রিডিং রুমলেখালেখি

একটি গল্পকে যখন যেকোনো জনরাতে লেখা যায়!

রাস্তার পাশে আইসক্রিমওয়ালার ভ্যান দেখে কালো রঙের গাড়িটা ব্রেক কষে থামলো। দরজা খুলে হুড়মুড় করে নামলো দুই ভাই বোন- নাবিলা ও অপু। বিরাট বড়লোকের দুই সন্তান। তারা দুজনে দুটো কোন আইসক্রিম কিনে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে মজা করে খেতে লাগলো।

(গল্পটা এতটুকু লেখার পর মনে হলো- চাইলে গল্পটাকে যেকোনো জনরাতে লেখা যায়! চলুন দেখি কোন জনরাতে কেমন হয় গল্পটা!)

#জীবনধর্মী:

একটু দূরে, ফুটপাতের উপর বসে আছে তাদের সমবয়সী একটি ছেলে। খালি গা, নোংরা হাফ প্যান্ট পরনে। বুভুক্ষের মতো তাকিয়ে থেকে তাদের আইসক্রিম খাওয়া দেখছে। জিভ বের করে ঠোঁট চাটছে।

ছেলেটিকে দেখেও না দেখার ভান করলো নাবিলা ও অপু। আইসক্রিম খাওয়ার পর কেএফসিতে বার্গার খেতে যাবে তারা। হাতে সময় কম! অথচ তারা জানে না, গত দুই দিন যাবত কোন দানাপানি পড়েনি ঐ অসহায় ছেলেটির পেটে!

#হরর:

হঠাৎ নাবিলার চোখে পড়লো- একটু দূরে, ফুটপাতের উপর বসে আছে তাদের সমবয়সী একটি ছেলে। ছেলেটার চাহনির মধ্যে এমন কিছু আছে যা দেখে ভয় পেয়ে গেলো নাবিলা! চোখ দুটো কেমন লাল লাল! দাতগুলো কালো!

নাবিলা তার ভাইয়ের হাত ধরে বললো, “ভাইয়া দেখ! ঐ যে ওখানে একটা ছেলে খালি গায়ে বসে আছে। কিভাবে যেন তাকাচ্ছে আমার দিকে! খুব ভয় করছে”।

নাবিলার আঙুল অনুসরণ করে ফুটপাতের দিকে তাকালো অপু। এবং চমকে উঠলো সাথে সাথে!

যায়গাটা খালি! কেউ বসে নেই ফুটপাতে। তাহলে কাকে দেখছে নাবিলা?

#সায়েন্স_ফিকশন:

হঠাৎনাবিলার চোখে পড়লো- একটু দূরে, ফুটপাতের উপর বসে আছে তাদের সমবয়সী একটি ছেলে। ছেলেটার চাহনি দেখে নাবিলার মায়া হলো খুব। কেমন ড্যাপ ড্যাপ করে তাকিয়ে আছে! কতদিন যেন খায় না! মনে হচ্ছে খুব গরীব পরিবারের সন্তান।

নাবিলা আর একটা আইসক্রিম কিনে এগিয়ে গেলো ছেলেটির দিকে। বাড়িয়ে ধরে বললো, “এই নাও, আইসক্রিম খাও”।

ছেলেটা যান্ত্রিক কণ্ঠে বলে উঠলো, “মাফ করবেন ম্যাম। আমি ওমেগা ওয়ান থ্রি নাইন। আমাকে খাদ্যদ্রব্য গ্রহন করার ক্ষমতা দেওয়া হয়নি!”

হতাশায় কাঁধ ঝুলে পড়লো নাবিলার। “এইটাও তাহলে সত্যিকারের গরীব মানুষ না!”

