শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে রেকর্ডগড়া একটা জয় পেয়েছে বাংলাদেশ দল, ছত্রিশ ঘন্টাও পার হয়নি ঠিকঠাক। মুশফিকের বীরত্বপূর্ণ ইনিংসে এসেছে এই অবিশ্বাস্য জয়টা, পাঁচটা চারের পাশাপাশি চারটা ছয়ে ৩৫ বলে ৭২ রানের একটা মনোমুগ্ধকর ধ্রুপদী ইনিংস খেলেছেন বাংলাদেশের এই উইকেটকীপার-ব্যাটসম্যান। অথচ পরদিন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন গণমাধ্যমের সামনে বলেছেন, মুশফিক যে এমন ছক্কা মারতে পারে, সেটা তিনি জানতেনই না!

বাংলাদেশের নিদহাস ট্রফির অভিযান শুরুর আগেই শ্রীলঙ্কা গিয়েছিলেন বোর্ড প্রেসিডেন্ট। ভারতের বিপক্ষে হারটা দেখেছেন মাঠে বসেই। সেটা তাকে হতাশ করেছে, সেই হতাশাটা লুকাননি তিনি। কিন্ত গত পরশুর ম্যাচে জয়ের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে যেসব কথা বলেছেন, বিস্ময়ের উদ্রেক করেছে সেগুলোই।

পাপন বলেছেন- “তামিম-সৌম্য যে এভাবে মারতে পারে, এটা আমাদের জানা ছিল। লিটন যে মারতে পারে, জানা ছিল না। মুশফিক তো না-ই। সত্যি বলতে, মুশফিককে সবার সামনে কালকেও বলেছি, ‘তুমি যে এরকম মারতে পারো, আমি জানিই না!”

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তেরো বছর পার করছেন মুশফিক, তিনশোর বেশী ইন্টারন্যাশনাল ম্যাচ খেলে ফেলেছেন, এই ম্যাচগুলোতে মোট ১১৭টা ছক্কা মেরেছেন তিনি। এরমধ্যে টি-২০তে ২৬ টি, ওয়ানডেতে মেরেছেন ৬২টি, যেটা বাংলাদেশের পক্ষে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ছক্কার রেকর্ড! টেস্টেও তার ছক্কা আছে ২৯টি। আর ঘরোয়া টুর্নামেন্ট বিপিএলে তো নিয়মিত পারফর্মারদের একজন তিনি। অথচ মুশফিক যে ছক্কা মারতে পারেন সেটাই জানেন না বোর্ড সভাপতি!

নাজমুল হাসান পাপন, বিসিবি সভাপতি, নিদহাস ট্রফি, মুশফিকুর রহিম

মুশফিককে অবশ্য মারকুটে ব্যাটসম্যানদের কাতারেই রাখেননি নাজমুল হাসান। তার মতে, মুশফিক ছয় মারার খেলোয়াড়ই নন! সাংবাদিকদের বাড়িয়ে ধরা মাইক্রোফোনের সামনে কি নির্লিপ্ত ভঙ্গিমায় তিনি বলছিলেন- “গত এক-দেড়-দু্ই বছর যদি দেখেন, মুশফিক ছয় মারতে গেলে বাউন্ডারিতে আউট হয়। আমি সবসময় বলি যে ও ছয় মারার খেলোয়াড় না। মারতে পারে, তবে ছয়ের খেলোয়াড় না। ছয় মারার খেলোয়াড় আমাদের তিনজন-তামিম, সৌম্য ও সাব্বির।”

লিটনের ব্যাটিঙে মুগ্ধ হয়েছেন নাজমুল হাসান পাপন, বলেছেন- “লিটন কাল যেভাবে খেলেছে, পুরো ম্যাচের সুরই বদলে দিয়েছে। তামিমের ওপর চাপ কমে গেছে।”  কিন্ত সেই প্রশংসাটাও ফিকে হয়ে যাচ্ছে তার “লিটন যে মারতে পারে, জানা ছিল না”- কথাটাতেই। ঘরোয়া ক্রিকেটে শটের ফুলঝুরি ঝড়ে পড়ে লিটনের ব্যাটে, আবাহনীর হয়েই গত দুই-তিন মৌসুমে দারুণ সব ইনিংস আছে লিটনের, আছে দেড় শতাধিক রানের ইনিংসও। অথচ সেই লিটন যে ‘মারতে জানেন’, সেটা ক্রিকেট বোর্ডের প্রধান ব্যক্তি হয়েও জানা থাকে না নাজমুল হাসানের!

আরও পড়ুন- একজন বাক্যবাগীশ বোর্ড প্রেসিডেন্টের গল্প!

