পুড়ে যাওয়া বিমানের ধ্বংসস্তুপ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে যত্রতত্র। আগুনের লেলিহান শিখা নিভে গেছে, সাদা বরফের স্তুপ জমে যাচ্ছে চারপাশে। হিমশীতল একটা ঠাণ্ডা বাতাস, সেই বাতাসে মিশে আছে মৃত্যুর ঘ্রাণ। বাঁচতে চাওয়া মানুষগুলোর আর্তনাদ থেমে গেছে অনেক আগেই। আহতদের সরিয়ে নেয়া হয়েছে, তাদের গন্তব্য হাসপাতাল। এরমধ্যেই একপাশে একটা বই পড়ে থাকতে দেখা গেল, মোটা বইটার উপরের অংশটা আগুনে পুড়ে গেছে, কিন্ত আগুনের করাল গ্রাস থেকে বেঁচে গেছে বাকী অংশটা। দুটো শব্দ মুছে গেলেও, সেটার নাম যে ‘ডেভিডসন’স মেডিসিন’, এটুকু বুঝতে কষ্ট হয় না মোটেই। মেডিকেল স্টুডেন্টদের কাছে এই বইটা মেডিসিনের বাইবেল স্বরূপ।

দেড় মাস ধরে চলা ফাইনাল প্রফ পরীক্ষা শেষ হয়েছে। মেডিকেল কলেজের চার বছরের পড়ালেখা শেষ, এবার শুধু রেজাল্টটা পেলেই ইন্টার্ন চিকিৎসকের খেতাবটা যোগ হতো নামের পাশে। ডাক্তারি ডিগ্রি আর ওদের তেরো জনের মধ্যে ব্যবধানটা ছিল কেবল একটা সনদের, অল্প কিছু সময়ের। সেই ব্যবধানটা আর কোনদিন দূর হবে না, ওদের মধ্যে এগারোজন আর কোনদিন ডাক্তার হতে পারবে না। নিয়তির অমোঘ টানে সব পার্থিব প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির সীমারেখা থেকে অনেকটা দূরে চলে গেছে নেপালের এগারোজন হবু ডাক্তার। ওদের প্রত্যেকেই সিলেটের রাগীব রাবেয়া মেডিকেল কলেজের শেষ বর্ষের ছাত্র ছিলেন। কাঠমান্ডুতে বিদ্ধ্বস্ত হওয়া ইউএস বাংলার বিমানটার যাত্রী ছিলেন ওরা সবাই।

নেপালে মেডিকেল কলেজের স্বল্পতা আছে। সেখানে ডাক্তারী পড়াটাও বেশ ব্যয়বহুল একটা ব্যাপার। একারণেই ভারত আর বাংলাদেশের বেসরকারী মেডিকেল আর ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নেপালি ছাত্র-ছাত্রীদের আগমন লক্ষণীয় পর্যায়ের। শুধু সিলেটের রাগীব রাবেয়া মেডিকেলেই প্রায় আড়াইশো নেপালি ছাত্র-ছাত্রী এমবিবিএস কোর্সে পড়ছে। সংখ্যাটা হেলাফেলা করার মতো নয় মোটেও। দেশের অন্যান্য বেসরকারী মেডিকেল কলেজগুলোতেও প্রচুর নেপালি ছাত্র-ছাত্রী পড়ছেন।

সঞ্জয় পৌডেল, সঞ্জয়া মহারজন, নেগা মহারজন, অঞ্জলি শ্রেষ্ঠ, পূর্নিমা লোহানি, শ্বেতা থাপা, মিলি মহারজন, সারুনা শ্রেষ্ঠ, আলজিরা বারাল, চারু বারাল, আশনা শাকিয়া- নামগুলো আলাদা, নিয়তি এক। দেড়মাস ধরে ফাইনাল প্রফের পরীক্ষা দিয়েছে ওরা, তারপর দুইমাসের ছুটি পেয়েই দেশের বিমানে চড়ে বসেছে। বাবা মায়েরা অপেক্ষা করে ছিলেন, ভাই-বোনেরা আবদার করেছিল তাদের পছন্দের কিছু নিয়ে আসার জন্যে। ছবিতে একটা শপিং ব্যাগ দেখা গেছে ডেভিডসনের বইটার পাশেই, হয়তো ওদের কেউ কোন নিয়ে যাচ্ছিল প্রিয়জনের জন্যে। ওদের ফেরার প্রতীক্ষায় যে মানুষগুলো বসেছিল, তাদের অপেক্ষা ফুরোবে না কোনদিন। দুর্ঘটনার শিকার রাগীব-রাবেয়ার আরও দুই ছাত্রী প্রিন্সি ধামী আর সামিনা বায়জানকার গুরুতর আহত অবস্থায় ভর্তি আছেন হাসপাতালে।

