সিনেমা হলের গলি

‘নায়ক’ নন বলেই কি ‘শ্রেষ্ঠ অভিনেতা’ নন বাবু?

যেকোন কল্পনাপ্রসূত শিল্পকর্ম, হোক সেটি নাটক, চলচ্চিত্র, উপন্যাস বা অন্য যেকোন মাধ্যম, সেখানে সত্যিকারের ‘নায়ক’ কে, তা নিয়ে আমাদের অনেকের মধ্যেই একটি মিস-কনসেপশন রয়েছে। আমরা মনে করি কাহিনীর যে প্রোটাগোনিস্ট, অর্থাৎ যাকে কেন্দ্র করে কাহিনী আবর্তিত হচ্ছে, সবচেয়ে বেশি সময় যার উপর ফোকাস ধরে রাখা হচ্ছে, সে-ই বুঝি নায়ক। কিন্তু একটি জিনিস আমাদের মাথায় থাকে না যে যাকে আমরা তথাকথিত নায়ক বলে মনে করছি, সে তো মূলত নায়ক হয়ে উঠছে কাহিনী বা গল্পের প্রয়োজনেই।

আমাদের দেশে, বা উপমহাদেশের আরও কিছু ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে কিছু কিছু ফর্মুলা ছবি হয়ত নির্মিত হয় যেখানে কাহিনীর কারণে কেউ কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে ওঠে না, বরং একটি চরিত্রকে মূল কেন্দ্র ধরে, তার চারপাশে নানা মালমশলা যোগ করেই একটি কাহিনী গড়ে তোলা হয়। আমাদের আলোচনা সেই ধরণের চলচ্চিত্র বা শিল্পমাধ্যম নিয়ে নয়। আমরা কথা বলছি সেই ধরণের শিল্প নিয়ে, যেখানে কাহিনী বা গল্পই মূল প্রাণ। কাহিনীর জোরেই যেখানে একটি নাটক বা চলচ্চিত্র বা উপন্যাস এগিয়ে চলে। এ ধরণের শিল্পমাধ্যমে মূল নায়ক বলতে গল্প বা কাহিনীকেই বোঝা উচিৎ, অন্য কোন কিছুকেই নয়।

কিন্তু বাস্তবে তেমনটি হতে দেখছি কই! সদ্য ঘোষিত জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের দিকেও যদি আমরা তাকাই তো দেখতে পাব, দেশের সবচেয়ে জ্ঞানী-গুণি চলচ্চিত্রবোদ্ধা ব্যক্তিদের নিয়ে গড়ে তোলা নির্বাচক প্যানেলও চিরাচরিত মিস-কনসেপশনেরই বশবর্তী হয়ে গল্পের নায়ক বলতে গল্পটিকেই না বুঝে, সেটির প্রধান চরিত্রকে বুঝছেন। তাই তো ২০১৬ সালের সেরা অভিনেতা কে, তা বের করতে গিয়ে তারা বেছে নিয়েছেন অমিতাভ রেজা চৌধুরী পরিচালিত ‘আয়নাবাজি’ চলচ্চিত্রের কেন্দ্রীয় চরিত্র চঞ্চল চৌধুরীকে। অথচ বেমালুম ভুলে গেছেন তৌকীর আহমেদের ‘অজ্ঞাতনামা’ চলচ্চিত্রে স্মরণকালের শ্রেষ্ঠ অভিনয়ের স্বাক্ষর রাখা ফজলুর রহমান বাবুর কথা।

হ্যাঁ, যদি ভিতরের কোন রাজনীতি এখানে প্রধান ভূমিকা পালন করে না থাকে, তবে আমরা ধরে নিতেই পারি যে বাবু ‘অজ্ঞাতনামা’র নায়ক নন বলেই তার ভাগ্যে জোটেনি সেরা অভিনেতার পুরস্কার। এবং তেমনটি ধরে নেয়ার পিছনে সঙ্গত কারণও রয়েছে। কেননা এই বাবুই কিন্তু আবার নাদের চৌধুরী পরিচালিত ‘মেয়েটি এখন কোথায় যাব’-তে অভিনয়ের সুবাদে সেরা পার্শ্ব-অভিনেতার পুরস্কার পেয়েছেন। অথচ ‘মেয়েটি এখন কোথায় যাব’-ই শুধু নয়, এমনকি ‘আয়নাবাজি’র চঞ্চল চৌধুরীর চেয়েও ‘অজ্ঞাতনামা’-য় অনেক বেশি উজ্জ্বল ছিল বাবুর অভিনয়, যে কথার সাথে একমত হবেন চলচ্চিত্র সংস্লিষ্ট সকলেই।

