জিমে গিয়ে শরীরচর্চায় যেমন শরীর সুগঠিত হয়, বই পড়ে চিন্তা করলে তেমনি মন সুগঠিত হয়। সুগঠিত মন অমূল্য সম্পদ, এটা দিয়ে বিশ্বজয় করে নেয়া যায়। এ কারণে আমি স্বপ্ন দেখি, আমাদের কিশোর তরুনেরাই শুধু নয়, যাঁরা এতদিন বই পড়েননি অনভ্যাসের কারণে তাঁরাও বই পড়া শুরু করবেন।

নিচের পছন্দগুলো আমার ব্যক্তিগত, কাজেই এর সাথে আপনার না মিললেও সমস্যা নেই। পাঁচ বছর বয়েস থেকে আজকের বত্রিশ বছর বয়েস পর্যন্ত বই পড়ার আমার যে অভিজ্ঞতা, এর আলোকে চেষ্টা করছি কিছু বলতে। চাইলে এভাবে বই পড়া শুরু করতে পারেন।

প্রথম পরামর্শ হচ্ছে-

READ ANYTHING- Just for five minutes a day.

আপনার যা পড়তে ভাল লাগে সেটাই পড়ুন, দিনে পাঁচ মিনিট করে হলেও পড়ুন, তাও অন্তত! পড়ুন, প্লিজ। হ্যাঁ, পাঁচ মিনিট প্রতিদিন কিন্তু একেবারে কম সময় নয়, এই সময়ে যে কোন একটা বিশ্ববিখ্যাত বইয়ের প্লট সিনোপসিস বা কাহিনীর সারমর্ম পড়ে ফেলা যায়। দৈনিক ইত্তেফাকে ছোটবেলায় টারজানের কমিক্স দিতো, প্রতিদিন সেগুলো কেটে জমিয়ে আঁঠা দিয়ে খাতায় সেঁটে কমিক বই বানাতাম সেই সময়ে।

হুমায়ূন আহমেদ এর নামে অনেক আঁতেল নাক সিঁটকান, আমি তাঁদের দলে নই। আম্মু বইমেলা থেকে তাঁর “বোতলভূত” বইটা সেই ছোটবেলায় এনে দিয়েছিলেন, ওটা দিয়েই আমার বই পড়ায় হাতেখড়ি। এরকম হাজার হাজার শিশু কিশোর হুমায়ূন আহমেদ পড়ে বই পড়ার অভ্যাসটা শুরু করে। আপনিও এরকম হালকা মেজাজের বই দিয়ে শুরু করতে পারেন।

আমার ফেসবুক প্রোফাইলে রিভিউ করা ভারী ভারী বইগুলো দেখে হতাশ হবেন না, এগুলোতে দাঁত বসাতে আমার সাতাশ বছর লেগেছে। আমি অতি নিম্নমানের মগজের মানুষ, তাই এতদিন লেগেছে- মোটামুটি মাঝারি মানের যে কেউ ছয় মাসের ভেতরেই একেবারে শূণ্য থেকে শুরু করে ভাল একটা পর্যায়ে চলে আসতে পারবেন। আর বছরখানেক প্রতিদিন আধ ঘন্টা থেকে এক ঘন্টা আনন্দ নিয়ে পড়লে তো কথাই নেই!

সবচেয়ে কঠিন হচ্ছে শুরু করাটা। এর পর বাকিটা এমনিই পারবেন। মাত্র পাঁচ মিনিট, এটুকু করবেন না?

দ্বিতীয় পরামর্শ-

আপনি বই পড়েন দেখে নিজেকে যেমন সুপিরিয়র ভাবার কোন কারণ নেই, তেমনি আপনার বই পড়াকে বিদ্রুপ করা লোকজনকে সিরিয়াসলি নেয়াটাও অনাবশ্যক। বই হাতে দেখলেই একজাতীয় মানুষ আপনাকে “পন্ডিত, আঁতেল” ইত্যাদি বলে বিদ্রুপ করবে। পাত্তাই দেবেন না। অসমাপ্ত আত্মজীবনী হাতে আপনি ব্যস্ত আছেন বঙ্গবন্ধুর সাথে আলাপচারিতায়, ধম্মপদ হাতে শুনছেন গৌতম বুদ্ধের উপদেশ, মসনভী হাতে নিয়ে কল্পনা করছেন জালালুদ্দিন রূমীর স্পিরিচুয়ালিটি- কে কি বলল এসবে কান দেবার কি দরকার? ওরা যখন বাজে গল্পে সময় নষ্ট করছে, আপনি তখন মগজে শান দিচ্ছেন। জীবনের লড়াইয়ে দুজন মুখোমুখি হলে কার পাল্লা ভারী হবে বলুন তো?

