একটা মানবশূন্য ছবি। কিছু নেই এখানে। তবে একটা গল্প আছে এই ছবির। একটু অন্যরকম গল্প। খানিকটা বিষাদের, খানিকটা আনন্দের, খানিকটা আত্মবোধের।

ছবির গল্প লিখতে গেলে অনেক বছর পেছনে যেতে হবে। ততটা পেছনে আপাতত যাচ্ছি না। অন্য কোনো একটা দিনে যাব।

গল্পটা মায়ের।

আট বছর আগে এরকমই সহজ স্বাভাবিক একটা দিনে আমরা জানতে পারলাম মা তাঁর বাম কিডনী হারিয়ে ফেলেছেন। বাম কিডনী কাজ বন্ধ করে দিয়েছে বহু আগেই। বিপদ এগিয়ে যাচ্ছে ডান কিডনীর দিকেও। মায়ের দীর্ঘ জীবনের পথচলা থমকে যাওয়ার পথে।

পুরো সংসারের উপর দুর্যোগ নেমে আসল। সবকিছু হয়ে গেল স্থবির। পুরো সংসারে মা একমাত্র মহিলা। রান্না বান্না থেকে সব গৃহস্থালির কাজ বন্ধ হয়ে গেল। রান্না বান্না গোল্লায় যাক। মায়ের কী হবে এখন? কী করব আমরা? কী করার আছে আমাদের?

ডাক্তার উপায় বলে দিলেন। অপারেশন করতে হবে। অপারেশন করে বাম কিডনী ফেলে দিতে হবে। তারপর দেখতে হবে ডান কিডনীর অবস্থা। ডান কিডনী বিকল হয়ে গেলে তখন করতে হবে ডায়ালাইসিস এবং তারপর কিডনী ট্রান্সপ্লান্টেশন।

খরচ?

যে অংক বলা হলো এটা আমাদের ভাবনার বাইরে। কোনো ভাবে, কোনো চেষ্টায় এই টাকা যোগাড় করা সম্ভব না। আমাদের নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে এমন অসুখ হবে, আমরা কখনোই ভাবিনি। ভাবলেও কিছু করার ছিল না।

চরম হতাশা, চোখে অন্ধকার দেখা এবং প্রায় ভেঙে পড়ার সময়ে ডাক্তার খানিকটা সান্ত্বনা বাণী শোনালেন। জানালেন আপাতত অপারেশ ছাড়া মেডিসিনের উপর চলা সম্ভব। যতদিন এভাবে রাখা যায়। আশা করা যায় জীবন সংশয়ের মতো কিছু ঘটবে না।

সাময়িকভাবে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম আমরা। শুরু হলো চিকিৎসা, নিয়মিত ডাক্তার দেখানো, ঔষধ। আমরা ভাবলাম এভাবেই হয়তো আজীবন চলে যাবে।

কিন্তু তা হলো না।

২০১৬ সালের মার্চ মাসে ডাক্তার জানিয়ে দিলেন অপারেশন বাধ্যতামূলক। অপারেশন করতে দেরি করলেই ক্যান্সার হয়ে যেতে পারে। বাম কিডনী আত্মঘাতী হয়ে গেছে।

২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারীতে আমার নিজের বাম কিডনী অপারেশন করা হয়। আমি তখনো ঠিকমতো হাঁটতে পারি না। নিজের উপর ঘটে যাওয়া ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তখনো মন থেকে মুছে যায়নি। প্রতি মুহুর্তে চোখের সামনে মৃত্যু এসে ভয় দেখিয়ে যায়। এরই মধ্যে মায়ের এই খবর আরেকবার ভেঙে দিল।

পারিবারিক মিটিং বসল। এই পরিস্থিতিতে কী করা যেতে পারে? তিন ভাইয়ের মতামত যত যাই হোক, অপারেশর তো করতেই হবে।

পরের প্রশ্ন? টাকা কোত্থেকে আসবে?

উত্তর নেই। অনেকক্ষণ পর আমি বললাম, টাকার কথা ভাবতে হবে না। টাকার দায়িত্ব আমার।

বড় দুই ভাই চোখ কপালে তুলে ফেললেন। দুই মাস আগে আমার অপারেশন হয়েছে। শারীরিক বা মানসিক কোনোভাবেই আমি টিউশনি অথবা কোচিং করানোর মতো অবস্থায় নেই। হাতে জমানো টাকাও নেই। তারা যৌথ গলায় বললেন, তুই টাকা কই পাবি?