এই ওমেগা রোবটগুলোকে নিয়ে হয়েছে যত জ্বালা! পৃথিবীতে এখন আর গরীব মানুষ নেই। তাই এই রোবটগুলোকে বানানো হচ্ছে গরীব মানুষের মতো করে। যাতে মানুষের মধ্যকার মানবিক গুণাবলী অক্ষুণ্ণ থাকে! এটা কোন কথা?

#থ্রিলার:

হঠাৎ নাবিলার চোখে পড়লো- একটু দূরে, ফুটপাতের উপর বসে আছে তাদের সমবয়সী একটি ছেলে। ছেলেটার চাহনি দেখে নাবিলার মায়া হলো খুব। কেমন ড্যাপ ড্যাপ করে তাকিয়ে আছে! মনে হচ্ছে কতদিন যেন খায় না! মনে হচ্ছে খুব গরীব পরিবারের সন্তান।

নাবিলার মনে হচ্ছে- এই ছেলেটাকে আগেও দেখেছে সে। কিন্তু কোথায় দেখেছে মনে করতে পারছে না! সে একটা আইসক্রিম কিনে নিয়ে এগিয়ে গেলো ছেলেটির দিকে। বাড়িয়ে ধরে বললো, “এই নাও, আইসক্রিম খাও”।

ছেলেটা প্যান্টের পকেটে হাত ঢোকালো। হাতে বেরিয়ে এলো একটা চাকু। নাবিলা কিছু বুঝে ওঠার আগেই চাকুটা আমূল গেঁথে গেলো তার পেটে। মরণ যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল সে। দু’হাতে পেট চেপে বসে পড়লো।

ততক্ষনে অপু ছুটে এসেছে। বোনকে পেছন থেকে জাপটে ধরলো। নাবিলার পেট থেকে অবিরাম রক্তের ধারা বের হচ্ছে দেখে কেঁদে ফেললো সে। ঘাতক ছেলেটির দিকে তাকিয়ে কান্না জড়ানো কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো- “কেন?”

ছেলেটির ঠোঁটের কোনে তিক্ত হাসির রেখা। বললো, “গত বছর তোরা গাড়ি চাপা দিয়ে আমার বাবাকে মেরে ফেলেছিলি। অনেক বিচার চেয়েও পাইনি! আজ তাই নিজ হাতে শোধ নিলাম!”

#রোমান্টিক:

হঠাৎ নাবিলার চোখে পড়লো- একটু দূরে, ফুটপাতের উপর বসে আছে তাদের সমবয়সী একটি ছেলে। ছেলেটার চাহনি দেখে নাবিলার মায়া হলো খুব। কেমন ড্যাপ ড্যাপ করে তাকিয়ে আছে তার দিকে! চোখের পলকও পড়ছে না!

নাবিলা তার ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললো, “ভাইয়া, দেখ, ছেলেটা কেমন অসহায় ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে জীবনে কখনও আইসক্রিম খায়নি”।

অপু ঘৃণায় নাক সিটকালো। “এই সব গরীব মিসকিন দেখলে তোর এত মায়া কোত্থেকে আসে বলতো? আমার তো এদের দেখলেই মেজাজ খারাপ হয়!”

“ছেলেটাকে একটা আইসক্রিম খেতে দেই?”

“তোর ইচ্ছা হলে তুই দে। আমি গাড়িতে গিয়ে বসলাম”। বলে অপু গট গট করে হেঁটে গাড়ির ভেতর গিয়ে বসলো।

নাবিলা একটা আইসক্রিম কিনে নিয়ে এগিয়ে গেলো ছেলেটির দিকে। কপট রাগে ভ্রু কুঁচকে বললো, “তুমি একটা বদ্ধ পাগল!”

ছেলেটি উঠে দাঁড়ালো। হাত বাড়িয়ে নাবিলার একটা হাত ধরলো। মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বললো, “পাগলামি ছাড়া উপায় কি বলো? তোমাকে না দেখে এক মুহুর্ত থাকতে পারি না! আর তোমার ঐ ভাইটা সারাক্ষণ তোমার সাথে আঠার মতো লেগেই থাকে!”

