২৫ মার্চের পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েক দিন প্রতিরোধের কাজে যুক্ত ছিলাম। ১৯৭১ সালের ২৫ এপ্রিল ভারতের আগরতলায় এবং সেখান থেকে ১৫ মে কলকাতায় সপরিবারে যাই। সেখানে গিয়ে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া শরণার্থী শিক্ষকদের সংগঠন গড়ার কাজে যুক্ত হই। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৭ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী হত্যার বিষয়টি সংবাদপত্রের মাধ্যমে জানতে পারি। ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি সপরিবারে ঢাকায় ফিরে আসি। মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর ছোট ভাই অধ্যাপক লুৎফুল হায়দার চৌধুরীর কাছে জানতে পারিব একাত্তরের ১৪ ডিসেম্বর তাঁর বাসা থেকে মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীকে কয়েকজন যুবক ধরে নিয়ে যান। ওই যুবকদের মুখে রুমাল বাঁধা ছিল। একপর্যায়ে যুবকদের একজনের মুখের রুমাল খুলে গেলে মোফাজ্জল হায়দার তাঁকে বলেন, ‘মইনুদ্দীন, তুমি?’ তখন মইনুদ্দীন মুখে রুমাল বাঁধতে বাঁধতে বলেন, ‘জি, আপনি আমার সঙ্গে যাবেন। কোনো ভয় নেই।এই মইনুদ্দীন তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের ছাত্র ও ‘দৈনিক পূর্বদেশ’ পত্রিকার নিজস্ব প্রতিবেদক ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে ১৯৬৯ সালে তাঁকে কিছুদিনের জন্য ছাত্র হিসেবে পেয়েছিলেন মোফাজ্জল হায়দার। ১৯৭২ সালের ৯ জানুয়ারি দুই শহীদ শিক্ষক মুনীর চৌধুরী ও মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর পরিবারের সঙ্গে তাঁদের বাড়িতে গিয়ে সাক্ষাৎ করি আমি। ওই সময় মোফাজ্জল হায়দারের স্ত্রী সৈয়দা মনোয়ারা চৌধুরী আমাকে বলেন, ‘আপনার ছাত্ররাই আপনার স্যারকে নিয়ে গেছে।’

একাত্তরে বুদ্ধিজীবী হত্যার অভিযোগে পলাতক আলবদর নেতা চৌধুরী মঈনুদ্দিন ও এক্সিকিউশনার বা জল্লাদ আশরাফুজ্জামান খানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের ২০ তম সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দিতে এসে প্রথিতযশা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যামিরেটাস  অধ্যাপক ডঃ আনিসুজ্জামান ঠিক এভাবেই তুলে ধরেন ইতিহাসটা।

একাত্তরের নয় মাস দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকায় সাংবাদিক সেজে থাকা এই কুখ্যাত খুনীই ছিলো জামায়াতের ইসলামের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘ(বর্তমানে ইসলামী ছাত্রশিবির)-এর নরপিশাচদের নিয়ে গঠিত আল-বদরদের কিলিং মিশনের অপারেশন ইনচার্জ।বুদ্ধিজীবীদের হত্যাকান্ডের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিল সে, তারই নির্দেশে আলবদর জল্লাদ আশরাফুজ্জামানসহ খুনীরা ব্ল্যাক আউট আর কারফিউর ঘুটঘুটে অন্ধকারে মাটি লেপা সাদা মাইক্রোবাস নিয়ে হানা দেয় খতম তালিকায় থাকা বুদ্ধিজীবিদের বাসভবনে। সাংবাদিক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাহিত্যিক- কে ছিলো না তাদের সেই তালিকায়! সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবী শহীদুল্লাহ কায়সারকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া জামায়াতে ইসলামের তৎকালীন দফতর সম্পাদক ঘাতক দালাল আবদুল খালেক মজুমদার স্বাধীনতার পর  মুক্তিযোদ্ধাদের জেরার মুখে জানায়, ১৪ ডিসেম্বর মঈনুদ্দিনের সঙ্গে তার শেষ দেখা হয়।

এদিন জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা শহর প্রধান সারওয়ার ও চৌধুরী মঈনুদ্দিন জামায়াত অফিসে এসে সব টাকাপয়সা নিয়ে যায়। এরপরই পালায় মঈনুদ্দিন!

