কীভাবে কীভাবে যেন পাঁচ বছর পার হয়ে গেল। ‘ও কারিগর, দয়ার সাগর, ওগো দয়াময় চান্নিপসর রাইতে যেন আমার মরণ হয়’ নিজের লেখা গানে চান্নিপসর রাতে শেষ বিদায় নেবার এমন আকুল চাওয়া ছিল মানুষটার। কিন্তু নিয়তির খেল! নিজ দেশের জমিন থেকে বহু দূরে বিদেশ বিভূঁইয়ে ২০১২ সালের ১৯ জুলাই চলে যাবার সময় আকাশে চাঁদ ছিল না, ফিনিক ফোঁটা জোছনা ছিল না। সিলেটের মীরাবাজারের সেই ছোট্ট কাজল সেই যে এক রাতে জানালার ফাঁকে আসা অবাক জোছনাকে নকশা আঁকতে দেখেছিল মশারীর উপর, ধরতে গিয়ে আর ধরতে পারেনি, সারাটা জীবন সেই অবাক জোছনাটুকুন ধরতে না পারার আক্ষেপ নিয়েই চলে গেল সে। বর্ষার ঝুমবৃষ্টি শ্রাবণ মেঘের দিন ছিল সেটা, আজন্ম প্রকৃতির মাঝে লীন হতে চাওয়া মানুষটার জন্য প্রকৃতিও কেঁদেছে আকুল হয়ে।

পাখি চলে গেলেও তার পালক পড়ে থাকে। হুমায়ুন আহমেদের এই উক্তিটা কীভাবে যেন খুব বাস্তব আজো। তার সুবিশাল সৃষ্টিকর্ম আজও তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে সর্বত্র, এক মুহুর্তের জন্যও ম্লান হতে দেয়নি। তার তৈরি মিসির আলী, হিমু, শুভ্র, রুপা, বাকের ভাই-মোনা, অয়োময়ের মির্জা, লাঠিয়াল সর্দার, বহুব্রীহির মামা, নান্দাইলের ইউনুস, এইসব দিনরাত্রির টুনি (যাকে উপন্যাসে মরতে হওয়ায় পাঠকমহলে তৈরি হয়েছিল বাকের ভাইয়ের মতই প্রচন্ড প্রতিবাদ), নন্দিত নরকের রাবেয়া বা মণ্টু ইত্যাদি অসংখ্য অসাধারণ চরিত্র তাকে আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক করে রেখেছে পাঠকমহলে এবং সমালোচকমহলে। সেই ১৯৭৩ সালে ‘তোমাদের জন্য ভালোবাসা’ নামের অনন্য অসাধারণ এক ভালোবাসার গল্পে তিনি বাংলা ইতিহাসের সায়েন্স ফিকশনের যে বীজ বুনে দিয়েছিলেন, তা আজ দাঁড়িয়েছে মহীরুহতে। তবু সব ছাপিয়ে তার এই বিস্তৃত সৃষ্টিকর্মের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ জুড়ে ছিল মুক্তিযুদ্ধ। বাবা ফয়জুর রহমান ছিলেন পিরোজপুর মহকুমার পুলিশ কর্মকর্তা। একাত্তরের প্রচণ্ড ভয় আর আতংকের সেই মার্চে মানুষটা ভয় পাননি, সরকারী কর্মকর্তা হয়েও পাকিস্তানী বর্বরতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোয় মানুষটাকে মেরে ফেলে পাকিস্তানী সেনারা, জোছনামাখা এক রাতে নদীতে ভেসে গিয়েছিল তার বাবার মৃতদেহ। মুক্তিযুদ্ধের সেই নয় মাস প্রবল বিভীষিকার ভেতর দিয়ে যাওয়া হুমায়ূন আহমেদকেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেল থেকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল পাকিস্তানীরা, গুলি ছোড়ার পরেও মৃত্যুর মুখ অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরা