দালালদের টাকা পয়সা না দিয়ে কি করে নিজের আর বাবা-মায়ের নাম পাল্টাবেন তাই জানাতে এই লেখাটি থাকলো।

১। ফর্ম কালেকশন

“ছাত্র/ছাত্রীর নাম, পিতার নাম, মাতার নাম, পদবী সংশোধনের আবেদনপত্র”- শিরোনামের ফর্মটি শিক্ষাবোর্ড থেকে কালেক্ট করবেন। ফর্মটি দেখতে এমন।

নাম সংশোধনের আবেদনপত্র

২। ফর্ম ফিলআপের সময় লক্ষ্যণীয়

ক) “১,২,৩” নম্বর পয়েন্ট : আপনার বর্তমান সার্টিফিকেটে ঠিক যেভাবে আপনার নাম, আপনার পিতার নাম এবং আপনার মাতার নাম লিখা আছে, ঠিক সেভাবেই লিখুন।

খ) “৪”–এ ঠিকানা ঠিকমতো লিখুন।

গ) “৫” নম্বরে বোর্ডের কেন্দ্রের কোড (অ্যাডমিট কার্ডে যেটা আছে), রোল নাম্বার এবং পরীক্ষার বছর লিখুন। অ্যাডমিট কার্ড থেকে কী করে লিখবেন? নিচের উদাহরণটি দেখুন।

আমার অ্যাডমিট কার্ড (এইচএসসি)-এর স্ক্যানড অংশ

এটার জন্য কেন্দ্রের নাম : DHAKA – 4 ; কেন্দ্রের কোড : 104

ঘ) পরিবর্তন যে নামটা হবে শুধু সেটাই সঠিক বানানে “৯” নম্বর পয়েন্টে লিখবেন। যেমন আপনার যদি শুধু মাতার নাম পরিবর্তন করার প্রয়োজন পড়ে, তাহলে “৯” নম্বরে নিজের, পিতার, মাতার নাম লিখবেন না। শুধুমাত্র লিখবেন মাতার নামটাই। বাকি দুটো স্লট ব্ল্যাংক রেখে দিবেন।

৩। আপনাকে জমা দিতে হবে কোন কোন কাগজ?

ফর্মের নিচের দিকে দেখুন স্পষ্টভাবে লিখে দেওয়া আছে কোন কোন কাগজ আপনাকে জমা দিতে হবে।

যে সকল কাগজপত্র ফরমের সাথে দাখিল করতে হবে

বিস্তারিত

কাগজপত্রের তালিকাটাকে সংখ্যা এবং ক্রম দিয়ে লিখবো। কারণ, ফর্মে যেভাবে হিজিবিজি লিখা আর এতোগুলো স্ল্যাস/অবলিগ/ দিয়ে লিখা, কোনটা দেবেন আর কোনটা দেবেন না সেটা বোঝা যায় না কিছু।

[১] এফিডেভিট এবং পত্রিকার বিজ্ঞপ্তি (এর পরের টপিকে ডিটেইলসে বলা হবে)

[২] সোনালী সেবার মাধ্যমে টাকা জমাদান  (এর পরের টপিকে ডিটেইলসে বলা হবে)

[৩] এসএসসির চারটি কাগজের সত্যায়িত ফটোকপি – ক. সার্টিফিকেট, খ. ট্রান্সক্রিপ্ট, গ. অ্যাডমিট কার্ড, ঘ. রেজিস্ট্রেশন কার্ড

[৪] এইচএসসির চারটি কাগজের সত্যায়িত ফটোকপি – ক. সার্টিফিকেট, খ. ট্রান্সক্রিপ্ট, গ. অ্যাডমিট কার্ড, ঘ. রেজিস্ট্রেশন কার্ড

