ফেব্রুয়ারি আসে আর বইমেলা ঘিরে নতুন শংকায় থাকি আমরা- এবার না জানি কার ঘাড়ে চাপাতির কোপ পড়লো! সেই হুমায়ূন আজাদ থেকে শুরু করে অভিজিৎ, আশংকা বেড়েই চলছে প্রতি বছর। এবার ফেব্রুয়ারি গেল, রক্তপাতহীন ফেব্রুয়ারি ভেবে নিঃশ্বাস নেয়ার মূহুর্তেই আঘাতটা এলো বড়সড় হয়ে। এবার স্বয়ং জাফর ইকবাল স্যার! যে মানুষটা স্বপ্ন দেখান আমাদের। একটা মানুষ, যাকে দেখে দেশপ্রেম কেমন হয় বুঝি! যিনি সম্ভাবনা দেখান একটা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের। যার জন্য নিজেকে ‘বর্তমান প্রজন্ম’ ভেবে গর্ববোধ করি। তার শরীরের রক্তে ভিজেছে এই দেশ, মাটি। তার মাথা জুড়ে ব্যান্ডেজ, মাথায় এতগুলো সেলাই!

সাস্টের ক্যাম্পাসে নিজের ডিপার্টমেন্টের ‘ইইই ফেস্টে’ জাফর ইকবাল স্যারের নিরাপত্তায় ছিলেন তিনজন পুলিশ। উপরে ছবিতে পুলিশ ও হামলাকারীর অবস্থান দেখুন। এক পাশে পুলিশ দাঁড়িয়ে মোবাইল টিপছে, আর ঘাতক নিঃশ্বাস ফেলছে স্যারের ঘাড়ের উপর! ঘাতক যেভাবে দাঁড়িয়ে, সেভাবে কাদের নিরাপত্তা দেয়ার কথা ছিলো জাফর ইকবাল স্যারকে? পুলিশের তো?

তাহলে শুনুন, এই পুলিশ গুলো দায়িত্ব অবহেলা করে কতটা অনিরাপদ করে রেখেছিলেন স্যারকে। আরাফাত তানিম নামের লন্ডন প্রবাসী পরিচিত একজন লেখক দেশে এসেছেন বইমেলা উদ্দেশ্য করে। এসেছেন মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে। আনসারউল্লাহ বাংলা টিমের হিটলিস্টে সিলেটের যে কজন ব্লগার ও লেখকের নাম  ছিলো তার মধ্যে নাম ছিলো তানিম ভাইয়েরও। সে তালিকা ধরে অনন্ত বিজয়কে মেরে ফেলা হয়েছে সেই শাহবাগ মুভমেন্ট পরবর্তী সময়েই! তাই ভাবীর স্পষ্ট নিষেধ, বই মেলায় যাওয়া যাবেনা। সে নিষেধাজ্ঞা থাকা স্বত্বেও তিনি বইমেলায় এসেছেন শেষ কয়েকদিন। মেলা শেষে সিলেটের বাসায় গিয়ে তার লিখা একাত্তরের রমজানঃ গণহত্যা ও নির্যাতন বই সহ দেখা করেছেন জাফর ইকবাল স্যারের সাথে। কাল জানালেন স্যারের বাসার সামনে বসে থাকা পুলিশের দায়িত্ব অবহেলার কথা। ফেসবুকে তিনি লিখেছেন,

“আমি ও আমার সাথের বন্ধু মোটরসাইকেলে গিয়েছিলাম, বিল্ডিং এর নিচেই দু’জন পুলিশ বসে গল্প করছিলো, পুলিশ আমাদেরকে থামায়নি। যদিও আমার কাঁধে বইয়ের ব্যাগ ছিলো।

