ইউএস ওপেন টেনিসের এটি পঞ্চাশতম আসর। তাই এই আসরটি এমনিতেই একটু বিশেষ মর্যাদা পাচ্ছে। যেহেতু খেলাটার নাম টেনিস আর এখনো টেনিস কোর্টে খেলে যাচ্ছেন রাফায়েল নাদাল, রজার ফেদেরারের মতো জীবন্ত কিংবদন্তি দুই খেলোয়াড়- তাই আলোটা রোশনাই তাদের দিকেই বেশি। তাদের এখন আর নতুন করে প্রমাণ করার কিছু নেই, টেনিসের জগতে সম্ভাব্য যা যা জেতার সবই জিতে ফেলেছেন দুইজনই। তবুও তারা যখন এখনো খেলে যাচ্ছেন তখন তাদের নিয়ে কথা হয়, তুলনা হয়। ফুটবলে মেসি-রোনালদোর যেমন দ্বৈরথ, টেনিসে সেটা রাফা-রজারের লড়াই। এই ইউএস ওপেনে যদিও রজার ফেদেরার দূর্ভাগ্যজনকভাবে হেরে বাদ পড়ে গিয়েছেন। কিন্তু রয়ে গেছেন আরেকজন লিজেন্ডারি টেনিস তারকা রাফায়েল নাদাল। অনেকে ভেবেছে রজারের মতো রাফারও বোধহয় বিদায় হবে শেষ ষোলোর লড়াইতে।

শেষ ষোলোর খেলায় রাফায়েল নাদালের প্রতিপক্ষ ছিলেন অস্ট্রেলিয়ান ডমিনিক থিম৷ এই ম্যাচের ক্ষণে ক্ষণেই উত্তাপ ছড়াচ্ছিল, শ্বাসরুদ্ধকর এক ম্যাচ দেখেছে টেনিসপ্রেমীরা। প্রায় ৪ ঘন্টা ৪৯ মিনিটের এই অসামান্য লড়াইয়ের প্রতিটি পরতে পরতে ছিল থ্রিলারের রোমাঞ্চ। ডমিনিক থিম এমনিতে নবম বাছাই হয়ে খেলছেন, গত জুনেই ফ্রেঞ্চ ওপেন টেনিসের ফাইনালেও উঠেছিলেন। যদিও হেরেছিলেন এই রাফার সাথেই। তাই হয়ত, বাড়তি একটা তাগিদ অনুভব করছিলেন, জেতার ক্ষুদা যে প্রবল সেটাও বোঝা যাচ্ছিল তার খেলায়৷

প্রথম সেটে ডমিনিক থিমতো পাত্তাই দিলেন না র‍্যাংকিংয়ে প্রথম স্থানে থাকা নাদালকে। ৬-০ তে হারিয়ে দেন নাদালকে! দর্শকরা নড়েচড়ে বসলেন। রাফায়েল নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছেন। জবাব দেওয়ার জন্য৷ ডমিনিক ভালো খেলোয়াড়, সন্দেহ নেই। কিন্তু তাই বলে প্রথম সেটেই ৬-০তে পরাজয়! তারপরই এক ক্ল্যাসিক ধ্রুপদী লড়াইয়ের গল্প। 

প্রথম সেট একদম বাজেভাবে হারার পর নাদাল ফিরে আসলেন দ্বিতীয় সেটে। তবে একদম এমনি এমনি নয়। দ্বিতীয় সেটের জয়টা ছিল কষ্টার্জিত লড়াইয়ের ফল। নাদাল জিতলেন ৬-৪ এ! ডমিনিক ৩য় সেটেই ‘ডমিনেট’ করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু, নাদালও নাছোড়বান্দা। লড়াই চলছে সমানতালে। সময় দীর্ঘায়িত হচ্ছে এদিকে। অবশেষে ডমিনিক এই সেটে একদম অল্পের জন্য হেরে গেলেন। ৭-৫ এ সেট জিতে এগিয়ে গেলেন নাদাল। প্রথম সেট হেরে পরের দুইটা জিতে ফাইট ব্যাক করলেন নাদাল। দর্শকরা বুঝতেই পারছেন না হচ্ছেটা কি! তারা চোখ বড় বড় করে মুগ্ধতায় চেয়ে আছেন মাঠে, ডুবে আছেন খেলাটার সৌন্দর্যে।

ডমিনিক থিমও দমে যাবেন কেনো! শুরুটা এতো ভাল ছিল, পরের দুইটা সেট হারলেই কি ম্যাচ হেরে গেছেন, তা তো নয়। তিনি কামড়ে ধরলেন চতুর্থ সেটে। তুমুল হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হচ্ছে। নাদাল এই সেট জিতলেই শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু একদম শেষ মুহুর্তে গিয়ে হলো না। নাদাল এই সেটে হারলেন। ডমিনিক জিতে গেলেন ৭-৬ ব্যবধানে। খেলা আবারো সাম্যাবস্থায়! দুইজনই দুইটি করে সেট জিতে সমান সমান অবস্থা। কেউ কাউকে ছাড়ছে না। কি অসাধারণ এক ম্যাচ!