[৫] শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানের সত্যায়িত এক কপি ছবি (আপনার), অর্থাৎ স্কুলের হেডমাস্টার কিংবা কলেজের প্রিন্সিপাল স্যারের কাছে সত্যায়িত করিয়ে নেবেন। উল্লেখ্য, উপরে বলা ৩ এবং ৪ নম্বর পয়েন্টের ৮টি কাগজ + ১টি ছবি – এই ৯টি ডকুমেণ্টস আপনি কলেজের প্রিন্সিপালের কাছ থেকে সত্যায়িত করে নিলে এক ধাক্কায় আপনার ৯টা ডকুমেন্ট রেডি হয়ে যাবে।

[৬] পিতার জাতীয় পরিচয়পত্রের সত্যায়িত ফটোকপি

[৭] মাতার জাতীয় পরিচয়পত্রের সত্যায়িত ফটোকপি

টিপস : অনুসন্ধান কিংবা দালালের সঙ্গে মোলাকাত হয়ে গেলে আপনাকে তারা নানা রকম ফালতু কথা বলে ভড়কে দেবে। যেমন – এই ৭টি পয়েন্টের বাইরে তারা আরও আনতে বলবে আপনার বাবা কোন অফিসে কাজ করেন বা করতেন সেখানকার এমপ্লয়ী কার্ড, অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার, ড্রাইভিং লাইসেন্স বাবা-মায়ের নিকাহনামা, বড় ভাইয়ের এসএসসি কিংবা এইচএসসির সার্টিফিকেটের সত্যায়িত কপি, বাবা, মা, বড় ভাইয়ের জাতীয় পরিচয়পত্রের সত্যায়িত কপি এবং তাদের কেউ কেউ বলে বসতে পারে “বাবা, মা এবং ভাইয়ের নামে থাকা ফর্মে উল্লেখিত তিনটা করে মোট নয়টা কাগজ নিয়ে আসেন।” একেবারেই পাত্তা দেবেন না। যেমনটা বলেছি, স্রেফ পিতা এবং মাতার জাতীয় পরিচয়পত্রের সত্যায়িত কপি জমা দিলেই কাজ শেষ। ২টা কাগজ। কোটি কোটি কাগজ যোগাড় করার জন্য ব্যস্ত হবেন না।

[] এফিডেভিট এবং পত্রিকার বিজ্ঞপ্তি

এই কাজটা আমি নিজেই দালালের মাধ্যমে করিয়েছি। তারা আমার থেকে ১৮০০ টাকা নেয় (দালাল না ধরলে আপনার ১০০০টাকার মতো লাগবে, তবে হাল্কা দৌড় দিতে হবে। কোথায় দৌড়াতে হবে তা জানার ইচ্ছা আমার ছিলো না দেখেই দালালকে দিয়ে দিয়েছিলাম। ছিলাম ঢাকায় কয়েক ঘণ্টার জন্য। এতোকিছু মেইনটেন করার সময় ছিলো না)। এবং তাদের ভেতরেরই পত্রিকা দৈনিক মাতৃভাষায় আমার জন্য বিজ্ঞাপন দেয়, সেই সঙ্গে ২০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে তারা ছাতা-মাথা যা লিখার লিখে এনে দেয়। সেটার কপি আমি এখানে যোগ করে দিলাম। চাইলে আপনারা নিজেরাও এটা করে নিতে পারেন যেন, তাই।

১০০টাকা মূল্যের দুই পৃষ্ঠায় এটা করতে হবে, প্রথম পৃষ্ঠা

১০০টাকা মূল্যের দুই পৃষ্ঠায় এটা করতে হবে, দ্বিতীয় পৃষ্ঠা

উল্লেখ্য, দুটো ১০০ টাকার স্ট্যাম্পে, দুই পৃষ্ঠাতেই আপনাকে এই এফিডেভিট করতে হবে। তারপর পত্রিকার বিজ্ঞাপনেও একই ভাষা ব্যবহার করবেন। আমার পত্রিকার বিজ্ঞাপন দালাল অ্যান্ড সানস যেভাবে করে দিয়েছিলো তারও নমুনা রাখলাম।