এই মানুষটি তাই মুক্তিযুদ্ধের সময়কার অবিশ্বাস্য দুঃস্বপ্নের দিনগুলো বারবার তুলে এনেছেন তার লেখায়, সৃষ্টিতে। শুধু প্রথাগত লেখায় নয়, টিভি নাটকে ও চলচ্চিত্রে তিনি মুক্তিযুদ্ধকে রূপায়িত করেছেন গতানুগতিক ধারা থেকে সম্পূর্ণ নতুন দৃষ্টিকোণে। সেটি ছিল কৃত্রিমতাবর্জিত, সরল, সাধারণ মানুষের দৃষ্টিকোণ। তার নানা সৃষ্টিকর্মে মুক্তিযুদ্ধ উঠে এসেছে সমাজের নানা অংশ এবং শ্রেণীর দৃষ্টিকোণ থেকে।

হুমায়ূনের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্যকর্মের সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং ব্যাপারটাই ছিল এটা। তার প্রত্যেকটি মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস এবং গল্পে তিনি মুক্তিযুদ্ধকে দেখিয়েছেন সমাজের আলাদা আলাদা শ্রেণী এবং অবস্থান থেকে, তুলে এনেছেন এমন সব দৃষ্টিভঙ্গি, যেগুলো আরও অনেক আগেই তুলে আনা উচিৎ ছিল আরও বিস্তৃত আকারে। যেমন সূর্যের দিন উপন্যাসে তিনি দেখিয়েছেন স্কুলপড়ুয়া কয়েকজন ছেলে ‘ভয়াল ছয়’ নামে একটি দল তৈরি করল। তাদের ইচ্ছা, আফ্রিকার অরণ্যে অভিযানে যাবে। কিন্তু একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ পাল্টে দিল এই কিশোরদের চিন্তাজগত। দুর্ধষ অপারেশনে তারা গেল ঠিকই, কিন্তু সেটা আফ্রিকার গহীন অরণ্যে নয়, স্বদেশের উপর ঝাঁপিয়ে পরা পাকিস্তানী নরপিশাচদের বিরুদ্ধে।অকুতোভয় এই কিশোর মুক্তিযোদ্ধারা আর কখনও ঘরে ফিরতে পারেনি। এই উপন্যাসটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় দেশমাতৃকার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়া এমন অসংখ্য কিশোরদের, যাদের বীরত্বগাঁথা আমরা কখনোই সেভাবে তুলে আনতে পারিনি। ‘একটি সূর্যের দিনের জন্য এ দেশের ত্রিশ লক্ষ মানুষকে প্রাণ দান করতে হলো’- ‘সূর্যের দিন’ উপন্যাসের এই শেষ লাইনেই মুক্তিযুদ্ধকে এক কথায় তুলে ধরেন হুমায়ূন, যা কিশোর থেকে তরুণ হতে যাওয়া অনাগত অসংখ্য প্রজন্মকে চেনাবে মুক্তিযুদ্ধকে। ওদিকে ‘অনিল বাগচীর একদিন’ উপন্যাসে আমরা দেখি, মুক্তিযুদ্ধের সাথে কোনভাবেই সংশ্লিষ্ট না থাকা এক হিন্দু যুবক কীভাবে সত্য আর ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াবার জন্য আঁকড়ে ধরে প্রিয় বাবার বলা কথাটা! একাত্তরে সেই অদ্ভুত সময়ে প্রাণ বাঁচানো কঠিন হবার পরেও এমন অসংখ্য অনিল দেশের জন্য, সত্য আর ন্যায়ের পক্ষে প্রাণ দিয়েছে, আমরা ক’জন জানি তাদের কথা! ‘শ্যামল ছায়া’য় যে নৌকায় একদল আশ্রয়হীন মানুষ প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে