ইনসাইড বাংলাদেশরাজনীতি নাকি জননীতি

মহাত্মা গান্ধী যদি সার্বজনীন নেতা হন, বঙ্গবন্ধু কেন নন?

ভারত পৃথিবীর বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ, এতোগুলো রাজ্যে কত রকমের দল সেখানে৷ উগ্রবাদী, মাওবাদী, ডানপন্থী, বামপন্থী মিলে দলের শেষ নেই। এতো দল থাকতেও তাদের গণতান্ত্রিক অবস্থা কতটা ভালো সেটা হয়ত আলাদা তর্কের জায়গা, কিন্তু একটা জায়গা তারা তর্কমত্যের বাইরে এখন পর্যন্ত এক। সেটা, হচ্ছে মহাত্মা গান্ধীকে তারা সার্বজনীন নেতা মনে করে, এবং তার প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে। বিজেপির আমল বলে মহাত্মা গান্ধী প্রেতাত্মা হয়ে যাননি, মহাত্মাই আছেন।

মহাত্মা গান্ধী সার্বজনীন হলেও তাকে নিয়ে এখনো গবেষণা হয়, সেসব গবেষণার ফল সব যে মহাত্মা গান্ধীর প্রশংসাবাচক তা নয়, বরং মহাত্মা গান্ধীর দোষ, ত্রুটিও গবেষণার বিষয়, এসব নিয়ে আর্টিকেল লিখা হয়, বই প্রকাশ হয়। এতে মহাত্মা গান্ধীর আবেদন একটুও কমেনা, বরং কিছু ক্ষেত্রে মানুষ নতুন ভাবনার খোরাক পায়, তাকে নিয়ে ভাবে।

আমার কাছে গান্ধীর চেয়ে শক্তিশালী নেতা মনে হয় বঙ্গবন্ধুকে। গান্ধীর স্ট্রাটেজি, স্ট্রাগলের চেয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠা বেশি সংগ্রামের বলে মনে হয়। বঙ্গবন্ধুর আগে পরে তো অনেক নেতা ছিলেন, কিন্তু বঙ্গবন্ধু রাজনীতিবিদের চেয়ে বেশি হয়েছিলেন এমন ব্যাক্তিত্ব যাকে বিশ্বাস করা যায়। রাজনীতিবিদ চাইলে যে কেউ হতে পারে, বিশ্বাসযোগ্যতা সবাই অর্জন করতে পারে না।

বঙ্গবন্ধুর আদর্শ

বঙ্গবন্ধুর মাহাত্ম্য এই জায়গায় যে, তিনি বাঙালির মধ্যে এই বোধটা জাগ্রত করেছিলেন, স্বাধীনতাটা আমাদের দরকার। মানুষ আন্দোলন করেছে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কারণে, কিন্তু একটা পর্যায়ে গিয়ে সবাই বুঝেছে আসলে স্বাধীনতাই আমাদের গন্তব্য। এরপর আপনি ইতিহাস নানা ভাবে দেখতে পারেন, ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করে বলতে পারেন, এই করলে সেই হতো, সেই না করলে এই হতো। কিন্তু, আল্টিমেট জায়গাটা এক৷ এই স্বাধীনতাকেই অনেকে অনেক ভাবে দেখতে চেয়েছেন, ভাসানী সাহেবের চিন্তা একরকম ছিলো, বাম দলগুলোর চিন্তা একরকম ছিলো। কিন্তু, অস্তিত্ববোধের উপলব্ধির জায়গাটা সবার এক।

অথচ, বঙ্গবন্ধুকে আমরা এখনো সার্বজনীন ভাবতে পারিনি। বিএনপির আমলে স্কুলের অফিসে দেখেছিলাম জিয়াউর রহমানের ছবি টাঙ্গানো। বঙ্গবন্ধুকে সার্বজনীন নেতা মানা হলে সেই স্কুল ঘরে হয়ত বঙ্গবন্ধুর ছবিটাও দেখতে পারতাম। কিন্তু, সেরকম হয়নি। অবশ্য, সেই একই অফিসঘরে ক্ষমতার পালাবদলের সূত্রে পরে বঙ্গবন্ধু ঠাই পেয়েছেন। অথচ, বঙ্গবন্ধুকে ক্ষমতা, দল এসবের বাইরে একটা আলাদা সম্মানের জায়গা দেয়া যেতো।

বঙ্গবন্ধুর প্রতি ভালবাসা থাকলে কেউ তেলবাজ হয়ে যায়, এই যুক্তিটা আমি ঠিক বুঝি না। গতবছর বঙ্গবন্ধুর প্রয়াণ দিবস অর্থাৎ জাতীয় শোক দিবসে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় মুক্তিযুদ্ধ ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক সরদার আমিরুল ইসলাম সাগর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে শ্রদ্ধা জানিয়ে ফেসবুকে পোষ্ট করে। এই অপরাধে তাকে তার সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয় তখন। অবশ্য, বহিষ্কার করাটা অস্বাভাবিক না, যেখানে তাদের মূল দলের নেত্রী খালেদা জিয়া ঘটা করে শোক দিবসে সুখ পালন করেন নিজের জন্মদিনের কেক কেটে।