[] সোনালী সেবার মাধ্যমে টাকা জমাদান

এটা আপনাকে করতে হবে সবগুলো কাগজ যোগাড় করে নিয়ে আসার পর। নাহলে ৫ নম্বর কাউন্টারে হাহাকার করে উঠবে এবং আপনাকে সব কাগজ রেডি করে (যতোগুলো বর্ণনা করেছি) আবারও ফিরে আসতে হবে। মনে রাখবেন, ৫ নম্বর বুথ থেকে যখন সোনালী সেবার কাগজ হাতে নিয়ে বের হবেন, ঐ কর্মদিবসের মধ্যেই আপনাকে টাকাটা ব্যাংকে জমা দিয়ে দিতে হবে। নয়তো পরের দিন এসে আবারও খুঁজতে হবে ৫ নম্বর কাউন্টারের শাহী স্টাফ কখন চেহারাটা দেখান তার জন্য।

৫ নং কাউন্টার কী?

এটা হলো ঢাকা বোর্ডে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে ডানদিকে তাকালে যে বসে থাকার জায়গাগুলো দেখা যায় (আর যেগুলোয় বসে থাকে কেবল দালালরাই, কাস্টোমারদের সাথে বৈঠকে বসেন উনারা ওখানে) তাদের বামে শিক শিক জানালা আছে। সেই শিক শিক জানালাগুলো আসলে কাউন্টার। সেখানেই আছে ৫ নম্বর কাউন্টার, মেইন গেট থেকে দেড়শ মিটার মতো দূরত্বে। যেখানে আপনি গিয়ে আপনার মোটাসোটা ফর্মটা (কারণ সব কাগজ আপনি পিনআপ করে লাগিয়ে ফেলেছেন ততোক্ষণে) ঢুকিয়ে দেবেন। আপনার তথ্যগুলো সে ওটা দেখে দেখে ফিল করবে। তারপর আপনাকে একটা প্রিন্টেড কাগজ ফেরত দেবে।

এবার এই প্রিন্টেড কাগজটা নিয়ে আপনি সোজা চলবেন হন হন, ছুটবেন পন পন। মেইনগেট দিয়ে ঢুকতে ঠিক বাম দিকে পরিষ্কার দেখতে পাবেন সোনালী ব্যাংকের শিক্ষাবোর্ড শাখা। ভেতরে ঢোকার দরকার নেই। বাইরে দেখুন জানালায় ফোকড় কাটা আছে। কাছে গেলেই ভেতর থেকে আসা এসির বাতাসে প্রাণটা জুড়িয়ে যাবে (যদি না শীতকালে যান)। ঐ ফুটো দিয়ে চালিয়ে দিন এই মাত্র পাওয়া ৫ নম্বর কাউণ্টারের প্রিন্টেড কাগজ। সেই সঙ্গে বাড়িয়ে দিন টাকা। একটা পরীক্ষার জন্য নাম পাল্টাতে চাইলে ৫৫৮ টাকা (এসএসসি ধরা যাক)। দুটো পরীক্ষার জন্য নাম পাল্টাতে চাইলে ১০৫৮টাকা (এসএসসি এবং এইচএসসি, ধরা যাক)। এমন আরকি। তবে টাকার পরিমাণটা আপনার হাতে ৫ নম্বর কাউন্টার থেকে আসা প্রিন্টেড কাগজেই লিখা থাকবে।

সেই প্রিন্টেড কাগজে আপনারও সাইন করার জায়গা রাখা আছে। তারিখ দেওয়ার বন্দোবস্ত আছে। লক্ষ্য করুন। সাইন আর তারিখ না লিখে সোনালী ব্যাংকের ফুটো দিয়ে প্রিন্টেড কাগজটা দয়া করে চালিয়ে দেবেন না। ভেতর থেকে ক্রুদ্ধ গর্জন ভেসে আসবে।