আমি বললাম, সেটা আমার ব্যাপার।

তারা বিশ্বাস করে নিলেন। আসলে বিশ্বাস না করে খুব বেশি উপায়ও ছিল না। আমার ভাগ্য, আমার পরিবারের প্রতিটা মানুষ আজীবন আমাকে বিশ্বাস করেছেন, যেটা যে কোনো ক্ষেত্রেই হোক।

পরের প্রশ্ন, অপারেশন হবে কবে?

আমি চার মাস সময় নিলাম। আমার নিজের ফিট হতে সময় লাগবে। অসুখের কারণে পুরো একটা প্রফ দিতে পারিনি, সেটা দিতে হবে। তারপর রমজান। এরপরই অপারেশন করাব।

আমি কোনোমতো সেরে উঠলাম। প্রায় একা একা বিরাট একটা সাপ্লি প্রফ দিলাম। তারপর একদিন মা ঢাকা নিয়ে চলে আসলাম।

আমার কোনো দিন সিলেটের বাইরে বের হোননি। সিলেটের বাইরে খুব বেশি মানুষের সাথে কথাও বলেননি। তিনি চারপাশে হতবিহ্বল দৃষ্টিতে তাকান। সিলেটি মানুষ, বাংলা বলতে পারেন না। কেউ কোনো প্রশ্ন করলে লজ্জিতভাবে আমার দিকে তাকান।

কোনো দিন স্কুলের বারান্দায় পা না রাখা আমার মা ভর্তি হলেন স্টুডেন্ট কেবিনে। পুরো রুম মায়ের দখলে। মা সকালে ঘুম থেকে ওঠেন। আমি আর আমার ভাই মায়ের ব্রাশে পেস্ট লাগিয়ে দিই। মা বাথরুম থেকে ফিরলে টিস্যু দিয়ে মুখ মুছে দিই। মায়ের চাওয়ামতো নাস্তা আনা হয়, জোর জবস্তি করে খাওয়াই।

মাকে নিয়ে হাসপাতালে ঘুরিয়ে দেখাই। ইনভেস্টিগেশন করানোর জন্য একহাতে জড়িয়ে ধরে বাইরে নিয়ে যাই, রাস্তা পার করাই। মা সেই হাতের বাঁধনে কবুতরের বাচ্চার মতো জড়োসড়ো হয়ে থাকেন।

দিন কাটে। দিন যায়। এত বড় একটা অপারেশনের প্রস্তুতির আয়োজন চলছে। ফাইল নিয়ে এখানে ওখানে দৌঁড়াই, এই স্যারের ঐ স্যারের ধমক খাই। এক আপু দুপুর রাতের খাবারের ব্যবস্থা করতেন। দুই কিলোমিটার দূর থেকে সেই খাবার টেনে নিয়ে আসতাম।

এক সময় অপারেশনের ডেট আসল। আমাদের মূল যুদ্ধ যেহেতু টাকার সাথে, সেই টাকা বাঁচাতে গিয়ে প্রচুর ঘাম ঝরানো লাগল। একটা ফ্রি স্যালাইন নেয়ার জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থেকেছি। ইনভেস্টিগেশনে ১০% ছাড় পাওয়ার স্বভাববিরুদ্ধ ছ্যাচড়ামি করেছি। সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা গেল অপারেশনের আগের দিন। একটা অপারেশনের আগের দিন কি পরিশ্রম যায় সেটা যার অভিজ্ঞতা আছে সে বুঝবে। সারাদিন দৌঁড় আর টেনশনে রাতে খেতে ভুলে গেলাম। সারা রাত ঘুম হলো না।

নির্ঘুম চোখে সকালে মা কে নিয়ে ওটিতে গিয়েই খেলাম ধমক। ১৫ মিনিট দেরি হয়ে গেছে। অপারেশনে থাকা সব স্যারের সাথে কথা বলতে হলো, অ্যানেসথেশিয়ার সব স্যারের রুমে রুমে গিয়ে ঘাড় নিচু করে বিনীত গলায় ইনফর্ম করলাম।

