ছেলেটা ছোটবেলা থেকেই খুব অস্থিরচিত্তের। পাড়ার সবাই একনামে চেনে তাকে, তার ধমকে এলাকার কুকুর-বিড়াল এক ড্রেনের পানি খায়। মুরুব্বীদের কাছে তেমন সুনাম নেই তার। পিতৃপ্রদত্ত নাম নাদের মিয়া, কিন্ত পুরান ঢাকার লোকজন তাকে ডাকে নাদের গুণ্ডা নামে। পড়ালেখা বেশি দূর করতে পারেনি, বখে যাওয়া একজন হিসেবেই সমাজে তার পরিচয়। পুরান ঢাকার মালিটোলায় তার বসবাস, সেখানকার লোকজন তাকে অপছন্দ করে, আবার খানিকটা ভয়ও পায়।

উনিশশো একাত্তর সাল, খুব অস্থির একটা সময়, ভীষণ অদ্ভুতও। মার্চের পুরো সময়টা জুড়েই নাটকীয় সব পরিবর্তন হয়েছে দেশের রাজনীতিতে। ঢাকা তখন বিদ্রোহের নগরী, বঞ্চনা আর শোষণ থেকে জন্ম নেয়া সেই ক্ষোভের আগুন স্ফুলিঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়েছে পুরো দেশে। পঁচিশে মার্চের অপারেশন সার্চলাইট, ঢাকা শহরটা রক্তের স্রোতে স্নান করে নিলো একদফা। শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ। কে কি করেছে, কার ধর্ম-বর্ণ কি, সেসবের ফারাক নেই কোন। দেশমাতৃকার টানে সবাই দলে দলে যোগ দিচ্ছে মুক্তিযুদ্ধে। পুলিশ-অপরাধী-ছাত্র-মজুর কিংবা ছাত্রলীগ-কম্যুনিস্ট-ডানপন্থী-বামপন্থী, সবার একটাই মিশন, দেশকে শত্রুমুক্ত করতে হবে। আগরতলায় মেলাঘরের ক্যাম্পে ভীড় জমাচ্ছে সীমান্ত পাড়ি দেয়া যুবকেরা। ওদের অস্ত্র চাই, ট্রেনিং চাই।

পঁচিশে মার্চ সকালে বন্ধু দুলুর (চিত্রনায়ক ফারুক) সঙ্গে দেখা করেছিল নাদের। শ্যামলীতে দুলুদের বাসা, সেই বাসার পেছনের একটা বাঁশঝাড়ের পেছনে একটা ওপেল গাড়ি নিয়ে আসে নাদের, ডাক দেয় দুলুকে। গাড়ির বনেট খুলে দিলো সে, দুলু অবাক হয়ে দেখে, সেখানে বেশ কয়েকটা রাইফেল আর পিস্তল। দুলুর তো চোখ আকাশে, সে জিজ্ঞেস করে, এত অস্ত্র কই পাইলা? নাদের একটা রহস্যময় হাসি দেয় শুধু, বলে, আইজ রাতে রেডি থাইকো, খারাপ কিছু হইবার পারে।

রাত দশটার দিকে দুলুরা আড্ডা দিচ্ছিল নবাবপুর রোডের হোটেল প্যারামাউন্টে। এমনিতে দশটার দিকে ঢাকা শহর শুনশান হয়ে আসে, তবে পুরান ঢাকা একটু আলাদা। এখানে মাঝরাতেও রাস্তায় লোকজন থাকে। আড্ডার মাঝখানেই এক পুলিশ সার্জেন্ট ছুটে এলেন চিৎকার করতে করতে, এসে বললেন, পাকিস্তানী আর্মি রাস্তায় নেমে গেছে, নির্বিচারে গুলি চালাচ্ছে। মূহুর্তের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো দুলু, যেভাবেই হোক, আর্মির গাড়ি এদিকে ঢুকতে দেয়া যাবে না, ব্যারিকেড দিতে হবে। ধোলাইখালে পুরনো ট্রাকের বডি পড়ে ছিল বেশ কয়েকটা, লোকজন মিলে সেগুলোকে টেনে আনা হলো রাস্তার মাঝখানে।

