে, ১৫৮২ সালে ক্যাথলিক দেশসমূহে প্রথম গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের প্রচলন শুরু হয়, এবং ক্রমান্বয়ে সেটি সমগ্র বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। এই ক্যালেন্ডার অনুসারেই আগামী ১ জানুয়ারী শুরু হবে নতুন বছর ২০১৮।

কিন্তু জানেন কি, বিশ্বের সব দেশেই কিন্তু আগামী বছর ২০১৮ আসছে না! এমনও অনেক দেশ আছে যেখানে আগামী বছর ২০১৮ শুরু না হয়ে শুরু হবে ভিন্ন একটি বছর। কেননা সেসব দেশে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের বদলে অনুসরণ করা হয় অন্য কোন ক্যালেন্ডার। আজ আপনাদেরকে জানাব এমনই কয়েকটি দেশের কথা যেখানে আগামী বছরটি ২০১৮ নয়।

থাইল্যান্ড

থাইল্যান্ডে আগামী বছর হবে ২৫৬১ সাল। কেননা থাইল্যান্ডের অধিবাসীরা বৌদ্ধ চন্দ্রবছর অনুসরণ করে থাকে, যেটির সূচনা হয়েছিল গৌতম বুদ্ধের নির্বাণ লাভের সময় থেকে। তবে থাইল্যান্ডে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারও অনুসরণ করা হয়, যেটি মূলত বাইরের দেশ থেকে আগত দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে। থাইল্যান্ডে অনুসরিত এই ক্যালেন্ডারটি অন্যান্য বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ যেমন শ্রীলংকা, কম্বোডিয়া, মায়ানমার, লাওস প্রভৃতি দেশেও অনুসরণ করা হয়।

ইথিওপিয়া

ইথিওপিয়ায় আগামী বছর আসবে ২০১১ সাল। কেননা এ দেশটি ‘নিয়মিত’ ক্যালেন্ডারের তুলনায় বছর আটেক পিছিয়ে আছে। তাছাড়া, এখানে ১২ মাসের পরিবর্তে ১৩ মাসে এক বছর হয়। প্রথম ১২ মাসে দিনসংখ্যা ৩০ করে হলেও, শেষ মাসে দিনসংখ্যা হয় ৫ অথবা ৬, যেটি ওই বছরটি লিপ ইয়ার কিনা তার ওপর নির্ভরশীল। এছাড়াও এ দেশে মধ্যরাতের বদলে সূর্যোদয়ের মাধ্যমে দিনের সূচনা হয়। ইথিওপিয়ান ক্যালেন্ডারটির মূল ভিত্তি হলো আলেক্সান্দ্রিয়ার প্রাচীন ক্যালেন্ডার।

পাকিস্তান

অন্যান্য অনেক ইসলামী দেশের মত পাকিস্তানেও হিজরী ক্যালেন্ডারকে মূল প্রাধান্য দেয়া হয়, যার ফলে আগামী বছর সেখানে শুরু হবে ১৪৩৯ সাল। হিজরী সন গণনা শুরু হয়েছে ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে মহানবী হযরত মুহম্মদ (সা) ও তাঁর সাহাবীদের মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের ঘটনা থেকে। এই ক্যালেন্ডারের দিন-তারিখও চাঁদ দেখার উপর নির্ভরশীল, এবং সৌর বর্ষ হতে হিজরি বর্ষে দিনসংখ্যা ১০-১১ কম হয়ে থাকে। এবং দিনের শুরুও হয় মধ্যরাতের বদলে সূর্যাস্ত থেকে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, এই ক্যালেন্ডার অনুযায়ী কয়েক বছর পরপর মাসের সাথে ঋতুর পারস্পরিক সম্পর্কে পরিবর্তন আসে। দেখা গেল নির্দিষ্ট একটি মাস এ বছর গরমকালে পড়েছে, কয়েক বছর পর সেই মাসটিই পড়বে শীতকালে।

ইসরাইল

ইসরাইলে আগামী বছর হবে ৫৭৭৮ সাল। এ দেশে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের পাশাপাশি হিব্রু ক্যালেন্ডার অনুসরণ করা হয়, এবং যেকোন ছুটি, জন্মবার্ষিকী বা স্মরণীয় তারিখের ক্ষেত্রে শেষোক্তটিকেই প্রাধান্য দেয়া হয়। প্রতিটি মাসের শুরু হয় নতুন চাঁদের আগমনের মাধ্যমে। তাছাড়া বছরের প্রথম দিনটি কেবলমাত্র সোম, মঙ্গল, বৃহস্পতি বা শনিবার হওয়াই বাঞ্ছনীয়। যদি কোন ক্ষেত্র তা না হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়, তবে আগের বছরের সাথে একটি বাড়তি দিন যোগ করা হয়।

