সরকারকে উৎখাত করার বুদ্ধিটা সরকারকেই কে দিয়েছে?

Ad

সম্প্রতি সরকার গুলশান-বনানীর কূটনৈতিকপাড়ার ৫৫২টি ‘অবৈধ’ প্রতিষ্ঠান উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় চলছে ব্যাপক আলোচনা। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধানটি বুমেরাং হয় কিনা, তা নিয়ে আশংকা ব্যক্ত করেছেন অনেকেই। সামগ্রিক পরিস্থিতিতে লিখেছেন- শামস রাশীদ জয়  

শামস রাশীদ জয়

গুলশান বনানী এলাকায় বিদেশীদের জন্য ও বিদেশীদের দ্বারা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, হোটেল, রেস্টুরেন্ট, ক্লাব, সুপারশপ, স্কুল, ক্যাফে, ইত্যাদি একদিনে গড়ে ওঠেনি। তিন দশকের বেশী সময় ধরে গড়ে উঠেছে। ঢাকার অন্যান্য জায়গায় বিদেশীদের কর্মকান্ড কেন্দ্রীভূত না হয়ে এই এলাকায় হওয়ার একটাই কারণ – নিরাপত্তা, তথা চাঁদাবাজ, মাস্তান, ছিনতাইকারী ইত্যাদির প্রাদুর্ভাব না থাকা।

এখন, ঢাকার অন্যান্য জায়গায় একই রকম নিরাপত্তা ও জীবনমান নিশ্চিত না করেই গুলশান, বনানী, বারিধারা থেকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো উচ্ছেদ করার তোড়জোড় শুরু হয়েছে হোলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি আক্রমণের পর। এর মানে হলো গার্মেন্টস বায়ার, জনশক্তির রপ্তানিকারক, বিদেশী বিনিয়োগকারীদের ঢাকায় অফিস করা, ঢাকায় মিটিং করা, পরিবারকে ঢাকায় রাখা – এগুলো কঠিন বা অসম্ভব করে ফেলা।

উচ্ছেদের তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আমার জানামতে অনেকগুলোই বাণিজ্যিক প্লটে অবস্থিত ও বেশীরভাগই বৈধ প্রতিষ্ঠান। অনেকগুলোকেই বিভিন্ন সরকারের আমলে সরকারের মন্ত্রী থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যবহার করেছে। প্রায় সবগুলোতেই সরকার এতদিন বাণিজ্যিক বা প্রাতিষ্ঠানিক হারে বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, ফোন ও ইন্টারনেট সংযোগ বিক্রি করেছে। এই কয়েকশত প্রতিষ্ঠানকে ঢালাওভাবে ‘অবৈধ’ তকমা দিয়ে দেয়াটা হাস্যকর ও অনুভূতিহীনআমলা মানের।

আশ্চর্যের বিষয়, এই তালিকায় এই এলাকার আবাসিক প্লটে অবস্থিত বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জাকের পার্টি, ইত্যাদির অফিসের নাম নেই।

কয়েক দশক আগেই সরকার দ্বারা নির্ধারিত ও বাণিজ্যিক প্লট বরাদ্দ করা বাণিজ্যিক এলাকা ‘বনানী বা/এ’ নামক এলাকায় অবস্থিত প্রতিষ্ঠানও উচ্ছেদ নোটিশ পেয়েছে দেখলাম। এটা বিনিয়োগ বান্ধব দেশ হিসেবে বাংলাদেশের র‌্যাংকিং কমাবে। কারণ, পলিসি স্টেবিলিটি বা নীতি স্থিতিশীলতা এসব সূচকের একটা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

