(দ্বিতীয় পর্বের পর থেকে)

হঠাৎ আজ কুয়াশা খুব বেশী। এই সময়টায় কুয়াশা এত পড়ার কথা না! বাইরে খুব একটা দেখা যাচ্ছে না কিছুই। কুকুরগুলোও খুব ত্যাদড়, আর উল্টোপাল্টা রাতভর ডাকতে থাকে এই সময়ে। দরজায় শাবল চালানোর শব্দ শোনা যায়,পুলিশ তিন তলার রুমের দরজা ভাঙতে ব্যস্ত, এদিকে খুব একটা খেয়াল নেই। মুজিব ওদের দুজনকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে, বাইরে তীব্র কুয়াশা, ওদের উদ্দেশ্য অজানা! মুজিব জানেনা ওরা কোথায় যাচ্ছে!

পেছনের গলি দিয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে এগোয়, হঠাৎ মুজিবের হাত টেনে ধরে মফিজ। পুলিশ! পুলিশ! তিনজন পুলিশ এদিকে পাহাড়া দিচ্ছে মুজিব যেন পালাতে না পারে। ওরা একবার গলির ওদিকে যাচ্ছে আরেকবার এদিকে, মুজিবরা ওদের সাথে খেলছে লুকোচুরি! পুলিশ সামনের দিকে যেতেই গোলাম মাহবুব মুজিবের হাতধরে পাশের আরেকটা গলির মধ্যে নিয়ে যায়। পুলিশ কুয়াশার ভিতরে টের পায় না কিছুই! মুজিবদের কাছে কুয়াশা এখন বড় বেশী প্রয়োজন!

ওরা খুব চুপিসারে মৌলভীবাজার পার হয়ে আসে, আপাতত গ্রেফতার এড়ানো গেছে,পিছনে পুলিশ নাই। মুজিব চশমা খুলে ওর কপালের ঘাম মোছে! মফিজ আর গোলাম মাহবুবের নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা নেই, মুজিব ওদের দুজনকে বিদায় করে দেয় আর নিজে গিয়ে ওঠে আব্দুল মালেক সর্দারের মাহুতটুলির বাড়ীতে। আপাতত তিন- চার ঘন্টা ঘুমাতে হবে!

ক্যাপ্টেন শাহজাহান রাজনীতি করেন না, উনার স্ত্রী নুরজাহান বেগম মুজিবকে ছোট ভাইয়ের মতো স্নেহ করেন।

মালেক সর্দারের বাড়ী থেকে মুজিব রাতটুকু কোনক্রমে কাটিয়ে আজ সকালে এসে উঠেছে ক্যাপ্টেনের বাড়ীতে। মুজিব অসুস্থ আর আহত, ঢাকা শহরে কে-ই বা তাকে যায়গা দেবে! নুরজাহান বেগম মুজিবকে খুব সেবা করলেন। ডাক্তারের কাছ থেকে ঔষধ আনালেন, মুজিব এখন বেশ সুস্থ। এর মধ্যে খবর এলো ভাষানীদের ছেড়ে দেয়া হয়েছে!

ভাসানীর সাথে দেখা করা দরকার, ওদিকে পুলিশ মুজিবকে খুঁজছে হন্য হয়ে! ও আবার আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতি পছন্দ করে না! তবে কি মুজিব সারেন্ডার করবে?

আইবি’র লোকেরা সন্দেহ করা শুরু করলো, কারন আগেও মুজিব ক্যাপ্টেনের সাথে উনার বাড়ীতে প্রায়ই যেত। ও বাইরে বের হতে পারে না, জানালা দিয়ে দেখে সাদা পোষাকের ঘুরাঘুরি!

১১ই সেপ্টেম্বরের পর দুদিন হয়ে গেছে ও ক্যাপ্টেন সাহেবের বাড়িতে আছে। মুজিব ঘরে বসে থাকা তরুন না, তার রক্তে তা নেই। ধীরে ধীরে মুজিব অস্থির হয়ে ওঠে!

১৩ তারিখ সন্ধ্যায় এক কাপ চা আর কটা বাকরখানি খেয়ে দুইতলার বৈঠকখানার পাশের রুমে মুজিব শুয়ে আছে। হঠাৎ বৈঠকখানার দরজায় খটখট শব্দ, ও আধশোয়া হয়ে বিছানায় বসে। নুরজাহান বেগম দরজা খুলতে যায়, মুজিব ভেতরে ভেতরে কেঁপে ওঠে! 

