বাচ্চা মেয়েটার বয়স মাত্র দুই বছর। কি সুন্দর একটা নাম ওর- প্রিয়ন্ময়ী! নেপাল যাত্রার দিনক্ষণ ঠিক হবার পর থেকেই বাসার সবাইকে বলে বেড়াতো মেয়েটা- আমি বিমানে চড়বো, আমি আকাশে উড়বো। জড়ানো গলায় কথাগুলো শুনতে যে কি ভীষণ মিষ্টি লাগতো সবার! সেই মেয়েটা আকাশে উড়েছে, বিমানে চড়েছে। কিন্ত বিমান থেকে নামা হয়নি ঠিকঠাক। ওর ছোট্ট শরীরটা আগুনের তাপে ঝলসে গেছে পুরোপুরি, প্রিয়ন্ময়ী নামের ছোট্ট মেয়েটা তার বাবার সঙ্গেই গতকালের প্লেন ক্রাশের শিকার হয়ে চলে গেছে না ফেরার দেশে!

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনের সামনে তোলা ওদের ছবিটা এখন শুধু স্মৃতি হয়েই টিকে আছে। লাল রঙের বড়সড় একটা স্যুটকেসের পেছনে দাঁড়ানো প্রিয়ন্ময়ী আর কোনদিন বিমানে চড়তে চাইবে না, আকাশে ওড়ার বায়না ধরবে না। গোলাপি রঙের একটা জামা পরে ছিল প্রিয়ন্ময়ী, সেটা গায়ে জড়িয়েই বাবার কোলে চড়ে স্বর্গের দ্বারে পৌঁছে গেছে ও। প্রিয়ন্ময়ীর বাবা ফারুক হোসেন প্রিয়কও নিহত হয়েছেন এই দুর্ঘটনায়, মা অ্যানি প্রিয়ককে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে ভর্তি করা হয়েছে নেপালের একটা হাসপাতালে।

নেপাল ট্র্যাজেডি, ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্স, বিমান ক্র্যাশ

ভালোবাসার বন্ধন নাকি মৃত্যুতেও ছিন্ন হয় না। আঁখি মনি আর মিনহাজের গল্পটা তেমনই কিছু একটা। চার বছরের প্রেমের সম্পর্ককে পরিণতি দিয়ে গত মাসের আঠাশ তারিখে বিয়ের বন্ধনে বাঁধা পড়েছিলেন দুজনে। মার্চের তিন তারিখে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ওদের বিবাহোত্তর সংবর্ধনা। আঁখি আর মিনহাজ আগেই পরিকল্পনা করে রেখেছিলেন, বিয়ের পরে হানিমুনে যাবেন নেপালে। কে জানতো, সেই যাওয়াটাও শেষ যাওয়া হবে?

নেপাল ট্র্যাজেডি, ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্স, বিমান ক্র্যাশ

বিমান দুর্ঘটনার পরে দেশে যখন উৎকণ্ঠিত সবাই, তখনই মিনহাজের বাসায় ফোন এলো নেপাল থেকে, জানানো হলো ছেলে আর পুত্রবধুর মৃত্যুসংবাদ। ওদের বিয়ের ছবিগুলো এখনও জ্বলজ্বল করছে ফেসবুকে, লাইক কমেন্টে ভেসে যাচ্ছে সেগুলো। ওরা কোনদিন সেগুলোর জবাব দেবেন না। সারা জীবন একসঙ্গে থাকার প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, সেই প্রতিজ্ঞাটা এভাবে রক্ষা করবেন তারা, সেটা হয়তো ভাবেনি কেউই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অপরাধবিজ্ঞানে মাস্টার্স করছিলেন তাহিরা তানভীন শশী। চিকিৎসক স্বামীকে নিয়ে নেপাল যাচ্ছিলেন ঘুরতে। শশীর বাবার সঙ্গে গতকাল সন্ধ্যায় যখন যোগাযোগ করা হয়, তখন তিনি সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, তখনও কোন খোঁজ পাননি মেয়ে আর মেয়ে জামাইয়ের। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে ওদের জন্যে দোয়া করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন শশীর বাবা। দেশবাসীর দোয়া, বাবা মায়ের ভালোবাসা- কোনটাই শশীকে ফিরিয়ে আনার জন্যে যথেষ্ট ছিল না তখন।

নেপাল ট্র্যাজেডি, ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্স, বিমান ক্র্যাশ