ছুটছিল, তাদের মাঝে হুমায়ূন তুলে এনেছেন মুক্তিযুদ্ধের সময়টায় প্রচন্ড ভয় আর আতংককে। ‘জোছনা ও জননীর গল্প’ অনেক বড় ক্যানভাসের এক বিস্তৃত উপন্যাস, যাতে হাছুইন্নাদের মতো অমিতসাহসী অকুতোভয় আনসাং হিরোদের কথা বলা হয়েছে। একাত্তরের নয় মাস দেশের আনাচে কানাচে এমন অসংখ্য হাছুইন্নারা অসম বীরত্বে যুদ্ধ করে গেছে, যাদের খোঁজ আমরা কেউ রাখিনি, যাদের গল্পটা আমরা কেউ শুনতে চাইনি। এছাড়াও খুব কৌশলী আঙ্গিকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের ১৫ খন্ড দলিলপত্রের অংশবিশেষ তুলে এনেছেন হুমায়ূন তার এই বইতে, যেখানে ২৫শে মার্চ পরবর্তী পাকিস্তানীদের নৃশংস বীভৎসতা উঠে এসেছে, রক্তে ভেজা যে ইতিহাস সচরাচর হয়তো হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া আর উল্টেপাল্টেও দেখেনি। ‘শীত’, ‘জলিল সাহেবের পিটিশন’, ‘উনিশশ একাত্তর’ অসাধারণ তিনটি ছোট গল্প। ‘শীত’ যেমন মনে করিয়ে দেয় মুক্তিযোদ্ধা ছেলেকে হারিয়ে অসহায় বাবার আজন্ম দুঃখকস্টের দিনরাত্রি, ঠিক তেমনি “জলিল সাহেবের পিটিশন” ছেলে হারা এক বাবার প্রচন্ড প্রতিজ্ঞার গল্প, ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে পাওয়া এই দেশে শহীদদের স্বীকৃতি আদায়ের জন্য বাড়ি থেকে বাড়ি ঘুরছেন তিনি, হাতে পিটিশনের ফাইলপত্র। এভাবেই উপন্যাসে আর ছোটগল্পে মুক্তিযুদ্ধ উঠে এসেছে হুমায়ূনের কলমে।

শুধু এখানেই শেষ নয়, টিভি নাটক আর চলচ্চিত্রেও হুমায়ূন তুলে এনেছেন মুক্তিযুদ্ধকে। বিশেষ করে নব্বই দশকের পর দীর্ঘদিনের উল্টোপথে চলা এই স্বাধীন বাংলাদেশে অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনকভাবে যখন স্বাধীনতাবিরোধীরা রাষ্ট্রক্ষমতায়- মুক্তিযুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধু দুটোই উচ্চারণ করা পাপ, একই সাথে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে একাত্তরের রাজাকার আলবদরদের নৃশংস অত্যাচার, তাদের নাম নেওয়া যায় না, তখন সেই সময়টায় বিটিভির ধারাবাহিক নাটক ‘বহুব্রীহি’তে অত্যন্ত শিল্পসার্থকভাবে তিনি মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গটি নিয়ে আসেন। টিয়া পাখির মুখে “তুই রাজাকার” শব্দটা বলানো তখন যেমন ছিল অভিনব, ঠিক তেমনি প্রচন্ড সাহসী একটা পদক্ষেপ। এই ছোট্ট কিন্তু সুদুরপ্রসারী ঘটনাটি বিশাল প্রভাব ফেলেছিল তখন এবং এখনও। ২০১৩ সালে আলবদর রাজাকার কাদের মোল্লার ফাঁসীর দাবিতে যে গণজাগরণের রোষ নেমে এসেছিল ঢাকার রাজপথে, তার সুদৃঢ় উচ্চারণ ছিল ২০ বছর আগে টিয়া পাখির মুখে বলানো সেই শব্দগুচ্ছ, ‘তুই রাজাকার! তুই রাজাকার!’

