তারুণ্যপিংক এন্ড ব্লু

নার্সিসিস্ট: ‘আমি, আমি’-তে বন্দী আমরা!

সৃজিত মুখার্জী পরিচালিত ‘নির্বাক’ সিনেমায় অঞ্জন দত্ত একটি চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। সেখানে তাকে দেখা যায় আয়নায় চুমু খেতে, অনেক সময় ধরে গায়ের ওপর সুগন্ধি ছড়াতে, আর সবসময় নিজেকে নিয়ে অত্যন্ত সচেতন থাকতে। একপর্যায়ে তাকে দেখা যায় আয়নায় নিজেকে দেখে হস্তমৈথুন করতে। এটা একজন নার্সিসিস্টের মোটামুটি সর্বোচ্চ পর্যায়ের রূপ।

গ্রিক মিথের নদী দেবতা সেফিসাস এবং জলদেবী লিরিওপের পুত্রসন্তান নার্সিসাসে’র নাম থেকে নার্সিসিজম শব্দের আগমন। নার্সিসাস হল অসম্ভব রুপবান এক যুবক। জলের দেবী, বনের দেবী, সুন্দরী মেয়েরা প্রায় সবাই-ই প্রেমে পড়তে থাকল নার্সিসাসের। কিন্তু সে কাউকে পাত্তা দিল না। তার প্রেমিক-প্রেমিক ভাব ছিল ঠিকই, কিন্তু যে-ই কেই তার প্রতি দূর্বল হয়ে যেত, নার্সিসাস তাকে তাড়িয়ে দিত ক্রূঢ়ভাবে।

নার্সিসাস একেক পর এক প্রেম প্রত্যাখ্যান করে যাচ্ছে। ক্রোধের দেবী নেমেসিসের কাছে নালিশ এলো, নার্সিসাসের নামে। একজন প্রার্থনা করল, নার্সিসাস যদি প্রেমে পড়েও যায়, সে যেন কারও ভালবাসা না পায়। নেমেসিসও সব শুনে সিদ্ধান্ত নিলেন, যে কাউকে ভালবাসতে পারে না, সে তাহলে নিজেকে নিয়েই থাকুক। নেমেসিস তাকে কোনও একভাবে এক জলাশায়ের ধারে নিয়ে এলেন। সেখানে জলের উপর নার্সিসাস দেখল এক রূপবান জলদেবতাকে। নার্সিসাস বুঝেনি জলের উপর তারই প্রতিবিম্ব দেখা যাচ্ছে। সে জলদেবতাকে চুমু খেল। প্রতিবিম্বও তাকে এগিয়ে এসে চুমু খেল। নার্সিসাস উত্তেজিত হয়ে হাত বাড়ালো জলদেবতার দিকে। যেই সে প্রতিবিম্বকে স্পর্শ করল, জলদেবতা উধাও! নার্সিসাস খুব অস্থির হয়ে পড়ল। এদিকে জল স্থির হয়ে গেলে আবার প্রতিবিম্ব দেখা গেল। নার্সিসাসের সে কি খুশি! তার ভালবাসার মানুষ ফিরে এসেছে। সে আবার ধরতে গেল জলদেবতাকে এবং পুনরায় সে হারিয়ে ফেলল তার প্রতিবিম্বকে। আবার যখন জল স্থির হলো, প্রতিবিম্ব ফিরে এলো, নার্সিসাস আর স্পর্শ করল না জলদেবতাকে। যদি আবার সে হারিয়ে যায়! নার্সিসাস এক দৃষ্টিতে অভিভূত হয়ে তাকিয়ে থাকত তার প্রেমের মানুষের দিকে। নিজের এই প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে কাঁদতে থাকল নার্সিসাস। জলের উপর নিজের ছায়ার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই নার্সিসাস শেষ হয়ে গেল। মিলিয়ে গেল তার শরীর।

“অন নার্সিসিজমঃ এন ইন্ট্রোডাকশন”, ১৯১৪ সালে সিগমুন্ড ফ্রয়েডের এই লেখার পর নার্সিসিজমের ধারণা জনপ্রিয় হয়ে যায়। ফ্রয়েড বললেন, একদম জন্ম থেকেই কিছু মাত্রায় নার্সিসিজম মানুষের জন্য একেবারে অবশ্যম্ভাবী ব্যাপার। এমনকি সন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের অতিমূল্যায়ন, প্রশংসার ফুলঝুরি এবং সন্তানরেও একইরকম প্রত্যাশা-এইসব থেকে একদম গোড়া থেকেই নার্সিসিজম শুরু হয়। কিন্তু বয়ঃসন্ধিকালের পর থেকে যদি নার্সিসিজমের মাত্রা বেড়ে যায় তাহলে সেটা হয় খুব বাজে ব্যাপার। মানুষের জগত বড় হবার চাইতে ধীরে ধীরে নিজের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়ে।

সাধারণভাবে নার্সিসিস্ট শব্দটি একজন ব্যক্তির ধরণ এবং তার ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে ধারণা দিয়ে দেয়। নার্সিসিস্ট শব্দটি মোটেও সম্মানের নয়। অহঙ্কার, স্বার্থান্ধতা, ইগো-প্রবণতা এইসব নেগেটিভ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী কাউকে নার্সিসিস্ট বলে থাকি আমরা। কিন্তু কেউ কেউ যে নার্সিসিস্ট এর বাংলা তরজমা ‘আত্মপ্রেম’ বলে মনে করেন সেটা মোটেও ঠিক নয়। ভুলটা এই চিন্তার গোড়াতেই যে, নার্সিসাস নিজের প্রেমে পড়েন নি। তিনি পড়েছিলেন তার প্রতিবিম্বের প্রেমে। যে প্রতিবিম্বের প্রাণ ছিল না। কেউ যদি সক্রেটিসের ‘নিজেকে জানো’ মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজেকে ভালবাসে এবং সেটা কেবল গভীরভাবে উপলব্ধি করার ব্যাপার হয় তাহলে ‘আত্মপ্রেম’ মোটেও নার্সিসিজম নয়।

