ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

মিয়ানমারের মামাবাড়ির আবদার ও আমাদের ব্যর্থতা!

মিয়ানমারের একটা সরকারী ওয়েবসাইটে কয়েকদিন আগে সেন্টমার্টিন দ্বীপকে সেদেশের অংশ বলে দাবী করে হয়েছে। মিয়ানমার ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট ইউনিট (এমআইএমইউ) নামের সেই ওয়েবসাইটে দেশটির জাতীয় খানা জরিপ শেষে যে পরিসংখ্যান দেখানো হয়েছে, তাতে সেন্টমার্টিনকে মিয়ানমারের অংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে, এমনকি সেখানকার অধিবাসীদেরও মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে দেখানো হয়েছে। ওয়েবসাইটে মিয়ানমারের মানচিত্রের রঙ আর সেন্টমার্টিনের মানচিত্রের রংও একই রাখা হয়েছে, তবে বাংলাদেশের মূল ভূখন্ডের রঙ সেখানে আলাদা দেখানো হয়েছে।

বাংলাদেশী ভ্রমণপিয়াসুদের কাছে সেন্টমার্টিন দ্বীপ মানেই বিশেষ কিছু। বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ড থেকে বেশ খানিকটা দূরে সাগরের বুকে জেগে ওঠা এই প্রবাল দ্বীপটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের আধার। এই দ্বীপের সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ পর্যটক ছুটে যান সেন্টমার্টিনে। এই প্রবাল দ্বীপটাকে বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর পর্যটন স্পট বললেও অত্যুক্তি হবে না একটুও। চারপাশে সাগরে ঘেরা এই দ্বীপটা অদ্ভুত রকমের মায়াময়। সেই দ্বীপটার দিকেই এবার হাত বাড়িয়েছে মিয়ানমার। 

সেন্টমার্টিন দ্বীপ, মিয়ানমার, রোহিঙ্গা, পররাষ্ট্রনীতি, বাংলাদেশ

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গতকাল এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছিল। এই ব্যাপারে তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে। এই বিষয়ে অবিলম্বে মিয়ানমারকে ব্যাখ্যা দিতেও বলেছে ঢাকা। তবে ঢাকায় নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত ইউ লিউন-ও মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছেন, এটা তাদের দেশের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অনিচ্ছাকৃত একটা ভুল।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) বলেছেন, “মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত আসামাত্র আমরা কঠোর প্রতিবাদ জানিয়েছি। এ-সংক্রান্ত একটি প্রতিবাদলিপিও তাকে দিয়েছি। মিয়ানমারের এ ধরনের ভুয়া দাবি উত্থাপনের দ্রুত ব্যাখ্যা দেওয়ার দাবি জানিয়েছি আমরা। মিয়ানমারের ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে সেন্ট মার্টিনকে দেখানোর পেছনে তাদের ‘অস্পষ্ট মনোভাব’-এর বিষয়ে ঢাকা চিন্তিত। কারণ, দ্বীপটি ব্রিটিশ আমল থেকে কখনোই তাদের ভূখণ্ডের অংশ ছিল না এবং ‘এখন পর্যন্ত ভূখণ্ডগত মালিকানা নিয়ে তাদের সঙ্গে কোনও ধরনের বিবাদও হয়নি।”

চলুন, একটু ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যাক। শত শত বছর আগে সেন্টমার্টিন দ্বীপটা ছিল বৃটিশ ভারতের অংশ। মূলত সেই সময়েই এই দ্বীপের অস্তিত্ব আবিস্কার হয়। বৃটিশরা ভারতবর্ষ ছেড়ে চলে যাবার পরে পূর্ব বাংলা হয়েছিল পাকিস্তানের একটা অংশ, সেই হিসেবে সেন্টমার্টিনও তখন পাকিস্তানের অংশ ছিল। আর ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হলো, তখন থেকে সেন্টমার্টিন দ্বীপটা বাংলাদেশের অংশ হয়ে আছে। বাংলাদেশ সৃষ্টির পর গত ৪৭ বছরেও এই দ্বীপের মালিকানা নিয়ে কোন প্রশ্ন ওঠেনি। 

সেন্টমার্টিন দ্বীপ, মিয়ানমার, রোহিঙ্গা, পররাষ্ট্রনীতি, বাংলাদেশ

তাহলে ২০১৮ সালে এসে হুট করে মিয়ানমারের একটা সরকারী ওয়েবসাইট কেন সেন্টমার্টিনকে তাদের দেশের অংশ বলে দাবী করছে হুট করে? মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত দাবী করেছেন, এটা অনিচ্ছাকৃত ভুল হতে পারে। আসলেই কি ভুল? কন্সপিরেসি থিওরি বা ষড়যন্ত্রতত্ত্বে গা ভাসাচ্ছি না, কিছু ফ্যাক্ট মেলানোর চেষ্টা করছি কেবল। কিছুদিন আগেই রোহিঙ্গা নিধনের মাধ্যমে পাঁচ লক্ষ রোহিঙ্গার বিশাল স্রোতকে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দিয়েছে দেশটা। বাংলাদেশে এখন পনেরো-বিশ লক্ষ বা তারও বেশি রোহিঙ্গা নাগরিক আছে, জাতিগতভাবে এদের সবাই মিয়ানমারের নাগরিক। এদের একজনকেও ফিরিয়ে নিয়ে যাবার ব্যপারে কোন উৎসাহ নেই দেশটার, উল্টো রোহিঙ্গারা ‘মিয়ানমারের নাগরিক নয়’ টাইপের আপ্তবাক্য তারা বলে চলেছেন রোজ।

