এক অন্তর্ঘাতী দূর্যোগের কবলে পতিত আমাদের সময়। নিজেদের ভোগ-স্বার্থের জন্য তাচ্ছিল্যবশে আমাদের একমাত্র জ্ঞাত আবাসভূমি এই পৃথিবীকে অ-বাসযোগ্য করে তুলছি আমরা কিংবা আমাদের পাশে হাঁটতে থাকা মানুষটি। আমাদের যেমন জানা উচিত ঠিক কারা কারা, কোন মানুষগুলো আমাদের বেঁচে থাকাকে কষ্টকর করে তুলছে। পৃষ্ঠা উল্টিয়ে আমাদের এটাও জানা উচিত সাধারণের মত দেখতে কোন কোন অসাধারণ মানুষগুলি আমাদের এবং আমাদের পৃথিবীটাকে বাঁচানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে অবিরত।

জুট পলিমার

সমুদ্রের হাজার ফুট গভীরের মৃত হাঙ্গরের পেটে পলিথিনের বর্জ্য পাওয়া যাচ্ছে। একটা সবুজ কচ্ছপকে দেখা গেল শক্ত প্লাস্টিকের ভেতর আটকে গেছে তার শরীর। আমাদের ব্যবহার্য বর্জ্য আরেকটা সৃষ্টিকে ধ্বংস করে ফেলছে এর চেয়ে আর মর্মান্তিক কী হতে পারে! ড. মুবারক আহমেদ খান প্রাণীজগতকে নীরবে খুনের দায় থেকে মানুষকে রক্ষা করতে পারেন আর নতুন আবিষ্কার দিয়ে। পাট থেকে পলিথিন তৈরীর ফর্মুলা আবিষ্কার করে ফেলেছেন প্রতিভাবান এবং পরিশ্রমী এই বিজ্ঞানী। দীর্ঘ ছয় বছর গবেষণার পর তিনি যে মহৎকর্মটি সাধন করে ফেলেছেন, সেটাকে আমরা এত বেশি গুরুত্ব না দিলেও পরিবেশ সচেতন দেশগুলো তার আবিষ্কারের জয়গান করছে। তারা অপেক্ষায় আছে বাংলাদশ থেকে পচনযোগ্য পলিথিন আমদানির এবং বাংলাদেশের জন্য অপেক্ষা করছে বিপুল জয়ধ্বনি এবং বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি বাজার। সবটাই বিজ্ঞানী ড. মুবারক আহমেদ খানের কৃতিত্ব।

তিনি তার আবিষ্কারের নাম দিয়েছেন ‘জুট পলিমার’। পাটের আশ থেকে সেলুলোজ গ্রহণ করে বিশেষ কিছু বিক্রিয়া ঘটিয়ে ড. মুবারক এই অসামান্য ব্যাপারটি ঘটিয়ে ফেলেছেন। পলিথিন যেমন কখনও পচে যায় না, জুট পলিমার মাত্র তিন থেকে চার মাসের মধ্যেই মাটির সাথে মিশে যাবে। সাধারণ পলিথিনের চাইতে জুট পলিমার দেড়গুণ বেশি ভার বইতে পারবে। বাংলাদেশ সরকার ২০১২ সালে পলিথিন ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেও বস্তুত তা কোনো কাজেই আসেনি। এর একমাত্র কারণ হিসেবে বলা যায় পলিথিনের কোনো বিকল্প না থাকা। ড. মুবারক আহমেদ খানের এই আবিষ্কারের ফলে হয়ত পলিথিন বর্জনের সেই সুযোগ এবার আমরা পাব।