#রম্য:

একটু দূরে, ফুটপাতের উপর বসে আছে তাদের সমবয়সী একটি ছেলে। খালি গা, নোংরা হাফ প্যান্ট পরনে। বড়লোকের দুই সন্তানের আইসক্রিম খাওয়া দেখে খুব হাসি পাচ্ছে তার। মনে হচ্ছে দুইটা ছাগলের বাচ্চা আইসক্রিম খাচ্ছে! তাদের দেখে ছেলেটিরও খুব ইচ্ছে করছে আইসক্রিম খেতে। কিন্তু খাবে কি করে? পকেটে যে একটা পয়সাও নেই!

হঠাৎ একটা বুদ্ধি এলো ছেলেটির মাথায়। সে উঠে গিয়ে নাবিলা আর অপুর সামনে দাঁড়ালো। ব্যাঙের মতো কয়েকবার তিড়িং বিড়িং লাফ দিলো।

তার এমন অভিনব লাফানো দেখে চোখ কপালে উঠলো নাবিলার। হতবাক কন্ঠে বললো, “ভাইয়া দেখ! কি সুন্দর ব্রেক ড্যান্স দিচ্ছে এই ছেলেটা!”

অপু ছেলেটির দিকে তাকিয়ে বললো, আচ্ছা, “তুমি কি আমাদের ব্রেক ড্যান্স শেখাবে? আমাদের খুউব শখ!”

প্ল্যানে কাজ হয়েছে! ছেলেটা দাঁত কেলিয়ে হাসলো, “শিখামু, আগে একটা আসকিরিম খাওয়া!”

#রহস্য:

হঠাৎ নাবিলার চোখে পড়লো- একটু দূরে, ফুটপাতের উপর বসে আছে তাদের সমবয়সী একটি ছেলে। ছেলেটার চাহনি দেখে নাবিলার মায়া হলো খুব। কেমন ড্যাপ ড্যাপ করে তাকিয়ে আছে! মনে হচ্ছে খুব গরীব পরিবারের সন্তান। জীবনে কখনও আইসক্রিম খেয়েছে কি না সন্দেহ!

নাবিলা আর একটা আইসক্রিম কিনে এগিয়ে গেলো ছেলেটির দিকে। বাড়িয়ে ধরে বললো, “এই নাও, আইসক্রিম খাও”।

ছেলেটা আইসক্রিম হাতে নিলো।

নাবিলা ভেবেছিলো ছেলেটি আইসক্রিম পেলে গোগ্রাসে খেতে শুরু করবে। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে ছেলেটা আইসক্রিম হাতে নিয়ে উদাস চোখে তাকিয়ে থাকলো। সে জিজ্ঞেস করলো, “খাচ্ছ না কেন? মন খারাপ?”

ছেলেটা জবাব দিচ্ছে না।

পাশ থেকে অপু নাবিলার হাত ধরে টান দিলো। “মনে হয় পাগল। চলতো এখান থেকে”।

দুই ভাই-বোন গাড়িতে উঠে বসলো। নাবিলা বার বার ঘাড় ঘুড়িয়ে ছেলেটাকে দেখছে। ছেলেটা এখনও খাচ্ছে না আইসক্রিম, তাকিয়ে আছে উদাস হয়ে।

গাড়িটা দৃষ্টির আড়ালে চলে যেতেই উঠে দাঁড়ালো ছেলেটি। আইসক্রিম ওয়ালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো, আইসক্রিমটা বাড়িয়ে ধরে বললো, “আব্বা, এই লও। থুইয়া দেও”।

আইসক্রিমওয়ালা বিরক্তমুখে বললো, “বারবার থুইয়া দিলে মাইন্সে সন্দেহ করবো। এইটা খাইয়া ফালা!”

ছবি কৃতজ্ঞতা- জাকিয়া রহমান তামান্না

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close