মনের অন্দরমহলরিডিং রুম

কে করবে এই খুনের বিচার?

স্বপ্নচারী ছেলেটার ফেসবুক প্রোফাইলের বায়োতে লেখা, “আই ড্রিম অ্যান্ড ড্রিম রিয়েলি বিগ।” সে যে কেবল নিজেই স্বপ্ন দেখত তা কিন্তু নয়। স্বপ্ন দেখাত অন্যদেরকেও। সদা হাসিখুশি ছেলেটা অন্যের বিপদে-আপদে এগিয়ে যেত। কেউ মানসিক ডিপ্রেশনে ভুগতে থাকলে তার কাউন্সেলিং করত, মনে সাহস যোগাত, অনুপ্রেরণা দিত। খুবই স্বাধীনচেতা ছিল সে। নিজের খেয়াল-খুশি অনুযায়ী চলত ফিরত। আর্থিক সমস্যাও কিছু ছিল না তার।

তবু ভিতরে ভিতরে, একটু একটু করে মরে যাচ্ছিল সে। হুট করে ক্ষণিকের খেয়ালে মারা যায়নি সে। আড়াই বছর আগে, ২০১৬ সালের ২২ জানুয়ারিও একবার আত্মহননের ভূত চেপেছিল তার মাথায়। ফেসবুক স্ট্যাটাসের মাধ্যমে না-ফেরার দেশে চলে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেছিল সে। তবে সেদিন অনেকেই বুঝিয়ে-শুনিয়ে ঠান্ডা করেছিল তাকে। তাই সে-যাত্রায় মরা হয়নি তার। আর কখনও মরবার কথা লেখেওনি সে। কিন্তু মনের মধ্যে সুপ্ত বাসনাটি যে রয়েই গিয়েছিল। এবং শেষমেষ তা চরিতার্থ করেই ফেলল ছেলেটা। 

বলছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের ৪র্থ বর্ষের মুশফিক বাবুর কথা। বুধবার রাতে নিজ বাসার ছাদ থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করে সে। তবে এর আগে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়ে যায়, যেখানে ব্যক্ত করে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও সরকারের প্রতি নিজের ক্ষোভ ও হতাশা। 

“একটা রাষ্ট্রব্যবস্থা যখন এতটাই পঁচে যায় যে আপনার ন্যূনতম কথা বলার অধিকারটুকু পর্যন্ত থাকে না, তখন বুঝে নিতে হবে আপনার কন্ঠস্বরের কোন মূল্যই আসলে নেই। সুতরাং অহেতুক মুখ চালানো বন্ধ করুন এবং সরকারের সাথে সমঝোতায় আসুন। ক্রীতদাসের ন্যায় তার অবিরত প্রশংসা করতে শুরু করুন।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাই আমাদেরকে বলে দিয়েছে কী চিন্তা করা যাবে আর কী চিন্তা করা যাবে না, যাতে করে আমরা সবসময় সমাজের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হই, যেটি চাইলেই আমাদেরকে জেলে পুরে দিতে পারে, আমাদেরকে মেরে ফেলতে পারে, আমাদের মরদেহ এমন কোথাও গায়েব করে দিতে পারে যেন কেউ তার হদিসও না পায়। তাহলে আমাদের অনুভূতির কী হবে? কে দিল তাদেরকে এমন ক্ষমতা?

এর নামই কি তবে ‘গণতন্ত্র’? নাকি গণতন্ত্রের নামে এটি কেবলই তাদেরকে মান্য করা ও তাদের পা-চাটা গোলামে পরিণত করার একটি রাস্তা মাত্র? অস্ত্রের জোর আছে মানে তো এই নয় যে দুনিয়ার যাবতীয় ক্ষমতার মালিক কেবল তারাই।

একজন বাংলাদেশি হিসেবে আমি স্বাধীনতা চাই, তাতে যদি আমার প্রাণ যায় তবুও।”

ঠিক এই কথাগুলোই সে লিখে গেছে নিজ হাতে নিজের জীবন কেড়ে নেয়ার আগে। তার লেখা প্রতিটি শব্দ যেন তীরের তীক্ষ্ণ ফলার মত এসে বিঁধে আমাদের বুকে, বাংলাদেশের বুকে। কারণ তার রচিত একটি শব্দও যে মিথ্যে নয়, অস্বীকার-অগ্রাহ্য করার মত নয়। সে যা লিখে গেছে, তাতে যে বাংলাদেশের সিংহভাগ তরুণের অব্যক্ত কথাই প্রতিধ্বনিত হয়েছে।

আসলেই তো, স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়েও যে আমাদের হাত-পা একেবারে বাঁধা। আমরা যেন বাস করছি হীরক রাজার দেশে, যেখানে আমরা কেবলই রাজার অনুগত পুতুলপ্রতিম প্রজা। বেঁচে থাকার কোন অধিকারই আমাদের নেই।