যদি লক্ষ্য থাকে অটুট

এবার আপনার হাতে চলে এসেছে টাকা জমা দেওয়ার রশিদ (ঐ প্রিন্টেড কপিটাই)। এবার এটাকেও আপনার ভোটকা “Form and other docs” ফোল্ডারের সঙ্গে পিন-আপ করে নিন। বেশ দামড়া একতাড়া কাগজ হলো, যা হোক।

শিক্ষাবোর্ডে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে বাম দিকে পড়ছে ব্যাংক। তার একটু সামনে (শিক্ষাবোর্ডের মেইন গেট দিয়ে ঢোকার পর পনেরো কদম হাঁটলে হাতের বাম পাশে, অনুসন্ধানের অপোজিটে) দাঁড়িয়ে আছে একটা বিল্ডিং।  এটা ব্যাংকের সাথে গা লাগানো বিল্ডিংটাই। কতো নাম্বার বিল্ডিং তা ভুলে গেছি। তবে অনুসন্ধানের অপোজিটে, ব্যাংকের গা ঘেঁষে এই দুটো ইঙ্গিতই আপনাকে সাহায্য করবে সঠিক বিল্ডিংটা চিনতে। সুড়ুৎ করে ওতে সেঁধিয়ে যান এবং চার তলায় উঠে পড়ুন। যে কাউকে প্রশ্ন করুন, “এই নাম সংশোধনের ফর্মটা কোথায় জমা দেবো, দাদা?” আপনাকে দেখিয়ে দেবে।

জমা দিয়ে আপনার রশিদের অংশটুকু নিন। সিরিয়ালটা দেখুন। তারপর ভূতের বাড়িতে রাত তিনটায় ঢুকে পড়ার পর নারীকণ্ঠের বীভৎস আর্তচিৎকার শুনলে যেভাবে প্রাণহাতে দৌড়ায় মানুষ, তেমনি এক চোঁ-চাঁ দৌড় দিন নাক বরাবর। গেটের বাইরে বের হওয়ার আগে থামবেন না। বেরিয়েই বন্ধুদের সঙ্গে সেন্ট মার্টিন কিংবা দার্জিলিং ট্যুরে বেরিয়ে পড়ুন। নয়তো উদ্দাম পার্টি দিন। কারণ, আপনার বহু দৌড়াদৌড়ি আর ঝামেলা অবশেষে শেষ হয়েছে।

তারপর?

যদি আপনি কাউকে খুন করে ফেরার আসামী হওয়ার ধান্ধায় নাম পাল্টানোর চেষ্টা না করে থাকেন, তবে…

১। এক মাস পর ঐ ৪ তলায় গিয়ে ৩০১ নম্বরে উঁকি দিন। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির চেয়ে তিনি কিছু যে কম যান না, তা-ই প্রমাণ করার জন্য একজন স্টাফ কম্পিউটার নিয়ে বসে আছেন। তাকে চটাবেন না। আপনি প্রশাসনের লোক হতে পারেন, এমনকী স্বয়ং রাষ্ট্রপতিও হতে পারেন, তাতে উনার কিছু আসবে যাবে না। কাজেই, ভদ্রলোককে মোটেও না চটিয়ে তার সামনে গিয়ে দাঁড়ান। বিনয়ে হাত অবশ্যই কচলাবেন। সেই সঙ্গে বলবেন, “মশাই, গত মাসে ফর্ম জমা দিয়েছিলাম। আমার রোল নাম্বারটা একটু দেখে দিন না। হয়ে গেছে কি না?”

