রানওয়ের একপাশ জুড়ে সারি সারি হলুদ ব্যাগ। মৃতদেহ রাখার জন্যে আনা হয়েছে ওগুলো। বিমানবন্দরের এক পাশে ছোটখাটো একটা জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড, ফায়ার সার্ভিসের গাড়ির তীক্ষ্ণ শব্দে শ্রবণশক্তি কমে আসে। কালো ধোঁয়ার দল মিছিল করে উঠে যাচ্ছে ওপরের দিকে। ত্রিভূবন এয়ারপোর্ট, কাঠমান্ডু। মৃত্যুরা আজ দুপুরে সশব্দে আছড়ে পড়েছিল সেখানে, ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের কিউ-৪০০ মডেলের সাদা বিমানটার রূপ নিয়ে! হিমালয়ের কোলে অবস্থিত বিমানবন্দরটা মূহুর্তেই পরিণত হলো মৃত্যু উপত্যকায়!

ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে দুপুর দুইটা বিশ মিনিটে আকাশে উড়েছিল বিমানটা, ৬৭ জন যাত্রী নিয়ে। দুপুর তিনটায় সেটা ত্রিভূবন এয়ারপোর্টের ওপরে পৌঁছায়। কিন্ত অবতরনের আগেই বিমানে দেখা দিয়েছিল যান্ত্রিক ত্রুটি। সাতষট্টি জন যাত্রী আর চারজন ক্রু নিয়ে সাদা রঙের বিমানটা হুট করেই আছড়ে পড়েছিল বিমানবন্দরের একপ্রান্তে। প্রথমে আগুন ধরেছিল চাকায়, তারপর সেটা ছড়িয়ে পড়ে বিমানের সব জায়গাতেই। গতি হারিয়ে এয়ারপোর্টের লাগোয়া একটা ফুটবল স্টেডিয়ামের পাশে এসে থেমেছিল বিমানটা, সেখানেই আগুনের লেলিহান শিখা গ্রাস করেছিল একাত্তর জন মানুষকে।

বিমানের বেশীরভাগ যাত্রীই ছিলেন বাংলাদেশী। অল্প কয়েকজন ছিলেন নেপালের নাগরিক। এদের মধ্যে কয়েকজন একটা প্রশিক্ষণে অংশ নিতে বাংলাদেশে এসেছিলেন। আবার, সিলেটের রাগীব রাবেয়া মেডিকেল কলেজের কয়েকজন নেপালী ছাত্র-ছাত্রীও সেই বিমানে করে নিজের দেশে ফিরছিলেন বলে জানা গেছে। দুর্ঘটনার পরপরই ঘটনাস্থলে উদ্ধার অভিযান শুরু করেছিল নেপালের সেনাবাহিনী। কিন্ত আগুনের তীব্রতার কাছে হার মানতে হয় শুরুতে। পুরো বিমানটাই ভয়াবহভাবে বিধ্বস্ত হয়েছিল, সেখানে কে জীবিত আর কে মৃত সেটা বোঝাই দুস্কর হয়ে উঠেছিল প্রথমদিকে।

ক্রমাগত পানি ছিটিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা গেছে, কিন্ত ততক্ষণে ঝরে পড়েছে অসংখ্য প্রাণ। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে নেপালি এক সাংবাদিক জানিয়েছেন, বাইশজনকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে, প্রায় সবার অবস্থাই আশংকাজনক। বাকীদের ভাগ্যে নির্মম পরিণতিই অপেক্ষা করছে হয়তো। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আর কাউকে জীবিত উদ্ধার করার আশা খুব কম। পুরো বিমানটাই ভয়াবহ একটা ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে। এখানে আর কারো জীবিত থাকার কোন সম্ভাবনা দেখছেন না তারা। বিমানের প্রায় পঞ্চাশজন যাত্রীর মৃত্যুসংবাদটা তাই মেনে নিতে হচ্ছে সবাইকে।

