নেপালের নির্বাচনে বামপন্থীদের বিরাট বিজয়ে আমাদের দেশের বামপন্থীদের আনন্দিত হওয়ার সুযোগ আছে কি? অবশ্য আনন্দিত হতে কোন বাধা নেই,আনন্দিত হওয়ার জন্য কোন নির্দিষ্ট নিয়মও নেই। তবে এটাকে নিজেদের বিজয় ভেবে নিলে সমস্যা! পশ্চিমবঙ্গেও এক সময় কমিউনিস্টরা বা কমিউনিস্ট নামধারীরা শাসন করেছে, তাতে খুব একটা উনিশ-বিশ হয়নি।

নেপালের বামপন্থী জোট- যার মধ্যে একটি মার্ক্সিস্ট-লেনিনিস্ট, আরেকটি মাওইস্ট- তাদের বিজয় এক রকম সুনিশ্চিত ছিল। নির্বাচন পূর্ববর্তী সময়ের পত্র-পত্রিকা দেখে যা বুঝলাম। নেপাল একটি পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বিগত কয়েক বছর ধরেই। রাজতন্ত্র ভেঙে সেখানে গণতন্ত্র এসেছে, নতুন সংবিধান গৃহীত হয়েছে, রাষ্ট্রধর্ম বাদ দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে, শান্তিপূর্ণ ভাবে নির্বাচন সম্পাদন করেছে এবং এরই ধারাবাহিকতায় বামপন্থী জোট ক্ষমতায় এসেছে।

এরই মধ্যে নেপাল শিকার হয়েছে শতাব্দীর অন্যতম ভয়াবহ ভূমিকম্পের, যেখানে প্রাণ হারিয়েছে প্রায় ৯ হাজার মানুষ। সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত নেপালের মাত্র ৪ শতাংশ পুনঃনির্মান করা হয়েছে এখন পর্যন্ত। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দেশটির উন্নয়নের পথে প্রধাণ বাঁধা হিসেবে দন্ডায়মান ছিল। সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকার গঠনের ফলে সেই বাঁধা কিছুটা হলেও দূর হবে বলেই মনে হয়।

অনেককে দেখলাম নেপালকে দক্ষিণ এশিয়ার ‘প্রথম কমিউনিস্ট রাষ্ট্র’ হিসেবে পরিচয় দিচ্ছে। কিন্তু নেপাল কি সাংবিধানিক ভাবে নিজেদের কমিউনিস্ট রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেছে? আমার জানা মতে করেনি। নেপাল Federal Democratic Republic , কমিউনিস্ট রাষ্ট্র নয়। কমিউনিস্টরা ক্ষমতায় আসা মানে নিশ্চয়ই কমিউনিস্ট রাষ্ট্র হয়ে যাওয়া নয়। এছাড়া এখানে আরো কথা আছে। ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল সাইন্সের প্রফেসর কৃ্ষ্ণ খানাল এর মত শুনলেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে, “the communist alliance is all about power consolidation and not about communism”.

এই বামজোটের প্রধাণ শরিক দুই দলের উভয়েরই প্রাইভেট ব্যাংকিং খাতে বিশাল শেয়ার আছে। এছাড়া শিক্ষা, চিকিৎসা, কনস্ট্রাকশন ইত্যাদি অনেক ক্ষেত্রেই প্রাইভেট খাতে তাদের বিনিয়োগ আছে! নেপালের সাংবাদিক নারায়ন ওয়াগেল আল-জাজিরাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, “We don’t have left parties. We just have parties who call themselves the left” ঠিক আমাদের মতই, তাইনা?

