ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

ওই লোকের তো সাত পুরুষের ভাগ্য!

পাভেল মহিতুল আলম

এই গরিব দেশে যে ছেলে অডি গাড়ি চালায়, সে রাস্তায় দুই চারটা মানুষকে চাপা দিয়ে মেরে ফেলার অধিকার রাখতেই পারে! পরশু রাতে যে লোকটা গাড়ি চাপায় মারা গেছে, অডির একটা গাড়ির দাম দিয়ে ওই রকম কয়েক শ লোককে কেনা যাবে। ওই লোকের তো সাত পুরুষের ভাগ্য যে, সে এমন একটা গাড়ির নিচে চাপা পড়েছে! আর বড়লোকের ছেলে, গাড়ি নিয়ে বের হয়েছে কি খরগোশের সাথে কচ্ছপের রেস দিতে? সে তো জোরে চালাবেই, কোথাকার কোন ব্যাপারী কেন সামনে এসে পড়বে? তার ওপর ব্যাটা পেশায়ও ড্রাইভার, দরিদ্র মানুষ। এই দেশে যে তুই এতদিন বেঁচে ছিলি, সেটাই বা কম কীসের!

অডি গাড়ি চালায়, শুধু এই কারণেই গাড়ির চালকের খুন মাফ করে দেয়া যেতে পারে! তার ওপর সে এমপির ছেলে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনাই তো রীতিমতো পাপ! মাননীয় সাংসদ কত কষ্ট করে দেশসেবা করছেন, তার ছেলেও কি কষ্ট করবে? রাতের বেলা সে একটু জোরে গাড়ি চালাতে পারবে না? বিদেশফেরত ছেলে, গাড়িতে গতি উঠিয়ে যদি একটু অ্যাডভেঞ্চারই না করতে পারে, তাহলে এই দেশে সে থাকবে কেন? তার বাবা-মা-পরিবার এই দেশকে কত কী দিল, সেই তুলনায় এই দেশ তাকে কী দিয়েছে? 

শাবাব, এমপিপুত্র, একরামুল করিম চৌধুরি, এমপি পুত্রের গাড়িচাপা

সুতরাং যারা এমপি-পুত্র গাড়িচাপা দিয়ে কাউকে মেরে ফেলেছে বলছেন, তারা উচ্চবাচ্য করে শুধু শুধু শক্তি ক্ষয় করবেন না। চাইলেই কিন্তু এমপি সাহেব প্রমাণ করে দিতে পারেন যে তার ছেলে গাড়ি চালানো তো দূরে থাক, সেদিন ঢাকা কিংবা দেশেই ছিল না! তিনি শোক দিবসে এক সাথে ১২০টা গরু জবাই করে কয়েক গ্রাম লোক খাওয়ান, খাইয়েছেন আপনি কোনোদিন? দলের জনসভায় তিনি এক লাখ পানি বিতরণ করেন, করেছেন আপনি? তার কত ক্ষমতা, কত অবদান সে সম্পর্কে কোনো ধারণা আছে আপনাদের?

এই এমপি-পুত্র যখন গ্রামে জুমার নামাজ পড়তে যায়, তার পেছনে লাইন দিয়ে ছেলেপেলে থাকে। যেন রাজপথের সংগ্রামী মিছিল। গাড়ি চাপা দিয়ে মানুষ মেরে ফেলুক, আর যা-ই করুক, কিছুদিন বিদেশে থেকে দেশে এসে রাজনীতিতে নামলেই আমরা আগের সব ভুলে যাব। সে দেখতে সুন্দর। স্মার্ট। বিদেশে পড়াশোনা করে। আমরা আবার এ ধরনের ছেলে খুব পছন্দ করি। ক্রাশ খাই। প্রায়ই বলি, রাজনীতিতে এদের আসা উচিৎ। জনসভায় নেত্রী বা বাবার পাশে বসে থাকলে কিংবা একটু ভাষণ দিলেই আমরা তাকে সাদরে গ্রহণ করে নিব। বলব, হাউ সুইট, কী হট, ক্রাশ খেয়ে গেলাম! 

শাবাব, এমপিপুত্র, একরামুল করিম চৌধুরি, এমপি পুত্রের গাড়িচাপা

তো, এই হট, ক্রাশ খাওয়ার মতো ক্ষমতাবান বাবার ছেলে যখন গাড়ি চাপা দিয়ে কোনো মানুষ মেরে ফেলে, তখন অতি-ব্যতিক্রম ছাড়া তার কিছু হবে না এটা মেনে নিন। আপনি যদি আন্দোলন-টান্দোলন করে ফাঁসির রায়ও নিয়ে আসেন, তারপরও বিশেষ ক্ষমায় তাদের বিদেশ চলে যাওয়ার সুযোগ আছে। এই ছেলের অপরাধ নিয়ে ভেবে তাই লাভ নেই। বরং ভাবুন এই এমপি সাহেবের সেই ড্রাইভারের কথা, ছেলেকে বাঁচাতে এখন যাকে বলির পাঠা বানানো হচ্ছে। বলা হচ্ছে, ওই রাতে নাকি এমপি-সাহেবের ছেলে গাড়ি চালায়নি, চালিয়েছিল তার ড্রাইভার! সেই ড্রাইভারকেও নাকি এখন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

এইসব এমপি-মন্ত্রীর ছেলেদের সাত খুন মাফ, তাদের কোনো শাস্তি অতীতে হয়নি, সামনেও হবে না, এটা দেশবাসী মেনে নিয়েছে। তাই ছেলেকে বিদেশ পাঠিয়ে দেয়া হোক, মানুষ সব ভুলে যাবে কয়েকদিন পর। তারপরও ওই নিরীহ ড্রাইভারটাকে ফাঁসানো না হোক। এক ড্রাইভার রাজপথে মরেছে এমপি-পুত্রের গাড়ি চাপায়, মরেছে তার পরিবার। আরেকজন মরবে এই সুযোগ্য সন্তানকে বাঁচাতে গিয়ে, মরবে তার পরিবারটিও!

থাক, মরুক। এই দেশে যে এই গরিবেরা এতদিন বেঁচে আছে, সেটাও তো কম পাওয়া না!

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close