দীর্ঘ ৪২ বছর পর ২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মানবতাবিরোধী অপরাধে মঈনুদ্দিনের অনুপস্থিতেই তার বিচার করে, তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। কিন্তু তখন তার সঠিক অবস্থান জানা যায়নি বিধায় তাকে দেশে ফেরানোর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। একাত্তরের বিজয়লগ্নে বুদ্ধিজীবী হত্যায় অভিযুক্ত এই জামায়াত নেতার বিরুদ্ধে ৯ জন শিক্ষক, ৬ জন চিকিৎসক ও ৩ জন সাংবাদিককে হত্যার অভিযোগ প্রমাণিত হয় ট্রাইবুনালে। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে মঈনুদ্দিনসহ অন্য পলাতক যুদ্ধাপরাধীদের অবস্থান জানতে ইন্টারপোলের সহায়তা চাওয়া হয়। বিশ্ব পুলিশের আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারপোলের ‘মোস্ট ওয়ান্টেড ব্রিটিশ ফিউজিটিভ’ এর সংক্ষিপ্ত ২৪ জনের তালিকায় ২০১৭ সালের জুলাই মাসে চৌধুরী মঈনুদ্দিনের নাম যুক্ত করা হয়। যেখানে মঈনুদ্দিনের ছবি ও তার অপরাধের বিবরণ উল্লেখ করা হয়। সেই তালিকাটা একবার চোখ বুলিয়ে আসতে পারেনঃ

The 24 most wanted Brits in the world revealed – including suspected terrorists, murderers, paedophiles and drug dealers

কিন্তু গত ২৬শে ডিসেম্বর বক্সিং ডে’তে, লন্ডনের প্রভাবশালী ও জনপ্রিয় ট্যাবলয়েড পত্রিকা ‘ডেইলি সানে’ প্রকাশিত হয়েছে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক নরপিশাচ চৌধুরী মঈনুদ্দিনের বিষয়ে এক সচিত্র প্রতিবেদন সেখানে দেখা যায়, লন্ডনের নর্থে অবস্থিত সাউথগেটে এক মিলিয়ন পাউন্ড মুল্যের এক বিলাসবহুল বাড়িতে স্ত্রী ফরিদা ও চার সন্তানকে নিয়ে বহাল তবিয়তে বাস করছে মঈনুদ্দিন। শপিং করছে, মসজিদে যাচ্ছে, সাধারণ এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে। ব্রিটিশ প্রিন্স চার্লসের সঙ্গে মঈনুদ্দীনের একটি ছবিও রয়েছে তার বাড়িতে, যা তোলা হয়েছিলো লেইসেস্টারশায়ারে একটি ইসলামিক ইভেন্টে। লন্ডনে জামায়াতের সংগঠন দাওয়াতুল ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি লন্ডনভিত্তিক সাপ্তাহিক দাওয়াতের বিশেষ সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করছে সে। এছাড়া সে সেখানকার ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের একজন সাবেক পরিচালক, মুসলিম এইডের ট্রাস্টি এবং টটেনহ্যাম মসজিদ পর্ষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্বেও ছিল। বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের দ্বৈত নাগরিক চৌধুরী মঈনুদ্দীনের এদেশের ঠিকানা ফেনীর দাগনভূঞার চানপুর গ্রাম। এতো বছর ধরে সে ব্রিটেনে আছে,  গত কয়েক মাস ধরে ইন্টারপোলের যুক্তরাজ্যে পলাতক শীর্ষ ২৫ অপরাধীর তালিকায় এই কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধীর নাম থাকা সত্ত্বেও ব্রিটিশ সরকার একে গ্রেফতার করতে কোন পদক্ষেপ নেয়নি। এমনকি ইন্টারপোলও চোখের সামনে থাকার পরেও একে ধরবার কোন চেষ্টা করেনি। অদ্ভুত না?

