সালমান খানের বজরঙ্গি ভাইজানের কথা মনে আছে? ঐ যে পাকিস্তান অধ্যুষিত কাশ্মীর থেকে ভারতে চলে আসা ছোট্ট মেয়ে মুন্নীর গল্পটা! বোবা মেয়ে মুন্নী ও পবন নামক এক বজরঙ্গবলীর ভক্তের সেই কোমল সম্পর্ক আমাদের মনকে কতোই না আর্দ্র করেছিল? আজ মুন্নীর সমবয়সী এক মেয়ের গল্প বলবো। সেও থাকতো পৃথিবীর স্বর্গ- জম্মু-কাশ্মীরে। নাম ছিল তার আসিফা…

আসিফা বানু। ৮ বছর বয়সী উচ্ছল, চঞ্চল একটি মেয়ে। ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু-কাশ্মীরের অদূরেই মুসলমান অধ্যুষিত কাঠুয়া নিবাসী গুজ্জার গোত্রের জনাব ইউসুফ পুজওয়ালার মেয়ে। ঐ এলাকার সকলেই প্রায় মেষপালন করতো, ইউসুফও ভিন্ন কিছু করতেন না। তার হয়ে জঙ্গলে মেষদের চড়াতে নিয়ে যেত আসিফা। বন্ধু কম ছিল তাই ঐ নিরীহ প্রাণীগুলোই ছিল আসিফার খেলার সাথী। জঙ্গলের অন্যপাশে হিন্দু অধ্যুষিত অঞ্চল। ভূমি নিয়ে বিরোধ লেগেই থাকতো সেখানকার হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে।

১০ জানুয়ারি, ২০১৮। আসিফা অন্যান্য দিনের মতো সেদিনও সকাল সকাল জঙ্গলে গেছে তার মেষগুলো চড়ানোর জন্য। কিন্তু সকাল থেকে রাত হয়ে গেল আসিফার কোন খবর নেই। তার বাবা-মা চিন্তায় পড়ে গেল। এই জঙ্গল, এই শহর তো আসিফার হাতের তালুর মতো চেনা, এতো দেরি তো কখনো হয় নি। একদিন গেল, দুইদিন গেল; আসিফার খোঁজ পাওয়া গেল না। পুলিশের দ্বারস্থ হতেই হল আসিফার বাবাকে। কিন্তু পুলিশেরও কেন যেন গড়িমসি আসিফাকে খোঁজার ব্যাপারে। খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না, পুলিশকে বারবার তাগাদা দিচ্ছেন আসিফার বাবা। পুলিশ তাকে আশ্বাস দেয়ার বদলে বলে- আপনার মেয়ে মনে হয় কোন ছেলের সাথে ভেগে গেছে। আসিফার বাবা হতবিহবল হয়ে পড়ে, তার ৮ বছর বয়সী বাচ্চা মেয়েটাকে নিয়ে এসন কথা শুনতে হবে ভাবতেও পারেন নি তিনি। পাঁচদিন পরে জনাব ইউসুফের এক প্রতিবেশী দৌড়ে এসে খবর দেয় যে আসিফাকে জঙ্গলে পাওয়া গেছে। একরাশ খুশি নিয়ে ছুট লাগায় আসিফার বাবা-মা তার মেয়েকে দেখতে। সেখানে গিয়ে দেখে পুলিশের জটলা, উৎসুক মানুষের ভিড়। পুলিশ বারবার বাঁধা দিচ্ছেন তাদের বলছেন ওদিকে যাওয়া যাবে না। আসিফার বাবা বুঝতে পারছেন না তার মেয়ের সাথে দেখা করার জন্য তাকে কেন যেতে দেয়া হচ্ছে না। তিনি একপ্রকার জোর করেই গেলেন সেখানে। দেখলেন তার ছোট্ট মেয়ে আসিফা জঙ্গলের ধুলোর মাঝে উপুর হয়ে শুয়ে আছে। কিন্তু তার মাথা উল্টো দিকে মটকানো, যে কপালে প্রতিদিন চুমু খেতেন সেখান থেকে দরদর করে রক্ত পড়ে শুকিয়ে গেছে। হাত-পা নীল, তার আদরের আসিফা আরও অনেক আগেই পৃথিবীর এই (স্বর্গ?) ছেড়ে আকাশ স্বর্গে চলে গেছে।

