ছোটবেলায় আরবি লেখা কোন কিছু রাস্তায় পড়ে থাকলে , চরম আদবের সাথে তুলে নিতাম। চুমু খেয়ে, বুকে ঠেকিয়ে, পানিতে ফেলে দিতাম। এটা মনের অজান্তেই করে ফেলতাম। কোন প্রশ্ন মাথায় আসতো না। শুধু মনে ছিল, আরবি মানেই পবিত্র কোরআন শরীফ। পবিত্র কোরআন শরীফ লেখা হয়েছে আরবি ভাষায়। কিন্তু আরবি একটা ভাষা মাত্র। যেখানে অন্যান্য ভাষার মতই ভাল কথা, মন্দ কথা সবই বলা সম্ভব।

বেশ কিছুদিন আগে, বাংলাদেশের ধর্ম মন্ত্রানলয় একটা উদ্যোগ নিয়েছিল, রাস্তার পাশে যেখানে মানুষ ইচ্ছেমত মুত্র ত্যাগ করে, সেখানে আরবিতে লিখে দিয়েছিল “এখানে প্রসাব করা নিষেধ”। সেটা বেশ কাজে দিয়েছিল, মানুষজন দেখলাম বেশ ভয় পেয়ে গেল এবং নতজানু হয়ে পিছনে হটতে শুরু করল। প্রশ্ন হল, কেন আরবি লেখা কাজে দিল, বাংলা ভাষায় লেখা নিষেধ কাজে লাগল না। যদি মানুষজন বুঝতে পারত যে আরবি ভাষায় লেখা আছে শুধু “এখানে প্রসাব করা নিষেধ”, তবে কি তারা সেখানে প্রসাব করা বন্ধ করে দিত?

এদেশের অধিকাংশ মানুষই ইসলাম ধর্মাবলম্বী হওয়ায় অধিকাংশ নাম নবী রাসুল এবং সাহাবাদের নামের থাকবে এটাই স্বাভাবিক। অনেক সময় একের অধিক নবীদের নামেও নাম রাখা হয়। বাবা-মা’দের বিশ্বাস থাকে যে ছেলেমেয়েরা সেইসব মহান মানুষের মত হবে। কিন্তু বাস্তবতা কী?

আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান, দাউদ ইব্রাহিম, মুসা ইব্রাহিম, আব্দুস সাত্তার- আর কত কুলাঙ্গারের নাম বলব? বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের নামের আগে এবং পরে “রহমান”, “করিম”,”রহিম’ এই ধরনের অসংখ্য আল্লাহর প্রশংসা সূচক নাম আছে। তাদের মধ্যে কয়জন তাদের নামের উপর সুবিচার করেন? যদি মানুষজন তাদের নামের প্রতি সুবিচার না করেন, তবে তারা কি সেই নাম নিজের সাথে রাখার অধিকার রাখেন? উত্তরটা আসলে “না”। তবে, নাম নিয়ে কারও খুব বেশি উল্লাসিত হবার কিছু নেই। বুকে হাত দিয়ে কয়জন বলতে পারবেন, যে তিনি তার নামটা ধারণ করার অধিকার রাখেন?

এই পর্যন্ত যদি আপনি আমার সাথে একমত থাকেন, তবেই পরেরটুকু পড়বেন।

আমার বন্ধু রাশেদ, হাতকাটা রবিন, রাজু ও আগুন আলী, জাফর ইকবাল স্যার আহত

এইবার আসি, জাফর স্যারের উপর হামলাকারী সারমেয় ছানা ফয়জুরের স্বীকারোক্তি, স্যারের একটা বইয়ের নাম “ভুতের বাচ্চা সোলায়মান” রেখেছেন বলে, তিনি ইসলামের শত্রু। আসলে ব্যাপারটা সেটা না। জাফর স্যারকে নিয়ে অনেকের অ্যালার্জি। সরকারদল, বিরোধীদল, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি, এবং অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তি। স্যারের সমস্যা হলো, তিনি যা বলেন খুব সহজ ভাষায় সরল করে বলেন, যুক্তি দিয়ে বলেন। যেটা আপামর জনগন বুঝতে পারে।