সোজা উপরে উঠে গিয়ে পিএর সাথে দেখা করে স্যারের সাথে সাক্ষাতের সুযোগ পেলাম।

আমরা স্যারের স্টুডেন্ট, সমস্যার কোন কারন নেই। কিন্তু আমি যা বলতে চাচ্ছি, তা হচ্ছে প্রশাসন থেকে ভালোভাবে খেয়াল রাখা, চেক করা বা জানতে চাওয়া কোনকিছুই দেখলাম না। ভেবেছিলাম এই বিষয় নিয়ে লিখবো, বলতে না বলতে ছুরিকাঘাত করে গেলো।”

পরশুর প্রোগ্রামেও পুলিশ ছিলো, পুলিশ থাকার পরও স্যারকে স্ট্যাবড করা হলো। মাথায় চারটা কোপ, ঘাড়ে-হাতে কোপ। ২৬ টা সেলাই! পুলিশের সামনেই হলো সব। আসলে সত্যি হচ্ছে, এখনকার পুলিশ কতটুকু চেনেন স্যরকে? তাঁর বেঁচে থাকা জরুরী তা কতটুকু অনুভব করেন? এই দায়িত্ববোধ আসতে হয়, থাকতে হয়। না হয় লক্ষ পুলিশ দিয়ে রাখলেও হবে না আসলে…

আর পরশু যে জারজ ধরা পড়েছে, সে তো একা না! এরা পালে পালে, এরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে গোটা রাষ্ট্র জুড়েই। স্যারের আহত হওয়ার খবরের নিচের মন্তব্য গুলো পড়লেই দেখা যায় এই শুয়রের পাল কত বড়, কত বিস্তৃত! এদের সাথে যুদ্ধটা আদর্শগত, নীতিগত। জিততে হলে খেলতে হবে, খেলতে হবে ওদের মত। এর জন্য রাষ্ট্রের কি প্রস্তুতি আছে? কিছু কি উদ্যোগ নিয়েছে রাষ্ট্র? চেতনা চর্চার জিনিস, চেতনা আলোচনার চেয়ে বেশী ছড়িয়ে দেয়ার জিনিস। ছড়িয়ে দেয়া এই দায়িত্বটুকু কি রাষ্ট্র অনুভব করে? না। রাষ্ট্রের অবস্থাও নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশের মতই। রাষ্ট্র ব্যস্ত পুলিশের মত ‘মোবাইল’- এ। জাফর ইকবাল স্যারদের ছাড়াই এ দেশ ডিজিটাল হবে, 4G আসবে। আরও কত কি! কিন্তু কারা ভোগ করবে এসব? জাফর ইকবাল কিংবা আমরা যারা ‘জাফর ইকবাল প্রজন্ম’ তাদের মেরে ফেললে এইসব সুযোগ থেকে যাবে কেবলই জঙ্গি, ধর্মান্ধ আর মৌলবাদীদের জন্য। সুযোগ সুবিধা গুলো কি তাদেরই জন্য? এই দেশ বুঝি ত্রিশ লক্ষ প্রান, তিন লক্ষের বেশী মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে স্বাধীন হয়েছিলো এই জন্যই?

আমরা? আমরা পড়ে আছি মৌলবাদী ও জঙ্গির হাতে স্যরের আহত হওয়া নিয়ে। অথচ এটাই হওয়ার ছিলো। যেখানে ব্লগার মেরে ফেলা হয়েছে কুপিয়ে, যেখানে জাফর ইলবাল স্যারকে ওরা বাঁচিয়ে রাখবে? অসম্ভব! এই বাস্তবতায় দেশ এসেছে বলেই তো লোভনীয় চাকুরী আর উন্নত জীবন ছেড়ে দেশের জন্য কিছু করতে আসা একজন ‘বুড়ো শিক্ষক’কে নিজ দেশেই নিরাপত্তাহীন ভাবে ঘুরতে হয়। এই বাস্তবতায় দেশ এসেছে বলেই তো, যিনি সবচেয়ে সম্মানিত হওয়ার কথা, তাঁর সম্বোধন হয়ে যায় ‘ষাঁড়’!