এই ঘটনা পুরো কাশ্মীরজুড়ে শোরগোল তুলল। ক্রাইম ব্রাঞ্চ থেকে চাপ দেয়া হল পুলিশের ওপর। এই কেসেরই দায়িত্বে থাকা দিপক খাজুরিয়া আটক হলেন। তদন্তে জানা গেল এই দিপক খাজুরিয়া একা নন আরও বেশ কয়েকজন পুলিশ অফিসার এই ধর্ষণ ও হত্যা মামলার সাথে জড়িত। তবে পুরো প্ল্যান সাজিয়েছিলেন একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা সাঞ্জি রাম। তার নির্দেশেই আসিফাকে কিডন্যাপ করা হয় এবং ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। জঙ্গলের সরকারি জমি নিয়ে হিন্দু-মুসলমানদের মাঝে যে দ্বন্দ্ব ছিল সে প্রেক্ষিতেই মুসলমান গুজ্জার গোত্রের মানুষকে ভয় দেখানোর জন্য এই কাজ করা হয় বলে ধারণা করা হয়েছে। ১০ জানুয়ারি আসিফা জঙ্গলে মেষ চড়াতে গেলে সেখানে অভিযুক্ত কিশোর ও আরও একজন অপেক্ষা করছিল ঘুমের ওষুধ নিয়ে। আসিফা বিপদ বুঝতে পেরে দৌড়াতে গেলে তাকে ধরে ফেলা হয় এবং ঘুমের ওষুধ দিয়ে অচেতন করা হয়। সেখানে জঙ্গলেই অভিযুক্ত কিশোর তাকে একবার ধর্ষণ করে। এরপর আসিফাকে নিয়ে যাওয়া হয় জঙ্গলের অপর পাশের এক মন্দিরে। সেই মন্দিরের এক কুঠুরিতেই দিনের পর দিন আসিফাকে ধর্ষণ করা হয় ঘুমের ওষুধ দিয়ে দিয়ে। ১২ জানুয়ারি অভিযুক্তদের একজন মিরাট থেকে চলে আসে কেবল আসিফাকে ধর্ষণ করবার জন্য। অভিযুক্ত ৮ জনের সকলেই ধর্ষণে অংশগ্রহণ করেছে। এমনকি যখন আসিফাকে মেরে ফেলা হবে বলে সিদ্ধান্ত নেয়া হল তখন খাজুরিয়া বলে যে সে মারার আগে আরও একবার ধর্ষণ করতে চায়। আসিফাকে ধর্ষণের পর তার পিঠের ওপর উঠে উল্টো করে ওড়না পেঁচিয়ে গলা টিপে ও ভেঙে হত্যা করা হয়। এরপর মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য পাথর দিয়ে দুইবার মাথা থেঁতলে দেয়া হয়। তার পা দুটিও ভেঙে যায় নির্যাতনকালীন সময়ে।

আসিফার লাশ পাবার পরে ফরেনসিকে কাপড়চোপড় জমা দেয়ার আগে তদন্তে থাকা ও পরে অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তা দীপক খাজুরিয়া আসিফার কাপড় সাবান দিয়ে ধুয়ে তারপর পাঠায় ফরেনসিক টেস্টের জন্য। আসিফার মৃত্যুর পর তার পাগলপ্রায় বাবা-মা আসিফার লাশ দাফন করতে গেলে হিন্দু ডানপন্থি নেতারা তাদের হুমকি দেয় যে সে জমিতে কোন লাশ কবর দিলে দাঙ্গা শুরু হবে। তাই আসিফার লাশ আরও ৭ মাইল দূরে অন্য এক গ্রামে গিয়ে কবর দেয়া হয়। এখানেই শেষ নয়, অভিযুক্ত পুলিশ অফিসার ও সরকারি কর্মকর্তাদের বাঁচানোর জন্য র‍্যালি-মিছিলও অনুষ্ঠিত হয় ‘হিন্দু একতা মঞ্চ’ এর নামে, যেখানে নেতৃত্ব দেন বিজেপির দুই নেতা। কিছু উকিলরাও ভারতের তেরঙ্গা পতাকা নিয়ে অভিযুক্তদের মুক্তি দেয়ার জন্য আন্দোলন করে।