খেলা গড়ালো ট্রাই-ব্রেকার সেটে। দর্শকরাও উত্তেজনায় টগবগ করছেন। টানটান একটা মুহুর্তে, জয় পরাজয়ের পেন্ডুলাম কার পক্ষে বিপক্ষে যায় দেখার জন্য উদগ্রীব অপেক্ষা। ডমিনিক থিম, রাফায়েল নাদাল পুরো ম্যাচের মতো ক্ষুরদার খেলা দেখালেন শেষ সেটেও। যখন মনে হচ্ছিলো ম্যাচ রাফার হাতে তখন ডমিনিক ফাইট দিচ্ছেন, যখন ডমিনিক আবার একটু প্রভাববিস্তার করলেন তখনই রাফার রিপ্লাই। একদম সমানে সমানে হচ্ছে লড়াইটা।

শেষ পর্যন্ত চার নাম্বার সেটের মতোই হলো ফলাফল। ৭-৬ ব্যবধান। তবে এবার ৭ রাফায়েল নাদালের পক্ষে। টাই-ব্রেকার সেট জিতে মহাকাব্যিক এক ম্যাচ জিতে গেলেন নাদাল। ডমিনিকের অভিব্যক্তিটা দেখে মনে হলো, আর কিভাবে চেষ্টা করলে হারানো যাবে এই অতিমানবকে, এটাই বোধহয় ভাবছিল সে। গ্যালারিতে দর্শকরা বিস্মিত, তাদের অভিব্যক্তিতেই বোঝা যাচ্ছে এই ম্যাচ দেখে তারা বাকরুদ্ধ। মুহুর্মুহ তালি পড়ছে খেলা শেষে।

ম্যাচের পর রাফা গিয়ে জড়িয়ে ধরলেন ডমিনিককে। কি একটা যেন বললেন। তারপর সটান হয়ে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে দুই হাত কোনাকুনি উঁচু করে কি যেনো বললেন। তার এক্সপ্রেশন, ম্যাচের পর উদযাপন এটাই বলে দিচ্ছে, হ্যাঁ এভাবেও ফিরে আসা যায়। এটাই আমি, এই টেনিসকোর্টই আমার যুদ্ধের ময়দান, আমি হাল ছেড়ে দেবার পাত্র নই, আমাকে তোমার ভাল না-ই লাগতে পারে, কিন্তু আমার সামর্থ্যকে অবিশ্বাস করো না। আমি শেষপর্যন্ত, শেষ টাচ পর্যন্ত এভাবে লড়াই চালিয়ে যেতে পারি।

হয়ত এবছরেরই সেরা ম্যাচ ছিল এটি৷ এখনো ম্যাচ নিয়ে কথা চলছে টেনিসওয়ার্ল্ডে। রাফার ফাইট ব্যাকের প্রশংসায় পঞ্চমুখ সবাই৷ কিন্তু তিনি কি বলছেন? তার জবাব- “অনেকে ব্যর্থ হলে র‌্যাকেট বা স্ট্রিংয়ের অজুহাত দেয়। আমি সেটা করি না। সামনের দিকে তাকাই। মানসিকতায় বদল আনার চেষ্টা করি। আর সেটা করতে গেলে অজুহাত দেওয়া যায় না। সত্যিটা হলো, ম্যাচে ফেরার জন্য বা জেতার জন্য ভাল খেলতে হবে। কঠিন পরিস্থিতিতে এটাই মাথায় থাকে।”

নিজের সেরাটা দেয়ার পর সেখানে আসলে জয় পরাজয় বলে কিছু থাকে না। অনেকে জয় পরাজয়কে বেশি গুরুত্ব দিয়ে ফেলে, নিজের সেরাটা না দিয়েই। কিন্তু রাফার দর্শন আলাদা। তিনি ম্যাচের পর বললেন, ‘‘জীবনে দীর্ঘ ও কঠিন অনেক ম্যাচ খেলেছি আমি। আজকেরটা আরো একটা। নিজের সেরাটা যখন দিই, যখন একেবারে সঠিক মানসিকতা নিয়ে কোর্টে নামি, জিতি বা হারি, তখনই তৃপ্তি পাই। এটাই আসল কথা।”

টেনিস আপনার ভাল লাগুক কিংবা না লাগুক, রাফায়েল নাদালের এই ফাইট ব্যাক করার সূত্রটা নিঃসন্দেহ আপনাকে অনুপ্রেরণা দিবে। খুব সহজ একটা শিক্ষা যেন হয়ে থাকবে এই খেলাটা, সেটা হলো, পিছিয়ে পড়লেই তুমি বাজে নও, পিছিয়ে পড়া মানেই হেরে যাওয়া নয়, তোমার উপর অনেকে অবিশ্বাস রাখতেও পারে, কিন্তু তুমি জানো তোমার সামর্থ্য কি। সেইটুকুর সেরাটাই ঢেলে দাও না! দেখো, অপেক্ষা করো, কি হয়। শুরুটা সবসময়ই ভাল শেষের ইংগিত দেয় না। কিন্তু, নিজের লড়াইটার প্রতি আস্থা থাকলে সেটার সেরাটা দিতে থাকলে জীবন সুন্দর কোনো আয়োজন নিয়ে অপেক্ষা করবে আপনার জন্য, সেটা প্রাপ্তির আগ পর্যন্ত বোঝা যায় না। তাই, ফলাফল আসার আগে আপনি শুধু একটা কাজই করে যেতে পারেন, নিজের শ্রেষ্ঠ সময়টুকু কাজে লাগিয়ে যাওয়া!

Comments
Spread the love