দুই হাতে জড়িয়ে ধরে মাকে ওটি টেবিলে শুইয়ে দিয়েছি। মা হতবিহ্বল দৃষ্টিতে তাকাচ্ছেন। মায়ের মাথায় হাত রেখে সাহস দিলাম। হাসিমুখে বললাম, কিচ্ছু হবে না। আমি তো পাশেই আছি। সম্ভবত মা সাহস পেলেন। অজ্ঞান করার আগ মুহুর্তেও তাঁর মধ্যে কোনো ভয় দেখলাম না। অথচ এই মহিলাকে যতটা চিনি, ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার কথা ছিল তাঁর।

অপারেশন শুরুর আধা ঘন্টার মধ্যে এক কিলোমিটার দূরের এক ফার্মেসীতে তিনবার যেতে হয়েছে। একটা ক্লিপ নিয়ে গন্ডগোল লেগেছে। প্রতিবার দৌঁড়ে গেছি, দৌঁড়ে আসছি। নির্ঘুম চোখে, ক্ষুধার্ত পেটে দৌঁড়ানোর মতো শক্তি কোথায় পেয়েছিলাম কে জানে।

সাড়ে চার ঘন্টার ওটি শেষ হলো। কিডনী বের করা হয়ে গেছে। মাকে নিয়ে যাওয়া হলো পোস্ট অপারেটিভ রুমে। মা জ্ঞান ফিরে পেয়েই চোখ খুলে আমাকে দেখে জড়ানো গলায় বললেন, ব্যথা! ব্যথা!

ঠিক তখুনি জীবনে এক অসম্ভব অনুভূতির সৃষ্টি হলো। আমার মনে হলো ব্যথাটা মায়ের পেটে না, আমার বুকে হচ্ছে। মায়ের পায়ের কাছে উঁবু হয়ে বসলাম। দুইটা পা একসাথে জড়িয়ে ধরলাম। তখন কান্না পাচ্ছিল, অসম্ভব কান্না। মাকে কি এতটা আর কখনো ফিল করতে পেরেছিলাম?

আমি জানতাম না ফিল করাটা তখনো অনেক বাকি।

অপারেশনের পরের সাতদিন আরো বেশি খাটতে হলো। আগের চেয়ে অনেক বেশি কেয়ার করতে হয়েছে তখন। মা যতটা সুস্থ হচ্ছিলেন, মনের মধ্যে একটা তৃপ্তি কাজ করছিল তত বেশি।

মনে হচ্ছিল হ্যাঁ আমি পেরেছি। আমি যা করতে চেয়েছি তার সবটা করতে পেরেছি। আমি টাকা যোগাড় করেছি, গায়ে খেটেছি, প্রচুর যত্ন নিয়েছি, মাকে কিচ্ছু করতে দিইনি। আমার সামনেই ফাইনাল টার্ম, তারপর ফাইনাল প্রফ। মাঝখানে ব্যাচ ট্যুর, তার আগে প্রফ শেষের ঘোরাঘুরি সব আমি স্যাক্রিফাইস করেছি মায়ের জন্য।

একটা দাম্ভিক অহংকারি অনুভূতি চলে আসল ভেতরে! এই অনুভূতিটা যে কতটা খারাপ ছিল টের পেলাম তারপর।

এক মাসের বেশি সময় ধরে মা কে কাছে রাখার সময় শেষ হলো এক সময়। মাকে বিদেয় দিতে হবে পরের দিন সকালে। বড় ভাই নিয়ে যাবেন। টিকেট করা হয়ে গেছে। ঐ রাতে খুব খারাপ লাগল। এতটা দিন একসাথে, এত কাছাকাছি ছিলাম। মাকে সম্ভবত এই জীবনে এত কাছে আর পাওয়া হবে না। চোখ ভিজল। ভাবলাম এটা আর এমন কি? চোখ সামান্য ভিজতেই পারে।