১৯৯৪ সালে তিনি প্রথম যে চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেন সেটিও খুব সঙ্গতভাবেই ছিল মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক। এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক অন্যান্য সিনেমা থেকে একেবারে আলাদা ধাঁচের। ঢাকা শহরের একটি মধ্যবিত্ত পরিবারকে ঘিরে গড়ে ওঠে ছবির কাহিনী।  মতিন সাহেব ঢাকা শহরের সাধারণ একজন মধ্যবিত্ত মানুষ। দুই মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে তার সংসার। যুদ্ধকালীন অবরুদ্ধ ঢাকার সঙ্গে দর্শকের পরিচয় ঘটে এই পরিবারের উৎকণ্ঠা, উদ্বেগ, রেডিওতে বিবিসির অনুষ্ঠান শোনা, ৭ই মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ মনে পড়ার মধ্য দিয়ে। এই পরিবারে আশ্রয় নেন একজন মুক্তিযোদ্ধা যিনি মতিন সাহেবের বন্ধুর ছেলে। তাকে ঘিরে এগিয়ে যায় গল্প। ছোট ছোট দৃশ্যের মাধ্যমে হুমায়ূন আহমেদ অসাধারণ নৈপুণ্যে তুলে ধরেন একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতা, মুক্তিযোদ্ধাদের উপর নির্যাতন, নারীর উপর বিভৎস নির্যাতন, গণমনের ক্ষোভ, গেরিলা যুদ্ধ, রাজাকার আলবদরদের ঘৃণিত কার্যকলাপ। আর এ সবই তিনি করেন চোখে আঙুল দিয়ে নয়, অতি নাটকীয় বা আরোপিতভাবে নয়, সহজ স্বাভাবিক ঘটনাপ্রবাহের মাধ্যমে।

এ ছবির একটি দৃশ্যে দেখা যায়, গণহত্যার শিকার অসংখ্য বাঙালির মৃতদেহের উপর ঝরে পড়ে বৃষ্টি। অসাধারণ একটি দৃশ্যকল্প এটি। সবচেয়ে জরুরী হচ্ছে এই গল্পে তিনি একাত্তরের ২৩ বছর পর প্রথমবারের মত ঢাকার আরবান গেরিলাদল ক্র্যাক প্লাটুনের দুর্ধষ অপারেশনগুলো তুলে এনেছিলেন। অন্য কোন দেশের ইতিহাস হলে এই ২৩ বছরে ক্র্যাক প্লাটুনের ৮১টা অপারেশনের উপর মোটামুটি কয়েকশো চলচ্চিত্র বানিয়ে ফেলতো। অথচ আমরা স্রেফ ভুলে গিয়েছিলাম মুক্তিযোদ্ধাদের, অকুতোভয় সাহসে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে নাকানিচুবানি খাওয়া সেই ইতিহাসকে। হুমায়ুনই প্রথম, যিনি পরম মমতায় তুলে এনেছিলেন ক্র্যাক প্লাটুনের অপারেশনগুলো, ক্র্যাক প্লাটুনের গেরিলা বদির নামটা সে চলচ্চিত্রেই প্রথম পরিচিতি পায়। এ ছবির মাধ্যমেই চলচ্চিত্রকার হিসেবে নিজের জাত চিনিয়ে দেন হুমায়ূন আহমেদ|

আর সে ধারাবাহিকতাতেই ২০০৪ সালে তিনি নির্মাণ করেন মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘শ্যামল ছায়া’। ছবির প্রারম্ভেই দেখা যায়, মুক্তিযুদ্ধের সময় আষাঢ় মাসে একদল মানুষ প্রাণটা বাঁচানোর তাগিদে নৌকায় করে মুক্তাঞ্চলের দিকে যাত্রা শুরু করে। যাত্রাপথের টুকরো ঘটনার ছোট ছোট দৃশ্যের মধ্য দিয়ে হুমায়ূন গ্রামবাংলার মানুষের বীরত্ব, অসহায়ত্ব, পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতন ও নিষ্ঠুরতার চিত্র তুলে ধরেন। বড় নৌকাটিতে যে ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপট থেকে আসা মানুষরা যাত্রী হয়, তাদের পারষ্পরিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে হুমায়ূন প্রকৃতপক্ষে বাঙালির সে সময়কার অনুভূতি, অভিন্ন স্বার্থ ও আবেগকেই তুলে ধরেন। আর জ্ঞানের দলের ছদ্মবেশে মুক্তিযোদ্ধার ভূমিকায় বরেণ্য অভিনেতা হুমায়ূন