২। অথবা, নিয়মিত বোর্ডের ওয়েবসাইটে চোখ রাখুন। আপনারটা পরের মাসে প্রকাশ পাওয়া পিডিএফেই থাকবে।

আমি ১৯শে মার্চ আমার ঐ ওপরের কাগজগুলো জমা দেই। ১৫ই এপ্রিল নতুন তালিকা প্রকাশ করে বোর্ড। তাতেই আমার নাম ছিলো। অথচ আমার সিরিয়াল ছিলো ৯২৬৫। আর ১৯শে মার্চ কাজ হচ্ছিলো ১১০০তম সিরিয়ালের। তাই, সিরিয়াল লম্বা দেখে আপনার ১ বছর লাগবে সেই ভয়ে থাকবেন না। দালালদের টাকাও দিতে যাবেন না!

এমন একটা কাগজে আপনার নাম পাবেন এবং তা প্রিন্ট করবেন।

“চিঠি!” — অন্তত শিক্ষাবোর্ডের ভেতর এটাকে এই নামেই ডাকা হয়!

খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা লাইন এর পরেরটা। কেন, তা এখন বোঝার দরকার নেই। অক্ষরে অক্ষরে পালন করুন। এটার গুরুত্ব এতো বেশি যে একে একটা হেডিং সমান বড় করে প্রকাশ করলাম।

এই পাতাটি (যেটায় আপনার নাম আছে) ২৫ কপি ফটোকপি করবেন এবং বোর্ডে গেলে ২৫ কপিই সঙ্গে রাখবেন। এর পর থেকে আলোচনায় এটাকে আমরা ডাকবো “চিঠি” বলে।

কাউকে খুন-টুন করেছেন বলে নাম পাল্টে ফেরারী হওয়ার চেষ্টায় আছেন? আপনার ডাক পড়বে একটা মিটিংয়ে। সেখানে আপনাকে জেরা করা হবে। তারপর তাদের যদি কনভিন্স করতে পারেন যে আপনি কাউকে খুন করেননি, নিতান্তই সখের বশে কিংবা বেখেয়ালি ডাটা এন্ট্রি অপারেটরদের নির্যাতনের শিকার হয়েই নামটা পাল্টাচ্ছেন, তখন অনুমোদন পাবেন। তবে দাগী আসামী বা ফুটো কপালওয়ালা ছাড়া কাউকে এই মিটিংয়ে যেতে হয় না। অথবা তাদের যেতে হয়, যারা “Firoz Mahmud” থেকে নিজের নাম “Fire-breather Firoz” বা এমন কিছুতে পাল্টে নিতে চান।

তারপর?

আপনাকে আসল সার্টিফিকেটস জমা দিয়ে দিতে হবে।  কিভাবে দেবেন? ঝামেলা আছে কিছু। সবটুকু জানা না থাকলে আমার মতো অযথা হয়রানির শিকার হবেন। তাই বিস্তারিত বলি। এই ধাপটাকে আমরা দুই ভাগে ভাগ করবো। এটা ভালোমতো লক্ষ্য করবেন।

১। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কাছে জমা দেওয়া

২। পরিবর্তনের জন্য জমা দেওয়া

১। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কাছে জমা দেওয়া

আপনার আসল সার্টিফিকেট, অ্যাডমিট কার্ড এবং ট্রান্সক্রিপ্ট জমা দিবেন। বার বার আসল সার্টিফিকেট, অ্যাডমিট কার্ড এবং ট্রান্সক্রিপ্ট বলাটা ক্লান্তিকর। এখানে মোট তিনটা কাগজ। রেজিস্ট্রেশন কার্ডটা বাদে বাকি তিনটা। তাই এটাকে আমরা এখন থেকে সার্টিফিকেট(+২) বলবো। আপনার যে প্রশ্ন উত্তরগুলো জানার দরকার, তাই এখানে আলোচনা করবো।

প্রশ্ন – ০১ । কোনটা কোথায় জমা দিবেন?