নাদের গুণ্ডা, পুরান ঢাকা

গোলাগুলির আওয়াজ আসছিল কানে। দুলু দৌড়ে নবাবপুর রোড হয়ে ছুটে গেল মালিটোলায়, খুঁজে বের করলো নাদেরকে। নাদের একা নয়, ওর সঙ্গে আরও বেশ কয়েকজন আছে। সবার হাতে অস্ত্র। সবাই মিলে ঈসা ব্রাদার্সের ছাদে ওঠে ওরা। ঢাকা তখন জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডের রূপ নিয়েছে। ছাদ থেকেই দেখা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওদিকটায় আগুন জ্বলছে। ধোঁয়া উড়ছে আকাশে। অনেক দূর থেকে মানুষের চিৎকার শোনা যায়, আর শোনা যায় একটানা গুলির আওয়াজ। নাদের আর দুলুর চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। চাপা গলায় ফিসফিস করে দুলুকে নাদের বলে, শুওরের বাচ্চা একটারেও জান নিয়া ফিরতে দেয়া যাইবো না।

ঢাকা শহরে তখন দলে দলে আর্মিরা ছড়িয়ে পড়েছে। বড় একটা দল হামলা করেছে রাজারবাগের পুলিশ লাইনে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে গেছে একদল। পুরান ঢাকার দিকেও আসে ওরা, বংশাল থানায় আক্রমণ করার জন্যে সত্তর-আশিজন সৈন্যের একটা বড় দল আসে। ওদের হিসেব পাকা, থানায় পুলিশ আছে বিশ-পঁচিশজন, তাদের জন্যে এরাই যথেষ্ট। সত্তরজোড়া বুটের আওয়াজে এলাকাটা গমগম করে ওঠে। সেই আওয়াজ হুট করেই আর্তনাদে রূপ নেয় গুলির শব্দে।

একজন, দুজন, তিনজন করে প্রায় পঁচিশ-ত্রিশটা খাকি শরীর মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। বন্দুকের শব্দে কানে তালা লেগে যায়। খোলা রাস্তায় কাভার নেয়ার কোন জায়গাও নেই, বেঘোরে মারা পড়তে থাকে ওরা। গুলি কোনদিক থেকে আসছে, সেটা বোঝার আগেই লাশ হয়ে যায় ওদের আটাশজন। সাতজন আহত সৈন্যকে রেখেই দিগ্বিদিক ছুটে পালাতে থাকে আক্রমণ করতে আসা সৈন্যরা। ঈসা ব্রাদার্সের ছাদ থেকে ছুটে আসা আগুনের ফুলকিগুলোতে কত ক্রোধ মিশে ছিল, সেটা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিল ওই পঁয়ত্রিশ পাকিস্তানী সেনা।

আরও পড়ুন- একজন কিশোরী মুক্তিযোদ্ধা কিংবা নাদের গুণ্ডার মুক্তিযুদ্ধ!

পাকিস্তানী হানাদারেরা ফিরে আসে কিছুক্ষণের মধ্যেই। অস্ত্র বোঝাই গাড়ি আর শয়ে শয়ে সৈন্য নিয়ে। খুঁজে ফেরে হামলাকারীদের। পুরান ঢাকায় আগুন জ্বলে ওঠে বাড়িতে বাড়িতে, শুরু হয় হত্যাযজ্ঞ। ওদের একটাই প্রশ্ন, কারা চালিয়েছে হামলা? জবাব না পেলেই গুলি। নাদের তার দলবল নিয়ে ততক্ষণে সরে পড়েছে নিরাপদ আশ্রয়ে।

যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। পাকিস্তানের অনুগতদের নিয়ে শান্তি কমিটি গঠিত হলো পাড়ায় পাড়ায়। এইসব দালালেরা খোঁজখবর নেয়া শুরু করলো বাড়ি বাড়ি ঘুরে, কার ঘরে যুবক ছেলে আছে, যুবতী মেয়ে আছে, কার ছেলে এলাকা ছেড়ে পালিয়েছে। নাদের এরমধ্যে গেরিলা আক্রমণ শুরু করেছে, কিন্ত অস্ত্রশস্ত্রের অভাবে সুবিধা করতে পারছে না খুব একটা। কয়েকটা থ্রি নট থ্রি রাইফেল আর অল্প কিছু বুলেট নিয়ে আর্মির সাথে যুদ্ধ করা যায়? তবুও এখানে সেখানে হামলা হচ্ছিল নাদের নেতৃত্বে। পুরান ঢাকার রাজাকারদের কাছে তখন নাদের গুন্ডা বা তার বাহিনীর নামটাই মূর্তিমান আতঙ্ক!