চৌধুরী মঈনুদ্দিনের যুদ্ধাপরাধের বিবরণ এবং তথ্যপ্রমাণ বারবার সামনে আসলেও কেন যেন আন্তর্জাতিক মিডিয়া সেটা নিয়ে কথা হয় না।এর আগেও  অবশ্য ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া শতাব্দীর অন্যতম বীভৎস গণহত্যাই তো আজো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়নি সর্বত্র! একাত্তরের পর চৌধুরী মঈনুদ্দিন কীভাবে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গিয়ে লন্ডনে আশ্রয় নিয়ে সেখানে ঘাঁটি গেড়ে বসলো, তার যুদ্ধাপরাধের অকাট্য প্রমাণ ও তৎকালীন প্রত্যক্ষদর্শী ও চাক্ষুষ সাক্ষীদের নিয়ে সহব্লগার এবং মুক্তিযুদ্ধ গবেষক অমি রহমান পিয়ালের কম্পাইল করা এই মাস্টারপিস আর্টিকেলটি থেকে পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ এই তথ্যগুলোতে এক নজর বুলিয়ে আসা যাক চলুনঃ

“১৬ই ডিসেম্বরের পর সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারত ও নেপাল হয়ে চৌধুরী মঈনুদ্দিন পৌছায় পাকিস্তানে। সেখানে হাজিরা দেয় গোলাম আযমের কাছে। পাকিস্তানী পাসপোর্ট নিয়ে যায় সৌদি আরব। বাংলাদেশ নাস্তিক হয়ে গেছে (ধর্ম নিরপেক্ষতার জামাতি ব্যাখ্যা), সেখানে সব মসজিদ এখন মন্দির- ইত্যকার মিথ্যাচারে যোগাড় করে বাদশাহী ফান্ড। এই ফান্ড জোগাড়ে গোলাম আযম ছাড়াও তার সঙ্গী ছিলো সিলেটের কুখ্যাত আল-বদর ঘাতক আবদুর রাজ্জাক এবং পাকিস্তান জামাতে ইসলামী নেতা মিয়া মোহাম্মদ তোফায়েল। এই ফান্ডের উদ্দেশ্য ছিলো পার্বত্য চট্টগ্রামকে ঘাটি বানিয়ে সারাদেশে অরাজকতা সৃষ্টি ও জাতীয় নেতৃবৃন্দকে হত্যা করা। জামাত নেতা আলী আহসান মুজাহিদ এ সময় ছাতা মেরামতকারীর ছদ্মবেশে গোটা দেশে ছাত্র সংঘ ও জামাত নেতাদের গোপনে সংগঠিত করতে থাকেন। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর অবশ্য জামাতের সেই অপারেশন চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন আর পড়েনি। পাশাপাশি ব্রিটেনে দাওয়াতুল ইসলাম নামে জামাতের একটি ফ্রন্টের দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হয় মঈনউদ্দিনকে। সেখানে ইস্ট লন্ডন মসজিদকে ঘাটি বানিয়ে সে সাপ্তাহিক দাওয়াত নামে একটি জামাতি প্রকাশনার সম্পাদনা চালিয়ে যায়।

‘স্যাটানিক ভার্সেস’ লেখক সালমান রুশদীর বিরুদ্ধে আন্দোলনের মাধ্যমেই লাইমলাইটে চলে আসে চৌধুরী মঈনুদ্দিন। ব্রিটেনের বিশিষ্ট নেতাদের একজন হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয় সে। ১৯৯৫ সালে লন্ডনের টুয়েন্টি টুয়েন্টি টেলিভিশন ‘ওয়ার ক্রাইমস ফাইল’ নামে একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করে যাতে চৌধুরী মঈনুদ্দিন ছাড়াও আবু সাঈদ ও লুতফর রহমান নামে ব্রিটেন আত্মগোপন করা তিন ভয়ঙ্কর যুদ্ধাপরাধীর সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা ছিলো। চ্যানেল ফোর থেকে পরিবেশিত এই ডকুমেন্টারিতে মঈনউদ্দিন এক লিখিত বক্তব্যে নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি জানায়। সে সমস্ত অভিযোগ মিথ্যা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত বলে অভিহিত করে। কিন্তু এসবই এই ঘৃণ্য খুনে বদমাশটার নির্লজ্জ মিথ্যাচার।