আমার খুব কৌতূহল, বঙ্গবন্ধুকে আমরা সার্বজনীন ভাবতে পারি না কেনো! এখানে, দায় কার? কিছু দায় তো আওয়ামিলীগ, ছাত্রলীগের পাতি, অশিক্ষিত নেতাদেরও আছে। যারা নিজের খোমা বিরাট করে লাগিয়ে পোষ্টার ঝুলায়, যে পোষ্টারের এক কোনায় অল্পএকটু জায়গায় কোনোমতে ঠাঁই হয় বঙ্গবন্ধুর। দায় তাদের যারা মুখে ফেনা তুলে ফেলে বলতে বলতে, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ করতে হবে কিন্তু নিজেরা একটা উদাহরণও দিতে পারে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ কি সেই সম্পর্কে। দিবে কিভাবে? তারা কতটুকুই বা বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে পড়াশুনা করে রাজনীতিতে নামে?

দায় তাদেরও যারা শোক দিবসে বঙ্গবন্ধুর নামে ভোজসভা করে গরীব দুখীদের দান করার বদলে সেখানেও স্বজনপ্রীতি করে। দায় তাদেরও, যারা প্রোগ্রামের পর রাস্তায় বঙ্গবন্ধুর পোস্টার, ব্যানার ফেলে যায়, এবং এগুলো পিষে যায় মানুষের পায়ের তলায় পড়ে। বঙ্গবন্ধুর এসব প্রাপ্য না আসলে। যারা বঙ্গবন্ধুকে আগলে রাখতে জানে না, বঙ্গবন্ধুকে ধারণ করতে শিখেনি তারাই বঙ্গবন্ধুর নাম জপে বড় নেতা হবার চেষ্টা করছে। তারাও বঙ্গবন্ধুকে সার্বজনীন করে তোলার প্রচেষ্টা নেয়নি কখনো।

দেয়াল - হুমায়ূন আহমেদ, বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড, শোক দিবস

বঙ্গবন্ধু মানেই আওয়ামী লীগ না, বঙ্গবন্ধু মানেই হবার কথা ছিল বাংলাদেশ। কিন্তু, এক পক্ষ তো বঙ্গবন্ধুকে স্বীকারই করতে চায় না। বঙ্গবন্ধু যেখানে শুয়ে আছেন, সেই গোপালগঞ্জের নামটাই বদলে দিতে চায়। এমন হবার কথা ছিলনা। বঙ্গবন্ধুর জন্য আলাদা স্পেস থাকা উচিত সবার কাছে, বঙ্গবন্ধুর জন্য আলাদা সম্মানের জায়গা থাকা উচিত৷ বঙ্গবন্ধুকে দল মতের বাইরে সার্বজনীন নেতার স্বীকৃতি দেয়া উচিত৷

আসলে আমাদের সেই মৌলিক ভাবনাটাই নেই, বিশ্বাসটাই নেই। তাই, সময়ে সময়ে আমরা নিজেদের সাথেই দ্বিচারিতা করে যাই। এই দ্বিচারিতা কোন দিকে নিয়ে যায়, জানি না। কাউকে অপরাধী বলছি না, কাউকে জাজমেন্ট ও করছি না, কিন্তু আরেকবার ভেবে দেখবেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে দলীয় দৃস্টিকোন দিয়ে বিচার করে সমগ্র বাঙ্গালি জাতিসত্তার প্রতি তার ত্যাগকে অবমূল্যায়ন করবেন না। এই দেশের ইতিহাসে বিশ্বাসঘাতকতার নমুনা অনেক, সেই বিশ্বাসঘাতকতার পরিনামে মূল্য দিতে হয় ভয়াবহ। মীর জাফরের এক বিশ্বাসঘাতকতার পরিনাম কতটা ভুগিয়েছে আমাদের সবাই জানি, ১৫ই আগস্টের বিশ্বাসঘাতকদের কারণে আমরা কতটা টালমাটাল সময় পেরিয়েছি আমরা জানি। বিশ্বাসঘাতকতার আর কি বাকি আছে আমাদের! বঙ্গবন্ধুর নামটা মুছে গেলেই কি বিশ্বাসঘাতকতার চূড়ান্ত হবে? বঙ্গবন্ধুর নামটা তখনই বাঁচবে যখন তাকে দলীয় না ভেবে সব দল, মত বর্ণ তাকে সার্বজনীন নেতা মনে করবে, তাকে ধারণ করবে।

Comments

Tags

Related Articles