তৃতীয় পরামর্শ-

এবার কিছু নির্দিষ্ট বইয়ের নাম দিই, যেগুলো শুরু করার জন্য চমৎকার। সেবা অনুবাদে অপূর্ব সব বিশ্বসেরা বই সহজ ভাষায় পড়তে পারবেন। কিশোর ক্লাসিক, থ্রিলার কিংবা মাসুদ রানা- এক কাজীদা গত পঞ্চাশ বছর ধরে আমাদের আলো দিয়ে যাচ্ছেন নীরবে নিভৃতে, একটা জাতিকে তিনি মগজে মননে উন্নত করে দিয়েছেন। একশটা একুশে পদকও কাজীদার কাজের স্বীকৃতির জন্য যথেষ্ট নয়। সেবার বই পড়ুন!

সেবা প্রকাশনীর আমার কিছু প্রিয় বই হচ্ছে অগ্নিপুরুষ (মাসুদ রানা) , আ টেল অফ টু সিটিজ ( কিশোর ক্লাসিক), বাউন্টিতে বিদ্রোহ, থ্রি কমরেডস, রবিন হুড (সেবা অনুবাদ)।

সেবা দিয়েই শুরু করুন না কেন?

ইংরেজি বই পড়তে চাইলে শুরু করুন পাউলো কোয়েলহোর দি আলকেমিস্ট বইটা দিয়ে। বানান করে ইংরেজি পড়তে পারে এমন মানুষও এ বই পড়ে বুঝতে পারবেন। বিদেশী ভাষায় প্রথম বইটা পড়াই সবচেয়ে কঠিন, যে কোন একটা বই পড়ে ফেললে যে সাহস হয় ওটা দিয়ে পরেরটা সহজেই পড়তে পারবেন। আমার সাজেস্ট করা পাঁচটা ইংরেজি বই হবে: দি আলকেমিস্ট, দি গডফাদার (মারিও পুজো), রেজ অফ এঞ্জেলস (সিডনি শেলডন) , দি ঈগল হ্যাজ ল্যান্ডেড ( জ্যাক হিগিন্স) আর স্যাপিয়েন্স (ইউভাল নোয়া হারারি)। প্রথম চারটা ফিকশন, শেষটা নন ফিকশন।

বোনাস হিসেবে দুটো লাইফ ম্যানুয়ালের নাম দিই-

মেডিটেশনস (মারকাস অরেলিয়াস)
আর্ট অফ ওয়ার (সান জু)

আরেকটা চমৎকার বই হচ্ছে সোফি’স ওয়ার্ল্ড, একেবারেই সহজ ভাষায় দর্শনের মত জটিল বিষয় এ বইয়ে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে, যা আপনার চিন্তার জট খোলার জন্য যাদুর কাঠির কাজ করবে। প্রতিটা বই নীলক্ষেতে সস্তায় পাবেন। আব্রাহাম লিঙ্কনের কোলে সব সময় বই খোলা থাকত। মিটিং শেষ করে একজন বেরিয়ে আরেকজন ঢোকার ফাঁকে তিনি চোখ বুলিয়ে দুটো করে শব্দ পড়ে নিতেন। আমার মনে হয় আমার আপনার জীবন আর যাই হোক এই লোকের মত জটিল না!

শেষ করছি চীনা দার্শনিক লাও জু এর উক্তি দিয়ে- 

A journey of thousand miles starts with one step. 

প্রথম পদক্ষেপটা আমার এই লেখাটা পড়া শেষ করেই নিয়ে ফেলুন!

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-