  • এসএসসির সার্টিফিকেট (+২) জমা দিবেন ৪ নং বিল্ডিংয়ের ছয় তলায়। সেই সঙ্গে দিবেন ২ কপি ‘চিঠি’র ফটোকপি। উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক চেম্বারের পাশের দরজা দিয়ে ঢুকে পড়বেন। আই রিপিট, পাশের দরজা দিয়ে ঢুকে পড়বেন। উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের চেম্বারে ঢুকে যাবেন না যেন আবার!
  • এইচএসসির সার্টিফিকেট(+২) জমা দিবেন ৪ নম্বর বিল্ডিংয়ের পাঁচতলায়। একটা দশাসই কাউন্টার আছে ৫ তলায়। সামনে হয়তো ৪/৫জনের একটা লাইন — এখানে আপনি অবশ্যই ঢুকবেন না। সার্টিফিকেট জমা দেওয়ার জায়গা ওটা নয়। বরং যেই ঘরটায় এসএসসি জমা দিলেন তার মেঝে ফুটো করে ফেললে একতলা নিচে যে ঘরে পড়তেন ঠিক সে ঘরে আপনি ঢুকবেন এবং সার্টিফিকেট(+২) জমা দেবেন। সেই সঙ্গে দিবেন ২ কপি “চিঠি”র ফটোকপি। আমি এভাবে বলছি কারণ আমার রুম নম্বর মনে নেই। কিন্তু এই দিকনির্দেশনা যথেষ্ট হওয়ার কথা।

প্রশ্ন – ০২ । জমা দিলেন, এবার কি করবেন? পরবর্তী ধাপগুলো কি?

  • সার্টিফিকেট(+০২) জমা দেওয়ার পর বিল্ডিং থেকে চুপচাপ বেরিয়ে যান। আপনাকে রশিদ বা এজাতীয় কিছু দেওয়া হবে না। সরি।
  • জমা দিলেন  ধরুন “ক” তারিখে। আপনাকে তাহলে আসতে হবে “ক+৭” তারিখে। ধরুন, এই সোমবার আপনি কাগজ জমা দিয়েছেন। আগামি সোমবার আবারও আসবেন। একই ঘরে এসে দেখা করবেন। আপনাকে ওরা আপনার সার্টিফিকেট(+২) ফেরত দেবে। ওতে কলমের খোঁচায় ঠিক করা হয়েছে ভুলগুলোকে। সেই সঙ্গে রয়েছে উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের সাক্ষর এবং সীল।
  • বেরিয়ে যাওয়ার সময় গেটের সামনে, অনুসন্ধান থেকে ছয়টা সাদা ফর্ম নিন। ফর্মগুলো দেখতে এমন। পূরণ করুন, তিনটা এসএসসির জন্য। তিনটা এইচএসসির জন্য। জেএসসি যদি থাকে তাহলে তার জন্য আরো তিনটা। এই কাগজের তাড়াগুলো নিয়ে এবার সংশ্লিষ্ট স্কুল এবং কলেজে দৌড়াতে থাকুন। নিচের ঐ অংশে আপনাকে প্রিন্সিপাল বা হেডমাস্টারের সাইন এবং সিলসহ সত্যায়িত করতে হবে। কারণ, ঐ চেহারা মোবারক দেখেই আপনাকে ফাইনাল কাগজ দেওয়া হবে। এটা আপনি অবশ্যই এই সাতদিনের মধ্যে করে রাখবেন, যেহেতু আপনি এখন জানেন এটা করতে হবে। আমি জানতাম না। ধরা খেয়েছিলাম। দিন নষ্ট হয়েছিলো এসব করতে পরে।

২। পরিবর্তনের জন্য জমা দেওয়া

এবার আমি আপনাদের জানাবো “ক+০৭” তারিখে বা পরের সোমবার এসে কী করবেন সেটার ধাপগুলো। আপনার হাতে এখন আছে ৬ বা ৯টি এক্সট্রা কাগজ। ঐ যে ফর্মগুলো পূরণ করে নিয়েছিলেন। প্রতিষ্ঠান প্রধানের সাক্ষরও নিয়ে এসেছেন নিশ্চয়ই? চমৎকার।