মে মাসের শেষদিকের কথা। বর্ষাকাল শুরু হবে হবে করছে। পুরান ঢাকার আরমানিটোলায় শান্তি কমিটির দালালদের মধ্যে প্রধান একজন খাজা খায়েরউদ্দিনের সভায় হামলা চালাবে বলে ঠিক করলো নাদের। কিন্ত গোলা-বারুদ তো চাই। যুদ্ধ শুরুর আগে নাদের গুন্ডা অস্ত্র কিনতো সংগ্রাম নামের এক লোকের কাছ থেকে। আবার তার সঙ্গে যোগাযোগ করলো নাদের। সংগ্রামও আশ্বাস দিলো, অস্ত্রের ব্যবস্থা সে করে দেবে।

নির্ধারিত দিনে নিজের দলের কয়েকজনকে নিয়ে অস্ত্রের ডেলিভারি নিতে আর্মেনীয় চার্চে গেল নাদের। সংগ্রাম এলো ঠিকই, কিন্ত সঙ্গে অস্ত্র নেই, আছে পাকিস্তানী সৈন্য। নাদেরকে ধরিয়ে দেয়াই ছিল তার উদ্দেশ্য। কিন্ত আড়াল থেকেই সংগ্রামের সঙ্গে আর্মি দেখে ঘটনা বুঝে ফেলে নাদের, অনেকটা দূর থেকে নিখুঁত নিশানায় গুলি করে সংগ্রামকে। সেখানেই পটল তোলে এই বিশ্বাসঘাতক।

পাকিস্তানী সৈন্যরা ততক্ষণে চার্চের চারদিক ঘিরে ফেলেছে। ভয় জিনিসটা নাদেরের মধ্যে কোনদিন ছিল না, সেই প্রতিকূল সময়টাতেও নার্ভ এতটুকু উত্তেজিত হয়নি তার। দলের বাকী লোকজনকে সরে যেতে বলে সে একাই গুলি করে কাভার দিতে শুরু করলো। নাদেরকে সঙ্গ দিলো তার ছোট ভাই হারুণ আর বন্ধু সোহরাব। হারুণ-সোহরাব দুজনেই গুলির আঘাতে লুটিয়ে পড়ে মাটিতে। নাদেরের বন্দুকের গুলিও শেষ হয়ে আসছিল। ধরা পড়ার চেয়ে পালানোর একটা চেষ্টা করা ভালো, এটা ভেবেই পিছু হঠে যায় নাদের। কিন্ত দেয়া টপকে পালানোর সময় পায়ে গুলি লাগে তার। আহত অবস্থায় নাদের আশ্রয় নেয় বেচারাম দেউড়ির বস্তিতে।

এতদিন যে নাদের গুণ্ডার জ্বালায় অতিষ্ট ছিল লোকজন, সেই নাদের গুণ্ডা আহত হয়ে আশ্রয় নিয়েছে তাদের ঘরে! বস্তির লোকজন মিলে নাদেরকে লুকিয়ে রাখার শেষ চেষ্টাটুকু করে। এরমধ্যেই পাকিস্তানী সৈন্যরা এসে পড়েছে বস্তিতে, সঙ্গে তাদের এদেশীয় দোসরেরা। পুরো বস্তিকে আজ জ্বালিয়ে শ্মশ্মান বানিয়ে দেবে ওরা, ‘আহত মুক্তি’র খোঁজ যদি না দেয়া হয় তাদের। জানের ভয়েই বস্তির মানুষগুলো নাদেরকে তুলে দিলো ওদের হাতে। তাকে তোলা হলো আর্মির জীপে। তীব্র শব্দ করতে করতে ঢাকা শহরের বুক চিরে জলপাই রঙের গাড়ি ছুটলো ক্যান্টনমেন্টের দিকে।