মূল ঘটনা ঘটল বিদায় দেয়ার মুহুর্তে।

আমি নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। এসব পরিবারে সন্তান মা কে চুমু খেতে পারে না। একটা বয়সের মা ও পারেন না। এসব পরিবারে মা-সন্তানের জড়িয়ে ধরারও রীতি নেই। জীবনে বড় হওয়ার পর এই প্রথম মায়ের কপালে চুমু দিলাম। সবকিছু ভুলে মা কে জড়িয়ে ধরলাম। তাঁর থেকে পেছন ফিরেই হুড়ি মাথায় তুলে সামনের দিকে টেনে দিয়েছি। আমার চোখের পানি আড়াল করতে হবে। কারণ আটকানো অসম্ভব।

মা যে রুমে থাকতেন সে রুমে ঢুকেই এই ছবিটা নিয়েছি। আপাত দৃষ্টিতে এই শূন্য ছবিটাই বুকের মধ্যে কাঁপন তুলে দিল। খুব সম্ভবত জীবনে সবচেয়ে বড় শিক্ষাটা পেলাম তখন। মিনিট খানেকের মধ্যে স্লাইড শোর মতো মনে পড়তে থাকল গত একমাসে জননীর সাথে খারাপ আচরণ করা মুহুর্তগুলো। কতবার পান খাওয়ার জন্য ধমক দিয়েছি যেটে নরম সুরে বলতে পারতাম। ভালো শাড়ি রেখে খারাপ শাড়ি পরার জন্য বকা দেয়ার কোনো দরকারই ছিল না। ফলমূল খেতে আপত্তি জানানোর কারণে ধমক দেয়ার আগে ভাবা উচিত ছিল বাড়িতে তিনি তাঁর নাতনী আর ছোট ছেলেকে রেখে এসেছেন। হয়তো তাঁদের কথা ভেবেই খাচ্ছেন না। এরকম কত কত খারাপ ব্যবহার, কত কত রূঢ় আচরণ!

মুহুর্তের জন্য মনে হলো আসলে এই জীবনে বাবা মায়ের জন্য কী সত্যিই কিছু করা গেছে? যে সময়টাকে জীবনের শ্রেষ্টতম সময় ভেবেছি, ভেবেছি সন্তান হিসেবে মায়ের জন্য সম্ভবত সর্বোচ্চটাই করে ফেলেছি সেই সময়েই যদি এত খারাপ ব্যবহার, এত অমার্জনীয় আচরণ, এত ভুল বোঝা, এত অবহেল থাকে তবে অন্য সময় কী করেছি?

দরজা লক করে বাচ্চাদের মতো কাঁদলাম অনেকক্ষণ। জীবনে এই সময়টা না আসলে বুঝতেই পারতাম না যাপিত জীবনে প্রতিটা মুহুর্তে বাবা মায়ের সাথে খারাপ আচরণ করা হচ্ছে। সেই দিন না আসলে হয়তো জানা হতো না একটা সন্তান আদতে বাবা মায়ের জন্য তেমন কিছুই করতে পারে না।

আমার অহংকার ভেঙে দেয়া সে দিনটার জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞতা। কৃতজ্ঞতা এমন একজন মা উপহার দেয়ার জন্য যিনি আগুনে বাস করে শিখিয়েছেন পৌষের শীতলতা, যিনি অন্ধত্বে বাস করে দেখিয়েছেন কীভাবে রঙধনু দেখতে হয়। কৃতজ্ঞতা সেই সৃষ্টিকর্তাকে যার কারণে একজন নিরক্ষর মায়ের প্রতিটা সন্তানই শিক্ষিত।

মা ভালো আছেন। তাঁর চোখে একটা অপারেশন ছিল, আরেকটা লাগবে। আশা করি সেই অপারেশনেও মায়ের পাশে দাঁড়াতে পারব।

আমার সেই কঠিন সময়ে যারা পাশে ছিলেন, নানা ভাবে সাহস দিয়েছেন, সহযোগীতা করেছেন সবার প্রতি অসীম কৃতজ্ঞতা। আপনাদের কাছে আমি চিরঋণী। কৃতজ্ঞতা তাদের প্রতি যারা মা না হয়েও মায়ের মতোই স্নেহ দিয়েছেন নানা সময়ে। ভালোবাসা দিয়ে ধন্য করেছেন।

প্রতিটা মা ভালো থাকুক। তাঁদের উদর হোক ধর্ষকমুক্ত, মাদকমুক্ত, জিহ্বা ও অস্ত্রের খুনিমুক্ত নিরাপদ বাসস্থান।

শুভ মা দিবস।

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-