‘হীরক রাজার দেশে’ ছবির এক জায়গায় হীরক রাজা জনগণ সম্পর্কে বলে, “এরা যত পড়ে, তত বেশি জানে আর তত কম মানে।” ঠিক সেই একই ধারনা কি আমাদের বর্তমান সরকারের, বর্তমান শাসকগোষ্ঠীরও নয়? জনগণ সচেতন হয়ে গেলেই শোষকদের জন্য সমস্যা, তাতে তাদের সাম্রাজ্যের ভিত নড়বড়ে হয়ে পড়ে। যার দৃষ্টান্ত মাত্র কদিন আগেও আমরা নিজেদের চোখে প্রত্যক্ষ করেছি নিরাপদ সড়কের দাবিতে ছাত্র আন্দোলনে। 

এইজন্যই শাসক শ্রেনী সবসময় জনগনের চিন্তার জগতে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করে। আর এই কাজে সহায়তা করে বুদ্ধিজীবী শ্রেনীর একটি অংশ। সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ধ্রুপদী ছবিটিতে যন্তর মন্তর ঘর নামে একটি ঘর আছে। যেখানে নিয়ে সবার মগজ ধোলাই করা হয়। সেখানে নিয়ে যার মাথায় যা ঢুকানো হয় তাই সে তোতাপাখির মতো আউড়ে যায়। আর এই যন্তর মন্তর ঘরের মন্ত্র লিখে দেয়ে রাজকবি। রাজকবি লেখে:

“ভরপেট নাও খাই,
রাজকর দেওয়া চাই।
বাকি রাখা খাজনা,
মোটে ভালো কাজ না।
যায় যদি যাক প্রাণ,
হীরকের রাজা ভগবান।
যে করে খনিতে শ্রম,
যেন তারে ডরে যম।
অনাহারে নাহি খেদ,
বেশি খেলে বাড়ে মেদ।
লেখাপড়া করে যেই,
অনাহারে মরে সেই।
জানার কোনো শেষ নাই,
জানার চেষ্টা বৃথা তাই।
বিদ্যা লাভে লোকসান,
নাই অর্থ, নাই মান।”

আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায়ও কি জোরপূর্বক ছাত্রদের মগজধোলাই করে অকার্যকর, মূল্যহীন শিক্ষার বীজ ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে না? সমাজ সচেতন হওয়ার মত, গভীর চিন্তার অধিকারী হওয়ার মত শিক্ষা কি আদৌ আমাদেরকে দেয়া হচ্ছে? হচ্ছে না। তারচেয়ে বরং পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে অবাধে প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে, ঢালাওভাবে জিপিএ-৫ দিয়ে শিক্ষার মান কত বেড়েছে তা প্রমাণের বৃথা চেষ্টা চালানো হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নেই গবেষণাধর্মী শিক্ষা অর্জনের পর্যাপ্ত সুযোগ। বিষয়ভিত্তিক বিশেষায়িত শিক্ষার পরিবর্তে মুখস্ত বিদ্যা কাজে লাগিয়ে বিসিএস দিয়ে সরকারি চাকরি লাভের দিকেই সকলের মনোযোগ। 

সরকারি হিসেবে দেশে বর্তমানে বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ৮০ হাজার। বাস্তবে সংখ্যাটি নিঃসন্দেহে আরও অনেক বেশি। উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যেই বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করেও চাকরি না পেয়ে বেকার বসে আছে এমন যুবক-যুবতীর সংখ্যা গুণে শেষ করা যাবে না। আর যারা চাকরি পাচ্ছেও, তাদের মধ্যেও খুব কম সংখ্যকই নিজেদের পছন্দের সেক্টরে কাজ করতে পারছে। স্রেফ পেটের দায়ে নিরানন্দ পেশায় নিজেদের জীবনীশক্তির করুণ অপচয় করতে বাধ্য হচ্ছে।

এমতাবস্থায় মুশফিকের মত স্বপ্নচারী ছেলেমেয়েদের কি হতাশ হওয়াটাই স্বাভাবিক না? নিজের জীবন নিয়ে, দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে যাদের আশার কোন শেষ নেই, তারা যখন নিজেদের চোখের সামনে দেশটিকে রসাতলে যেতে দেখে, তখন তাদের কি নিরাশ হয়ে পড়ারই কথা না?

মুশফিকের মত ছেলেমেয়েরা তো আর ফেসবুকে সিফাতউল্লাহ সেফুদা বা হিরো আলমদের নিয়ে মেতে থাকে না। সোলাইমান সুখনদের মোটিভেশনে তারা মোটিভেটেডও হয় না। তারা চায় তাদের স্বপ্নের বাংলাদেশের বাস্তবায়ন দেখতে। কিন্তু তাদের সেই আশা ক্রমাগত দুরাশায় পর্যবসিত হয়। তারপরও অধিকাংশ ছেলেমেয়েই হয়ত দাঁতে দাঁত চেপে, মাটি কামড়ে পড়ে থাকে, লড়াই চালিয়ে যায় জীবনের বিরুদ্ধে। কিন্তু মুশফিকের মত দুই-একজন তো থাকেই যাদের পক্ষে আর বিরুদ্ধ স্রোতে দাঁড় টেনে যাওয়া সম্ভবপর হয় না। তাই তারা লড়াই সাঙ্গ করে জীবনের ইতি টেনে দেয়। কাগজে-কলমে তাদের মৃত্যুর কারণ হিসেবে লেখা হয় আত্মহত্যা। কিন্তু আসলে কি তারা খুনের শিকার না? কে করবে এই খুনের বিচার?

Comments

Tags

Related Articles