ইনসাইড বাংলাদেশরক্তাক্ত একাত্তর

উত্তাল উনসত্তুরের এক দুরন্ত কিশোরের গল্প

উত্তাল উনসত্তুর…

তৎকালীন মতিঝিল ন্যাশনাল ব্যাংক কলোনির এক দুরন্ত ছেলের গল্প বলছি। তার নাম মতিউর রহমান মল্লিক। পুরান ঢাকার বকশীবাজারের নবকুমার ইন্সটিটিউটে ছেলেটা পড়তো। ক্লাস টেন। বয়স ১৬। দিনগুলো কি ভয়ানক টালমাটাল। দৃশ্যপট যেনো দ্রুতই পাল্টে যাচ্ছে। কান পাতলেই শুধু স্লোগানের ধ্বনি।

বঙ্গবন্ধু তখন জেলে। বঙ্গবন্ধু ৬৬’-তে ঐতিহাসিক ছয়দফায় সমগ্র বাংলার দাবি এঁকেছিলেন। দাবি শুনে, দাবির পেছনে জনসাধারণের একাত্মতা ও দাবি আদায়ের তীব্র আকাঙ্ক্ষা দেখতে পেয়ে ঘাবড়ে গেলেন স্বৈরশাসক আইয়ুব খান। বঙ্গবন্ধুর জনপ্রিয়তা তার মাথা ব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়ালো। স্বৈরশাসক সামরিক শাসকদের ঘন ঘন মাথা ব্যাথা হওয়া স্বাভাবিক ব্যাপার। মাথা ব্যাথায় নিজের মুন্ডূ কাঁটার যখন উপক্রম, তখন আইয়ুব খান মনে করলেন বাঙ্গালিকে একটু ভয় দেখানো যাক। তার ধারণা একটা মামলা দিলেই রুদ্ধ হয়ে যাবে সব। এই বেকুব তার জীবনের সবচেয়ে বড় বেকুবি বোধহয় তখনই করলেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করলেন বঙ্গবন্ধু সহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে। বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রদ্রোহী এই মর্মে মামলাটি দায়ের করা হলো!

চারদিকে মিছিলের পদচিহ্ন। ঢাকার রাস্তা সরগরম। মানুষ চরম ক্ষিপ্ত।

“জেলের তালা ভাঙবো, শেখ মুজিবকে আনবো।”

“তোমার আমার ঠিকানা—পদ্মা মেঘনা যমুনা”– এমন সব স্লোগানে স্লোগানে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত।

মতিউর কলোনির ছেলে। ঢাকার উত্তাপ, মানুষের দাবি দাওয়া, নিজেদের একধরণের পরাধীনতা, মুক্ত পাখির মতো স্বাধীন একটা দেশের স্বপ্ন… এসব কি তাকেও ছুঁয়ে যেতো না? সময়ের দাবিতে কি সেও আনমনা এসব মিছিলের মধ্যে ঢুকে পড়েনি! পড়েছে। তাই বিভিন্ন মিছিলে তাকে প্রায়ই দেখা যেতো।

২০ জানুয়ারি, ১৯৬৯

এই দিনটিতে যখন কারফিউ ভেঙ্গে ছাত্রদের মিছিল নামলো, পুলিশ গুলির ফোয়ারা ছোটালো মিছিলের উপর। পুলিশের গুলিতে নির্মম ভাবে নিহত হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র আসাদুজ্জামান আসাদ। আসাদের মৃত্যুতে সকলে হতভম্ব হয়ে গেলো! সেই মিছিলে ছিলো মতিউরও।

কবি শামসুর রাহমান লিখেছেন,

গুচ্ছ গুচ্ছ রক্তকরবীর মতো কিংবা সূর্যাস্তের

জ্বলন্ত মেঘের মতো আসাদের শার্ট

উড়ছে হাওয়ায় নীলিমায়।

ঘরে ফিরেও আসাদের মৃত্যু দৃশ্যের কথা ভুলতে পারছিলেন না মতিউর। এত কাছ থেকে কাউকে মরতে দেখলে কিভাবে ভুলা যায়! সেদিনই বইপুস্তক বেঁধে ড্রয়ারে তালা-চাবি দিয়ে ঘোষণা করেছিলেন, লেখাপড়া আর নয়। এখন রাজপথে যাওয়াই সময়ের দাবি।

