ফিচারটি যতবার পড়া হয়েছেঃ 294

এ গ্রেট এস্কেপ: মুজিব পর্ব-২

illustration- saidulislam

বাঙালি নিজের ইতিহাস জানে না। তবে বাঙালির উচিৎ নিজের ইতিহাসটা জানা। ইতিহাস পাঠে মানুষের মূল অনিহার কারণ ইতিহাসে রস নাই। এই সিরিজের লেখাগুলো আমাদের পড়া উচিত এজন্যই। একটাই লক্ষ্য, সহজ সরল সাধারণের ভাষায় বাংলার ইতিহাসের পাঠ। লেখক নিজের স্বভাব-সুলভ কথোপকথন আর রসবোধের ভেতর দিয়ে ইতিহাসটাকে উপভোগ্য করে তুলেছেন। আসুন ঘুরে আসি ইতিহাসের গলি ঘুপচিতে…

Ad

(প্রথম পর্বের পর থেকে…)

ফরিদপুরের দত্তপাড়ার জমিদারেরা খুব নাম করা, আর ওই এলাকায়ও যথেষ্ট প্রভাবশালী। ওই বাড়ীর ছেলে সাইফুদ্দিন চৌধুরী ওরফে সূর্য মিয়া, মুজিবের আত্নীয়। সূর্য মিয়া রাত দুইটা পর্যন্ত জেগে জেগে মুজিবের সেবা করছে, মুজিবের পায়ে ব্যান্ডেজ, খানিক আগেও ব্যথায় কাতরাচ্ছিল। সূর্য মিয়া ভাবে মুজিবের শরীরে কত রক্ত! সূর্য মিয়া খুব যতন করে মুজিবের মাথায় হাত বুলায় আর ভাবে, পোলাডার ঘাড়ের রগ বেজায় ত্যাড়া……!

সেদিন সভা শেষে মিছিল নিয়ে বেরিয়েছে ওরা তিনজন, পেছনে কয়েক হাজার মানুষ। মৃদু শীতের দুপুরের সূর্যের তেজ যেন ভাসানী-হক-মুজিবকে দেখে তীব্র হয়ে উঠেছে আরো বেশী। প্রকৃতিও জানে না কি ঘটবে আজ এই ১১ই সেপ্টেম্বরে!

পাশের গলির বুড়ো চাচায় মিছিল দেখে ভাবে- এই মাওলানা সাব আসাম থেইকা আইসা কী যে এক ভ্যাজাল লাগাইয়া দিছে! এরা দেহি লিয়াকতরে মানে না, জিন্নাহরে মানে না!

শোভাযাত্রা চলছে, ভাসানীদের কোন ইচ্ছাই নাই আইন ভাংগার। মুজিবরা মিছিল নিয়ে আস্তে আস্তে নবাবপুর রেল ক্রসিংয়ে উপস্থিত হলো, তাকিয়ে দেখে পুলিশ রাস্তা-বন্ধ করে বন্দুক গুলো উচু করে দাঁড়িয়ে আছে। মুজিবদের কোন ইচ্ছাই নাই গোলমাল করার, ওরা খুব শান্ত ভাবেই প্লান সাজিয়েছে। প্রথমে যাবে নাজিরাবাজার রেললাইন, ওটা ক্রস করে নিমতলীতে ঢাকা মিউজিয়ামের পাশ দিয়ে নাজিমুদ্দিন রোড, সেখান থেকে আবার আরমানিটোলায়!

হিসাব সহজ।

আর এই সহজ হিসাবেই প্যাচ লাগায়- নাজিমুদ্দিনের পেটোয়া পুলিশ বাহিনী!

ভাসানীরা আর রেলক্রসিং পার হতে পারে না, পুলিশ ওদের যেতে দেয় না, এদিকে মুজিব-ভাসানীরা যাবেই। তখন নামাজের সময় হয়ে গিয়েছে, মাওলানা সাব রাস্তার উপরেই নামাজে দাঁড়িয়ে গেলেন দেখাদেখি শামছুল হক সাহেবও দাড়ালেন!

কিসের কি নামাজ; পুলিশ তার মধ্যেই চালাল টিয়ার শেল- আর পাবলিকে ছুড়তে শুরু করলো ইট, এভাবে পাঁচ মিনিট! পুলিশ লাঠি চার্য করতে করতে এগিয়ে আসছে। একদল কর্মী মাওলানা সাব’কে কোলে করে নিয়ে রেখে আসলো হোটেলের ভিতরে, অনেক কর্মী হলো আহত। আহত হলেন কাজী গোলাম মাহবুব, চট্টগ্রামের ফজলুল হক বি এস সি, আব্দুর রব ও রসুলসহ অনেকেই!