ফরিদী এবং সহঅভিনেতার অসামান্য অভিনয় আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে একাত্তরের সেই অদ্ভুত সময়ের প্রয়োজনে পাকিস্তানী হায়েনাদের বিনাশ করবার জন্য আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা তৈরি করেছিল বহুরূপী যোদ্ধা হিসেবে। জলে-স্থলে,ভাতে-পানিতে সর্বত্র আমাদের জাতির সুর্য সন্তানেরা হয়ে উঠেছিলেন পাকিস্তানীদের মৃত্যুদূত। বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাত, বাধা আর যুদ্ধ পেরিয়ে নৌকার এই শরনার্থীদের দলটা শেষ পর্যন্ত মুক্তাঞ্চলে পৌছায় এবং ওড়ায় বাংলাদেশের পতাকা। ছবিটি প্রথম মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক চলচ্চিত্র হিসেবে অস্কার পুরস্কারের জন্য সেরা বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র শাখায় বাংলাদেশ হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উৎসবেও প্রশংসিত হয় ছবিটি।

একজন শহীদ সন্তান হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ হুমায়ূনের সৃষ্টিকর্মে উঠে এসেছে বারবার। সে কারণেই তার কাছে আমাদের প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশী। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, হুমায়ূনের জোছনা ও জননীর গল্প উপন্যাসে এক অমার্জনীয় ভুলকে স্থান দিয়েছেন। ৭ মার্চের ভাষণের শেষে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলেছিলেন, এই নির্লজ্জ মিথ্যাচার স্বাধীনতা বিরোধী রাজাকার এবং আলবদরেরা বছরের পর বছর ধরে প্রচার করে আসছে “বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা চাননি, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীত্ব চেয়েছিলেন” এই প্রোপ্যাগান্ডা স্ট্যাব্লিশ করতে। স্বাধীনতাবিরোধীরা এই বক্তব্যের সপক্ষে যাদেরই সূত্র দিয়েছে, তাদের কেউই সেদিন রেসকোর্স ময়দানে ছিলেন না, নিজের কানে বঙ্গবন্ধুর মুখে পাকিস্তান জিন্দাবাদ শোনেননি, শুনেছেন অন্যজনের কাছে। কিন্তু হুমায়ূন তার এই উপন্যাসে উল্লেখ করেছেন, বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলেছিলেন, যা খুবই অনভিপ্রেত এবং অগ্রহণযোগ্য। এছাড়াও এই উপন্যাসে আমরা তার নানা, যিনি শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে তাদের পরিবারের এবং অনেকের জীবন বাঁচিয়েছেন বলে উল্লেখ পাই, কিন্তু সারা দেশ জুড়ে শান্তি কমিটির চেয়ারম্যানেরা এবং রাজাকার-আলবদরেরা পাকিস্তানীদের সহায়ক শক্তি হিসেবে কি বীভৎস গণহত্যা চালিয়েছে, তার কোন উল্লেখ পাই না। ফলে এই উপন্যাস পাঠ করা নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের কাছে শান্তি কমিটি কিংবা রাজাকার-আলবদরদের মূল চেহারা উন্মোচন না হবার একটা আশংকা থেকেই যায় এবং একটা সিম্প্যাথি তৈরি করার হবার সুযোগ থেকে যায়। অদ্ভুত ব্যাপারটা হচ্ছে, হুমায়ূনের বাবা শহীদ ফয়জুর রহমানের মৃত্যুর পেছনে পিরোজপুরের দেলু রাজাকার অর্থাৎ দেলোয়ার হোসেন সাইদীর ভূমিকাটা বারবার উঠে এসেছে নানা অনুসন্ধানে। সেক্ষেত্রে হুমায়ুনের উপন্যাসে কেন রাজাকার-আলবদরদের অপকর্মগুলো বিস্তৃতভাবে উঠে আসলো না, সেটা খুবই খুবই হতাশার!