নেপালে বিমান দূর্ঘটনা, রাগীব রাবেয়া মেডিকেল, ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্স

টাঙ্গাইলের কুমুদিনী মেডিকেল কলেজের ছাত্রী শ্রেয়া ঝা’ও ছিলেন ইউএস বাংলার সেই ফ্লাইটে। রাগীব রাবেয়া মেডিকেলের সেই এগারোজনের মতো একই পরিণতি বরণ করে নিতে হয়েছে তাকেও। সদাচঞ্চল, হাসিখুশী এই মেয়েটা ছিল ক্যাম্পাসের সবার প্রিয়। খুব ভালো ছাত্রী ছিল শ্রেয়া, ছাত্র-ছাত্রী মিলিয়ে নিজের ব্যাচের সেরাদের একজন ছিল ও।  বাড়ির জন্যে মন ভীষণ টানতো মেয়েটার, ছুটিছাটা পেলেই ছুট লাগাতো নেপালে। শ্রেয়া আর কোনদিন বাড়ি ফিরবে না, বাবা-মা’কেদেখার জন্যে আর কখনও ওর মন কাঁদবে না। মন খারাপের অনেক ঊর্ধ্বে চলে গেছে শ্রেয়া।

ঢাকা ক্লাবে চিকিৎসকদের একটা সেমিনারে যোগ দিতে ঢাকায় এসেছিলেন বি কে থাপা। নেপালের বিপি কয়রাল ক্যান্সার মেমোরিয়াল হাসপাতালের অনকো সার্জারী ইউনিটের প্রধান ছিলেন তিনি। এই ভদ্রলোক ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরো সার্জারির ছাত্র ছিলেন। বাংলাদেশের সঙ্গে তার যোপগাযোগটা পুরনো। এগারো তারিখে ঢাকা ক্লাবের সেই সেমিনারে তিনি পুরো বক্তব্যটা রেখেছিলেন বাংলায়। তার বাংলাদেশী বন্ধুরা খুবই অবাক হয়েছিলেন সেই বক্তব্য শুনে। তারচেয়েও বেশী অবাক হয়েছেন, যখন তারা জেনেছেন, নেপালে ফেরার পথে প্লেন ক্র্যাশে নিহত হয়েছেন বি কে থাপা! কয়েক ঘন্টা আগেও তারা যে মানুষটার সঙ্গে আড্ডা দিয়েছেন, খাওয়াদাওয়া করেছেন, বক্তৃতা শুনে পিঠ চাপড়ে দিয়েছেন, সেই মানুষটা হুট করে এভাবে না ফেরার দেশে চলে গেল!

রাগীব রাবেয়া মেডিকেলের সঞ্জয় পৌদেলকে আর কখনও টেবিল টেনিস খেলতে দেখবে না কেউ, সঞ্জয় মহারজনের সঙ্গে লাইব্রেরীতে দেখা হবে না ওর ব্যাচমেটদের। চারুর মিষ্টি হাসিতে মুগ্ধ হবে না ওর বন্ধুরা, মিলি মহারজনের বিশুদ্ধ ইংরেজী উচ্চারণটা কানে বাজবে সবার। ওরা পরীক্ষায় পাশ করবে, ডাক্তারী সার্টিফিকেট ইস্যু হবে ওদের নামে, কিন্ত সেটা কোনদিন ব্যবহার করবে না ওদের কেউই।

সঞ্জয়, অঞ্জলী, পূর্ণিমা, শ্বেতা, শ্রেয়াদের বাবা মায়েরা কোনদিন নিজেদের মনকে বোঝাতে পারবেন কি? ডাক্তারী পড়াতে বুকের মানিককে দূরদেশে পাঠিয়েছিলেন, সেই ভীনদেশে যাওয়াটাই যে কাল হলো, এই কষ্টটা ওরা কি করে সইবেন? ক’টা টাকা বেশী খরচ করে নেপালে পড়ালেই হয়তো তাদের সন্তানেরা আজ জীবিত থাকতো- এই ভাবনাটা কি প্রতিমূহুর্তে ওদের দংশন করবে না? ডেভিডসনের মেডিসিন বইটার লক্ষ-কোটি কপি বিক্রি হবে বিশ্বজুড়ে, হাজারো মুদ্রণ বের হবে। কিন্ত ত্রিভূবন এয়ারপোর্টের সেই পুড়ে যাওয়া কপিটার মধ্যে মিশে থাকা আবেগটুকু আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না কখনও।

ছবি কৃতজ্ঞতা- বাংলা ট্রিবিউন

Comments
Spread the love