রাষ্ট্রদূতের কথায় ফিরি। তিনি বলেছেন, এটা অনিচ্ছাকৃত ভুল। তাহলে এর আগে আন্তর্জাতিক সীমানা লঙ্ঘন করে মিয়ানমারের হেলিকপ্টার বা ড্রোন বিমান যে বাংলাদেশের সীমানায় ঢুকে পড়েছে একাধিকবার, সেটা কি ধরণের ভুল ছিল? পাশাপাশি দুটো পাতিল থাকলেও নাকি টক্কর লাগে। আর পাশাপাশি দুটো দেশ হলে তো মাঝেমধ্যে একটু ঠোকাঠুকির আওয়াজ হতেই পারে। ঠোকাঠুকির স্বভাবটা একচেটিয়া মিয়ানমারের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে। গতকাল বিমান পাঠিয়েছে, আজ সেন্টমার্টিনকে নিজেদের সম্পত্তি দাবী করছে, আগামীকাল হয়তো কক্সবাজার জেলাটাকেই তাদের সীমানা বলে দাবী করবে। কে জানে, পরশু তারা বলে বসে কিনা, পুরো বাংলাদেশটাই তাদের সীমানায় পড়ে! 

সেন্টমার্টিন দ্বীপ, মিয়ানমার, রোহিঙ্গা, পররাষ্ট্রনীতি, বাংলাদেশ

সেন্টমার্টিনকে মিয়ানমারের ওয়েবসাইটে সেদেশের ভুখণ্ড হিসেবে দাবী করায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যথেষ্ট হাস্যরসের সৃষ্টি হয়েছে। খবরগুলো শেয়ার দিয়ে অনেকেই কৌতুক করছেন, কেউ কেউ গালিও দিচ্ছেন। বিষয়টা হাসিঠাট্টার নয়, আবার গালি দিয়ে উড়িয়ে দেয়ারও নয়। ঘটনাটাকে দেখতে যতোটা ছোট মনে হচ্ছে, আদতে সেটা এত ছোট কিছু না’ও হতে পারে।

অবশ্য এমনটা ঘটায় খুব বেশি অবাক হবার কিছু নেই। বরং মিয়ানমার যে আরও এক-দেড় বছর আগেই সেন্টমার্টিনের মালিকানা দাবী করে বসেনি, সেটাই অনেক বেশি। এগুলো কেন ঘটছে জানেন? আমাদের পররাষ্ট্রনীতির ব্যর্থতায়। ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির আঁতিপাঁতি নেতারা দু’দিন পরপর বাংলাদেশকে তাদের অংশ বলে দাবী করে, কেউ কেউ বাংলাদেশ দখলের ডাক দেয়, আসামের বিজেপির নেতারা হুমকি দেয়, সব বাঙালিকে ঝেঁটিয়ে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেবে- এসব তো বছরের পর বছর ধরে হয়ে আসছে।

একটা দেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কতটা শক্তিশালী অবস্থান নিতে পারবে, সেটা তার পররাষ্ট্রনীতির ওপরে খুব বেশি পরিমাণে নির্ভর করে। আমরা এই জায়গাটায় ভীষণ দুর্বল। মিয়ানমার রোহিঙ্গা স্রোত ঠেলে দিয়েছিল আমাদের দিকে, অসহায় মানুষগুলোকে গ্রহণ না করে উপায় ছিল না আমাদের। কিন্ত তারাই এখন আমাদের গলার কাঁটা হয়ে উঠেছে, না পারছি গিলতে, না পারছি উগরে দিতে। এই রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে মিয়ানমারের কোন আগ্রহই নেই, তাদের সরকার তো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে সেদেশের নাগরিক হিসেবে মানতেই নারাজ! 

রোহিঙ্গা, অং সান সুচি, মিয়ানমার, বাংলাদেশ, মিয়ানমার সেনাবাহিনী

আমাদের দুর্বল পররাষ্ট্রনীতির কারণেই মিয়ানমার রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ঢল পাঠায় নাফ নদী দিয়ে, ভারতের বিজেপির নেতারা বাংলাদেশ দখল করতে চায়। এখন আবার মিয়ানমার নতুন করে মামাবাড়ীর আবদার করছে, সেন্টমার্টিন দ্বীপকে নিয়ে! এগুলোকে হালকাভাবে নেয়ার কিছু নেই। গৃহস্থের ঘরে সিঁধ কাটার আগে চোর ভালোমতো পরখ করে নেয় সবকিছু। কে জানে, মিয়ানমারও হয়তো পরখ করে নিচ্ছে বাংলাদেশকে!

ব্যপারটাকে অনাকাঙ্ক্ষিত ভুল ভেবে এড়িয়ে গেলে হবে না, দেখাতে হবে কঠোর প্রতিক্রিয়া, করতে হবে প্রতিবাদ। মিয়ানমারকে বুঝিয়ে দিতে হবে, এই ভূখণ্ডের সার্বভৌমত্ব তিরিশ লক্ষ প্রাণ আর দুই লক্ষ নারীর সম্ভ্রমের দামে কেনা। সেটার জন্যে প্রতিবেশিদের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানোর দরকার নেই, কিন্ত কড়া প্রতিক্রিয়া দেখাতে হবে অবশ্যই। নইলে লাই পেয়ে বানর মাথাতেই উঠবে, সেখান থেকে নামতে চাইবে না আর।

আরও পড়ুন- 

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close