তবে হুমায়ূনের সবচেয়ে বিতর্কিত এবং প্রচন্ড হতাশাজনক সৃষ্টি ছিল দেয়াল। মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী বীরবিক্রম-এর লেখা “এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক” বইয়ের ৭৪ পৃষ্ঠায় তথ্যটি আছে যে মেজর ফারুক ১২ ডিসেম্বর ১৯৭১ বিজয়ের তিন দিন আগে কলকাতায় রিপোর্ট করে যশোরে তৎকালীন মেজর মনজুরের অধীনে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ায়তাকে আর কষ্ট করে যুদ্ধ করতে হয়নি। সামরিক নিয়ম অনুযায়ী কেউ ২১ দিন যুদ্ধে না থাকলে তাকে মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতিই দেওয়া হয় না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র, সেনাবাহিনীর দলিলপত্র কোথাও ফারুককে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। একজন মেজর ফারুক, যে কিনা একাত্তরের পুরো সময়টা ডেপুটেশনে ছিলো আবুধাবীতে, সেখানে থেকে পালিয়ে (!) এসে বিজয়ের তিন দিন আগে যুদ্ধে যোগ দিল, যখন ঢাকা ছাড়া প্রায় সারাদেশ মুক্ত হয়ে গেছে এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পরাজয় নিশ্চিত হয়ে গেছে। আর বঙ্গবন্ধুর আরেক খুনী কর্ণেল রশিদ যুদ্ধে যোগ দিয়েছিলো নভেম্বরের শুরুতে। যাদের পরবর্তী কার্যকলাপে পরিষ্কার যে পরিকল্পিতভাবে এঁদের মুক্তিযুদ্ধের একেবারে শেষে পাঠানো হয় পাকিস্তানের এজেন্ট হিসেবে, যারা স্বাধীন বাংলাদেশে পাকিস্তানের পারপাস সার্ভ করবে। যা তারা জাতির পিতাকে নৃশংসভাবে হত্যা করে খুব সফলভাবে করেছিলও। তো, এমন দুজন অফিসারকে যখন হুমায়ূন আহমেদ তার উপন্যাসে বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে চিত্রিত করেন, যে ফারুক নাকি প্রচন্ড তৃষ্ণার্ত অবস্থায় বন্দী এক পাকিস্তানী ক্যাপ্টেনের কাছে পানি খেতে পেয়ে বেঁচে যাবার পরেও তাকে হত্যা করেছিল, শুধুমাত্র সে প্রচুর ধর্ষণ করেছিল তাই। প্রচণ্ড দুঃখজনক হলেও সত্য, হুমায়ূনের কলমে এখানে মেজর ফারুককে একজন নীতিবান টাফ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দেখানো হয়েছে, যা কিনা স্বাধীনতাবিরোধীদের কাছে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার সাফাই গাইবার একটা জঘন্য অস্ত্র হিসেবে চিহ্নিত হয়।

যদিও হুমায়ূন বারবার বলেছেন, তিনি ইতিহাস লিখতে বসেননি, তিনি লিখছেন ইতিহাসের আশ্রয়ে ফিকশন, সুতরাং তার লেখা যেন কোনভাবেই ইতিহাসের দলিল হিসেবে না পড়া হয়। কিন্তু বছরের পর বছর ক্রমাগত মিথ্যাচার আর প্রোপ্যাগান্ডায় এই জাতির গৌরবৌজ্জ্বল ইতিহাস যখন প্রায় ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে, তখন সাধারণ মানুষের কাছে মোটামুটি একলা হাতে মুক্তিযুদ্ধকে তুলে ধরা এবং পৌছে দেওয়ার যে কর্তব্য হুমায়ূন নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন, তার ফলে তার উপর একটু হলেও জাতির জন্মইতিহাসের বিকৃতি রোধের দায় জন্মায়। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, অনেক ক্ষেত্রেই ব্যক্তি হুমায়ূন সেই দায় এড়িয়ে গেছেন; যা পাঠক হিসেবে, তার সৃষ্টিকর্মে, তার ব্যক্তিত্বে, তাকে পাগলের মতো ভালোবেসে যাওয়া মুগ্ধ পাঠক হিসেবে আমাদের পোড়ায়। দিনশেষে হুমায়ূন যেন তার চরিত্রগুলোর মতই রহস্যময়, ফিনিক ফোঁটা জোছনাস্নাত ভরা পুর্নিমার মত তার অসামান্য সব সৃষ্টিকর্মের গায়ে এই ভুলগুলো যেন কালো কলংক! ফুটে থাকে, চোখে লাগে, মন খারাপ করিয়ে দেয়!

