আমরা অনেকেই ছেলেবেলায় রুপকথার গল্প পড়েছি। সেসব গল্পে থাকত সুন্দর সব রাজকুমার, রাজকুমারী, রাজা-রাণীর কথা। আমরা শুনেছি, সিন্ডেরেলার কথা, স্লিপিং বিউটি বা ঘুমন্ত রাজকুমারী কথা। আর শুনেছি রাজপ্রাসাদের কথা। রুপকথার রাজপ্রাসাদ। যে প্রাসাদে থাকত এইসব কল্পনার রাজা-রাণী আর রাজকুমারীদের বাস।

আজ শুনাবো এমন এক রাজপ্রাসাদের গল্প। রুপকথার আদলের যে রাজপ্রাসাদের অস্তিত্ব রয়েছে বাস্তবের দুনিয়ায়। সে প্রাসাদ দেখতে এতোটাই রুপকথার আদলের যে, ওয়াল্ট ডিজনি পর্যন্ত তা দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। সে প্রাসাদের আদলেই তিনি তার সিনেমায় বানিয়েছিলেন সিন্ডেরেলার রাজপ্রাসাদ। শুধু তাই নয়, এ প্রাসাদের মতো করেই বানানো হয়েছে, ক্যালিফোর্নিয়ার ডিজনিল্যান্ডে স্লিপিং বিউটি বা ঘুমন্ত রাজকন্যার রাজপ্রাসাদ।  

প্রাসাদটি রয়েছে জার্মানিতে। নাম নয়েচওয়ানস্টাইন প্রাসাদ বা দূর্গ। জার্মানীর সবচেয়ে দর্শনীয় প্রাসাদ বলা হয় এটিকে। ইউরোপ ভ্রমণকারী পর্যটকদের জন্য এ প্রাসাদ খুবই আকর্ষনীয়। জার্মানির ফাসেন শহরের নিকটে বেভারিয়া রাজ্যে এ প্রাসাদটির অবস্থান। রাজা দ্বিতীয় লুডউইগ এ প্রাসাদটি নির্মাণ করেন, ‍যিনি রুপকথার রাজা বলেও পরিচিত ছিলেন।

রাজা লুডউইগ ১৮৬৪ থেকে ১৮৮৬ সালে তার মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত জার্মানির বেভারিয়া রাজ্যের রাজা ছিলেন। তিনি হংস রাজা, পাগল রাজা লুডউইগ এবং রুপকথার রাজা বলেও পরিচিত ছিলেন। তার মনটা ছিল শিশুর মতন কল্পনাপ্রবণ। একারণেই সম্ভবত, রাজা লুডউইগ নিজের জন্য কল্পনার মত একটি প্রাসাদ নির্মাণের পরিকল্পনা করেন।

নয়েচওয়ানস্টাইন প্রাসাদের নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৮৬৯ সালে। প্রথমদিকে এটি নির্মাণের সময়কাল নির্ধারণ করা হয়েছিল তিন বছর। কিন্তু রাজা লুডউইগ চেয়েছিলেন প্রাসাদটি নিখুঁতভাবে নির্মাণ করতে। তাই দীর্ঘসময় লেগেছিল এ প্রাসাদ নির্মাণে। এতোটাই দীর্ঘ যে রাজা লুডউইগ যখন ১৮৮৬ সালে মারা যান তখনও এর নির্মাণকাজ শেষ হয়নি। রাজা মারা যাবার পরে, প্রাসাদটির নির্মাণ কাজ আর বেশিদূর এগোয়নি। তাই, আজও এ প্রাসাদের নির্মাণকাজ খানিকটা অসমাপ্তই রয়ে গেছে।

নয়েচওয়ানস্টাইন প্রাসাদটি দেখতে রুপকথার রাজপ্রাসাদের মত। এটাকে বলা হয় ক্যাসেল অব প্যারাডক্স। যদিও উনিশ শতকে জার্মানির বেভেরিয়ায় নির্মাণ করা হয় প্রাসাদটি, প্রাসাদের নির্মাণশৈলী ছিল অনেকটা মধ্যযুগীয়। নিজের বসবাসের জন্য শখের রাজপ্রাসাদ বানাতে চেয়েছিলেন জন্য রাজা লুডউইগ এ প্রাসাদে প্রতিরক্ষামূলক বা কৌশলগত কোন নিরাপত্তার ব্যবস্থা রাখেননি।

বাইরে থেকে দেখতে নয়েচওয়ানস্টাইন দূর্গটি মধ্যযুগীয় প্রাসাদের মতো হলেও, এর ভেতরটায় রয়েছে আধুনিকতার ছোঁয়া। উদাহরণস্বরুপ বলা যায়, এ প্রাসাদের টয়লেটগুলোতে অটোমেটিক ফ্ল্যাসের ব্যবস্থা রয়েছে। রয়েছে প্রাসাদের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাও। সারা বছর পানি সরবরাহের সুব্যবস্থা রয়েছে এ প্রাসাদে।

