মনের অন্দরমহলরিডিং রুম

মায়েরা এমনই হয়..

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডমিশন টেস্ট আমি দিয়েছিলাম আজ থেকে চার বছর আগে। জীবনের অদ্ভুত এক সময় গিয়েছিল তখন। এডমিশনের আগের তিন মাসে একেকটা শিক্ষার্থীর জীবনে কত ঘটনাই ঘটে। সেসব গল্প নিয়েই হয়ত একটা গল্প কিংবা উপন্যাস লেখা সম্ভব। সে যাই হোক, এডমিশনের একটা সফল পরীক্ষার পর অনেকের জীবন বদলে যায়। যেসব মানুষ কখনো পাশে ছিল না, একটু অনুপ্রেরণা দূরে থাক উল্টো তুচ্ছতাচ্ছিল্য করত তারাও এইসময় বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পাওয়া ছেলের বন্দনা শুরু করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা একদিনে হলেও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল একদিন আগে দেয়। আমি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আলাদা করে প্রস্তুতি নেইনি, ম্যাথ পার্টের কিছুই এন্সার করিনি। আমি জানতাম আমি চান্স পাবো না। কিন্তু এও জানতাম ঢাবির ভর্তি পরীক্ষা ভীষণ ভাল হয়েছিল। যা হোক, যখন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলাফল আসলো এলাকার এক বড় ভাই বললেন, মন খারাপ কইরো না মিয়া। সবাই কি আর চান্স পায়। দেখো ন্যাশনালের ফরম কবে ছাড়ে খেয়াল রাইখো।

পরেরদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলাফল দেয়। আমার ফলাফল জানতেই ইচ্ছে করছিল না। ভীষণ ভয় যদি চান্স না পাই, এটা মেনে নিতে পারব তো! আমি এমনিতেই একটু আবেগী। আবেগ দ্বারা তাড়িত হই খুব। অবশ্য আমার সেরকম কিছু হলো না। আমি জানলাম আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়েছি। সে এক অদ্ভুত স্বপ্নের দিন। এখন আমি ট্যুরিজম এন্ড হস্পিটালিটি ম্যানেজমেন্ট নিয়ে পড়ি। শেষ বর্ষ৷ আর কিছুদিন পর আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ হবে। তবুও, প্রতি বছর এডমিশনের সময় আসলে আমি স্মৃতির টাইমলাইন ঘুরে ফিরে যাই ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে।

যাই হোক, সেই বড় ভাইয়ের সাইবার ক্যাফের দোকানে পরদিন আবার গিয়েছিলাম কি একটা কাজে। আমি তাকে নিজ থেকে কিছু বলিনি। বেচারার একটা বিশ্বাস আমি চান্স পাবো না, ভাল কিছু আমার দ্বারা হবে না, এই বিশ্বাসটুকু থাকুক না তার। খামাখা নষ্ট করে কি লাভ। এই ধরণের মানুষের দরকার আছে জীবনে। এদের জন্যই দ্বিগুণ জিদ নিয়ে কিছু করে দেখানোর তাড়না জাগে। সেই বড় ভাইকে আমার বন্ধু বলে বসলো, ভাই জানেন সাইফ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়েছে সি ইউনিটে। ভাই শুনেই অবাক হলো। তারপর নিজেকে স্থির করে টেবিলে একটা থাবড়া দিয়ে বললো, আরেহ মিয়া আমি জানতাম তুমি পারবা। তুমি না পারলে আর কেডায় পারবো! আমি তো অনেকের কাছেই বলি আমার দেখা অন্যতম মেধাবী পোলা তুমি। আচ্ছা মিষ্টি খাওয়াবা কখন…

এই মানুষগুলো আমাদের প্রত্যেকের জীবনে থাকে। তারা জীবনের একটা পার্ট। এরা আছে বলেই জীবন চ্যালেঞ্জিং। কিন্তু, এর বাইরেও গল্প থাকে। আমাদের প্রিয় কিছু মানুষ থাকেন। যারা সবসময় আমাদের সাহায্য করতে চান, আমরা যতই খারাপ সময়ের মধ্যে থাকি না কেন। হয়ত আমরা তাদের মর্যাদা দেই না, ভুলে যাই জীবনে তাদের অবদান, কিংবা তাদের ভাল চাওয়াকে ভুল বুঝি। কিন্তু, তারা থাকেন আমাদের জীবনে। এটাই সত্য। তারা আমাদের বাবা মা। আরো স্পেসিফিক করে বললে বলতে হয় মায়ের কথা।

