খেলা ও ধুলা

মুশির কোবরা ড্যান্স ও অসামান্য এক জয়ের গল্প!

রুমে টিভি নেই, খেলা দেখতে হয় ইন্টারনেটে, টিভির চেয়ে প্রায় দুই বল পরে দেখতে হয় আমাদের। বাসার নীচে একটা দোকানের সামনে জড়ো হয়ে লোকজন খেলা দেখে, সেখান থেকে চিৎকারের শব্দ শুনলেই আমরা বুঝে যাই, বাংলাদেশের কেউ চার ছক্কা মেরেছে। একদফা চিৎকার-চেঁচামেচি হয়ে যায় তখনই। ল্যাপটপের স্ক্রীনে মিনিটখানেক পরে সেই শটটা দেখে আবার চিৎকার, এক জিনিসের ডাবল উদযাপন। কিন্ত এমন ম্যাচে, এরকম দারুণ রানচেজের দিনে চেঁচিয়ে গলা ফাটাতেও আপত্তি থাকে না একটুও।

শ্রীলঙ্কার ব্যাটিং শেষেই সম্মানজনক পরাজয়ের সমীকরণ মাপা শুরু হয়ে গিয়েছিল। বিশ ওভারে দুশো পনেরো রান তাড়া করে বাংলাদেশ জিতবে? এই বাংলাদেশ? যারা টি-২০ খেলাএ ধরণটাই বুঝে উঠতে পারলো না আজ পর্যন্ত, কোন বলটা মেরে খেলা উচিত আর কোনটা ধরে খেলা, সেটা বিচার করতে যে দলের ব্যাটসম্যানেরা ভুল করেন বারবার, সেই দলটা এভারেস্ট জয় করে নেবে বিপুল বিক্রমে, এমনটা ক’জন ভেবেছেন সেটা হাতে গুণে বলে দেয়া যাবে। কলম্বোর বৃষ্টিস্নাত সন্ধ্যায় সেই অসম্ভবের বন্ধুর পথে হেঁটে সম্ভবের এক অবিশ্বাস্য কাব্য লিখলো বাংলাদেশ দল, পাহাড়সম লক্ষ্যমাত্রা ডিঙিয়ে জয় তুলে নিলো পাঁচ উইকেটে!

২১৫ রানের লক্ষ্যমাত্রায় ঠিক যেভাবে শুরু করা দরকার ছিল, তামিম-লিটন শুরু করেছেন সেভাবেই। ক্রিকেটীয় শট খেলেছেন সব, লিটনের ব্যাটিং দেখে বিরাট কোহলিকে মনে পড়ছিল বারবার। দুজনের উদ্বোধনী জুটিতেই এসেছে ৭৪ রান, পাওয়ারপ্লে শেষ হয়নি তখনও! লিটনের ব্যাটে ভারত মহাসাগরের উত্তাল ঢেউয়ের ছোঁয়া, বলকে যেভাবে সীমানাছাড়া করছিলেন, মনে হচ্ছিল সেটাই বুঝি দুনিয়ার সবচেয়ে সহজ কাজ! সঙ্গী হিসেবে তামিমও ছিলেন দারুণ সাবলীল। ১৯ বলে ৪৩ রান লিটনের। তামিমও ফিরেছেন হাফসেঞ্চুরীর একটু আগেই, ২৯ বলে ৪৭ রান স্কোরবোর্ডে জমা করেছেন এই বাঁহাতি।

তামিমের আউটের পরে ধ্বস নামতে পারতো। সৌম্যের ব্যাটে রান ছিল, কিন্ত সৌম্য’সুলভ ঝড় ছিল না। রানরেট কমতে দেননি একজন, তিনি মুশফিকুর রহিম। স্ট্রোকের ফুলঝুড়ি ছুটেছে তার ব্যাটে, বনবন করে ঘুরেছে রানের চাকা। আস্কিং রেটটা নাগালের বাইরে যেতে দেননি একটা মূহুর্তের জন্যেও। সাবলীলভাবে রান করে গেছেন, রান তোলার চাপটাও বোঝা যায়নি সেভাবে। পছন্দের শট খেলার বিলাসিতা দেখাননি, দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে নিয়ে গেছেন দলকে। কিন্ত তখনও অনেকটা পথ বাকী।

সৌম্য গেলেন, মাহমুদউল্লাহ এলেন। তিনিও টিকতে পারলেন না বেশীক্ষণ, সাব্বির হতাশা উপহার দিলেন আরও একবার। কিন্ত মুশফিক অবিচল। আজ তিনি রুদ্র প্রকৃতির, আজ তিনি ঝড়, তিনি সাইক্লোন, কিংবা টর্নেডো। কিন্ত ক্ষণিকের অতিথি নন মোটেও। শেষটা দেখেই ছাড়বেন, পণ করে মাঠে নেমেছিলেন বোধহয়।

সাব্বিরের বিদায়ের পর হুট করেই খানিকটা এলোমেলো লাগলো সবকিছু। খেলাটাও যেন খানিকটা হেলে পড়লো লঙ্কানদের দিকে। কিন্ত মুশফিক তো আছেন বাংলাদেশ দলে! তিনি পকেট সাইজ ডিনামাইট, শরীরের ওজনটা বেশী নয়, কিন্ত ফাটলে বুঝিয়ে দেন, ছোট মরিচে কতখানি ঝাল ছিল! সেই ডিনামাইটটাই আজ সশব্দে ফাটলো কলম্বোতে।