ভারত

ভারতবাসী আগামী বছর পালন করবে ১৯৩৯ সালের সূচনা। তবে তাদের এই সর্বভারতীয় জাতীয় ক্যালেন্ডারের প্রচলন খুব বেশিদিন আগে শুরু হয়নি, মাত্র ১৯৫৭ সালে। এই ক্যালেন্ডারের ভিত্তি হলো শাকা ইরা (প্রাচীন বর্ষক্রম), যেটি ভারত ও কম্বোডিয়ায় মানা হয়ে থাকে। তবে ভারতে শুধু এই একটি ক্যালেন্ডারই নয়, বিভিন্ন জাতি, গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ভেদে আরও বহু ক্যালেন্ডার মেনে চলা হয়।

ইরান

ইরানে আগামী বছর শুরু হবে ১৩৯৬ সাল। পারস্য ক্যালেন্ডার, তথা সৌর হিজরি ক্যালেন্ডার, ইরান ও আফগানিস্তানে অফিসিয়ালি অনুসরণ করা হয়। একদল জ্যোতির্বিদ কর্তৃক এই ক্যালেন্ডারটি প্রবর্তিত হয়, যাদের মধ্যে ছিলেন বিখ্যাত কবি ওমোর খৈয়ামও। এই বর্ষক্রমের সূচনা হয় ইসলামী হিজরি বর্ষের আদলেই, তবে এটি সৌর বর্ষকেও অনুসরণ করে, যে কারণে ঋতু ও মাসের মধ্যে কোন পরিবর্তন দেখা যায় না। এই বর্ষক্রম অনুসারে সপ্তাহের শুরু হয় শনিবারে, শেষ হয় শুক্রবারে, এবং শুক্রবারকেই মানা হয় সাপ্তাহিক ছুটির দিন হিসেবে।

জাপান

জাপানে আগামী বছর শুরু হবে ৩০ সাল। কেননা এ দেশে দুই রকমের ক্যালেন্ডারের প্রচলন রয়েছে। একটি হলো যীশু খ্রিষ্টের জন্মের সাথে সম্পর্কিত গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার। আর অন্যটি হলো একদমই এ দেশের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী ক্যালেন্ডার, যেটি জাপানের সম্রাটের শাসনকালের মেয়াদের ওপর ভিত্তি করে গণনা করা হয়। প্রতিটি সম্রাটের শাসনামলকে একটি নির্দিষ্ট নামে নামাঙ্কিত করা হয়, এবং তাঁর শাসনের একটি উদ্দেশ্য নির্ধারিত হয়। বর্তমানে এ দেশে সম্রাট আকিহিতোর শাসনামলের যে নাম দেয়া হয়েছে তা হলো ‘শান্তি ও স্থিরতার যুগ’। এ যুগের সূচনা হয়েছে ১৯৮৯ সালে। এর ঠিক আগের শাসনামলটি ছিল ‘আলোকিত বিশ্বের যুগ’, এবং সেটি স্থায়ী হয়েছিল দীর্ঘ ৬৪ বছর।

চীন

চীনে আগামী বছর শুরু হবে ৪৭১৬ সাল। এ ক্যালেন্ডারটি চীন ছাড়াও কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, মঙ্গোলিয়াসহ আরও বেশ কয়েকটি এশিয়ান দেশে অনুসরণ করা হয়। এই বর্ষক্রমের সূচনা ঘটে খ্রিষ্টপূর্ব ২৬৩৭ সালে, সম্রাট হুয়াংদির হাত ধরে। এই ক্যালেন্ডারটি চক্রাকারে আবর্তিত হয়, এবং এর ভিত্তি হলো জুপিটার নামক গ্রহের ঘূর্ণায়ন। প্রতি ৬০ বছরে জুপিটার সূর্যকে পাঁচবার প্রদক্ষিণ করে, এবং ওই পাঁচটিই হলো চৈনিক ক্যালেন্ডারের মূল পাঁচ উপাদান। যেহেতু জুপিটার একবার সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে ১২ বছরে, তাই এই বছরগুলোকে একটি নির্দিষ্ট নাম দেয়া হয়। আসছে বছরের নাম হবে ‘কুকুর বর্ষ’।

উত্তর কোরিয়া

উত্তর কোরিয়ায় আগামী বছর হবে ১০৭ সাল। এ দেশে যে ক্যালেন্ডারটি অনুসরণ করা হয় তার নাম জুশে ক্যালেন্ডার। এই ক্যালেন্ডারটি অনুসরণ করা শুরু হয়েছে ৮ জুলাই, ১৯৯৭ থেকে। তবে এই ক্যালেন্ডারের তারিখ গণনা হচ্ছে উত্তর কোরিয়ার স্থপতি কিম ইল সাংয়ের জন্মসাল ১৯১২ থেকে। তাঁর জন্মসালটিকে ধরা হয়েছে ১, অর্থাৎ অন্যান্য ক্যালেন্ডারের মত এই ক্যালেন্ডারের সূচনালগ্নে কোন শূন্য-সন ছিল না।

ব্রাইটসাইড অবলম্বনে

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-