একজন চা বিক্রেতার মাসিক আয় কত হতে পারে? দশ-বিশ-ত্রিশ হাজার টাকা? আমি একজনকে চিনি, যিনি শুধু চা বিক্রি করেই ধানমন্ডির মতো এলাকায় একটা ছোটখাটো ফ্ল্যাটের মালিক হয়েছিলেন। তবে মহারাষ্ট্রের নবন্ত ইউলের কীর্তি ছাপিয়ে গেছে সব কিছুকেই। শুধু চা বিক্রি করেই কোটিপতি হওয়া তো চাট্টেখানি কথা নয়! লোকে শুনলে বিশ্বাসও করতে চায় না সহজে। এই অবিশ্বাস্য কাজটাই করেছেন নবনাথ ইউলে নামের এই মারাঠি ভদ্রলোক।

ভারতের পুনেতে সবচেয়ে বিখ্যাত চায়ের দোকানটার নাম ইউলে টি স্টল, সেটার মালিক এই নবনাথ ইউলে। একটা-দুটো নয়, তার দোকানের তিনটে শাখা আছে পুনের তিনটে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায়। বারোজন কর্মচারী আছে তার অধীনে, মাসে বারো লক্ষ রুপি আয় হয় এই দোকানগুলো থেকে, বছরে যেটা প্রায় দেড় কোটি রুপির কাছাকাছি! পড়ন্ত বিকেলে চায়ের কাপে ঠোঁট ভেজাতে লোকজন দলে দলে ভীড় জমায় ইউলে টি-স্টলের সামনে, মোটামুটি লাইন লেগে যায় বলা চলে!

অথচ শুরুতে এরকম কিছুই ছিল না। ২০১১ সালে ছাপরা একটা টং দোকানে চা বিক্রি শুরু করেছিলেন নবনাথ, নিজেরও বোধহয় ধারণা ছিল না, তার বানানো চা এভাবে মন জয় করে নেবে মানুষের! সাধারণ চা দোকানদারদের চেয়ে খানিকটা ভিন্নভাবে চা বানাতেন নবনাথ, সেই চায়ে মেশাতেন নানা রকমের মশলা। সেই ছোট্ট দোকানটাই একসময় পাড়ার লোকজনের আড্ডার কেন্দ্রস্থল হয়ে উঠলো, আশেপাশের বাকী সব দোকান ফেলে সবাই ছুটে আসতে শুরু করলো নবনাথের চায়ের দোকানে।

নবন্ত ইউলে, পুনে, চা, কোটিপতি

লাভের মুখ দেখতে শুরু করলেন নবনাথ, তার সুস্বাদু আর সুগন্ধী চায়ের স্বাদে তখন মাতোয়ারা পুনের লোকজন। তিনি ভাবলেন, এই ছোট্ট চৌহদ্দীতে আটকে থাকার তো মানে নেই কোন, পুরো পুনের মানুষকেই তিনি নিজের চায়ের স্বাদে বিমোহিত করতে চাইলেন, ধরতে চাইলেন বড়সড় এই বাজারটা। আরও দুটো শাখা খুললেন নবনাথ, ইউলে টি-স্টল নামের সেই দোকানগুলো এখন পুনের চা-খোর লোকজনের শিকারের কেন্দ্রস্থল হয়ে উঠেছে। নিজের রেসিপিতে বানানো চা দিয়ে নবনাথ ইউলে জয় করে নিয়েছেন পুনের লাখো মানুষের হৃদয়। পনেরো থেকে পঞ্চাশ- বয়সের কোন সীমারেখা নেই, লোকজন ভীড় জমিয়ে আয়েশ করে খাচ্ছেন তার দোকানের চা। এই বিষয়টা নবনাথের জন্যে দারুণ তৃপ্তির।

একদিনে অবশ্য এমন সুস্বাদু চা বানানোতে হাত আসেনি নবনাথের, এটার পেছনে খাটতে হয়েছে দীর্ঘদিন। সাফল্য তো নিমেষেই হাতে ধরা দেয়না। প্রায় চার বছর ধরে চা নিয়ে গবেষণা করেছেন নবনাথ, বিভিন্ন ধরনের চা পাতা ব্যবহার করেছেন, দুধ-চিনি-মশলার অনুপাত ঠিক করেছেন সময় নিয়ে। তারপর কাজে নেমেছেন। নামার পরেও লোকের জিভের টেস্টটা বুঝতে সময় লেগেছে। তবে একবার সেটা আয়ত্ব হবার পরে লক্ষী ফুলেফেঁপে এসেছে তার ঘরে।