নাদের গুণ্ডা, পুরান ঢাকা

ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে নাদেরের ওপর চালানো হলো অকথ্য নির্যাতন। কিন্ত মানুষটা তো অন্য ধাতুতে গড়া, শত অত্যাচারের পরেও স্বীকার করলো না নিজের কিংবা সঙ্গী-সাথীদের পরিচয়। আর্মির লোকজন বুঝলো, সোজা আঙুলে কাজ হবে না। পুরান ঢাকায় নাদের গুণ্ডার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল গ্যাদা নামের এক ছোটখাটো গুণ্ডা। নাদেরের কারণে সেভাবে কাজকর্ম কিছুই করতে পারতো না সে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হবার পরে সে যোগ দিয়েছিল শান্তি কমিটিতে। তাকে নিয়ে আসা হলো ক্যান্টনমেন্টে। সে’ই আর্মিকে জানালো, এই লোকই নাদের গুণ্ডা।

এরপরের গল্পটা খুব সংক্ষিপ্ত। নাদের গুণ্ডা আর কখনও ফিরে আসেনি। যে পুরান ঢাকায় তার একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল, সেই এলাকাটায় তাকে আর কখনও দেখা যায়নি। গ্যাদা এসে বলেছিল, তার সামনেই নাকি আর্মিরা গুলি করে হত্যা করেছে নাদেরকে। ‘ইসলামবিরোধি ভারতীয় কাফের’দের পরিণতি এমনই হয়, পুরান ঢাকায় দাঁড়িয়ে বুক ফুলিয়ে এসব বলে বেড়িয়েছিল গ্যাদা।

ওয়ারি থেকে ফরাশগঞ্জ হয়ে শ্যামবাজার, কিংবা নারিন্দা থেকে রায়সাহেব রোড- নাদের গুন্ডার নামে লোকে কেঁপে উঠতো। সেই নাদের গুন্ডা, যার ওপর এলাকার মানুষ ছিল বিরক্ত, সেই লোকটা একাত্তরের সেই উত্তাল সময়টাতে দেশমাতৃকার ডাকে সাড়া দিয়ে, এলাকার মানুষকে পাকিস্তানীদের অত্যাচার থেকে রক্ষা করতে হাতে তুলে নিয়েছিলেন বন্দুক, চালিয়েছিলেন গুলি। দেশ আর দেশের মানুষের জন্যে নাদেরের বুকের ভেতরের এই ভালোবাসাটা আগে কেউ দেখেনি, কেউ বোঝেনি। উত্তাল একাত্তর তার হৃদয়ের গভীরে লুকিয়ে থাকা সেই ভালোবাসার বারুদটা বের করে এনেছিল।

পুরান ঢাকা নাদের গুন্ডার জন্যে বিখ্যাত হবার কথা ছিল। অথচ নাদের গুন্ডাকে কেউ মনে রাখেনি। মুক্তিযুদ্ধে অবদানের স্বীকৃতি তিনি পেয়েছিলেন কিনা আমার জানা নেই। মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের গেজেটেড লিস্টে তার নাম আছে কিনা সেটাও আমি জানিনা। অথচ প্রতি বছর কিন্ত নতুন নতুন ‘মুক্তিযোদ্ধা’ গেজেটেড হচ্ছেন! সরকারী বা বেসরকারীভাবে বছরের একটা দিনে, বা দশ বছরে একদিন তাকে অথবা তার আত্মত্যাগকে কেউ স্মরণ করেছিলেন বলে আমি কখনও শুনিনি। আমাদের অল্প কিছু মানুষের কাছে নাদের গুণ্ডা বেঁচে আছেন কয়েক পৃষ্ঠার একটা গ্রাফিক্যাল নভেলের একটা চরিত্র হয়ে।

পুরান ঢাকার বিরিয়ানি খুব বিখ্যাত; বেচারাম দেউড়ি কিংবা ইসলামপুর রোডে কাচ্চির দোকানে বসে মাংসে কামড় বসানো আমরা জানি না, এই গলিগুলোতে লেগে আছে নাদের গুণ্ডা নামের এক মহৎ হৃদয়ের মুক্তিযোদ্ধার স্পর্শ, যে মানুষটা অসম সাহসিকতার সাথে পাকিস্তানী সেনাদের বিরুদ্ধে গড়ে তুলেছিলেন সশস্ত্র প্রতিরোধ। যিনি জীবনের শেষ মূহুর্তেও সঙ্গীদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে তাদের অবস্থান জানিয়ে দেননি, যে মানুষটা দেশের জন্যে প্রাণ বিলিয়ে দিতে একটুও ভয় পাননি!

কার্টুন কৃতজ্ঞতা- আলিফ গিয়াস

আরও পড়ুন-

 

Comments
Spread the love