অনুপ্রেরণার গল্পগুচ্ছতারুণ্য

কে এই নাস ডেইলি?

আমেরিকান লেখক নিক পিরোগের একটা থ্রি.এম সিরিজ আছে। থ্রিলার এই সিরিজের বইগুলো বাংলায় অনুবাদ করেন সালমান হক। বইগুলো অগণিত পাঠকের কাছে পৌঁছে যায়। অবস্থা এমন যে, নিক পিরোগই মনে করেন, তার নিজ দেশের তুলনায় বাংলাদেশেই যেন তার ভক্তের সংখ্যা বেশি। আমাদের দেশটা আসলে এমনি। কাউকে আপন করে নিলে, তাকে আমরা আলোচনায় রাখি, তাকে নিয়ে প্রচুর কথা বলি। যেমন নাস ডেইলি এবছর আমাদের দেশে অন্যতম আলোচিত ব্যাক্তিত্ব জনপ্রিয় কন্টেন্ট নির্মাতা, ইউটিউবার, ভ্লগার!

নাস ডেইলির বিশেষত্ব সবাই জানেন। তিনি প্রত্যেকদিন এক মিনিটের একটা ভিডিও প্রকাশ করেন। অনেক আকর্ষণীয় বিষয় কিংবা সাদামাটা বিষয়কেই আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপনার গুণের জন্য তার ভিডিও বহুল আলোচিত হয়। তিনি বিভিন্ন দেশ ঘুরে বেড়ান এবং সেসব দেশের ইন্টেরেস্টিং বিষয়গুলো তার এক মিনিটের ভিডিওতে তুলে ধরেন।

আগস্টে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময়টায় নাস ডেইলি একটা ভিডিও বানান। তার ভিডিওতে আন্দোলনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চিত্রগুলো দেখানো হয়। রাতারাতি ভাইরাল হয়ে যায় সেই ভিডিও। বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষই সেই ভিডিওর আগে পর্যন্ত চিনতেন না নাস ডেইলিকে। কিন্তু, সেই ভিডিও’র পর নাস ডেইলি এখন সোশ্যাল মাধ্যমে বাংলাদেশিদের কাছে পরিচিত মুখ।

কে এই নাস ডেইলি? নাস ডেইলির জন্ম ইসরায়েলে। কিন্তু, তার আসল নাম কিন্তু সত্যি সত্যি ‘নাস ডেইলি’ নয়। তার মূল নাম নুসায়ের ইয়াসিন। ইসরায়েলের আরাবায় জন্মগ্রহণ করেন এই মুসলিম ইউটিউবার। তবে, ছোটবেলায় তাকে দেখে কখনো মনে হয়নি, সে এতো কথা কখনো বলতে শিখবে একদিন। ভীষণ লাজুক আর ইন্ট্রোভার্ট ধরণের মানুষ ছিলেন ছোটবেলায়। অবশ্য, একসময় খোলস ভেঙ্গে বের হন। মানুষের সাথে মিশতে শুরু করেন। ভিডিও বানান, কথা বলেন। ঘুরে বেড়ান। এখন তিনি এতো হাসিখুশি থাকেন আর এতো কথা বলেন যে, তার ভিডিও দেখার পর আলাদা একটা এনার্জি তৈরি হয়। কারণ, তিনি যে ভীষণ এনার্জেটিক সেটা বোঝা যায় তার ভিডিওতে। তার এনার্জি ছড়িয়ে যায় ভিডিওর দর্শকদের মধ্যেও।

তার স্বপ্ন ছিল কোনো বিখ্যাত নামিদামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়বেন। আবেদন করেছিলেন হার্ভার্ডে। আবেদনপত্রে লিখেছিলেন, নিজের শৈশবের স্ট্রাগলের কথা, স্বপ্নের কথা। শুধু যে সুযোগই পেলেন তা নয়, হার্ভার্ডের লেখাপড়ার খরচ চালানোর স্কলারশিপও পেয়েছিলেন নাস। ২০১৪ সালে তার গ্র‍্যাজুয়েশন শেষ হয়। চাকরি নিয়েছিলেন একটা কোম্পানিতে সফটওয়্যার ডেভেলপার হিসেবে। বেতনও বেশ, বছরে ১২০০০০ ডলার! আপাতদৃষ্টিতে সুখী তরুণের জীবনচিত্র৷ সবাই হয়ত ঈর্ষাও করবে তাকে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, হাজার হাজার ডলারের চাকরি পেয়েছে, আর কি লাগে জীবনে!