নেপালের সেনাবাহিনীও দাবী করছে, মৃতের সংখ্যা পঞ্চাশ ছাড়িয়ে যেতে পারে। সংবাদমাধ্যম এএফপি’র দাবী, নিহত হয়েছে কমপক্ষে চল্লিশ জন। আহতদের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে হাসপাতাল থেকে। এয়ারপোর্টের ট্র্যাফিক কন্ট্রোল টাওয়ারের সঙ্গে পাইলটের কথপোকথনের অডিও রেকর্ডেই বোঝা যাচ্ছিল, একটা ভুল বোঝাবুঝি তৈরী হচ্ছে। বেঁচে যাওয়া যাত্রীদের একজনের নাম বোহরা। নেপালি এই নাগরিক জানিয়েছেন- ‘ঢাকা থেকে স্বাভাবিকভাবেই উড্ডয়ন করে বিমানটি। কিন্তু ত্রিভুবন বিমানবন্দরে অবতরণের কিছুক্ষণ আগ থেকেই এটি বড়ধরণের কোনো সমস্যায় পড়েছে বলে মনে হয়। এর একটু পরেই খুব ভয়ঙ্করভাবে কেঁপে ওঠে বিমানটি এবং বিকট শব্দে আছড়ে পড়ে।’ মাথায় ও পায়ে গুরুতর আঘাত পেয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন তিনি।

আমাদের দেশের ভ্রমণপিয়াসু মানুষদের জন্যে নেপাল বেশ পরিচিত একটা নাম। পাহাড়ে ঘেরা এই দেশটার সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে ট্যুরিস্টরা দলবেঁধে ছুটে যান সেখানে। মধুচন্দ্রিমার জন্যেও অনেকেই পছন্দের তালিকায় নেপালের নামটা সবার ওপরের দিকেই রাখেন। এভারেস্টের বিশালত্বের সামনে নিজের ক্ষুদ্রত্বকে অনুভব করতে সবাই ঘুরতে যান এই দেশটাতে।

আজকের বিমানেও হয়তো কোন নবদম্পতি ছিলেন, নতুন সংসার শুরুর প্রাক্কালে নিজেদের মতো করে প্রকৃতির সান্নিধ্যে খানিকটা সময়ে একান্তে কাটাতে তাদের কেউ হয়তো চেপে বসেছিলেন ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের বিমানটায়। কারো সাজানো সংসার এলোমেলো হয়ে গেছে মূহুর্তের ব্যবধানে, কারো বা সংসার জীবন শুরু হওয়ার আগেই শেষ হয়ে গেছে চিরতরে। একই পরিবারের ৩ বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তারা হলেন সানজিদা হক, স্বামী রফিকুজ্জামান ও তাদের সন্তান অনিরুদ্ধ। এই দুর্ঘটনার দায় কি কেউ নেবে? পুরনো লক্কড়ঝক্কড় বিমান কেন ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইটের বহরে, এই প্রশ্নের জবাব কি কেউ দেবে?

আগুনের লেলিহান শিখা নিভে গেছে অনেকক্ষণ আগেই। ত্রিভূবন এয়ারপোর্টে এখনও চলছে উদ্ধারকাজ, আহতদের আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছে হাসপাতালগুলোর বাতাস। হাসি হাসি মুখ করে যারা ছবি তুলে ফেসবুকে আপলোড দিয়েছিলেন কয়েক ঘন্টা আগেও, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে চেকইন দিয়েছিলেন, সেই মানুষগুলোর মধ্যে অনেকেই হারিয়ে গেছেন চিরতরে। এই কষ্টটা কি তাদের আপনজনেরা কোনদিন মেনে নিতে পারবেন? দুর্ঘটনার পেছনে কারো হাত থাকে না, কিন্ত সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা না হলে দুর্ঘটনা ঘটবেই, এই সতর্কতা অবলম্বন না করার কারণে হলেও তো কারো শাস্তি দাবী করা যায়?

Comments
Spread the love