সরকারী দল স্যারকে পছন্দ করেন না কারণ তিনি ভাল কাজকে ভালোই বলেন, অকাজকে অকাজ। বিরোধীদল পছন্দ করে না কারণ, স্যার মাঝে মাঝে সরকারী দলের ভাল কাজের প্রশংসা করেন। আমাদের রাজনীতির যে মূলমন্ত্র “বিরোধীদল যাহা করিবে, তাহাই খারাপ” সেটার মধ্যে স্যারকে কোনোভাবেই ফেলা যায় না। এবার আসি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের(!) শক্তি। কে যেন একবার বলেছিলেন, “একজন মুক্তিযোদ্ধা সারাজীবন মুক্তিযোদ্ধা না”। প্রমান লাগবে? কয়েকটা টিভি চ্যানেল ঘুরিয়েই দেখুন না! মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তির অপছন্দের তালিকায় জাফর স্যারের নাম অনেক উপরে। কারণ, “ব্রেনওয়াশ” নামের তাদের প্রায় অব্যর্থ অস্ত্রের একমাত্র চিকিৎসা স্যারের লেখা বাচ্চাদের, কিশোরদের জন্য লেখা বইগুলো। যেখানে ৭২ হুরের লোভ দেখিয়ে নিজের অমূল্য জীবনটা দিয়ে দেতে বলেন, সেখানে স্যারের বই শেখায় কীভাবে দেশকে ভালবাসতে হয়, দেশের মানুষকে ভালবাসতে হয়, স্বপ্ন দেখতে হয়। যার মাঝে সুন্দর স্বপ্ন দেখার অভ্যাস থাকে, সে কি পারে নিজের জীবনটা এত সহজে ধ্বংস করে দিতে?

স্যার পাকিস্তানের কোন খাবার খান না, পণ্য ব্যবহার করেন না। যে দেশের হানাদাররা তার বাবাকে মেরে ফেলছে, যে মানুষটি বাবা মারা যাবার প্রায় ১ বছর পর কবর খুঁড়ে বাবার লাশ বের করে এনেছেন, সেই মানুষটা কিভাবে সেই দেশের পণ্য ব্যবহার করবেন? কতজনের বুকের পাটা এতটা চওড়া হয় যে, নিজের বাবার গলিত লাশের দিকে তাকাতে পারেন। এই দেশীয় রাজাকার, যাদের কারনে তার বাবাকে মরে যেতে হয়েছে, তাদের বিচারের দাবীতে যদি স্যার সোচ্চার হয়, তবে কি সেটা তার বড় অপরাধ?

আপনার আমার কাছে অপরাধ মনে না হলেও, অনেকের কাছেই সেটা অপরাধ। কোন যুক্তিতে না পারলে, শেষ অস্ত্র হিসাবে ধর্মকে ব্যবহার করা হলো স্যারের বিরুদ্ধে। আমার প্রশ্ন- প্রমান দেন, কবে কোথায় কোন লেখায় স্যার ইসলাম ধর্মকে অবমাননা করেছেন? কোন বই, অডিও, ভিডিও প্রমান আছে? না নেই। ১ সেকেন্ডের কোন প্রমান নেই।

তাহলে, দিগন্ত টিভিতে সাক্ষাতকার না দেয়া কি ইসলামের অবমাননা? রাজাকারের বিচারের দাবির সাথে একাত্মতা ঘোষণা করা, ইসলামকে অবমাননা? তার মানে, ১৯৭১ সালে রাজাকারদের কাজ ইসলামসম্মত ছিল? যেখানে মুড়ি মুড়কির মতো নবীদের নামধারি লোকেরা করে যাচ্ছে জঘন্যতম অপরাধ, সেখানে একটা বাচ্চাদের বইয়ের নাম কিভাবে ইসলামের অবমাননা হয়? যদি এটাই এত বড় ইস্যু হয়, তবে নবীর নামধারী অপরাধী মানুষদের বাবা মা এর কেন শাস্তি হবে না? তারাইত তাদের ছেলেমেয়েদের নাম রেখেছেন। তাদেরকেও কি ধর্ম অবমাননার দায়ে ঘাড়ে কোপ মারা হবে?