Nas Daily, মাস ডেইলি, ট্রাবেলার, ইউটিউবার, কন্টেন্ট ক্রিয়েটর

কিন্তু, নাস কিংবা নুসায়ের ইয়াসিন হাঁপিয়ে গেলেন। ডেস্কের এককোনায় বসে থাকতে থাকতে তার খারাপ লাগলো। এই রুটিন মাপা জীবন তাকে কি আসলে সুখ দিচ্ছে? নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করলেন। তার মনে হলো, এটা তার কাজ নয়। তিনি দেশ বিদেশ ঘুরে বেড়াতে চান। জীবনকে সত্যিকার অর্থেই উপভোগ করতে চান। তাই সামর্থ্যের অতিরিক্ত পারিশ্রমিক পাওয়া সেই চাকরিটা ছেড়ে দিলেন। তবে চাকরি ছাড়ার আগে বেশ কিছু টাকা জমিয়ে নিয়েছিলেন। দেড় বছরে যখন ষাট হাজার ডলার জমলো, তখন ২০১৬। সাহস করে অফিসে চাকরি ছাড়ার পত্রটা দিয়ে আসলেন। তারপর বিমানের টিকেট আর ক্যামেরা নিয়ে ছুটলেন এয়ারপোর্টে। তাকে এই বিশ্বটা ঘুরে দেখতে হবে। এটাই যে লক্ষ্য!

এরপর শুরু হয় স্বপ্নের মতো এক যাত্রা। তিনি তার প্রত্যেকদিনকার গল্প ভিডিও আকারে প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেন। খুলেন ‘নাস ডেইলি’ নামে একটি পেজ। নুসায়ের ইয়াসিনের পেজের নাম কেনো নাস ডেইলি? কারণ, আরবিতে নাস মানে জনগণ। নুসায়ের প্রতিদিন যে জনগণের সাথে কমিউনিকেশন করছেন, বিভিন্ন জীবনযাত্রা, কালচারের সাথে মিশছেন সেগুলো ডেইলি আপলোড করে দেখাবেন বলে পেজের নাম হয়েছে নাস ডেইলি। তার লক্ষ্য ছিল টানা ১০০০ দিন তিনি ভিডিও প্রকাশ করে যাবেন।

Nas Daily, মাস ডেইলি, ট্রাবেলার, ইউটিউবার, কন্টেন্ট ক্রিয়েটর

বিশ্বভ্রমণের পথে নুসায়েরের প্রথম ছিল গন্তব্য কেনিয়ায়। এখানে গিয়ে ৩০০০ ডলারের একটা কাজ পেয়ে যান। একটা রাশিয়ান কোম্পানি ফেসবুক পেজের জন্য কিছু কন্টেন্ট বানানোর দায়িত্ব দেয় তাকে। এই কোম্পানি ইতিপূর্বে নুসায়েরের আগের কিছু ভিডিও দেখে পছন্দ করেছিল তাকে। হঠাৎ কেনিয়ায় তাকে পেয়ে যাওয়ায় ব্যাটে বলে হয়ে যায়! নাস ডেইলির জন্য এমনিতে ভিডিও তো বানাতেনই, এখন ভিডিও বানানো উপলক্ষে যদি কিছু টাকা উপার্জন হয় খারাপ কি! নুসায়ের প্রথম মাসে ইনকাম করে ফেললেন ৩০০০ ডলার।

নুসায়ের ইয়াসিনের সবচেয়ে বড় স্বতন্ত্র দিকটি হলো, তার ভিডিওর দৈর্ঘ্য। সবগুলো একমিনিটের। আজকাল মানুষের হাতে সময় কম। অনেক তথ্য মাথায় নেয়ার সময় নেই। চোখের পলকে যা চোখে পড়ে ওতটুকুই। তাই দর্শকদের কিছু দেখানো আজকাল বড়ই চ্যালেঞ্জিং কাজ। নাস সেই বিশাল টার্গেট মার্কেটকে ধরতে পারলেন, এক মিনিটের ভিডিও দিয়ে। তবে, কোয়ালিটি এখানে বড় এক্স ফ্যাক্টর। তিনি এমন কিছুই দেখান যা আগে কখনো দেখানো হয়নি। আর নিয়মিত ভিডিওর দেয়ার কারণেও দ্রুতই প্রিয় হয়ে উঠেন নাস। তার ভিডিও প্রকাশ হবার পর সেগুলো রাতারাতি ভাইরাল হয় কন্টেন্টের কোয়ালিটির কারণে এবং নতুন কিছু থাকার কারণে। আর নতুন কিছু দেয়ার জন্য তার কৌশল নতুন জায়গায় ভ্রমণ। তিনি অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত দেশগুলো যেমন রোমানিয়া, মাল্টা, তানজানিয়া, রুয়ান্ডা ইত্যাদি দেশে ভ্রমণ করে সেখানকার গর্ব করার মতো ব্যাপারগুলো ফুটিয়ে তোলেন। যাদের নিয়ে আগে কেউ কাজ করেনি, তাদের নিয়ে কাজ করায় ফ্যানবেজ খুব দ্রুতই বড় হয় তার। এখন গ্লোবালি নাস ভীষণ পরিচিত এক মুখ।

Nas Daily, মাস ডেইলি, ট্রাবেলার, ইউটিউবার, কন্টেন্ট ক্রিয়েটর

নাস ডেইলির ভিডিওতে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, নুসায়ের প্রত্যেকদিন একরকম টি-শার্টই পড়ে থাকেন। তার পোষাকে কোনো পরিবর্তন নেই। কেন? তার মনে হয়েছে সমাজ সে সিস্টেমে চলছে এখানে সবাই পোষাক দেখে মানুষ বিচার করেন। তিনি এটা একদমই অপছন্দ করেন। তাই, তিনি প্রত্যেকদিন একরকম টিশার্ট পড়েন কারণ, তার মনে হয় মানুষের ভেতরকার সৌন্দর্য্যই আসল, সেটা যদি না বুঝানো যায় পোষাক দিয়ে তাহলে কোন সৌন্দর্য্য আমরা বুঝাতে চাই?