ঠিক এমন সময়ে গিয়ে ভারতের সচেতন নাগরিক সমাজের টনক নড়ে। নৃশংসতা কোন পর্যায়ে গেলে সাধারণ মানুষ বিচার চাইতে নামে তার একটা ভালো উদাহরণ হতে পারে এই ঘটনাটি। কারণ ধর্ষণ খুব ক্যাজুয়াল এখন, ধর্ষকের মুক্তি চাওয়া এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। ঠিক নৃশংস না হলে জমে না আজকাল! তাই লিখতে গিয়েও কোন রাখঢাক করলাম না। পড়তে গিয়ে গা রি রি করে উঠলে বুঝবেন আপনার মনুষ্যত্ব এখনো বেঁচে আছে, সামলে রাখবেন, প্রতিবাদের সময় কাজে লাগাবেন। তো ভারতের সর্বস্তরের মানুষ এরপর আসিফার হয়ে বিচার চাইতে নামলো। পুরো দেশ উত্তাল হয়ে উঠলো এই ঘটনায়। সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার ভারতের সেলেব্রিটিরাও কোন রাখঢাক করেন নি। ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়, সাক্ষাৎকারে। ভাবতে ভালো লাগে যে মিডিয়া জগত থেকে এখনো মনুষ্যত্ব উবে যায় নি। সেলেব্রিটিরা যাদের কারণে সেলেব্রিটি হয়েছে তাদের পাশে দাঁড়াতে ভুলে যায় নি। যেটা বাংলাদেশে ভুলে গেছে হয়তো অনেক সেলেব্রিটিরাই। আপনাদের ‘বজরঙ্গী ভাইজানের মুন্নী কাঁদায়! কিন্তু আসিফা বানু না?’

সম্প্রতি আমাদের একজন তারকা মোশাররফ করিম ধর্ষণ ইস্যুতে তার মতামত ব্যক্ত করেছেন। খুবই সাহসী পদক্ষেপ। তিনি বলেছিলেন যে মেয়েদের পোশাক ধর্ষণের কারণ না, ধর্ষণের কারণ শুধু ধর্ষকই। তার এই মতামতের প্রতিক্রিয়ায় আমরা যেরকম উগ্রতা দেখতে পেয়েছিলাম তা আসিফার ধর্ষণের ক্ষেত্রেও অনেক প্রতিক্রিয়াশীল ধর্মবাদীরা দেখিয়েছেন পাশের দেশেই। এই অমানুষগুলো, ধর্মকে ব্যবসা করে-রাজনৈতিক পুঁজি করে বেচা পশুগুলোর কারণেই প্রশ্রয় পায় ধর্ষকরা, হয়তো নিজেরাও একদিন ধর্ষণ করতে এরা পিছপা হবে না। আর আমাদের তারকার পাশে দাঁড়ানোর মতো তারকাও কেউ ছিল না যেন। এতো এতো সেলেব্রিটি আমাদের দেশে, কেউ মোশাররফ করিমের ডিফেন্সে এসে কিছু বলতে পারলো না? আপনাদের সেলেব্রিটি বানিয়েছে সাধারণ মানুষেরা, সেই সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্টকে চোখের আড়াল করে আপনারা কি শান্তির ঘুম ঘুমোতে পারেন? দেশের প্রতি, মানুষের প্রতি দায়বোধ এতোটাই কম? আর সেইসব ধর্ষকামী অমানুষদের বলে দিতে চাই- জম্মুর আসিফার মতো, আমাদের তনুর মতো, বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি যদি তোমাদের সাহস যোগায় তাহলে কান খুলে শুনে রাখো, আমরা সাধারণ মানুষরা সে সাহস বর্বরতার সাথে গুড়িয়ে দিতে দ্বিধা করবো না।

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-