তবুও সব কিছুর পরেও হুমায়ূন আমাদের যাপিত জীবনের অনেক বড় একটা অংশ জুড়ে থাকা সত্ত্বার নাম। আমাদের কখনোই দস্তয়ভস্কি কিংবা গার্সিয়া মার্কেজ ছিল না। আমাদের সাহিত্যে সাধারণ মানুষের কথা, মধ্যবিত্তের সংকট, তাদের হাসি-কান্না, চাওয়া-পাওয়া, ব্যাথা-বেদনা হুমায়ূনের মতো নিপুণ হাতে আঁকেনি কেউ এর আগে। আমাদের প্রতিদিনের যাপিত জীবনের পেছনে লুকিয়ে থাকা আপন আঁধারগুলো অসামান্য দক্ষতায় কেউ এর আগে দেখিয়ে দেয়নি, আবার মানব চরিত্রের খুব স্বাভাবিক নিষ্ঠুর নির্মম নিকষ অন্ধকারগুলো তুলে এনে তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা শুভ্র সৌন্দর্যের পরম আলোকচ্ছটাও এতো মমতা নিয়ে কেউ আবিষ্কার করেনি আগে। এই দেশের প্রচন্ড অন্ধকার একটা সময়ে যখন একটা টিয়া পাখির মুখ দিয়ে তিনি তুই রাজাকার বলিয়েছিলেন, সেটা যে কি অসম্ভব এক আশার মশাল ছিল, তা হুমায়ূন হুয়তো কখনই জানবেন না। অদ্ভুত এই মানুষটা তার অসংখ্য বইয়ে নিকষ কালো পিশাচ শ্রেনীর যে খারাপ মানুষটা, তারও ভালো দিক খুজে বের করতে চেয়েছেন। হয়তো সেটা মানুষকে বেশি ভালোবাসতেন বলে। হয়তো মানুষের উপর কখনোই ভরসা হারাননি বলে। বাংলা সাহিত্যের সায়েন্স ফিকশন “তোমাদের জন্য ভালোবাসা”র লেখক হুমায়ূন আহমেদ জীবনের শেষদিন পর্যন্ত অসামান্য ভালোবাসার আবেশে তাদের লেখনীর জাদুতে বেঁধে রেখেছিলেন আমাদের, তাই তার হঠাৎ চলে যাওয়া আমরা আজো বিশ্বাস করতে পারি না, ভাবতে বড় ব্যাথা হয়, বুকের এক কোনে হয় প্রচন্ড যন্ত্রণা। তার না থাকা মেনে নিতে পারে না হৃদয়, একটুও না।

প্রিয় লেখক, আমরা এখনো মেনে নিতে পারিনি। লিলুয়া বাতাসে কেমন যেন খাঁ খাঁ করে প্রাণটা! স্তব্ধ বিষাদে ছেয়ে থাকে চারদিক! ওপারে আপনি কেমন আছেন জানি না, কিন্তু আপনাকে ছাড়া আমরা ভালো নেই, একটুও ভালো নেই!

Comments
Spread the love