ব্লু হোয়েল চ্যালেঞ্জের কথা মনে আছে নিশ্চয়ই। সেই যে, প্রাণঘাতি যে অনলাইন গেমের কবলে পড়ে রাতের ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছিল বিশ্বব্যাপী লক্ষ লক্ষ মানুষের। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, গেমটি খেলে বেঘোরে প্রাণ হারিয়েছিল অনেকেই। এবং এখনও পুরোপুরি দূর হয়নি ব্লু হোয়েল আতঙ্ক।

এই তো জুলাইয়ের শুরুর দিকেও সৌদি আরবে ১২ বছর বয়সী এক বালকের মৃত্যু ঘটেছে ব্লু হোয়েল চ্যালেঞ্জ খেলার ফলে। অর্থাৎ ব্লু হোয়েলের প্রভাব এখনও রয়ে গেছে অনেকের মনেই। আর তারই মধ্যে হাজির হয়েছে নতুন এক জীবন কেড়ে নেয়া অনলাইন গেম। সেটির নাম ‘মমো’।

জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে ‘মমো’ নামের এই অনলাইন গেম ৷ ইতিমধ্যেই এই অনলাইন গেম নিয়ে দক্ষিণ আমেরিকায় সতর্কতা জারি হয়েছে ৷ নতুন এই গেমকে বিশ্লেষকরা ব্লু হোয়েলের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

মমো মূলত গেমের একটি চরিত্র। সে দেখতে ভীতিকর। গায়ের চামড়া ফ্যাকাসে। চোখে অশুভ হাসি। এবং বাইরের দিকে প্রসারিত লাল লাল চোখ। সবমিলিয়ে গায়ে কাঁপন ধরিয়ে দেয়া ও শিরদাঁড়া বেয়ে ভয়ের ঠান্ডা স্রোত বইয়ে দেয়ার মত সকল উপাদানই বিদ্যমান মমোর মধ্যে।

গত ২৫ জুলাই আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস এইরেসে ১২ বছর বয়সী বালিকা ইনজেনিয়েরো মাশউইজের আত্মহত্যার জন্য এই ‘মমো’ গেমকে দায়ী করা হয়েছে। বিশ্লেষকরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, এ খেলা মানুষকে মারাত্মক পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে পারে। যদিও এর মধ্যেই এটি এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপে ছড়িয়ে পড়েছে।

মমো’র এমন বিস্তার নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠেছে। অনলাইন প্লাটফর্ম রেডিটে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশিবার দেখা ও পড়া পোস্টগুলোর একটি হলো “হোয়াটসঅ্যাপ বালিকা মমো কী ও কে”? জবাবে রেডিট বলছে, “একটি ভিডিও পেয়েছি এটি সম্পর্কে এবং এটি ভীতিকর।”

সবচেয়ে জনপ্রিয় উত্তর ছিলো, “স্প্যানিশভাষী কোন দেশ থেকে একজন ইন্সটগ্রাম থেকে একটি ছবি নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট তৈরি করে। লোকজন সেখান থেকে একটি কন্টাক্ট নাম্বার পায় ও গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে তুমি একে স্পর্শ করলে সে তোমাকে গ্রাফিক ছবি ও বার্তা দেবে। কেউ কেউ বলেন যে আপনার সব ব্যক্তিগত তথ্যে তার প্রবেশাধিকারের সুযোগ আছে।”

গত ১১ জুলাই ইউটিউবার রেইনবট এ বিষয়ে একটি ভিডিও পোস্ট করেন, যার ভিউ সংখ্যা ইতিমধ্যেই দেড় মিলিয়ন ছাড়িয়ে গেছে। তবে তিনিও কিন্তু সঠিক জানেন না যে এই ‘মমো’র প্রকৃত স্রষ্টা আসলে কে।

এখন পর্যন্ত ‘মমো’ সম্পর্কে প্রাপ্ত তথ্যের পরিমাণ একদমই সীমিত। হোয়াটসঅ্যাপ গেমটি জাপানের কোড সম্বলিত তিনটি ফোন নম্বরের, কলম্বিয়ার কোড সম্বলিত দুটি আর মেক্সিকোর কোড সম্বলিত আরেকটি নম্বরের সঙ্গে সংযুক্ত। আর ছবিটি নেওয়া হয়েছে টোকিওর একটি প্রদর্শনী থেকে।

এ কথা বলাই বাহুল্য যে গেমটির প্রকৃত উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু বলা দুঃসাধ্য একটি ব্যাপার। কিন্তু এটি এখন জানা যে ছবিটি জাপানের মমোকেই প্রতিনিধিত্ব করতে ব্যবহার করা হয়। মমোর ভীত চাহনির মুখ একটি পাখি মানবীর মূর্তিকে তুলে ধরে। ২০১৬ সালে টোকিওতে ভ্যানিলা গ্যালারিতে একটি প্রদর্শনীর অংশ ছিল এটি।

মেক্সিকোর পুলিশের মতে, অন্তত পাঁচটি কারণে মমো গেমটিকে এড়িয়ে চলা উচিৎঃ

১. ব্যক্তিগত তথ্য চুরি হতে পারে
২. সহিংসতা, এমনকি আত্মহত্যায় প্রলুব্ধ করতে পারে
৩. ব্যবহারকারী হয়রানির শিকার হতে পারে
৪. ব্যবহারকারী চাঁদাবাজির শিকার হতে পারে
৫. ব্যবহারকারী মানসিক ও শারীরিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে, উদ্বেগ, বিষণ্ণতা, অনিদ্রা জেঁকে ধরতে পারে।

যদিও ‘মমো’ ছড়াচ্ছে শুধু হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে, কিন্তু এটি শিশুদের অনলাইন গেম মাইন ক্রাফটেও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন ব্যবহারকারীদের এ ধরনের বার্তা অনুসরণ করা উচিত নয় এবং কোন অপরিচিত নাম্বারের সাথে সংযোগ করা ঠিক হবেনা।

জামাল ফারউইজ নামে মিশরের এক কনসাল্ট্যান্ট সাইকিয়াট্রিস্ট বলেন, এই গেমটি খেলার ফলে শিশু-কিশোরদের মধ্যে সাইকিয়াট্রিক ডিজ-অর্ডার দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি তাদের অবধারণগত সক্ষমতায়ও প্রভাব পড়তে পারে।

এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে কেউ এই গেম খেলে আক্রান্ত হয়েছে এমন সংবাদ পাওয়া যায়নি। কিন্তু ইন্টারনেটের উন্মুক্ত প্রান্তরে সবকিছুই আজকাল একদমই সহজলভ্য। তাই বাংলাদেশেও যদি ইতিমধ্যেই কেউ গেমটি খেলা শুরু করে দিয়ে থাকে, তাহলে অবাক হওয়ার কিছুই নেই। এখনও এই গেম খেলে আমাদের দেশে কেউ মারা যায়নি বলে নিশ্চিন্ত বোধ করার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই।

এখনও কেউ মারা যায়নি ঠিক আছে, কিন্তু মারা যেতে কতক্ষণ! তাই অভিভাবকদের প্রতি অনুরোধ করা যাচ্ছে, তারা যেন তাদের সন্তানদের উপর সজাগ দৃষ্টি রাখেন। তারা মোবাইলে কোন অপরিচিত ব্যক্তিদের সাথে কথা বলছে কি না, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সন্দেহজনক কোন কাজের সাথে লিপ্ত হচ্ছে কি না এ সকল বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে।

তথ্যসূত্র- বিবিসি, মেট্রো, খালিজ টাইমস

আরও পড়ুন-

Comments
Spread the love