সিনেমা হলের গলি

নানার বিরুদ্ধে তনুশ্রীর যৌন হয়রানির অভিযোগে উত্তাল বলিউড

১৩ বছর আগে ইমরান হাশমীর সাথে ‘আশিক বানায় আপনে’ ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছেছিলেন বলিউডের বাঙালি অভিনেত্রী তনুশ্রী দত্ত। ছবিটির টাইটেল ট্র্যাকে ইমরান হাশমীর সাথে তার উষ্ণ অন্তরঙ্গ মুহূর্তের দৃশ্যগুলো আজও বলিউডের ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত বিষয়গুলির একটি।

কিন্তু সেই তনুশ্রী দত্তই পারেননি অপার সম্ভাবনাময় ক্যারিয়ারটিকে নিজের মত করে ঢেলে সাজাতে, সাফল্যের ফুল ফোটাতে। বরং ২০০৪ সালে ফেমিনা মিস ইন্ডিয়া প্রতিযোগিতায় জয়ী এবং ওই একই বছর ইকুয়েডরের কুইটোতে অনুষ্ঠিত মিস ইউনিভার্স প্রতিযোগিতায় ভারতের প্রতিনিধিত্ব করে সেরা দশে জায়গা করে নেয়া তনুশ্রীর ক্যারিয়ারের ইতি ঘটেছে অকালেই, মাত্র ১৪টি মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিতে কাজ করেই।

সর্বশেষ তনুশ্রীকে বড় পর্দায় দেখা গেছে বছর আটেক আগে, ‘অ্যাপার্টমেন্ট’ ছবিতে। কিন্তু তারপর থেকেই বেপাত্তা তিনি। এক সময় লাখো দর্শকের রাতের ঘুম কেড়ে নেয়া এই সুন্দরী বলিউডের আলো ঝলমলে দুনিয়ে থেকে পুরোপুরি সরিয়ে নেন নিজেকে। কিন্তু নতুন করে আবারও পাদপ্রদীপের আলোর নিচে এসেছেন তিনি। তাও একটি বিতর্ককে কেন্দ্র করে।

কিছুদিন আগেই একটি সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেছেন, ২০০৮ সালে ‘হর্ন ওকে প্লিজ’ নামক একটি ছবির সেটে তাকে নাকি যৌন হয়রানী করেছিলেন বলিউডের বর্ষীয়ান অভিনেতা নানা পাটেকার। সে ঘটনার সাক্ষী ছিলেন পরিচালক রাকেশ সারাঙ, প্রযোজক সামী সিদ্দিকী এবং কোরিওগ্রাফার গণেশ আচার্য। এছাড়াও তনুশ্রী অভিযোগের আঙ্গুল তুলেছেন পরিচালক বিবেক অগ্নিহোত্রির দিকেও। বিবেক নাকি তাকে বলেছিলেন ‘চকোলেট’ ছবিতে কাপড় খুলে ইরফান খানের সাথে নাচতে। তবে সেই সময়ে তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন ইরফান ও সুনীল শেঠী।

তনুশ্রীর দেয়া এই বিতর্কিত সাক্ষাৎকার নিয়ে ইতিমধ্যেই আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠেছে গোটা বলিউড ইন্ডাস্ট্রিতে। এবং সেটি খুব স্বাভাবিক কারণেই। বলিউডে যে প্রায়সই অভিনেত্রীদের এ ধরণের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার শিকার হতে হয়, সেটি মূলত একটি ওপেন সিক্রেট, কারোই অজানা নয়। কিন্তু এ ঘটনাগুলো সরাসরি আক্রান্ত ব্যক্তির মুখ থেকে প্রকাশ্যে আসার দৃষ্টান্ত খুবই কম। তাই সাহস করে কেউ একজন বিষয়টি নিয়ে মুখ খুললে, সেটি নিয়ে হইচই তো হবেই।

এবং একটি দিক থেকে তনুশ্রীই বলিউডের ইতিহাসে প্রথম। তা হলো, লিডিং লেডি বা প্রধান নায়িকার ভূমিকায় কাজ করা অভিনেত্রীদের মধ্যে তিনিই প্রথম সংবাদমাধ্যমের সামনে যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার কথা বললেন। এর আগ পর্যন্ত ভাবা হতো, এ ধরণের পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে বুঝি উঠতি কোনো নায়িকা, অপ্রধান চরিত্রাভিনেতা বা এক্সট্রাদেরই কেবল যেতে হয়েছে। কিন্তু এখন বদলে গেছে পুরো চিন্তাধারণাই। মনে করা হচ্ছে, তনুশ্রী একাই নন, যুগে যুগে বলিউডে তার মত আরও অসংখ্য তনুশ্রীকেই এ ধরণের হয়রানির শিকার হতে হয়েছে।

