অদ্ভুত,বিস্ময়,অবিশ্বাস্যএরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

নির্ভুল যত পুকুরচুরির ঘটনা ঘটেছে দুনিয়াজুড়ে!

বলা হয়ে থাকে, কোন অপরাধই নাকি নির্ভুল হয় না। অপরাধী সব সময়ই পেছনে ফেলে যায় প্রমাণ। যার সূত্র ধরে, এক সময় ধরা পড়ে অপরাধী, বিচার হয় অপরাধের। কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাসে এমন কিছু অপরাধ এবং অপরাধী আছে যারা মানুষের এ ধারণায় আনতে পারে আমূল পরিবর্তন। সেসব অপরাধীর কথা শুনলে হঠাৎ মনে পড়ে যেতে পারে বলিউডের “ধুম” ছবির নায়কের কথা। কেননা, চুরি বা ডাকাতিকে এরা অপরাধে সীমাবদ্ধ না রেখে, এগুলোকে নিয়ে গেছে শিল্পের পর্যায়ে। মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার টাকার সম্পদ চুরি করে তারা একরকম হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। না পাওয়া গেছে চুরি করা সম্পদের কোন হদিস, না ধরা গেছে চোরকে।

  • জাপানের ৩০০ মিলিয়ন ইয়েন ডাকাতি

৩০০ মিলিয়ন ইয়েন ডাকাতির ঘটনা জাপানের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ডাকাতির ঘটনাগুলোর মধ্যে অন্যতম। একক ব্যক্তির দ্বারা এরচেয়ে বড় ডাকাতির ঘটনা স্মরণকালে আর জানা যায় না।

১৯৬৮ সালের ১০ ডিসেম্বর টোকিও ভিত্তিক নিহন শিনটাকো গিনকো ব্যাংক থেকে তোশিবা কোম্পানীর কর্মচারিদের বেতন-ভাতা দেবার জন্য ৩০০ মিলিয়ন ইয়েন তোলা হয়। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ একটি গাড়িতে করে তোশিবা কোম্পানির ফুচু ফাক্টরিতে নিয়ে যাচ্ছিলেন ব্যাংকের চারজন কর্মচারী। পথিমধ্যে মটর সাইকেলে করে ইউনিফর্ম পরা এক পুলিশ গাড়িটিকে থামায়। গাড়ি থামিয়ে পুলিশবেশী লোকটি গাড়ির যাত্রীদের জানায় গাড়ির নিচে বোমা ফিট করা আছে, গাড়ি চেক করা প্রয়োজন। পুলিশের কথা শুনে যাত্রীরা তড়িঘড়ি করে গাড়ি থেকে নেমে পড়ে। পুলিশ হামাগুড়ি দিয়ে গাড়ির নিচে প্রবেশ করে। কিছুক্ষণ পর গাড়ির নিচ থেকে ধোঁয়া বের হতে শুরু করে। ঘটনার আকস্মিকতায় গাড়ির যাত্রীরা যখন হতবিহবল, পুলিশ দৌড়ে গিয়ে গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসে এবং গাড়ি চালিয়ে উধাও হয়ে যায়।

এ ঘটনার তদন্ত চলাকালে ১২০ টি প্রমাণ দাঁড় করানো হয়, ১ লক্ষ ১০ হাজার মানুষকে সন্দেহভাজনদের তালিকায় ঠাঁই দেওয়া হয় এবং ১ লক্ষ ৭০ হাজার গোয়েন্দাকে কাজে লাগানো হয়। কিন্তু কোন কিছুতেই কোন ফল পাওয়া যায় নি। কে ছিল সেই পুলিশবেশী ডাকাত তা বের করা সম্ভব হয়নি। ১৯৭৫ সালে এই মামলার কার্যকাল শেষ হয় এবং ১৯৮৮ সালে এর তদন্তকাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। আজ পর্যন্ত জানা যায়নি কে ছিল এই চোর বা ডাকাত।

  • ব্যাংকো সেন্ট্রাল টানেল ডাকাতি

ব্যাংকো সেন্ট্রাল ব্যাংক হলো ব্রাজিলের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ২০০৫ সালের ৬ই আগস্ট একদল ডাকাত মাটির নিচ দিয়ে ২০০ মিটার লম্বা টানেল খুঁড়ে ব্যাংটিতে প্রবেশ করে। ব্যাংকের সকল অ্যালার্ম এবং সেন্সর অকেজো করে, তারা ব্যাংকের ভল্ট থেকে পাঁচটি ৫০ ডলার রাশিয়ান রিয়েলের নোটের কন্টেইনার পাচার করে। এই পাঁচটি কন্টেইনারে যে পরিমাণ অর্থ ছিল তার মূল্যমান ৬৫ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি।

এই বিপুল পরিমাণ অর্থের কোন ইন্সুরেন্স ছিল না। এত বিশাল অঙ্কের অর্থ যে ব্যাঙ্কের ভল্ট থেকে সরানো সম্ভব তা হয়তো কারও মাথায়ই আসেনি।

যা হোক, এই অর্থ উদ্ধারেও ব্যাপক তদন্ত করা হয়। তদন্তে জানা যায়, ব্যাংক থেকে দুইশ মিটার দূরে ডাকাতদল একটি বাড়ি ভাড়া করে। তারা সেই বাড়ির মেঝে খুঁড়ে তিন মাস বাপী এই বিশাল লম্বা টানেলটি তৈরি করে। ডাকাত দলে ১৯ জনের মত লোক ছিল। ব্রাজিলের ইতিহাসে এই ব্যাংক ডাকাতির চেয়ে বড় ডাকাতি আর কখনও ঘটেনি।