কাউকে আস্তিক, নাস্তিক বলার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে? সৃষ্টিকর্তা যদি আপনাকে সৃষ্টি করতে পারেন, তবে তাকে যে মানবে বা মানবেনা, তার বিচার করার ভারও তিনি নিতে পারেন। আপনি যদি নিজেই আস্তিক, নাস্তিকের শ্রেণীবিভাগ করতে চান, তবে কিসের ভিত্তিতে করছেন? সৃষ্টিকর্তা কি আপনার পদ্ধতি অনুমোদন করছেন? আপনাদের নিরেট মস্তিস্কের জন্য বলি, যে মানুষটা হাসপাতালের বেডে শুয়ে বলতে পারেন “খোদা কি আমাকে আর কিছুদিন সুযোগ দিবেন ”, যিনি মৃত্যুর কাছ থেকে ফিরে এসে সৃষ্টিকর্তার আছেই আবেদন করেন, তিনি আর যাই হন, নাস্তিক না। আর যদি তারপরও আপনার কাছে তিনি নাস্তিক, তবুও তার ঘাড়ে চাপাতির কোপ দেয়ার অধিকার কে দিয়েছে?

এইসব ভুজুং ভাজুং ছাড়েন, সোজা বাংলায় বলেন আপনাদের রাজনৈতিক মতাদর্শকে সবচেয়ে কোণঠাসা করে ফেলছেন একজন শিক্ষক। মিছিল মিটিং না করে শুধুমাত্র কলমের খোঁচায় আপনাদের মিথ্যে, সাজানো গল্পগুলো একের পর এক মিথ্যা প্রমান করে যাচ্ছেন। নিভু নিভু করে জ্বলা মিথ্যের সামনে সত্যের বাতাস, বড় বেশি ক্ষতিকর। সেই ক্ষতি কি আর এত সহজে মেনে নেয়া যায়? 

স্যারের উপর হামলায় অনেকেই মনে মনে খুশি হয়েছেন, কারণ স্যারের জন্যে অনেকেরই অনেক অবৈধ, অনৈতিক সুবিধা নিতে অসুবিধা হয়েছে। ফেসবুক এবং কিছু কিছু পত্রিকা পড়লেই ব্যাপারটা পরিস্কার হয়। তাদের জাফর স্যার নামের এক অ্যালার্জি প্রবল। ব্যাপারটা অনেকটা “যা কিছু হারায় গিন্নি বলেন, কেষ্ট বেটাই চোর”। আসুন আপনাদের সুবিধার জন্য কিছু কিছু অ্যালার্জি বলে দেই-

১। ট্রাম্প কেন প্রেসিডেন্ট, জাফর ইকবাল জবাব চাই

২। সিরিয়াতে কেন বোমা হামলা, জাফর ইকবাল জবাব চাই

৩। প্রশ্নপত্র কেন ফাঁস, জাফর ইকবাল জবাব চাই

৪। মেসের বুয়ার রান্না খারাপ, জাফর ইকবাল জবাব চাই

৫। প্রেমে কেন ব্রেকআপ (অস্তাগফিরুল্লাহ), জাফর ইকবাল জবাব চাই

৬। এইবার শীত কেন বেশি, জাফর ইকবাল জবাব চাই

৭। কেন আমারে র‍্যাগ দিলো, জাফর ইকবাল জবাব চাই

৮। ক্যাম্পাসে কেন ছিনতাই, জাফর ইকবাল জবাব চাই

৯। হ্য………চ………… চো , আমি কেন হাঁচি দিলাম, জাফর ইকবাল জবাব চাই

থাকেন আপনারা আপনাদের অ্যালার্জি নিয়ে। স্যারের কাজ স্যার করেই যাবেন। স্বপ্ন দেখাবেন হাজারও মানুষকে। হয়তো একদিন আপনাদের অ্যালার্জিও কমে যাবে, সুন্দরের সংস্পর্শে, সত্যের সংস্পর্শে। সেদিন আপনি হাঁচি না দিয়ে নিজের ভুল বুঝতে পেরে মুচকি হাসবেন। সেই দিনের প্রতীক্ষায় রইলাম।

দামাল
পিএইচডি শিক্ষার্থী
ইউনিভার্সিটি অফ নর্থ টেক্সাস, যুক্তরাষ্ট্র

Comments
Spread the love