বরং নিচের উদাহরণগুলোর দিকে চোখ বোলানো যাক। এমন ধরণের মানুষ আমরা হয়ত দেখেই থাকব। একদম নিজের মত করে কোনো সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে পারছেন না। যখনই কাউকে ভাল লাগছে, তার পেছনে ছুটছেন। তাকে পেয়ে গেলেন আর তারপর শুরু হল নিজের অতৃপ্তির তালিকা তৈরির কাজ। খুঁতখুঁতে একটা ভাব আপনার মনে লেগেই থাকে। কোনও একটা আর্টিকেল পড়ছেন হয়ত। বিখ্যাত কাউকে নিয়ে। অথবা সবাই খুব আলোচনা করছে কাউকে নিয়ে। আপনি তৎক্ষণাৎ সেই বিখ্যাত ব্যক্তিটির সাথে আপনাকে মেলানো শুরু করে দিলেন। আপনার তো মনে হচ্ছে আপনার মাঝে কোনো কমতি নেই।

আড্ডায় বসেন প্রতিদিন সন্ধ্যায়। সবাই আপনার কথায় সায় দেয় না। কিন্তু যে দুইজন আপনার প্রশংসা করে আপনি তাদের তোষামোদিতে একেবারে পঞ্চমুখ। কিন্তু অনেক পরিশ্রম করে আপনি একটা কাজ করে ফেললেন। অনেকে প্রশংসা করল না। এদের উপর আপনার মেজাজ চড়ে গেল। মাঝে মাঝে আপনি খুব নির্লজ্জ হয়ে যান। নিজে যেটা চান কিংবা ভাবছেন সেটা পেতে আশে পাশের কারও ভালমন্দের দিকে তাকানোকে প্রয়োজনই মনে করেন না আপনি। অথবা বাসের সিটে বসে আছেন বেশ শরীর মেলে। আপনি এভাবেই হয়ত বসেন বাড়িতে। কিন্তু পাশের যাত্রীটার যে সমস্যা হচ্ছে সেই সংবেদনশীলতা আপনাকে স্পর্শ করে না।

নার্সিসিজমের বাকেটের তলার দিকে ঘেঁটে দেখলে প্রায় সব নেগেটিভ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যেরই উৎস খুঁজে পাওয়া যাবে। ‘আমি’ ‘আমি’ বলতে বলতে এবং ভাবতে ভাবতে আপনি বাকি পৃথিবী ভুলে যান ধীরে ধীরে, আরেকজনের অনুভূতি কিংবা স্পর্শও আপনাকে জাগাতে পারে না।

আপনার বন্ধু আপনাকে তার অনুভূতি জানাল, ‘একটা শাড়ী কিনব ভাবতেছি’। আপনি সাথে সাথে বলে ফেললেন, ‘আমার একটা নীল শাড়ি কি যে পছন্দ হয়েছে!’ এটা নার্সিসিস্ট লক্ষণ। আপনার বন্ধু যদি শাড়ী কেনার চিন্তা করতেছে বলে জানায়, সেক্ষেত্রে আপনার কি প্রথম চিন্তাতেই আপনার নিজেকে নিয়ে আসা উচিত? নাকি এমন সংবেদনশীল পালটা প্রশ্নই স্বাভাবিক হত, ‘কি রঙের শাড়ী কিনবি?’ প্রায়শই আড্ডায় এখন এমন দেখা যায় যে, কেউ কোনও বিষয়ে প্রসঙ্গ তুললে আরেকজন সাথে সাথে সেখানে নিজের প্রসঙ্গ টেনে আনে। ‘আজকে ভাল কিছু খাব’ এর উত্তরে শোনা যায় ‘কালকে আমি দারুণ একটা বার্গার খেলাম’। আরেকজনকে মানে সঙ্গীকে করা প্রশ্নগুলো ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে এবং একটা কথোপকথনে প্রত্যেকজন-ই ‘আমি’ ‘আমি’ দিয়ে তাদের কথা শুরু করছে। এটা নার্সিসিজমের ছোঁয়াচে সংক্রমণ।

যত ধরণের নার্সিসিস্ট মানুষ আছে এদের মধ্যে উপরের ভাগের মানুষই আমাদের সমাজে সবচেয়ে বেশি। আমি কি করছি, আমি কি খাচ্ছি, আমি কি ভাবছি এগুলো অন্যদের জানানো খুব জরুরী হয়ে পড়েছে। গুরুত্ব হারিয়ে ফেলছে অপরপ্রান্তে যে আছে তার বক্তব্য। এই ছোট ছোট অভ্যাসগুলির কারণে আমরা সবাই ছোট ছোট ‘আমি’তে বন্দী হয়ে পড়ছি। এই আমিগুলোর চারদিকে ধীরে ধীরে দেয়াল গড়ে উঠছে। আরেকজন মানুষের অনুভূতি আমাদের স্পর্শ করছে না।

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close