কাজেই, বামপন্থীরা ক্ষমতায় গেছে, এখানে আসলে কমিউনিজমের বিজয় খোঁজাটা সমীচীন হবেনা। বামপন্থীদের বিজয় মোটামুটি অনুমিত ছিল তখন থেকেই, যখন তারা জোট গঠন করলো। এবং তাদের বিশাল বিজয়ের পিছনে মূল কারণও হচ্ছে এই জোট গঠন, এতে করে ভোট গুলো ভাগ হয়ে যায়নি। এককথায় বলা চলে, তাত্ত্বিক ভাবে মোটামুটি ভিন্ন দুই দলের নির্বাচনে বিজয়ের মূল কারণ হচ্ছে, ‘একতা’। এখন তারা কিভাবে দেশ পরিচালনা করে সেটাই মূল প্রশ্ন। বিদায়ী দল ‘নেপাল কংগ্রেস’ ছিল ভারতমুখী, আর নবনির্বাচিত বামজোট চীনমুখী। হিমালয়-কন্যা নেপালকে কেন্দ্র করে এই দুই বৃহৎ শক্তি তাদের সমীকরণ কিভাবে মেলায়, সেটাও দেখার বিষয়।

সত্যিকার অর্থে কমিউনিজম বলতে আমরা যা বুঝি, তা এক প্রকার ইউটোপিয়া মাত্র। কমিউনিস্ট রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মূল অন্তরায়- মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি, সীমাহীন আকাঙ্ক্ষা। তারপরেও বামপন্থীরা মেহনতি মানুষের কথা বলে, তাদের জন্য কাজ করে, সাম্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখে। বিশ্বে সামগ্রিক ভাবে কমিউনিজম কোন পথে যাবে, এটা এখনো টিকে আছে কিনা, ভবিষ্যতে আসবে কিনা- সেটা নিয়ে বিস্তর আলোচনা হতে পারে, হচ্ছে। তবে সেই আলোচনা থেকে বাংলাদেশে বামপন্থী রাজনীতির কোন উপকার হবেনা। মুক্তিযুদ্ধের আগেকার সেই উত্তাল সময়ে, নেতৃত্ব যখন মধ্যবিত্ত নাগরিক দলের হাতে চলে গেছে, তখন থেকেই সাধারণ জনগণের সাথে দুরত্ব তৈরি হয়ে গেছে বামপন্থীদের। আর ঐ সময় থেকেই বাংলাদেশে রাজনীতির ধরণ ও পথ নির্ধারিত হয়ে গেছে।

আদর্শ, দেশপ্রেম এবং মানবতার চেতনায় উজ্জীবিত হয়েও সাধারণ মানুষের কাছে দেশের বামপন্থী দল গুলোর কোন গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়নি। তেল-গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়লে এই বামপন্থীরাই প্রতিবাদ করে, পুলিশের মার খায়, কিন্তু জনগণের মনে তাদের জন্য কোন নির্দিষ্ট স্থান সৃষ্টি হয়না। উন্নাসিক ভাবে এটাকে অস্বীকার না করে, অন্যের উপরে দোষ না চাপিয়ে, নির্মোহ ভাবে এর কারণ খোঁজা দরকার। বিশাল কোন অঘটন না ঘটলে, দেশের নেতৃত্ব দেবে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর নাগরিক দল গুলোই- আরো বহুকাল। ভারত ও নেপালে বামপন্থীদের যে অবস্থান আছে, বাংলাদেশে তার সিকিভাগও গড়ে ওঠেনি। তাই তুলনাটা ঠিক না হলেও, উদাহরণ দেবার জন্য বলা যায়, নেপালে বামপন্থীদের জয়ের বড় কারণ হচ্ছে তাদের ঐক্য। আর আমাদের এখানেও বামপন্থীদের ঐক্যের কথা শোনা যায়। যেমন- গত দু মাসে তিনটি আলাদা আলাদা ‘বাম-ঐক্য’ গঠনের কথা শুনেছি!

নেপালি সাংবাদিক নারায়ন ওয়াগেলের মত আমারও বলতে হয়, We don’t have left parties. We just have parties who call themselves the left. তারপরও ভারত কিংবা নেপালে তথাকথিত বামদের একটা অবস্থান আছে, যেটা আমাদের এখানে একেবারেই নেই। কেন নেই? অন্যের বিজয়ে অকারণ খুশি না হয়ে, এই উত্তরটা খোঁজা জরুরী।

ভূমিকম্প বিধ্বস্ত নেপাল জেগে উঠুক নতুন শক্তিতে। নতুন নির্বাচিত প্রতিনিধিরা দেশের উন্নয়নের জন্য কাজ করবে- এমনটাই আশা। নেপালের জনগণকে অভিনন্দন।

Comments
Spread the love