১৯৭০ সালের ৭ জুন, পল্টন ময়দানে জয়-বাংলা বাহিনীর (যার আগে নাম ছিলো জহুর বাহিনী) কুচকাওয়াজ হবে আর বঙ্গবন্ধু সেই কুচকাওয়াজ পরিদর্শন করবেন। ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি মনিরুল ইসলাম প্রধান সমন্বয়কারী। ৬ জুন রাতে হঠাৎ সিদ্ধান্ত, ওই কুচকাওয়াজে জয় বাংলা বাহিনীর একটা পতাকা থাকতে হবে, যেখানে গাঢ় সবুজের মাঝে থাকবে লাল বৃত্ত।

কাপড় জোগাড়ের জন্য রফিকুলকে বললেন মনিরুল। রফিকুল ছাত্রলীগের মধ্যে ‘লিটল কমরেড’ নামে পরিচিত। রফিক, জগন্নাথ কলেজের ছাত্র নজরুলকে নিয়ে নবাবপুর চষে বেড়ালেন, পেলেন না কালচে সবুজ কাপড়। কী আর করা! ফিরে এসে ঢুকলেন নিউ মার্কেটে। কিন্তু বিধিবাম, সাপ্তাহিক ছুটির কারনে মার্কেট বন্ধ।

এপোলো ফেব্রিক্সের মালিক লস্কর সাহেবের ছেলে ইকবাল ছিলেন রফিকের বন্ধু। রফিক ইকবালের বাসায় গিয়ে সব খুলে বললেন, ইকবালের বাবা চাবি দিয়ে দিলেন বিনা দ্বিধায়, নিউমার্কেটে এলেন আর সেখানেই খুঁজে পেলেন কালচে সবুজ কাপড়।

বলাকা বিল্ডিংয়ের তিনতলায় ছাত্রলীগ অফিসের পাশে পাক ফ্যাশন টেইলার্স, ওই দোকানের অবাংগালী দর্জী মোহাম্মাদ হোসেন, নাসির উল্লাহ আর আব্দুল খালেক পতাকাটি সেলাই করে দেন, রাত ততক্ষনে অনেক। লিটল কমরেড রফিক পতাকাটিকে খুব যত্নে ভাজ করে নিয়ে এলেন ইকবাল হলের ১১৬ নম্বর কক্ষে, এখানে থাকতেন ছাত্রলীগের সাধারন সম্পাদক শাজাহান সিরাজ।

হলের মধ্যে তখন উপস্থিত কাজী আরেফ, মনিরুল ইসলাম,আ স ম রব সহ আরো অনেক নেতাকর্মী। তারপরও সিনিয়র কারো অনুমতি দরকার। সবাই মিলে চলে গেল তিনতলার একটি কক্ষে, সেখানে প্রায়শই নিউক্লিয়াস হেড সিরাজুল আলম খান অবস্থান করতেন (তখন তিনি কাপালিক হিসেবে পরিচিত)। সব কিছু শুনে তিনি বললেন পতাকা যেভাবেই প্রদর্শন করো, ‘একেই বাংলাদেশের পতাকা হিসেবে মনে করা হবে। তাই লাল বৃত্তের মাঝে এক খন্ড বাংলাদেশ একে দাও যেটার রঙ যেন হয় সোনালী (সোনার বাংলা থেকে), যাতে কেউ এইটারে নিয়ে অপপ্রচার না চালাইতে পারে।’

এখন সমস্যা হলো কে আঁকবে এই পতাকায় একখানা সোনালী মানচিত্র? সলিমুল্লাহ হল শাখা ছাত্রলীগের সম্মেলন উপলক্ষে ব্যানার ফেস্টুন আঁকার জন্য কুমিল্লার ছাত্রনেতা শিব নারায়ন দাশ তখন ঢাকায়। মনিরুল ইসলাম, বাংলা বিভাগের ছাত্র ফজলুর রহমান বাবুলকে পাঠালেন। বাবুল এক দৌড়ে চলে গেলেন সলিমুল্লাহ হলে। সুমন মাহমুদেরর কামরা থেকে বগলদাবা করে নিয়ে এলেন শিব নারায়নকে। মানচিত্র আঁকা হবে, কিন্তু রং-তুলি কই? কামরুল আলম খান খসরু ছুটলেন কাঁচাবাজার। রাত্র প্রায় তিনটা, ঘুমিয়ে পড়েছেন দোকানী। কী আর করা, ডেকে তোলা হলো তাকে। খসরু নিয়ে এলেন রঙ, আর আঁকা হলো লাল বৃত্তের মধ্যে একটা স্বপ্নকে অথবা একটা মানচিত্রকে।

৭ জুন সকালে বৃষ্টি ছিলো, পল্টনে কুচকাওয়াজ চলছে। সবার সামনে আ স ম আব্দুর রব, তার পেছনেই খসরু। রব একটি লাঠিতে পেচানো পতাকা তুলে দিলেন বঙ্গবন্ধুর হাতে, বঙ্গবন্ধু খুলে দেখলেন আর কপালে হাত তুলে অভিবাদন গ্রহন করলেন কুচকাওয়াজের!

নাকি সালাম জানালেন বাংলাদেশের প্রথম পতাকাকে!

– নাজমুর হুদা

লেখক, বস্ত্র প্রকৌশলী

আপনার কাছে কেমন লেগেছে এই ফিচারটি?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-