মনের অন্দরমহলরিডিং রুম

তুরস্কের মসজিদ, আমাদের কলোনীর মসজিদ…

তুরস্কের মসজিদগুলোতে নাকি একটা বাণী লেখা থাকে, যার মানে এরকম অনেকটা- যেদিন থেকে মসজিদের পেছনের কাতার থেকে শিশুর হাসির শব্দ ভেসে আসবে না, সেটা খুবই ভয়াবহ একটা ঘটনার ইঙ্গিত দিবে। কিছু দিন আগে সিরাজদিখানে এক মসজিদে জুম্মার নামাজ আদায় করতে গেলাম। বহু দিন পর কোন মসজিদে প্রাপ্তবয়স্ক নামাজীর থেকে শিশু নামাজীর সংখ্যা বেশী দেখলাম। বাচ্চারা খুব সাবলীলভাবে মসজিদে দুষ্টুমি খুনসুটি করছে, কারো দেখলাম তাতে মাথা ব্যাথা নেই, বিরক্তি নেই, যেন এটাই স্বাভাবিক এমন একটা ভাব সবার মাঝে। নামাজ শুরু হতে ইমাম সাহেব স্বাভাবিকভাবেই বললেন, বাচ্চাদের মাঝে নিয়ে দাঁড়ান, ওদের নামাজের নিয়ম শিখিয়ে দেন।

এটা দেখে ছোটবেলায় নিজের মসজিদের অভিজ্ঞতা মনে পড়লো। আমার বেড়ে উঠা কিশোরগঞ্জ শহরে। কলোনীর মসজিদ একটা সময় আমাদের বিনোদনের অন্যতম ক্ষেত্র ছিল বলা চলে। বৃষ্টির দিনে যেদিন মাঠে খেলার উপায় থাকতো না, সেদিন বোতলের ছিপি খুলে মসজিদের বারান্দায় রেগুলার ফুটবল খেলতাম আমরা। অবশ্য এই খেলা জায়েজ করতে আমরা আসরের নামাজ পড়ে বসে থাকতাম, সবাই বের হলেই খেলা শুরু এবং মাগরিবের আগে আগে খেলা বন্ধ করে মাগরিব পড়ে তারপর বের হতাম। অন্তত বর্ষায় খেলার উছিলাতেও দুই ওয়াক্ত নামাজ পড়বার অভ্যাস আমাদের ছিল! এছাড়া তাবলীগের জন্যে প্রচুর ফরেনার আসতো আমাদের কলোনীর মসজিদে। সোমালিয়ান, ইন্দোনেশিয়ান, চেচেন এরা বেশী আসতো। বিদেশী লোকজন আমাদের মসজিদে এসে থেকে যাচ্ছে এই বোধ থেকেও অন্তত মাগরিবের নামাজে মসজিদে যেতাম একপ্রকার আতিথেয়তাবোধ থেকে। এসবই ক্লাস ওয়ান-টু এর কাহিনী।

জুম্মাবার মানে ছিলো উৎসব, তবে মাঝে মাঝে কিছুটা এডভেঞ্চারের লোভে দূরে পাগলা মসজিদে যেতাম আমরা দলবেঁধে। এডভেঞ্চার এই জন্যে, কলোনী থেকে প্রায় আড়াই কিলো দূরে পাগলা মসজিদ। মাঝে পাটগবেষণা কেন্দ্রের বিশাল নির্জন এরিয়া। এর মাঝ থেকে আমরা শর্টকাট নিতাম, মাঝে মাঝে দাড়োয়ানের দাবড়ানি- এসব মিলিয়ে বিরাট এডভেঞ্চার। মানে ওই বয়সের অপরাধ যা করতাম, নামাজ দিয়ে কীভাবে ব্যাপারটা বাসা এবং নিজের কাছেও জায়েজ করা যায়, এদিকে বেশ খেয়াল ছিল। তবে সবচেয়ে বড় উৎসব ছিল শবে বরাতের রাত। আলুয়া রুটির জন্যে না, এই একটা দিন আমরা রাত অবধি বাইরে থাকার সুযোগ পেতাম, শবে বরাত মানে অন্ধকারে পুরো কলোনী দৌড়ঝাঁপ করা আর মসজিদের বাইরের বারান্দায় কিছুটা আড়ালে সারি সারি জায়নামাজ পেতে সব বন্ধুরা মিলে শুয়ে আয়েশ করা।

সব মিলিয়ে মসজিদ আমাদের কলোনীর লাইফে অন্যতম এক আগ্রহের কেন্দ্র ছিল। মাঝে মাঝে অতিরিক্ত সোয়াবের আশায় পুকুরের কাঁদা তুলে ঢিলা কুলুপ বানাতাম আমরা, রীতিমত প্রতিযোগিতা চলতো কে কয়টা ঢিলা কুলুপ বানাতে পারে। তবে কুলুপ শুকানোর পর এর ১০% যেত মসজিদে, বাকীসব ঢিল মেরে নয়তো গুলতির গোলা হিসেবেই ব্যবহার হতো। তারপরেও ১০% যে মসজিদে রেখে আসবো এই বোধ সবার ছিল।

প্রতীকী ছবি

আমাদের এই কলোনীর বাধাধরা রুটিনের জীবনে খেলার তিনটা মাঠ, অসংখ্য ফলের গাছ, বিশাল একটা দীঘি আর এর সাথে মসজিদের আনন্দটুকু, সব মিলিয়ে দারুণ জীবন ছিল। হুট করে আমাদের মসজিদের আকার বাড়ানো হলো, আশপাশের মানুষ আসতে লাগলো, আমাদের পছন্দের ইমাম সাহেব হুট করে আরেক মসজিদে চলে গেলেন। সব বিপর্যয় যেন একসাথে শুরু হলো। মসজিদ বড় হতেই আমাদের কলোনীবাসীরা হয়ে গেলাম সংখ্যালঘু। হুট করে আবিস্কার করলাম আমাদের মসজিদ পুরোপুরি আমাদের আয়ত্বে নেই। এবং এর সাথেই উটকো সব ঝামেলা হাজির হতে লাগলো।