  • এবার টাকা জমা দেবেন ব্যাংকে। ৫ নম্বর কাউন্টারে চলে যান। লাটসাহেবদের ওর ভেতরে নাও পেতে পারেন। না পেলে বাইরে শখানেক টাকার বিনিময়ে দ্রুত আপনাকে সোনালি সেবা প্রিন্ট আউট করে দেবে। এবং আপনি চাইলে বাসা থেকেও করে নিয়ে আসতে পারেন। তবে বিভ্রান্তি এড়াতে এটা ৫ নং কাউন্টার বা বাইরের দোকান থেকে করে নিলেই ভালো করবেন। এবার আপনার ফর্মগুলো ধরিয়ে দিলেই (৫ নং কাউন্টার কিংবা দোকানদার) তারা আপনার সোনালি সেবার ফর্ম ফিল আপ করে দেবে। প্রতিটা কাগজের টুকরোর জন্য ৫৫৮ টাকা করে যাবে আপনার। একেবারে খোলামেলা লিখে দিচ্ছি। কারণ, এটা আমার জন্য অনেক বড় একটা প্রশ্ন ছিলো।

  • আপনার দৌড়াদৌড়ি চূড়ান্তভাবে শেষ হচ্ছে এই ধাপের সঙ্গে। এবার আপনি আবারও যাবেন ৪ নম্বর বিল্ডিংয়ে। এর আগের দিনই আপনি লক্ষ্য করেছেন একটা দশাসই কাউন্টার আছে ৫ তলায়। সামনে হয়তো ৪/৫জনের একটা লাইন – যেখানে আপনাকে আগে আমি ঢুকতে মানা করেছিলাম। এবার আপনি সেখানে ঢুকবেন। লাইন থাকলে লাইনে দাঁড়াবেন। জমা দেবেন কাগজ। সেই সঙ্গে দিবেন ১২ কপি “চিঠি”র ফটোকপি।  আরও দেবেন ঐ উল্লেখিত ২০০টাকার ঘুষ। ব্যাস। আপনাকে ওরা একটা তারিখ বলে দেবে। সেই তারিখে এসে শুদ্ধ বানানে আসল নামে সার্টিফিকেট নিয়ে যাবেন।

আশা করি আগামিতে যারা নিজের বা বাবা-মায়ের নাম পরিবর্তন করতে লড়বেন, তারা এই ওয়াকথ্রু (ওয়াক, থুঃ না, Walkthrough) পড়ে আলোকিত পথেই হাঁটতে পারবেন। অসাধ্য সাধন করতে আমার মতো অন্ধকারে স্রেফ একবুক সাহস নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে না (গ্লোরিফাই করছি, ভাই। যে অদ্ভুত আচানক প্যারাটা খেতে হয়েছে, হাল্কা গ্লোরিফাই কি করবো না নিজের কর্মকীর্তিকে?)। ধাপে ধাপে এগিয়ে যাবেন, কাজ হয়ে যাবে।

সময় কেমন লাগতে পারে?

আমি কাজটা শুরু করি ২৫শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮। আমাকে ২১শে মে, ২০১৮ মূল সনদ নিয়ে যেতে বলা হয়েছে। অর্থাৎ তিন মাস। এই সময়টা লেগেছে সাত দিন, এক মাস এমন গ্যাপ দিয়ে দিয়ে পরের কাগজ রেডি হচ্ছিলো, তাই। দালাল কিংবা ফেরেশতাকূলও আপনাকে এর থেকে দ্রুত কাজ করে দিতে পারবে না। তাই দালালগোত্রের পেছনে টাকা অপচয় না করে ঐ অর্থলগ্ন করে সেঁটে খেয়ে নিন কোনও প্রিয় রেস্তোঁরা থেকে। শুভকামনা রইলো আগামী যুদ্ধের জন্য।

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-