নাকে একটা নাকফুল ছিল মানিকগঞ্জের মেয়ে শশী’র। সেটা দেখেই ঢাকা থেকে এক সাংবাদিকের দেয়া তথ্য অনুসারে একজন নেপালি সনাক্ত করেছিলেন শশীর মৃতদেহটা। পরে শশী’র পরনে থাকা পোষাক দেখে নিশ্চিত হওয়া গিয়েছিল, তিনি চলে গেছেন না ফেরার দেশে। ঢাকা বিমানবন্দর থেকে আকাশে ওড়ার আগে শশী ছবিও আপলোড করেছিলেন নিজের ফেসবুক ওয়ালে, সেই ছবিতেই পাসপোর্টের আড়ালে দেখা যাচ্ছিল ইউএস বাংলা বিএস-২১১ বিমানটার টিকেট। দুজনের হাস্যোজ্জ্বল ছবিগুলো রয়ে যাবে, শশী ফিরবেন না আর কোনদিন। শশীর স্বামী গুরুতর আহত অবস্থায় ভর্তি আছেন ওম হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে।

ফেসবুক গ্রুপ ট্রাভেলার্স অফ বাংলাদেশের হেল্পনাইনে গত আটই মার্চ পিয়াস রায় লিখেছিলেন- ‘বারো তারিখে নেপাল যাচ্ছি, কেউ গেলে আওয়াজ দিন।’ সেই পোস্টে সবাই তাকে স্মরণ করছে, আওয়াজ দিচ্ছে, সেই আওয়াজের জবাব তিনি কোনদিনই দেবেন না, দিতে পারবেন না। বরিশালের ছেলে পিয়াস পড়ছিলেন গোপালগঞ্জ মেডিকেলে, ডাক্তার হতে আর অল্প ক’টা দিনই তো বাকী ছিল। নিয়তি সেই সময়টুকু পিয়াসকে দিলো না। বিমানে ওঠার আগে ফেসবুকে একটা ছবি আপলোড দিয়ে পিয়াস লিখেছিলেন- টাটা মাই কান্ট্রি ফর ফাইভ ডে’জ। জীবনকেই যে তিনি টাটা বলতে চলেছেন, সেটা কি ঘুর্ণাক্ষরেও টের পেয়েছিলেন পিয়াস?

নেপাল ট্র্যাজেডি, ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্স, বিমান ক্র্যাশ

বরিশালে পিয়াসের পৈত্রিক বাড়িতে এখন কান্নার ঢল, ওর মায়ের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে সেখানকার বাতাস। বাবার চোখে জল, বোনের চোখের শূন্য দৃষ্টি, কোনকিছুই আর ফিরিয়ে আনতে পারবে না পিয়াসকে। তার ভালোবাসার মানুষটা পিয়াসের যাত্রার আগেরদিন ফেসবুকে লিখেছিলেন, পিয়াসকে খুব মিস করবেন তিনি, যেভাবে ভালোয় ভালোয় যাচ্ছেন, সেভাবেই যেন ফিরে আসেন। স্রষ্টা সেই মেয়েটার ইচ্ছেটা পূরণ করেননি।

একটা মিডিয়াম সাইজের এয়ারবাস, খানিকটা ভুল বোঝাবুঝি, কয়েক মূহুর্তের ব্যবধানে লাশ হয়ে যাওয়া মানুষগুলো, অগ্নিকুণ্ডের লাল আভা, হাসপাতালের সাদা দেয়াল, ফিনাইলের কর্কশ গন্ধ, পত্রিকার পাতা কিংবা ফেসবুকের নিউজফিডে সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার স্থিরচিত্রগুলো মনে গেঁথে যায়। প্রতিটা ছবির পেছনে নাম না জানা কত গল্পের সমাহার! সবগুলো গল্প জুড়েই অপূর্ণতার হাহাকার!

কেউ চলে গেছেন হাতে হত ধরে, কেউবা একা। পড়ে আছে স্মৃতির ভাণ্ডার, সেগুলোর ওপরেও ধুলোর আস্তর জমে যাবে খুব দ্রুতই। আমরা ভুলে যাবো হয়তো, ভুলবেন না তারা, যারা প্রিয়জন হারিয়েছেন। নেপাল শব্দটা শুনলেই ওদের গায়ে কাঁটা দেবে, বিমানের নাম শুনেই ওদের হৃদয় হাহাকারে পূর্ণ হয়ে যাবে। অপূর্ণতার সেই হাহাকারের শব্দ সবাই শুনতে পায় না।

তথ্যসূত্র কৃতজ্ঞতা- দৈনিক যুগান্তর, চ্যানেল আই অনলাইন। 

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-