তার স্মৃতি হয়তো প্রতারণা করতে পারে, কিন্ত আমরা দর্শকেরা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মুশফিকের মায়াবী ইনিংসগুলোর কথা ভুলে যাইনি, আমরা জানতাম তিনি মারতে পারে, উড়িয়ে বা গড়িয়ে, দলের প্রয়োজন বুঝে তিনি বলকে সীমানাছাড়া করতে পারেন অনায়াসে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে শেষ ওভারে ছক্কা মেরে জয় ছিনিয়ে আনা, কিংবা ভারতের বিপক্ষে ২০১২ এশিয়া কাপে সাত বলের ব্যবধানে তিনটা ছক্কায় ম্যাচ শেষ করা- আমরা সবকিছুই মনে রেখেছি মুশফিকের কীর্তিগুলো।

সাব্বিরের রানআউটেও বিরক্তি প্রকাশ করেছেন নাজমুল হাসান। বলছিলেন- “সে তো ডাইভও দেয়নি। ওকে ওই সময় সিঙ্গেল নিতে কে বলল? কাল সবার সামনেই ওকে বলেছি, ওখানে সিঙ্গেল নিতে পাঠানো হয়নি তোমাকে। ছয় মারার খেলোয়াড় তো মিরাজ নয় । তোমাকে পাঠিয়েছি ছক্কা মারতে। তোমাকে মারতে হবে, ব্লক করেছ কেন? হয় মারবা, না হলে নাই! জিতে গেলে তো বেশি বলা যায় না!”

নাজমুল হাসান পাপন, বিসিবি সভাপতি, নিদহাস ট্রফি, মুশফিকুর রহিম

খেলোয়াড়দের ওপর খবরদারী তিনি নিয়মিতই করে থাকেন। নতুন কিছু নয় এটা। বোর্ড প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি দলের অভিভাবক, সেই অভিভাবকত্বটা তিনি প্রকাশ্যে জাহির করতেই পছন্দ করেন সবসময়। কি বলছেন, কোথায় বলছেন সেটা বেশীরভাগ সময়ই খেয়াল রাখেন না তিনি। সাব্বিরের রানআউটটা দৃষ্টিকটু ছিল সত্যি, কিন্ত সেটার ব্যপারে টিম ম্যানেজমেন্ট সিদ্ধান্ত নেবেন, কোচ আছেন, তিনি সাব্বিরকে বোঝাবেন, কিংবা দল থেকে বাদ দেবেন। সাব্বিরকে ধমক দেয়া, বা শাসানোটা তো বোর্ড প্রেসিডেন্টের কাজ নয়। অবশ্য বাংলাদেশ দলে কোচ থেকে শুরু করে প্রধান নির্বাচকের সব কাজই নাজমুল হাসান পাপন একাই করে থাকেন বোধহয়। দল চূড়ান্ত করার আগে বোর্ড সভাপতির বাসভবন থেকে নির্বাচকেরা পরামর্শ নিয়ে এসেছেন- এরকম কীর্তিও রয়েছে। এমন ঘটনা বিশ্বের আর কোন দেশে ঘটে কিনা আমাদের জানান নেই।

যদিও এই কাজটা তিনি এর আগেও অজস্রবার করেছেন, সাকিবকে ধমকেছেন, মুশফিকের কড়া সমালোচনায় মেতেছেন মিডিয়ার সামনেই! খেলোয়াড়দের ভুল আছে, থাকবে। সেগুলো ড্রেসিংরুমের ভেতরে সীমাবদ্ধ রাখাটাই উচিত। নাজমুল হাসান মাঝেমধ্যেই অনধিকার চর্চাটা করে ফেলেন, মিডিয়ার সামনে আলগাপটকা কথাবার্তা বলাটা তিনি ছাড়তে পারছেন না কোনভাবেই। তার মতো দায়িত্বশীল একটা জায়গায় থেকে এমন কথাবার্তা বলাটা মানায় না মোটেও। এসব কথাবার্তা নিয়ে যে মিডিয়া আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কি পরিমান হাস্যরসের উদ্রেক করে, সেটা যদি তিনি জানতেন!

ভারতের কাছে হারার পরে তিনি দলের সঙ্গে বসেছিলেন, লিটনকে তিনিই পরের ম্যাচে ইনিংস উদ্বোধন করতে বলেছেন বলে দাবী করেছেন মিডিয়ার সামনে। ৫৭টা ডটবলের কৈফিয়ত চেয়েছেন। সবকিছুই ঠিক আছে, দলের খোঁজ খবর তিনি রাখবেন, ভালো কোন পরিকল্পনা মাথায় এলে সেটা শেয়ারও করবেন। যদিও এটা কোন বোর্ড প্রেসিডেন্টের কাজ হতে পারে না, তবে দীর্ঘদিনের অভ্যাসটা থেকে নাজমুল হাসান পাপন বেরুতে পারবেন বলেও মনে হয় না। এইটুকু পর্যন্ত মেনে নেয়া যায়।

কিন্ত বোর্ড প্রেসিডেন্ট হয়ে মিডিয়ার সামনে এভাবে খেলোয়াড়দের সমালোচনা করাটা অনৈতিক একটা কাজ। আপনি সাকিব-মুশফিক-সাব্বিরকে ধুয়ে ফেলুন, তারা অপরাধ করলে ধমক দিন, খারাপ খেললে দল থেকে বাদ দেয়ার ভয় দেখান, কিন্ত সেগুলো বুক ফুলিয়ে হেসে হেসে মিডিয়ার সামনে বলার মানেটা কি? মাঠে গিয়ে খেলে দিয়ে আসা ছাড়া বাকী সব কাজেই আপনি ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেন, সেটা অনুমান করতে কষ্ট হয় না খুব একটা। এবার প্লিজ একটু ক্ষান্ত দ্যান!

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-