প্রদীপের বলে ছয় মেরে লক্ষ্যমাত্রাটা নাগালে আনলেন, থিসারা পেরেরার শেষ ওভারে বাউন্ডারি হাঁকিয়ে জয়ের বন্দরে রাখলেন একটা পা। বাকীটুকু আনুষ্ঠানিকতা। তবুও ভয় ছিল, ভারতের বিপক্ষে তিন বলে দুই রানের সেই হারের দিন তীরে এসে তরী ডোবানোর দায়ভার তো মুশফিকের কাঁধেও পড়ে। সেই মুশফিক আজ বোধহয় প্রায়শ্চিত্ত করতে নেমেছিলেন। ভারতের জায়গায় শ্রীলঙ্কা, ধোনীর জায়গায় চান্দিমাল। মুশফিক ভুল করলেন না আর, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তিও ঘটলো না। আজ মুশফিক বিজয়ী দলে, আজ মুশফিক একাই টেনে দলের তরী ভিড়িয়েছেন জয়ের বন্দরে, সেটাকে নিরাপদে নোঙর করে তবেই মাঠ ছেড়েছেন! ৩৫ বলে ৭২ রান, পাঁচটা চার, চারটা ছয়! আরও অবিশ্বাস্য বিষয় ঘটেছে আজ, মুশফিক আজ তার শেষ ১৯ বলে কোন ডট বল খেলেনি। ৩৫ বলের ইনিংসে ডট বল খেলেছেন মাত্র ৪টি! বাউন্ডারি রান বাদ দিয়ে বাকি ২৬ বলে মুশফিক করেছেন ২৮ রান। কতটা ভয়াবহ ছিল মুশফিক ঝড়, সেটা লঙ্কান শিবির আজ টের পেয়েছে হাড়ে হাড়ে।

গত কিছুদিনের টানা ব্যর্থতায় উপশম হয়ে এল পরম আকাঙখিত একটা জয়। নিদহাস ট্রফির আশাটাও জেগে রইলো ভালোভাবেই। টুর্নামেন্টটাও এখন ওপেন হয়ে গেল একদম। দুই ম্যাচ খেলে প্রত্যেক দলের সংগ্রহে একটা করে জয়। ছন্দে ফেরা বাংলাদেশের ভয়াল রূপ প্রতিপক্ষ দুঃস্বপ্নেও দেখতে চাইবে না নিশ্চিত, সেই ছন্দটা ধরে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। মাটি থেকে কয়েক হাজার ফুট ওপরে, বিমানে বসে মিরাজ আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন, টুর্নামেন্টের ট্রফিটা ঘরে নিয়ে আসার, সেই চ্যালেঞ্জটায় এখনও হেরে যায়নি টিম টাইগার্স!

২০১৬ টি-২০ বিশ্বকাপের কথা মনে পড়ে গেল খেলা দেখতে দেখতে। বাসার নিচের দোকান থেকে চিৎকার শুনে ল্যাপটপে দেখার আগেই বুঝতে পারছি কি হচ্ছে। শেষ ওভারের খেলা, মুশফিক চার মারলেন, নিচে কি ধুন্ধুমার চিৎকার চেঁচামেচি! কান পাতা দায়! ল্যাপটপের স্ক্রীনে দেখি, চার মেরেই মুশফিক উদযাপন শুরু করে দিয়েছেন, রুমে বসে আমরাও বোতল হাতে নিয়ে টেবিল চাপড়াই। তিন বল বাকী, জিততে লাগে দুই রান। বাইরে কোন সাড়াশব্দ নেই। যেন শ্মশানের নীরবতা চারপাশে! ব্যাপার কি?

মুশফিক, বাংলাদেশ-শ্রীলংকা, রেকর্ড জয়

একজন মহেন্দ্র সিং ধোনি সেদিন দাবার ছকটা উল্টে দিয়েছেলেন। জিভের ডগা থেকে কেড়ে নিয়েছিলেন জয়টা। মুশফিকের সেই আগাম উদযাপন নিয়ে কম ট্রোল হয়নি অনলাইনে। আজ মুশফিক কত শান্ত! ব্যাটে তার সাইক্লোন, আবেগী এই মানুষটা ভেতরে ভেতরে হয়তো ফুটছেন টগবগ করে, অথচ সম্পূর্ণ বিপরীত একটা চেহারা ধরে রেখেছেন মুখে, ব্যাটে। তাড়াহুড়ো নেই, তুলে মারার প্রবণতা নেই, ছক্কা মেরে ম্যাচ শেষ করার হিরোইজম দেখানোর ইচ্ছেও নেই! জয়টা নিশ্চিত করেই উল্লাসে মাতলেন, কোবরা ড্যান্স দেখালেন থিসারা পেরেরাকে! এই মুশফিক কত পরিণত, সেই একটা হার কতকিছু শিখিয়ে দিয়েছে দলটাকে, সেটা এই একটা জয়েই বোঝা গেল! এমন দিনে, এমন কীর্তির সাক্ষী হয়ে চিৎকার করতে হয় গলা ফাটিয়ে, শরীরের সবটুুুকু জোর দিয়ে।

টি-২০ ইতিহাসে নিজেদের দলীয় সর্বোচ্চ রান আজকেই উঠলো বাংলাদেশের স্কোরবোর্ডে। এর আগে যে দলটা দুশো রানও করতে পারেনি কখনও, ওরাই ২১৫ রান তাড়া করে জিতে গেল! দলীয় প্রচেষ্টা অবশ্যই, কিন্ত সবচেয়ে বেশী অবদান তো ওই বদলে যাওয়া মুশফিকের। শুধু কোবরা কেন, পাইথন কিংবা অ্যানাকোন্ডা ড্যান্সও আজ তিনি দিতেই পারেন!

Comments

Tags

Related Articles