টিশার্টে লাইফলাইন দেয়া, সেখানে লেখা ৩৪%। এর ব্যাখ্যাও দিয়েছেন তিনি৷ এভারেজ মানুষের আয়ু ৭৫ ধরা হলে এখন তার বয়স যেহেতু ২৬ তার মানে ৩৪% জীবন খরচ করে ফেলেছেন, মানে ৩৪% মৃত। এটাকে রিমাইন্ডার হিসেবে রাখেন যেন আরো বেশি কাজ করতে পারেন। একটা দিনও নষ্ট করেন না এই মানুষটা। প্রত্যেকদিন একটা করে ভিডিও বানানো, এডিট করা, আপলোড করা তারপর আবার পরেরদিন একই কাজ রিপিট করা দিনের পর দিন, জীবনকে অনেক বেশি ভাল না বাসলে বোধহয় সম্ভব না এমন।

Nas Daily, মাস ডেইলি, ট্রাবেলার, ইউটিউবার, কন্টেন্ট ক্রিয়েটর

কিন্তু, টাকা আয় করেন কিভাবে নাস? তার যে খুব বেশি অর্থ তাও নয়, কিন্তু বেঁচেবর্তে থাকার জন্য যথেষ্ট। আর এই টাকাটা আসে টিশার্ট ব্যবসায় থেকে। এছাড়া তিনি একজন ভাল সিনেম্যাটোগ্রাফার৷ সেখানেও তার ডিমান্ড আছে। তার মিলিয়ন মিলিয়ন ভক্ত আছে। তাই বিভিন্ন কোম্পানি তাকে স্পন্সর্ড ভিডিও বানানোর কাজ দেয়। এড বাবদ তিনি কোনো অর্থ পাননা। কারণ, ভিডিওর মাঝখানে বিজ্ঞাপন যাওয়া তিনি অপছন্দ করেন। ফেসবুক থেকেও সরাসরি কোনো অর্থ পাননি, তবে ফেসবুকের কারণে বেশ কিছু উপার্জন হয়েছিল তার। কারণ, তার ভিডিও অনেক মানুষের কাছে যাওয়ায় তিনি সেখান থেকে কিছু পোটেনশিয়াল কাস্টমার পান, যাদের বিভিন্ন সেবার দরকার হয়। যেমন- বিজন্যাস কনসালটেন্সি, ভিডিও মেকিং, সিনেম্যাটোগ্রাফি, স্পিকিং ইত্যাদি। এই সার্ভিসগুলো থেকে প্রাপ্ত টাকা দিয়ে তিনি ঘুরে বেড়ান, এবং আরো নতুন নতুন ভিডিও বানান।

তার ইচ্ছে আছে, সামনে টিভি সিরিজ বানাবেন কিংবা কোনো ট্রাভেল শো করবেন। বই লেখারও ইচ্ছে আছে। তিনি বই লিখলে সেখানে কত মজার মজার ঘটনার উল্লেখ থাকবে, ভাবতেই আরামবোধ হচ্ছে! এমনকি তার রাজনীতি করারও ইচ্ছে আছে। প্রচলিত রাজনীতির উপরও নুসায়ের বেশ খানিকটা বিরক্ত।

নাস ডেইলি বাংলাদেশে পরিচিত হবার আগেই কিন্তু বাংলাদেশে আসতে চেয়েছিলেন। তার ভিডিও প্রজেক্টের আওতায় বাংলাদেশের নামও ছিল। বিশেষ করে, রোহিঙ্গা শরণার্থী ইস্যুতে বাংলাদেশের নাম গোটা বিশ্বে আলোচিত হয়, ফলে বাংলাদেশ সম্পর্কে আগ্রহী হন নুসায়ের। তিনি বাংলাদেশে এসে রোহিঙ্গাদের নিয়ে, বাংলাদেশ নিয়ে ভিডিও করার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন। কিন্তু, তার পাসপোর্ট ইসরায়েলের হওয়ায় বাংলাদেশে আসতে পারছেন না, কারণ, ইসরায়েলের সাথে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। তবে, তিনি আকুতি জানিয়েছিলেন গত জানুয়ারিতে, তাকে যেনো বিশেষ ব্যবস্থায় অনুমতি দিয়ে বাংলাদেশে আসতে দেয়া হয়! নাস ডেইলি কখনো বাংলাদেশে আসলে নিশ্চিত এই দেশকে তার অপরিচিত মনে হবে না, কারণ, আনাচে কানাচে নাস ডেইলির ভক্তরা ছড়িয়ে আছে, তাকে দেখলেই চিনে ফেলবে বাংলাদেশের পাগলা তরুণরা!

আরও পড়ুন-

Comments

Tags

Related Articles