গ্রেফতার করা হল ভাসানীকে, শামসুল সাহেবও গ্রেফতার এড়াতে পারলেন না!

পুলিশের রাগ মুজিবের উপরে। তাদের ধারনা এই লম্বা চিকন পোলাডাই পাবলিকরে উত্তেজিত করে তুলছে! তাই পুলিশ ইচ্ছামতন মুজিবকে লাঠি দিয়ে মারলো। একপর্যায়ে মুজিব বেহুষ হয়ে পড়ে গেল পাশের নর্দমায়!

‘মুজিবের পায়ে গুলি লাগছে’ কর্মীরা চিৎকার করে ওঠে!

‘মুজিব মনে হয় মইরা গেছে’!

কয়েকজন লোক ওরে নর্দমা থেকে ধরাধরি করে রিক্সায় উঠায় আর বিলাপ করতে থাকে! মোগলটুলি আওয়ামী মুসলিম লীগের অফিসে মুজিবকে নিয়ে আসে কয়েক জন। নাহ মুজিব মরে নাই; তবে খুব আহত আর ক্লান্ত। ডাক্তার এল, ক্ষত পরিষ্কার করে ইঞ্জেকশন দিল, মুজিব ঘুমিয়ে গেল আস্তে আস্তে!

সূর্য মিয়া মুজিবের মাথায় হাত বুলায় আর ভাবে-

পোলাডার কৈ মাছের মতো প্রান!

তখন বাজে রাত দুইটা!

সূর্য মিয়ার কান খুব সজাগ। বাইরে অন্ধকার শীতের রাত, নবীন কুয়াশারা ঘিরে আছে মোগলটুলির অফিস। বাইরে ঝিঝি পোকার ডাক, কোথাও কি একটা বাদুড় উড়ে গেল? সূর্য মিয়া হাত বুলায় মুজিবের মাথায়… সুর্য কান খাড়া করে, বাইরে কি বুটের শব্দ? একজোড়া পা না, এটাতো কয়েকজোড়া পায়ের শব্দ, সূর্য মিয়ার মাথা কাজ করতে শুরু করে!

মুজিব যখন ঘুমিয়ে তখন মাওলানা সাব একটি সংবাদ ওদের কাছে পাঠিয়েছে।

সূর্য মিয়া কাজী গোলাম মাহবুব, মফিজ আর মুজিবকে ডেকে উঠায় আর বলে…

-“পুলিশ এসেছে তোমাদের গ্রেফতার করতে;

আর মাওলানা সাব তোমাদের গ্রেফতার হইতে বারন করছে!”

ওস্তাদে বলছে, কিছুই করার নাই, মুজিব এই শীতের রাতে ব্যান্ডেজ পরা পা নিয়ে উঠে পড়ে আর ভাবে কিভাবে এখান থেকে ভাগা যায়। ওরা তিনতলায় থাকে, পাশেই একটা দোতলা বাড়ীর ছাদ! দুই দালানের মাঝে ফাকা আছে অনেক, কি করবে মুজিব ভেবে পায় না। দুই দালানের মাঝে পড়লে সাথে সাথেই শেষ! কিন্তু কিছুই করার নেই, মাওলানা সাব বলছে গ্রেফতার এড়াতে হবে। কাজেই মুজিবের লাফ দেয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই, ওর দেখাদেখি কাজী গোলাম মাহাবুব আর মফিজও লাফ দিল। বাইরে অন্ধকার কিছুই দেখা যায় না, পাশের বাড়ির সিড়ির উপর একটা বালতি ছিলো সেটা পায়ে লেগে নীচে পড়ে গেল!

কম্পন শুরু হলো! কোন কথা নয়, চুপ! মুজিব মুখে আংগুল দিয়ে ওদের ইশারা করে! পুলিশ নীচে বালতি পড়ার শব্দ শুনেছে! মুজিব বরফ শীতল হয়ে ওঠে ভেতরে ভেতরে…..

গ্রেফতার বুঝি আর এড়ানো গেল না!!!

মুজিবের মাথায় হাত, সিড়ি ঘরের ওদিকে শোনা যাচ্ছে পুলিশের বুটের খটখট আওয়াজ!

(চলবে…)

আরও পড়ুন- 

এ গ্রেট এস্কেপ: মুজিব পর্ব-১

আপনার কাছে কেমন লেগেছে এই ফিচারটি?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...
Ad

এই ক্যাটাগরির অন্যান্য লেখাগুলো

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-

Ad