মায়ের কথা কেন? আমাদের মধ্যবিত্ত জীবনে মায়েরা সবসময় অন্তরালে থাকেন। তারা এতো কাজ করেন যে তাদের কাজ আলাদা করে আমাদের চোখে পড়ে না। মায়েরা সন্তানদের ভাল যেভাবে বুঝতে চান, সেটা অনেকসময়ই আমরা আপদ মনে করি, মধ্যবিত্ত সংসারে এমনই হয়।

আমার মা একসময় পড়ালেখার জন্য অনেক তাগাদা দিত। আব্বার কাছে বিচার দিত। আমার মাকে আমার সবসময়ই একটু কাঠখোট্টা মনে হতো। একটা মধ্যবিত্ত জড়তার কারণে মায়ের ভালবাসাকে হয়ত উটকো ঝামেলাই মনে করেছি৷ কিন্তু, দেখা গেলো, আমার এডমিশনের রেজাল্ট জানার পর আমি সবার আগে আমার মাকেই খুঁজেছি এই রেজাল্ট জানানোর জন্য। আম্মা ছোট ভাইকে স্কুলে পৌঁছে দেয়ার জন্যে গেছেন। আমি রাস্তায় বের হলাম। আম্মার আসছেন বাড়ির দিকে। আম্মাকে যখন জানালাম, আম্মা আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে…

আম্মা রাস্তায় আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। রাস্তায় কান্না শুরু করলেন। আনন্দের কান্না। চারপাশের মানুষ তাকিয়ে দেখছে অদ্ভুত এই দৃশ্য৷ মায়েরা এমনই বোধহয়।

আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বি ইউনিটের এডমিশন এক্সাম ছিল। হাজার হাজার বাবা মায়েরা সন্তান নিয়ে এসেছেন, প্রবল উৎকন্ঠা তাদের। আমি গত বছর একটা হেল্পডেস্কে বসেছিলাম। বাবা মায়েদের আবেগ আমাকে ছুঁয়ে গিয়েছিল তখন। প্রত্যেক বছরই বাবা মায়েদের ত্যাগের অদ্ভুত কিছু নিদর্শন দেখা যায়। এ বছর তেমনই একটা দৃশ্য দেখা গেলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডমিশন টেস্টে।

সন্তান শারীরিক প্রতিবন্ধী। কিন্তু মায়ের কাছে সে তো সবার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মা তার আঠারো বছরের কিশোর সন্তানকে কোলে নিয়ে গেলেন এডমিশন সেন্টারে। সন্তান যেনো সঠিক সময়ে ভর্তি পরীক্ষার হলে ঢুকতে পারে, নিশ্চিন্তে পরীক্ষা দিতে পারে এজন্যেই মা সন্তানকে বয়ে নিয়ে গেলেন। মায়ের কাছে সন্তান কখনোই বোঝা নয়, মায়ের কাছে সন্তান কখনোই বড় হয় না। তাই মা তার সন্তানকে কোলে নিয়ে বয়ে নিয়ে যেতে কুন্ঠা বোধ করেননি।

আহ আমাদের মায়েরা, এভাবেই কত রকমে যে তারা আমাদের জন্য ত্যাগ স্বীকার করে যাচ্ছেন, আমরা কি তা খেয়ালে রাখি। আমি নিজেই বা কতটুকু রাখি! তবুও, মায়েরা প্রতিদানের আশা না করে নিজের সব শ্রম দিয়ে যান সন্তানের জন্য। পৃথিবীর সবাই মুখ ঘুরিয়ে নিলেও, মা ঠিকই বোঝেন। খারাপ সময়ে সবাই আপনার কাঁধ থেকে হাত সরিয়ে নিলেও মায়েরা ঠিকই সন্তানকে কাঁধে তুলে রাখেন। মায়েরা তো এমনই। ভাল থাকুক পৃথিবীর সব মা, ভাল থাকুক স্বপ্নগুলো।

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close