অবাক হতে চান? তাহলে শুনুন… স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আসাদুজ্জমান খান বলেছেন, ‘জাফর ইকবালের নিরাপত্তার কোনো ত্রুটি ছিল না। ত্রুটি থাকলে হামলাকারী ধরা পড়ত না। হামলাকারী ধরা পড়েছে।’
 
অথচ আমরা ছবিতে দুই পুলিশকে মোবাইল টিপতে দেখলাম। আর ভিডিওতে স্পষ্ট দেখলাম, হামলাকারীকে ধরেছে ছাত্ররা। এরপর গণধোলাই দিয়ে দেয়া হয়েছে পুলিশের হাতে। কিন্তু মাননীয় মন্ত্রী আমাদের শেখালেন, হামলাকারী ধরা পড়া মানেই নিরাপত্তায় ক্রুটি না থাকা। এটা আসলে আগে জানতাম না, না জানার জন্য আমি ক্ষমাপার্থী। আর এইটুকু জানানোর জন্য অশেষ ধন্যবাদ মাননীয় মন্ত্রী।
 
কিন্তু ঝামেলা বেঁধেছে অন্যখানে! একাত্তর টিভির খবরে শুনলাম, দায়িত্ব অবহেলার কারণে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা দুই পুলিশ সদস্যকে অব্যহতি দেয়া হয়েছে। নিরাপত্তায় যদি ক্রুটিই না থাকলো (মাননীয় মন্ত্রী বলেছেন), তাহলে দায়িত্ব অবহেলা হলো কিভাবে? একটু কেমন যেনো হয়ে গেলো না?

আমার দুর্ভাগ্য, আমার ক্ষমতা নেই। আমার ক্ষমতা থাকলে জাফর ইকবাল স্যারের উপর হামলার ঘটনায় ‘উল্লাসিত’দের ফেসবুকে সংবাদপত্রগুলোর পেজের কমেন্টস বক্স থেকে খুঁজে বের করে চরমতর শাস্তি দিতাম। এরা নিশ্চিতভাবেই পাকিস্তানের প্রেতাত্মা, সুযোগ পেলে এরাই আবার কোপ বসিয়ে দেবে জাফর ইকবাল স্যার কিংবা মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তির মানুষদের। প্রবল ঘৃণা, হতাশা আর আক্ষেপ নিয়ে রাষ্ট্রের কাছে ফরিয়াদ জানাতে ইচ্ছে হয়, ‘হে রাষ্ট্র, বুলেটগুলোকে কি তাঁক থেকে নামাবেন? জাফর ইকবাল স্যারেরা মরে গেলে এই বুলেট দিয়ে আর কাদের রক্ষা করা হবে? কি হবে এই ভূ-খন্ড দিয়ে? কারা ভোগ করবে স্বাধীনতা? এই দেশের বাতাস থেকে কারা নিঃশ্বাস নিবে?’

আমি জানি, এইসব প্রশ্নের উত্তর রাষ্ট্র দিবে না। কারণ, রাষ্ট্রের দেয়া পুলিশ নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা অবস্থায়তেই তো অনিরাপদ থাকেন স্যার। তারা মোবাইল টিপবেন, ঘাতক চাপাতি চালাবে ঘাড়ে-মাথায়। ২৬ টা সেলাই নিয়ে ফিরবেন জাফর ইকবাল স্যার। এরপর আবার পুলিশ মোবাইল টিপতে থাকবে, ঘাতক দাঁড়াবে পুলিশের জায়গায়, আবার কোপ মারবে স্যারকে। এরপরের আঘাতটা নিশ্চয়ই ঠিকঠাক জায়গায় হবে, এবারের মতো ভুল করবে না ওরা। তারপর ওসমানী মেডিক্যাল হয়ে আর সিএমএইচ অব্দি আনা লাগবেনা তাকে, স্যার আর ফিরবেন না এবারের মতো!

পুলিশের তাতে কি যায় আসে? কিংবা রাষ্ট্রেরও কি কিছু যায় আসে তাতে? না বোধহয়!

Comments
Spread the love