উচ্ছেদ অভিযানের এই আজব কান্ডের ফলে পোশাক রপ্তানী হুমকির মুখে পড়বে, জনশক্তি রপ্তানী বাধাগ্রস্ত হবে, নতুন বিদেশী বিনিয়োগের উৎসাহ কমবে, এই প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেক কর্মী বেকার হবে, গ্রাম থেকে বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়া লোকেরা হতাশাগ্রস্থ হবে, পোশাক কর্মীদের বেকারত্ব বাড়বে হুহু করে। আর এই এলাকা থেকে এই প্রতিষ্ঠানগুলো উচ্ছেদ করে দিলে বিদেশী কূটনীতিক ও উন্নয়নকর্মীরা এই দেশে পরিবার নিয়ে বসবাস করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন কিনা সেই আলোচনায় নাই বা গেলাম।

হ্যাঁ, অর্থনীতির এমন ধ্বস নামার পরিস্থিতিতে প্রাথমিকভাবে ধান্দা বাড়বে পেশাদার হতাশাব্যবসায়ীদের। তবে আসল লাভটা হবে জঙ্গিবাদের গডফাদারদের। সরকারেরই টিকে থাকাটা কঠিন হয়ে যাবে।

সরকারের এমন বারোটা বাজানোর বুদ্ধিটা সরকারকে কে দিয়েছে? পূর্তমন্ত্রী? রাজউক? না কি অন্য কেউ?

গতকাল পর্যন্ত এই উচ্ছেদ অভিযানের তোড়জোড়ের পর আজকেই দেখলাম পূর্তমন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির পুরনো একটা মামলা আজকেই চালু হয়েছে। উচ্ছেদ ঠেকাতে মামলা চালু হলো নাকি মামলা চালু ঠেকাতে উচ্ছেদের তোড়জোড় হয়েছে, নাকি অন্যকিছু?

আর রাজউক! পুরোপুরি আমলা চালিত যেই সংস্থাটির পিয়নও কোটিপতি হয়, যেই সংস্থাটির পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতির কারণে গুলশানসহ পুরো ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে জমির ব্যবহারে অনিয়ম হয়, সেই সংস্থাটি থেকে দুর্নীতিবাজদের উচ্ছেদ করে ও সংস্থাটি জনপ্রতিনিধিদের অধীনে এনে সুস্থ করার চেষ্টা না করে এসব বিচ্ছিন্ন উচ্ছেদ অভিযানে শুধু জনগণ আর অর্থনীতিই বিচ্ছিন্ন হবে, কাজের কাজ কিছু হবে না।

অথচ, উচিৎ ছিল সুনির্দিষ্টভাবে জঙ্গিবাদের সাথে জড়িত শুধু এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া। মাথা ব্যাথার কারণে মাথা কেটে ফেললে নতুন মাথা উঠবে, সেটা জঙ্গিবাদের মাথাই হবে।

জঙ্গিবাদের কারণে জীবন যাত্রা আমূল পাল্টে ফেললে জঙ্গিদেরই এক রকম জয় হয়। লাইফ শুড গো অন অ্যাজ ইট ইজ। নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাড়ুক এবং সেটায় জনগণকে সম্পৃক্ত করা হোক, জনগণ সেটা মানবে। জয় বাংলা বলেই জনগণ আগে বাড়বে, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সরকারের সাথে হাঁটবে। কিন্তু, উল্টো পথে হাঁটা নয়, প্লীজ।

প্রশ্নটা আবার করি: সরকারকেই উৎখাত করার বুদ্ধিটা সরকারকে কে দিয়েছে?

পুনশ্চঃ রাজউকের যেই কর্মচারীটির ব্যর্থতার কারণে ইতালীয় নাগরিক সিজার তাবেয়া খুন হবার সময় ঠিক সেই জায়গাটির সড়কবাতি নিভানো ছিল, সেই কর্মচারীটিকে কি উচ্ছেদ করা হয়েছে?

(এই লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। egiye-cholo.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে র মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতা নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে egiye-cholo.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না)

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...
Ad

এই ক্যাটাগরির অন্যান্য লেখাগুলো

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-

Ad