ঢাকার ডেমরায় অবস্থিত সরকার পরিচালিত লতিফ ভবানী পাটকলে ইতঃমধ্যে জুট পলিমার দিয়ে পলিথিনের ব্যাগ বানানো শুরু হয়ে গেছে। নাম দেয়া হয়েছে ‘সোনালী ব্যাগ’। পরীক্ষামূলকভাবে বিভিন্ন সরকারি কার্যক্রমে স্যুভেনির হিসেবে এসব ব্যাগ বিতরণ করা হচ্ছে। ডেমরার পাটকলে এখন প্রতিদিন দুই হাজার ব্যাগ তৈরী করা হচ্ছে। তবে একটাই বাধা এখন আছে সেটা হল পাটের পলিথিন ব্যাগের উৎপাদন খরচ সাধারণ পলিথিন ব্যাগের থেকে দুইগুণ বেশি। তবে ড. মুবারক বলেছেন বাণিজ্যিক ভিত্তিতে অটোমেটিক মেশিনের সাহায্যে জুট পলিমার উৎপাদন করা গেলে সেটার খরচ সাধারণ পলিব্যাগের মতই হবে। সরকার ইতঃমধ্যেই স্বয়ক্রিয় মেশিনে পলিমার উৎপাদনের জন্য কাজ শুরু করে দিয়েছে। সেটা ঠিকঠাকভাবে করা গেলে প্রতিদিন সাত থেকে দশ টন পর্যন্ত পলিব্যাগ উৎপাদন করার ক্ষমতা অর্জন করা সম্ভব হবে।

চিতোজান

২০১৬ সালের ডিসেম্বরে আমরা খবরের কাগজে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ খবর দেখতে পাই। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের প্রাক্তন প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মুবারক আহমেদ খান ফরমালিনের বিকল্প তৈরী করে ফেলেছেন। সেটা মানবদেহের কোনও ক্ষতিই করবে না। ড. মুবারকের এই নিরাপদ ফুড প্রিজারভেটিভের নাম ‘চিতোজান’।

অসাধু আর লোভী ব্যবসায়ীরা যখন তাদের স্বার্থে ফলমূল-শাকসবজি-মাছ প্রায় সবকিছুতেই বিষাক্ত ফরমালিন ব্যবহার করছিলেন বেশি মুনাফার লোভে, ড. মুবারক তখন খুব সস্তায় উৎপাদনযোগ্য চিতোজান নিয়ে এসেছেন। অন্যান্য দেশে এক কিলোগ্রাম চিতোজানের উৎপাদন খরচ পড়ে প্রায় ৫ লাখ টাকা। সেখানে তেজস্ক্রিয়তা পদ্ধতি অবলম্বন করে চিংড়ির খোলস থেকে মাত্র ২০ হাজার টাকা কেজিতে চিতোজান উৎপাদনের ফর্মূলা বের করেছেন ড. মুবারক আহমেদ খান এবং তাঁর দল। মাছ যেমন চার ঘন্টার পরই পচতে শুরু করে। চিতোজান সেটা ২১ ঘন্টা পর্যন্ত প্রলম্বিত করতে পারে। রেফ্রিজারেটর কিংবা বরফের আচ্ছাদনে মাছ ঠিকঠাক থাকতে পারে ২০ থেকে ২৫ দিন। টমেটোর পচন রোধ করতে পারে ২০-২৫ দিন, আমের ১০ দিন পর্যন্ত। সেসময় আমরা খবরের কাগজে পড়েছিলাম ড. মুবারক আহমেদ খান এই নিরাপদ ফুড প্রিজারভেটিভ উৎপাদনের জন্য যথেষ্ঠ টাকা পাচ্ছেন না। সরকার প্রাথমিক কিছু অর্থ দিয়েছিল বটে কিন্তু পাইলট স্কেল প্রোডাকশনের জন্য তাদের হাত খালি। দেশের প্রাইভেট সেক্টর তাঁর সেই আবিষ্কারের উপর কোনও আগ্রহ দেখায়নি। আমরা এখনও জানি না, দেশের সাধারণ মানুষের খায় বিষমুক্তকরণের এই পদযাত্রা বর্তমানে কেমন অবস্থায় আছে। সরকারি ঢিমেতালে ব্যবস্থাপনা-মুনাফালোভী বেরসকারি খাত বাদ দিয়ে ড. মুবারক আহমেদ খান যদি সাধারণ মানুষের কাছ থেকে তহবিল গ্রহণ করতেন, আমার মনে হয় তাহলে কাজটা তাড়াতাড়ি হয়ে যেত। আমি জানি না, পরিশ্রমী এবং প্রতিভাবান এই বিজ্ঞানীর এরকম এখতিয়ার আছে কি নেই! তবুও আমরা আশা করি ড. মুবারক আহমেদ খানের এই পরিশ্রম, বিশেষ করে মানুষকে ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাতে তার এই প্রচেষ্টা সর্বক্ষেত্রে ব্যবহার করা হবে খুব শীঘ্রই।