উপমহাদেশের মানুষকে চায়ের নেশা ধরিয়ে দিয়ে গিয়েছিল ইংরেজরা। এমন মানুষও আছেন, যারা একটা দিন চা না খেয়ে থাকতেই পারেন না। চা যেন কারো জন্যে প্রাণঘাতি রোগের ঔষধস্বরূপ! ভারতের মানুষদের এই চা-প্রীতিটাকেই ব্যবসায় রূপ দিতে চেয়েছিলেন নবনাথ। জানতেন, কাজটা সহজ কিছু হবে না। মানুষের মন জয় করা তো মুখের কথা নয়। তাছাড়া চায়ের স্বাদের ব্যপারে সবাই বেশ খুঁতখুঁতে হয়ে থাকেন। পুরো ভারতে চা খাওয়ার মতো কোন ব্র‍্যান্ডশপ ছিল না সেই সময়ে। নবনাথ চেয়েছিলেন, এই শূন্যতাটা তিনি নিজেই পূরণ করবেন। ইন্ডিয়া টাইমসকে নবনাথ বলছিলেন- “আমাদের এখানে চায়ের কোন বিখ্যাত ব্র‍্যান্ড নেই, অথচ পাকোড়া থেকে শুরু করে কাবাবেরও দারুণ সব নামকরা রেস্তোরাঁ আর দোকান আছে। আমি চেয়েছিলাম চা জিনিসটাকে ব্র‍্যান্ডে পরিণত করতে।” নিজের দেখা সেই স্বপ্নপূরণের পথে দারুণভাবেই এগিয়ে যাচ্ছেন নবনাথ।

নবন্ত ইউলে, পুনে, চা, কোটিপতি

প্রতিদিন নবনাথের তিনটে চায়ের দোকান থেকে গড়ে চার-পাঁচ হাজার কাপ চা বিক্রি হয়। নবনাথ এখন পুরো মহারাষ্ট্রজুড়ে প্রায় একশোটা আউটলেট খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, এর ফলে অনেক বেকার যুবকের কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরী হবে। আর এতে করে তার নিজের লাভের অঙ্কটাও কয়েকগুণ বেড়ে যাবে অনায়াসে। ইউলে টি-স্টলের এই আউটলেটগুলোতে যারা কাজ করবেন, তাদের প্রশিক্ষন দেবেন নবনাথ নিজেই। পুনের সীমানা ছাড়িয়ে ইউলে টি-স্টলকে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে নিয়ে যাওয়াটাই এখন তার লক্ষ্য। লোকে যেন ভারতীয় চা বলতে এক নামে ইউলে’র চা-কেই চেনে, সেটাই তিনি চান।

কিছুদিন আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সেদেশের বেকার যুবকদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, চাকুরী না পেলে তারা যেন পাকোড়া বিক্রির কাজে হলেও নেমে পড়েন। এতে অসম্মানের কিছু নেই। দিনে দুই হাজার টাকার পাকোড়া বিক্রি করে নিজের খরচ জোটাতে পারলে সেটা মন্দ কিছু তো নয়। সেই মন্তব্যটা সমালোচিত হয়েছিল। অনেকেই বলেছিলেন, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নিজে রাস্তায় নামলেও পাকোড়া বিক্রি করে একদিনে দুই হাজার টাকা আয় করতে পারবেন না, তিনি অন্যদের মিথ্যে আশা দেখান কেন? পাকোড়া বিক্রি করে দুই হাজার টাকা আয় করা যাবে কি যাবে না সেটা তর্কের বিষয়, তবে নবনাথ ইউলে নামের এই উদ্যমী মানুষটা দেখিয়ে দিয়েছেন, শুধু চা বিক্রি করেই বছরে কোটি কোটি টাকা আয় করা যায়!

তথ্যসূত্র- দ্য ইকনোমিক টাইমস, ইন্ডিয়া টাইমস, টাইম অব ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়া টুডে।

Comments
Spread the love