এমনকি বাবুর নিজেরও আশা ছিল, ‘অজ্ঞাতনামা’-র কল্যাণেই সেরা অভিনেতার জাতীয় পুরস্কারটি পাবেন তিনি। কিন্তু দুঃখের বিষয়, নায়ক না হওয়ার কারণে সেই মনস্কামনা পূরণ হলো না তার। এ ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘তৌকীর আহমেদ পরিচালিত অজ্ঞাতনামা ছবিতে অভিনয়ের পর অনেকের মতো আমারও ধারণা ছিল, হয়তো এই ছবিতে অভিনয়ের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেতে পারি। কিন্তু আমি পুরস্কার পেতে যাচ্ছি মেয়েটি এখন কোথায় যাবে ছবিটির জন্য। পুরস্কারপ্রাপ্তি অবশ্যই আনন্দের। মেয়েটি এখন কোথায় যাবে ছবির নির্মাতা নাদের চৌধুরী, প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান জাজ মাল্টিমিডিয়ার কর্ণধার আব্দুল আজিজ ভাইয়ের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাই। তবে অজ্ঞাতনামা ছবিতে অভিনয়ের জন্য পুরস্কার না পাওয়ার আক্ষেপটাও থেকে গেলো।’

এরপর বাবুর নিজের কন্ঠেও আক্ষেপের সাথে উঠে আসে আমাদের দেশীয় সংস্কৃতিতে নায়কের সাথে পার্শ্ব অভিনেতাদের বিভাজনের বিষয়টি। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে চলচ্চিত্রের নায়ক না হলে যেন শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার দেয়া যাবে না। এমন একটি ধারণার চর্চা রয়েছে। সিনেমার চরিত্রও যে, গল্প এবং অভিনয় গুণে নায়ক হতে পারে, সেটা এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আমাদের শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার পাবেন ছবির নায়ক, আর বাকি সবাই যেন পার্শ্ব অভিনেতা। এছাড়া মঞ্চ অভিনেতা, টেলিভিশন অভিনেতা, চলচ্চিত্র অভিনেতা বলে একটা বিভাজন তো রয়েছেই।’

বাবু সেরা অভিনেতা হিসেবে জাতীয় পুরস্কার পান বা না পান, তাতে কিন্তু সময়ের সেরা অভিনেতা হিসেবে তার লিগ্যাসিতে বিন্দুমাত্র প্রভাব পড়বে না। বর্তমানে ছোট পর্দা ও বড় পর্দায় দুই জায়গাতেই কাজ করছেন এমন অভিনেতাদের মধ্যে বাবুর উপরে যে আর কেউ নেই, সেটি একবাক্যে মেনে নেবেন সকলেই। বিগত বছরগুলোতে বাবু যেখানেই হাত দিয়েছেন, সেখানেই যেন সোনা ফলেছে। এমনকি গতকাল (শুক্রবার, ৬ এপ্রিল)-ও মুক্তিপ্রাপ্ত গিয়াস উদ্দিন সেলিম এর বহুলন প্রতীক্ষিত ‘স্বপ্নজাল’ ছবিতে অনবদ্য অভিনয় করে সব আলো নিজের দিকে টেনে নিয়েছেন তিনি। তাই তার সামর্থ্য নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলার কিছু নেই।

তবু একটি আক্ষেপ অনন্তকাল ধরে ঠিকই পোড়াবে। বাবুকে, পাশাপাশি তার ভক্তদেরও, কিংবা নিতান্তই নিরপেক্ষ চলচ্চিত্রা অনুরাগীদেরও। আর তা হলো, এখন পর্যন্ত নিজের অভিনয়জীবনের সেরা কাজটি ‘অজ্ঞাতনামা’ ছবিতে করার পরও, নিজের অভিনয় দক্ষতার শতভাগ উজাড় করে দিয়ে পর্দায় কেফায়েত প্রামাণিক চরিত্রটিকে জীবন্ত করে তোলার পরও, স্রেফ ‘নায়ক’ না হওয়ার সুবাদে সেরা অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারটি নিজের ঝুলিতে পোরা হলো না তার।

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close