মসজিদে শব্দ করলেই বাইরের মানুষজন ঝাড়ি দিতে লাগলো। আগে প্রতিযোগিতা হতো কে কত সামনে নামাজে দাঁড়াব। হুট করে আবিস্কার করলাম সামনের কাতারে থাকলে কিছু কপালে দাগ ফেলা মুরুব্বি অকারণে কাঁধে দু’হাতে চেপে পেছনে ঠেলে দিতেন! শুধু এই না, পেছনে কিছু ইয়ং ড্রিল সার্জেন্টের আগমন ঘটলো, কঠিন এক মাওলানা ছিল, ঈগলের মতো চোখ। সে স্বেচ্ছায় দায়িত্ব কাঁধে নিল মসজিদে বাচ্চাদের শৃঙ্খলা আনতে। নামাজে একটু শব্দ হয়েছে কী হয়নি, সে ঘাড় ঘুরিয়ে চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে মার্ক করতো, নামাজ শেষে তার ভয়ে আমরা সালাম কোনোমতে ফিরিয়েই দৌড়! ধরা পড়লে মার খেতে হবে এই আশঙ্কা। ধরা খেলে মার খেতে হতো সত্যি সত্যি। সব মিলিয়ে মসজিদ পরিণত হলো এক বিভীষিকায়। ধীরে ধীরে জুম্মা বাদে অন্যান্য ওয়াক্তে আমাদের বাচ্চাপার্টির মসজিদ যাবার প্রবণতা নেমে আসলো শুন্যের কোঠায়। কতবার যে প্ল্যান করেছি যে সবাই মিলে এই ড্রিল সার্জেন্টকে মেরে ড্রেনে ফেলে দিবো! (মসজিদের সামনেই বিশাল ড্রেন ছিলো, ড্রেনের উপরের স্ল্যাব পার হবার সময় কাউকে কায়দা করে ল্যাং মারতে পারলে সোজা ড্রেনে, কাউকে যে আমরা ফালাইনি এমন না, তবে এই কঠোর মাওলানাকে কোন সময় ফেলার সুযোগ হয়নি।) আরেকটা উপায় ছিলো বড় কাউকে বিচার দেয়া, কিন্তু বড় কাউকে বিচার দিবো যে, কি বলবো? নামাজে কথা বললেই সে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে, পরে মারে? নামাজে যে কথা বললাম- এই অপরাধ কাউকে কিভাবে বলবো, এই দোটানায় বড় কাউকে বলা হয়নি।

মাঝে মাঝে যে ব্যাটাকে কথায় ফাঁদে ফেলিনি এমনটা নয়, সে যে নামাজের সময় পেছনে তাকায় ১০০ বার, এই তাকানোতে তার নামাজ হয় কিনা এই ধরণের যুক্তি আমরা দিতে চাইতাম! কিন্তু সে ধরেই নিয়েছিল বাচ্চাদের মুখ বন্ধ রাখতে পারলে নামাজ এমনিতেই সারা হয়ে যায়, তাই এই যুক্তিতে তাকে কখনো টলতে দেখিনি!

এই লোকগুলো আসবার পর থেকে মসজিদ আমাদের জন্যে এতটাই আতংকের নামে পরিণত হলো যে, ‘মসজিদ একটি আনন্দের জায়গা’- এই বোধটাই উধাও হয়ে গেল। মসজিদ আনন্দের জায়গা নিয়ে অনেকের দ্বিমত থাকতে পারে, আমি ব্যাপারটাকে দেখি এভাবে। নামাজ হচ্ছে স্রষ্টার সবচেয়ে নিকটে যাবার সুযোগ, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মানে দায়িত্ববোধ থেকে যখন এই বোধ আসে যে দিনে ৫ বার আমার সুযোগ ঘটে স্রষ্টার কাছাকাছি যাবার, এই বোধটা আসা মাত্রই নামাজ, মসজিদে যাবার ব্যাপারটা দায়িত্ব বা অবশ্য পালনীয় থেকে একটা আনন্দের ঘটনায় পরিণত হয়।

এখন এটা যে আনন্দ। এটা পরিণত বয়সের বোধের ব্যাপার, কিন্তু বাচ্চা বয়সে যাকে এই বোধ বোঝানো সম্ভব না, তার কাছেও মসজিদ একটা আনন্দদায়ক জায়গা, এই বোধ গড়ে দেয়া জরুরী। মাথায় যদি একবার বিভীষিকা বোধ ঢুকে যায়, এর থেকে বের হওয়া সত্যি সত্যিই কঠিন। তুরস্কের মসজিদগুলোর সেই বাণীর অর্থ হয়তো এটাই, মসজিদ যেদিন থেকে শিশুশুণ্য হয়ে যাবে, সেদিন থেকে মসজিদে নামাজীর সংখ্যা কমতে থাকবে। এর জন্যে যত না বে-নামাজীর বোধের অভাব দায়ী, তার থেকে অনেক বেশী দায়ী তারাই যারা ধর্মীয় আচার-ব্যবস্থাকে শিশুদের কাছে রীতিমতো আতংকে পরিণত করে দিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত।

আরও পড়ুন-

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close