আইবি অফিসারদের দরজায় দেখে নুরজাহান বেগমের মুখের ভাব এমন হলো যে তাদের আর বুঝতে বাকী রইলো না মুজিব কোথায়! মুজিব পাশের রুম থেকে শুনতে পায় ওদের কথা, মুজিব ভাবে পালাতে হবে, আবার পালাতে হবে, ‘মাওলানা সাব গ্রেফতার হইতে বারন করছে!’ 

নুরজাহান বেগম খুবই চালাক আর বিচক্ষন। উনি প্রাথমিকভাবে ভ্যাবাচ্যাকা খেলেও তা কাটিয়ে উঠে অফিসার দুজনকে চা খেতে দিলেন। আর বললেন, “নাস্তা করুন, আমি মুজিবকে ডেকে আনছি!”

মুজিবকে পেছনের দরজা দিয়ে নিচতলায় নিয়ে গেলেন আর বললেন ‘ পালাও তাড়াতাড়ি’! মুজিব বলে “একটা চাদর দেন”, ও মালেক সর্দারের বাড়ি থেকে এক পাঞ্জাবী আর এক লুঙ্গীতে এখানে এসেছে!

চাদর এনে পেছনের দরজা দিয়ে মুজিবকে রাস্তা দেখিয়ে দেন নুরজাহান বেগম। মুজিব বেরিয়ে আসে রাস্তায়! আইবি’র অফিসারেরা তখনো বৈঠক খানায় চা খেতে ব্যাস্ত! মুজিব জানেনা ক্যাপ্টেন শাহজাহানের ভাগ্যে আজ কি আছে!

রাস্তায় বেরিয়েই দ্যাখে আরো দুইজন পুলিশ গার্ড দাঁড়িয়ে! মুজিবকে ওদের চোখকেও ফাঁকি দিতে হয়! আপাতত মুজিবের উদ্দেশ্য মাওলানা সাবের সাথে দেখা করা। মুজিব তাকে জিজ্ঞেস করবে কেন তাকে গ্রেফতার হতে নিষেধ করা হয়েছে? মুজিব পালিয়ে থাকার কিংবা গোপন থাকার রাজনীতিতে বিশ্বাসী না!  

ঢাকায় থাকলে মাওলানা সাব মোটামুটি বেশিরভাগ সময় ইয়ার মোহাম্মদ সাহেবের বাড়ীতেই থাকেন। এখনো ওখানেই আছেন বলে মুজিবের দৃঢ় বিশ্বাস। তাই মুজিবের এখন পৌছাতে হবে ইয়ার মোহাম্মদের বাড়ীতে!

পুলিশের চোখ ফাকি দিয়ে একটা রিকশা ভাড়া করে মুজিব। এক সহকর্মীকে তুলে নেয় ওর রিকশায়। আপাতত চশমাটা খুলে রেখেছে, চাদর দিয়ে একেবারে মুখ ঢাকা। ও ভাবে, গোঁফটা কেটে ফেললে ভালো হতো হয়তো!

ইয়ার মোহাম্মদের বাড়ীর পেছনের দিকে একটা রাস্তা আছে, রিকশা ওদিকে ঘুরায় মুজিব। ভালো করে লক্ষ্য করে বাড়ীর আশেপাশে অনেকগুলো গোয়েন্দা পুলিশ ঘুরাঘুরি করছে!

ওরা রিক্সা ছেড়ে দেয়! ‘ভুল হয়ে গেছে বুঝলা’- মুজিব ওর সহকর্মীকে বলে, ‘গোঁফটা কেটে নাপিতের ঘরে গিয়ে খানিক পাঊডার চুলে মাখলে পুলিশের ব্যাটারা আমারে চিনতো না’… ‘আউগাও মিয়া, গ্রেফতার করলে করব, আমি কি পুলিশরে ভয় পাই?’!

মুজিব আস্তে আস্তে এগোতে থাকে! গোয়েন্দা পুলিশ ওদের দেখতে পারে না। ইয়ার মোহাম্মদের বাড়ীর সীমানায় ঢুকে পড়ে মুজিব, পেছনে তাকায়, নাহ পুলিশ টের পায় নাই! হাফ ছেড়ে বাঁচে মুজিব!

আর আমাদের ইতিহাস এগোতে থাকে তার নতুন উপন্যাস রচনায় যার নায়ক সোহরাওয়ার্দী- ভাসানী-মুজিব!!

মুজিবকে দেখে ভাসানী আর ইয়ার মোহাম্মদ খুব খুশি হলেন! ও গত দুদিনের ধকলের পরেও বেশ সুস্থ! এইবার মুজিব জিজ্ঞেস করে মাওলানা ভাষানীকে, 

“কি ব্যাপার, কেন পালিয়ে বেড়াব?”

(চলবে…)

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-