ফারহান আখতার, প্রিয়াংকা চোপড়া, পরিনীতি চোপড়া, টুইংকেল খান্না, সোনম আহুজা, রিচা চাঢা, রাভিনা ট্যান্ডনের মত শীর্ষস্থানীয় বলিউড তারকারা টুইটের মাধ্যমে ইতিমধ্যেই পাশে দাঁড়িয়েছেন তনুশ্রীর। সমর্থন জানিয়েছেন তার প্রতি। এছাড়া পৃথক পৃথক সংবাদসম্মেলনে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়েছে সালমান খান, আমির খান, অমিতাভ বচ্চনদেরও। তবে বলিউডেরই একাংশ আবার মনে করছে, হঠাৎ করে তনুশ্রীর এমন অভিযোগ নিছকই ‘এটেনশন সিকিং’ এর প্রচেষ্টা। তবে কেউ কেউ আবার অভিনেতা হিসেবে নানা পাটেকারের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হলেও, তার মানসিক অপ্রকৃতস্থতার ব্যাপারে কথা বলেছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন মনীষা কৈরালাও।

এইমুহূর্তে সাধারণ মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ৬৭ বছর বয়সী নানা। তিনি এ ব্যাপারে কী বলেন, সে ব্যাপারে জানতে উৎসুক সকলেই। তবে নানা সরাসরি সংবাদমাধ্যমের সামনে খুব বেশি কিছু বলেননি। বরং তনুশ্রীকে ‘নিজের মেয়ের মত’ আখ্যা দেয়ার পর, আদালতে তার নামে ঠুকে দিয়েছেন মানহানির মামলা।

নানার আইনজীবী রাজেন্দ্র শিরোদকর সোমবার বলেছেন, “তার কাছে ইতিমধ্যেই একটি লিগ্যাল নোটিস পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। আজই তিনি সেটি হাতে পাবেন। নোটিসটি খুবই উন্নতমানের — সেখানে তার আনা অভিযোগটিকে অস্বীকার করে, তাকে ক্ষমা প্রার্থনা করতে বলা হয়েছে।” তবে তাকে যখন জানানো হয় যে সাংবাদিক জ্যাসিন সিকুয়েরা, সহযোগী পরিচালক শাইনি শেঠী এবং অভিনেত্রী ডেইজি শাহও তনুশ্রীর হয়ে সাক্ষ্য প্রদান করছেন, তখন শিরোদকর জানান যে নানা খুব শীঘ্রই একটি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করবেন।

“আমি এই মুহূর্তে খুব বেশি কিছু বলতে পারছি না। আমার কোনো ধারণাই নেই যে এখন কেন তিনি (তনুশ্রী) এই বিষয়টি নিয়ে কথা বলছেন। তবে তার এসবের পেছনে কোনো কারণ নিশ্চয়ই রয়েছে। নানা আজ শহরে (মুম্বাই) আসবেন, এবং আজকালের মধ্যেই হয়ত তিনি একটি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করবেন। তাকে আসতে দিন আগে, তারপর তিনিই যা বলার বলবেন। বিষয়টি সম্পর্কে জানার এটিই সেরা উপায়। আগামীকাল তিনি অবশ্যই থাকবেন।”

এদিকে তনুশ্রী তৎক্ষণাৎ কোনো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেননি। এখন পর্যন্ত তার তরফ থেকে তার ক্যারিয়ার ধ্বংসের দায়ে নানা বা অন্য কারও কাছ থেকে কোনো ক্ষতিপূরণও দাবি করা হয়নি। তবে গত রবিবারই তিনি জানিয়েছিলেন যে তিনি একটি আইনজীবী দলকে একত্র করছেন, যারা তার হয়ে আদালতে লড়াই করবেন।

সুতরাং আদালতেই নির্ধারিত হবে তনুশ্রী বনাম নানার মধ্যকার লড়াইয়ের ফল। কিন্তু আইনি লড়াইয়ের মারপ্যাঁচে শেষ পর্যন্ত কোথাকার জল কোথায় গড়ায়, সেটিই এখন দেখার অপেক্ষা।

আরও পড়ুন-

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close