১৯৭২ সালের ৩ জানুয়ারি নিউইয়র্ক টাইমসে ফক্স বাটারফিল্ডের লেখা ‘আ জার্নালিস্ট ইজ লিংকড টু দ্য মার্ডার অব বেঙ্গলিজ’ নামে একটি বিশেষ রিপোর্ট ছাপা হয়। এতে বুদ্ধিজীবি হত্যাকান্ডে মঈনউদ্দিনের সংশ্লিষ্ঠতার আদ্যোপান্ত বর্ণনা ছিলো। সেখানে পূর্বদেশ সম্পাদক এহতেশাম চৌধুরীর বয়ানে মঈনউদ্দিনের বিরুদ্ধে তার ভাইকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়। এহতেশাম নিজে রক্ষা পান অফিসে আশ্রয় নিয়ে।

ফক্সের প্রতিবেদনে লেখা হয় : To his fellow reporters on the Bengali-language paper where he worked, Chowdhury Mueenuddin was a pleasant, well-mannered and intelligent young man…there was nothing exceptional about him except perhaps that he often received telephone calls from the leader of a right-wing Moslem political party. But, investigations in the last few days show that those calls were significant. For Mr. Mueenuddin has been identified as the head of a secret, commando like organization of fantatic Moslems that murdered several hundred prominent Bengali professors, doctors, lawyer and journalists in a Dhaka brick yard. Dressed in black sweaters and khaki pants, members of the group, known as Al-Badar, rounded up their victims on the last three nights of the war…Their goal, captured members have since said, was to wipe out all Bengali intellectuals who advocated independence from Pakistan and the creation a of a secular, non Moslem state.

…According to one captured member now being held in the Dacca jail, the reporter, Mr. [Choudhury] Mueenuddin, had been the master-mind of the organisation. A diary belonging to Mr. Mueenuddin’s room-mate has been found. It listed the names of Al Badar members and how much money they contributed to the group. The two men lived next door to the Dacca headquarters of Jamaat-e-Islami, a right-wing Moslem political party that ran in the last elections for the National Assembly last year but won less than one per cent of the vote. Al Badar is believed to have been the action section of Jamaat-e-Islami, carefully organised after the Pakistani crackdown last March.

Mr. Mueenuddin was last seen on 13 December after having an argument with a fellow reporter at their paper, Purbodesh. That reporter was kidnapped from his house by Al Badar a few hours later.

এর আগে ২৯ ডিসেম্বর ১৯৭১, ডেইলি অবজারভারে প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয় : “Chowdhury Mainuddin, a member of the banned fanatic Jamaat-e-Islami, has been described as the “operation-in-charge” of the killing of intellectuals in Dhaka by Abdul Khaleq, a captured ring leader of the Al-Badr and office bearer of the Jamaat-e-Islami.”

নিউইয়র্ক টাইমসে তার যেই সঙ্গীর কথা বলা হয়েছে তার নাম আশরাফুজ্জামান, ইসলামী ছাত্র সংঘের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। মঈনুদ্দিন ছিল অপারেশন ইন চার্জ আর আশরাফুজ্জামান ছিলো প্রধান জল্লাদ বা চিফ একজিকিউশনার। যে গাড়ি করে ঘাতকেরা বুদ্ধিজীবিদের রায়ের বাজারের শিয়ালবাড়ি বধ্যভূমিতে নিয়ে যেত, তার ড্রাইভার মফিজুদ্দিন ধরা পড়ার পর জবাববন্দীতে তার এই পরিচয়ই দেয়। দুজনে জামাতে ইসলামী অফিসের উল্টোদিকে থাকত। আশরাফুজ্জামানের ৩৫০ নম্বর নাখালপাড়ার বাড়ি থেকে একটি ব্যক্তিগত ডায়েরি উদ্ধার করে মুক্তিবাহিনী। সেখানে দুটো পৃষ্টায় ২০জন বুদ্ধিজীবীর নাম পাওয়া যায় যাদের মধ্যে ৮ জনকে হত্যা করা হয়। তারা হলেন মুনীর চৌধুরী, ড. আবুল খায়ের , গিয়াসউদ্দিন আহমেদ, রশিদুল হাসান, ড. ফয়জুল মহী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসক ডাক্তার গোলাম মুর্তজা। এদের প্রত্যেককে আশরাফুজ্জামান নিজে গুলি করে হত্যা করেছিল বলে জবানবন্দী দেয় মফিজুদ্দিন। ডায়েরির অন্যান্য পাতায় দালাল বুদ্বিজীবীদের নামের পাশাপাশি আল-বদরের হাই কমান্ডের নামের তালিকা ছিলো। এতে মঈনুদ্দিন ছাড়াও ছিল কেন্দ্রীয় কমান্ড সদস্য শওকত ইমরান ও ঢাকা শহরপ্রধান শামসুল হকের নাম।