জুটিন

২০১২ সালে ড. মুবারক আহমেদ খান নিয়ে আসেন ‘জুটিন’। পাটের আঁশের সাথে পলিমারের মিশ্রণে তৈরী টিন। ইউরোপসহ অন্যান্য দেশে তখন পাটের বিকল্প হিসেবে কৃত্রিম তন্তু বুবহার শুরু হয়ে গেছে। বাংলাদেশের পাট ও পাটজাত দ্রব্যের বাজার নিম্নমুখী। ড. মুবারক আমেরিকা থেকে ফিরে এসে তৈরী করে ফেলেন জুটিন। দেখতে অবিকল ঢেউটিনের মতই। এতে মরিচাও ধরে না। স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর সীসা এই জুটিনে অনুপস্থিত। সাধারণ ডেউটিনের চাইতে জুটিন মজবুত, দৃঢ় ও তাপ বিকিরণরোধী। সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা হল, এই জুটিনের দাম সাধারণ টিনের চাইতে কম। জুটিন নির্মাণে কোনও ধাতব পদার্থ ব্যবহার করা হয় না। খুব সাধারণ উপায়ে গ্রামের নারী-পুরুষরাই এই জুটিন তৈরী করে ফেলতে পারেন পাটের চট, পলিমার আস্তরণ দিয়ে।

পাট থেকে অনেক ব্যবহার্য পণ্য তৈরী করেছেন ড. মুবারক আহমেদ খান। মোটরসাইকেল চালকদের জন্য পাটের হেলমেট যা সাধারণ হেলমেটের চাইতেও মজবুত, পাটের টাইলস্, চেয়ার, টেবিল ইত্যাদি অনেক আগেই বানিয়েছেন তিনি।

ড. মুবারক আহমদ খান বর্তমানে বাংলাদেশ জুট মিলস কর্পোরেশনের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত আছেন। তিনি রসায়নের উপর বিএসসি এবং এমএসসি সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে তিনি পলিমার এবং তেজস্ক্রিয় রসায়ন নিয়ে পিএইচডি ডিগ্রি নেন। ন্যানো-টেকনোলজি, বায়োদিগ্রেডেবল্‌ পলিমার সায়েন্স, ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স, বায়োমেডিকেল সায়েন্স প্রভৃতি বিষয়ে নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছেন প্রথিতযশা এই বিজ্ঞানী। তবে ড. মুবারক আহমেদ খানের কাছে সবথেকে গুরুত্বের কাজগুলো হলো পরিবেশ এবং মানুষের স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য টেকসই উন্নতি ঘটানো।

স্কোপাস নামের বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা প্রকাশের ওয়েবসাইটে ড. মুবারক আহমেদ খানের বিভিন্ন বিষয়ের উপর ডকুমেন্ট রয়েছে ৩১৩ টি। সারাবিশ্বের পাট বিষয়ক গবেষণায় তিনি এক নাম্বার বিজ্ঞানী। ড. মুবারক আহমেদ খান বাংলাদেশ একাডেমী অব সায়েন্সসহ বেশ কিছু জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেলেও মানুষের কাছে একটি জনপ্রিয় নাম নয়। অথচ দেশের সম্পদ পাট এবং দেশের মানুষের স্বাস্থ্য নিয়ে নিরবে নিভৃতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন তিনি। এমন মানুষ ও পরিবেশ সচেতন বিজ্ঞানী-ই আমাদের কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজে জনপ্রিয় হওয়া উচিত। এমন সুপারহিরো নিয়েই আলোচনা হওয়া উচিত গ্রামে-গঞ্জে-শহরের চায়ের দোকানে কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

Comments
Spread the love