শেষ পর্যন্ত যদিও এই ডাকাতির কিছু অর্থ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল, এবং ডাকাতির সাথে জড়িত এক ব্যক্তির মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল, তবু  ঘটনার সাথে জড়িত আরো ১৮ জন ব্যক্তির কারোরই কোন পরিচয় বা সন্ধান মেলেনি।

  • ডিবি কুপারস হ্যাইজাকিং

১৯৭১ সালের ৪ঠা জুন এক ব্যক্তি ওয়াশিংটনের পোর্টল্যান্ড, অরিগন এবং সিয়াটলের মাঝামাঝি জায়গায় একটি বিমান হ্যাইজাক করে। প্লেন যখন আকাশে উড়ছিল, সুই-টাই পরা লোকটি তখন একটা ড্রিংকস্ এর অর্ডার দেয়ার ছলে বিমানবালাকে বলে, “আমার ব্রিফকেসে একটা বোমা আছে। আমি তোমাদের সবাইকে হ্যাইজাক করেছি।” এরপর সে মুক্তিপণ হিসেবে, দুই লক্ষ ডলার, দুটি প্যারাসুট এবং সেগুলোর জন্য ফুয়েল ট্রাক দাবী করে।

যখন প্লেন সিয়াটলে ল্যান্ড করে, লোকটি বন্দীদের বদলে টাকা এবং প্যারাসুট বিনিময় করে এবং প্লেন পুনরায় আকাশে ওড়ানোর নির্দেশ দেয়। প্লেন আকাশে ওড়ার ত্রিশ মিনিট পরে সে প্লেনের পেছনের দিক দিয়ে টাকা এবং প্যারাসুট নিয়ে শূন্যে লাফ দেয়। এরপর তাকে নিয়ে নানারকম তদন্ত হয়েছে। কিন্তু এই আসামীর কোনদিনই আর কোন খোঁজ মেলেনি। কোথায় গেল সেই ব্যক্তি, আর কোথায় গেল টাকা কেউ তার সন্ধান দিতে পারেনি। বহু বছর তদন্তের পরে এফবিআই ২০১৬ সালে এ কেসের তদন্ত বন্ধ করে দেবার নির্দেশ দেয়।

  • জমজ রত্ন চোর

ডাকাতির এই ঘটনাটিতে একটু বাড়তি টুইস্ট রয়েছে। ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারী তিনজন মুখোশধারী ডাকাত ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম ডিপার্টমেন্টাল স্টোর ভেঙে ৭ মিলিয়ন ডলার মূল্যমানের হীরা চুরি করে।

চুরি করে পালাবার সময় একজন ডাকাতের হাত থেকে গ্লাভ খুলে পড়ে যায়। তদন্ত করার সময় গ্লাভটি পরীক্ষা করা হলে তাতে দু’জন মানুষের ডিএনএর সন্ধান পাওয়া যায়। যে দু’জনের ডিএনএর সন্ধান পাওয়া যায় তারা ছিল জমজ দুই ভাই। হাসান এবং আব্বাস নামের সেই দুই আসামীর ডিএনএতে এতোটাই মিল ছিল যে, সেগুলোকে আলাদা করে সনাক্ত করা যাচ্ছিল না। তাই জার্মানীর এক বিশেষ আইনের আওতায় তারা শেষ পর্যন্ত ছাড়া পেয়ে যায়।

জার্মানীতে এমন একটি আইন আছে যে, প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার ব্যক্তিগত অপরাধ অনুযায়ী শাস্তি প্রদান করতে হবে। তাই ডাকাতির সময় পাওয়া গ্লাভ কোন ভাইয়ের, হাসানের নাকি আব্বাসের এটি সনাক্ত করা না যাওয়ায় দু’জনকেই মুক্তি দেওয়া হয়। আর ডাকাতিতে জড়িত তৃতীয় ব্যক্তিটি কে ছিল তা জানা না যাওয়ায় কারোরই সাজা দেওয়া সম্ভব হয়নি এই ডাকাতির মামলায়।

  • ইসাবেলা স্টুয়ার্ট গার্ডনার জাদুঘর ডাকাতি

১৯৯০ সালের মার্চের ১৮ তারিখে পুলিশের পোষাকে দুইজন লোক যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনের ইসাবেলা স্টুয়ার্ট গার্ডনার জাদুঘরে প্রবেশ করে। সেখানকার দু’জন সিকিউরিটি গার্ডকে বেধে রেখে জাদুঘরে প্রদর্শিত ১৩ টি পেইন্টিং ফ্রেম থেকে কেটে বের করে নেয়। বিখ্যাত সব শিল্পীদের আঁকা শিল্পকর্মগুলোর মূল্যমান ছিল ৩০০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি।

শিল্পকর্মগুলো আর কখনওই উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। জানা যায়নি কারা ছিলেন পুলিশ ছদ্মবেশী সেই দুই ডাকাত।

এমনই আরও কিছু চুরি-ডাকাতির ঘটনা রয়েছে যেগুলোকে পারফেক্ট বা নির্ভুল বললেও কম বলা হবে। মজার সেসব ঘটনার সবটাই এখানে লেখা সম্ভব নয় একদিনে। তাই আজ এখানেই সমাপ্তি টানছি।

Comments
Show More

Related Articles

Close