নয়েচস্টাইন দূর্গের মধ্যে দেয়ালঘেরা চত্বরে খুব সুন্দর একটি বাগান রয়েছে। এটির মধ্যে একটি কৃত্রিম গুহাও রয়েছে। বাইরে থেকে দেখতে প্রাসাদটি যতটা সুন্দর, ভেতর থেকে দেখতেও ঠিক ততটাই মোহনীয়। যদিও রাজা লুডউইগের মৃত্যুর পূর্বে প্রাসাদের মাত্র ১৪ টি কামরার কাজ সম্পূর্ণ করা সম্ভব হয়েছে, তবু কামরাগুলোর সাজসজ্জা কিন্তু রাজকীয়। জানা যায়, ১৪ জন কাঠমিস্ত্রী চার বছরেরও বেশি সময় ধরে কাজ করেছেন শুধু এই প্রাসাদের ১৪ টি ঘরের কাঠের জিনিসপত্র তৈরির জন্য। 

দুই তলা বিশিষ্ট একটি বিশাল রাজসভা রয়েছে নয়েচওয়ানস্টাইন প্রাসাদের ভেতরে, যেটি ষষ্ঠ শতকের বাইজেনটাইন স্থাপত্যের আদলে নির্মিত। চারপাশের দেয়ালে রয়েছে অসাধারণ সব চিত্রকর্ম। মজার ব্যাপার হলো রাজসভা থাকলেও সে ঘরে কিন্তু কোন সিংহাসন নেই। লুডউইগ রাজসভার নির্মাণকাজ শেষ হবার পূর্বেই মারা গিয়েছিলেন, তাই সিংহাসন স্থাপনের আর প্রয়োজন পড়েনি। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! রাজা লুডউইগ এত শখ করে যে রাজপ্রাসাদ বানিয়েছিলেন সে অসমাপ্ত রাজপ্রাসাদে তিনি মাত্র ১১টি রাত কাটাতে পেরেছিলেন।

রাজা লুডউইগ ছিলেন সেসময়ের জার্মান অপেরা সঙ্গীতের বিশ্ববিখ্যাত সুরকার, গীতিকার, নাট্য পরিচালক উইলহেম রিচার্ড ওয়েগনারের একজন ভক্ত ও অনুরাগী। রাজা নয়েচওয়ানস্টাইন প্রাসাদ নির্মাণের সময় ওয়েগনারের কাজের প্রতি সন্মান প্রদর্শনের চেষ্টা করেছিলেন। যার কারণে, প্রাসাদের ভেতরের অনেক সাজসজ্জা ওয়েগনারের চরিত্রের দ্বারা অনুপ্রাণিত। বিশেষভাবে দূর্গটির চতুর্থ তলা ওয়েগনারের প্রতি লুডউইকের সন্মান প্রদর্শনের নিদর্শন হয়ে রয়েছে। সেখানে রয়েছে অপেরা সঙ্গীতের পুরো একটি হলরুম, যেখানে ওয়েগনারের অপেরার বিভিন্ন সাজসরঞ্জাম রাখা রয়েছে। ওয়েগনারের সন্মানে বানানো হলেও জীবনকালে ওয়েগনারের এ প্রাসাদে আসার সুযোগ হয়নি। প্রাসাদের নির্মাণ শেষ হবার আগেই তিনি মারা যান।

নয়েচওয়ানস্টাইন কথাটির অর্থ হলো ‘নতুন রাজহাঁসের দূর্গ’ বা ‘নিউ সোয়ান নাইট’ যেটা ওয়েগনারের সৃষ্ট একটি চরিত্র ‘সোয়ান নাইট’ থেকে অনুপ্রাণিত।

নয়েচওয়ানস্টাইনের অবস্থানও রুপকথার মত নান্দনিক। এটি জার্মানির বাভেরিয়ান আল্পস নামক পার্বত্য অঞ্চলে একটি পাহাড়ের চূড়ায় বিশাল জায়গাজুড়ে অবস্থিত। এ প্রাসাদের উপর থেকে হোহেঞ্চওয়ানগা উপত্যকা চোখে পড়ে। যারা এ প্রাসাদ দেখতে যায়, তারা সবাই’ই এর চারপাশের পাহাড়ি প্রাকৃতিক সৌন্দের্যে বিমোহিত হয়ে পড়ে। এছাড়া ফাসেন নামক যে শহরের উপকূলে প্রাসাদটি অবস্থিত, সে শহরটিও পর্যটকদের কাছে খুবই আকর্ষণীয়।

নয়েচওয়ানস্টাইন জার্মানির সবচেয়ে দর্শনীয় প্রাসাদ, যা পর্যটকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়। এ প্রাসাদের নির্মাতা, রাজা দ্বিতীয় লুডউইগ অন্য কারো দেখবার জন্য নয়, নিজের থাকার জন্য বানিয়েছিলেন এটি। তবু বর্তমানে, প্রতিবছর সারাবিশ্বের ১৩ লক্ষেরও বেশি পর্যটকের আগমন ঘটে এ প্রাসাদে। কোন কোন সময় একদিনেই ৬ হাজারেরও বেশি পর্যটকের পা পড়ে এই প্রাসাদটিতে। এ কারণেই অনেকের মতে, নয়েচওয়ানস্টাইন প্রাসাদটির যত সংখ্যক ছবি তোলা হয়েছে, পৃথিবীর আর কোন বিল্ডিংয়ের বুঝি এত বেশি ছবি তোলা হয়নি।

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-