২৪ জানুয়ারি, ১৯৬৯

আসাদের মৃত্যুতে হতবিহবল ছাত্র, জনতা। কিন্তু তাতে যেনো আরো হাজারো আসাদ জ্বলে উঠছে শহরে। তবে, এখন ছেলেরা বুঝে। তারা জানে, তাদের উপর যেকোনো সময় হামলা হবে। তারা জানে, তারা হয়ত নাও ঘরে ফিরতে পারে। তারা জানে, এই শুভ্র শার্ট রক্তে রাঙ্গা হতে পারে। তাই, শার্টের বুক-পকেটে করে তারা এখন চিঠি নিয়ে বের হয়।

২৪ জানুয়ারি দিনটিতে সমগ্র পূর্ব পাকিস্থানে হরতাল আহ্বান করা হয়।

মতিউরদের অভাবের সংসার। পিতা আজহার আলী মল্লিক স্বপ্ন দেখতেন ছেলেটাকে নিয়ে। ছেলে আমার বড় হবে, একদিন সব পাল্টে যাবে। ব্যাংক কর্মচারী বাবা হয়ত জানতেন না, বয়সে নয়, সময়ের দাবিতে মনের দিক দিয়ে যে একজন মতিউর সমগ্র দেশকে বুকে ধারণ করে বসে আছে! মতিউর মিছিলে বের হলো। মিছিলে মিছিলে কথা বলছে হাজার হাজার কন্ঠস্বর। রাজপথের নেশায় পেয়েছে মানুষগুলোকে। তীব্র গন প্রতিক্রিয়া ও এই অভূতপূর্ব গন-অভ্যুত্থান আর নিতে পারলো না শাসকেরা। পুলিশ গুলি চালালো। অবিরত গুলি বর্ষণের সামনে পড়ে গেলো ছেলেটা। মতিউরের দেহ ঢলে পড়েছে রাজপথে। নবকুমার ইনস্টিটিউটের কিশোর ছাত্র মতিউরের দেহবসান হয় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেবার পথে।

মৃত্যুর পর কিশোর মতিউরের বুক পকেটেও একখানা চিরকুট পাওয়া যায়। সেখানে লেখা ছিলো, “প্রত্যেক মানুষকে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করতে হবে।…আজ হোক কাল হোক, একদিন যেতে হবে।”

কি ভেবে লিখেছিলো কে জানে!

মতিউরের মৃত্যু সংবাদ হু হু করে ছড়িয়ে পড়ে, আন্দোলনের মধ্যে থাকা মানুষ ফুঁসে উঠে খবর শুনে। তাদের আর আটকে রাখা যায় নি। আন্দোলন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। উত্তেজিত জনতা সচিবালয়ের পাশে আবদুল গণি রোডে মন্ত্রীর বাড়িতে আক্রমণ করে।

ঢাকায় আগুনে পুড়তে থাকে দৈনিক পাকিস্তান, মর্নিং নিউজ অফিস, এমএনএলস্করের বাড়ি। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিশেষ আদালতের বিচারকের বাড়িতে আক্রমণ হয়। বিচারপতি এস এ রহমান ফ্যাঁকড়ার মধ্যে পড়ে যান। বেচারা কোনো মতে লুঙ্গি পরে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যান সেখান থেকে।

মতিউর লাশ হয়ে মায়ের কোলে ফেরে। সে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। সন্তানের লাশের সামনে মতিউরের মা শুধু বললেন, “আমার সন্তানের রক্ত যেন বৃথা না যায়।”

মতিউরের রক্ত বৃথা যায়নি। এই লাশের রক্ত হজম করতে পারেনি স্বৈরশাসক আইয়ুব খান। মতিউরের লাশের সামনে হাজার হাজার ছাত্র জনতা। মতিউরের লাশ নিয়ে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের মিছিল ততক্ষণে শহর প্রদক্ষিণ করে ফেলেছে। ক্ষোভ যেনো আর বাঁধ মানতে চাইছে না। মতিউরের পিতা সেদিন বলেছিলেন, “এক মতিউরকে হারিয়ে আমি আজ হাজার হাজার মতিউরকে পেয়েছি।”

হাজার হাজার মতিউরের সামনে, এক মতিউরের লাশ, যে আসলে লাশ নয়, যে একটি পুষে রাখা দাবি এবং আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে উঠেছিলো। যে লাশ প্রেরণা হয়ে উঠেছিলো, যার লাশের সামনে থেকে গন-অভ্যুত্থান ঘটলো, সেই গণ বিস্ফোরণে আইয়ুব খানের ক্ষমতার পতন হলো।

মতিউর অমর হয়ে রইলেন ইতিহাসে। কাকতালীয় ব্যাপার এই যে, ২৪ শে জানুয়ারিতেই জন্মেছিলেন মতিউর, কে জানতো আবার কোনো এক ২৪শে জানুয়ারিতে মতিউর ইতিহাস রচনা করেই চলে যাবেন লোকান্তরে!

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close