আশরাফুজ্জামান যেসব সাংবাদিককে হত্যা করেছিল তার মধ্যে অন্যতম পূর্বদেশের শিফট ইনচার্জ ও সাহিত্য পাতা সম্পাদক আ.ন.ম গোলাম মোস্তফা। ঘটনার কয়দিন আগে মঈনুদ্দিনের সঙ্গে তার ঝগড়া হয়। গোলাম মোস্তফা জামাতে ইসলামীর সমালোচনা করায় মঈনুদ্দিন তাকে দেখে নেওয়ার হুমকি দেয়। ওয়ার ক্রাইমস ফাইলে এক সাক্ষাৎকারে এই ঘটনাটা বলেছেন আতিকুল ইসলাম যিনি টাইমসের প্রতিবেদনে পণ করেছিলেন মঈনুদ্দিনকে যেভাবেই হোক খুঁজে বের করার। মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে খালেকের নিশ্চিত মৃত্যু ঠেকিয়ে তাকে দিয়ে জবানবন্দী নেওয়ার সুপারিশটা আতিকের। মঈনুদ্দিনকে নিয়ে পত্রিকায় প্রথম প্রতিবেদনটিও তার। আর এই প্রতিবেদনের ছবি দেখেই মঈনুদ্দিনকে বুদ্ধিজীবী অপহরণে সনাক্ত করেন অনেকেই। এদের মধ্যে ছিলেন প্রাণে বেঁচে যাওয়া বিবিসির বাংলাদেশ সংবাদদাতা আতাউস সামাদের দুই প্রতিবেশী, নিহত সাংবাদিক সিরাজউদ্দিন হোসেন স্ত্রী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর ছোটো ভাইয়ের স্ত্রী ডলি চৌধুরী। এই মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর ছাত্র ছিলো মঈনুদ্দিন এবং একপর্যায়ে তার মুখ ঢেকে রাখা রুমালটা সরে গেলে তাকে চিনে ফেলেন তারা। আশরাফুজ্জামানের ডায়েরিতে আতিকুল ইসলামের নামও ছিল। কিন্তু সেটি ছিল ভুল ঠিকানা। মঈনুদ্দিনকে সন্দেহ করতেন বলেই আসল ঠিকানাটা দেননি তিনি।

এমন দৃঢ় সব দলিল ও তথ্যপ্রমাণ থাকার পরেও মঈনুদ্দিন ও তার পোষা আইনজীবীর দল বারবার অস্বীকার করেছে অপরাধ, বুক ফুলিয়ে মিথ্যাচার করেছে। সবচেয়ে হতাশাজনক ছিল বিশ্বের নানা মানবাধিকার সংস্থার নির্লজ্জ মিথ্যাচার। নানাসময়ে জামায়াত ও মৌলবাদী রাজনৈতিক দলগুলোর রাজাকার-আলবদরদের ফাঁসীর সময় তাদের প্রবল কান্নাকাটির কথা নিশ্চয়ই আপনাদের মনে আছে! তাদেরই একজন জামায়াতের পে-রোলে থাকা কথিত হিউম্যান রাইটস আইনজীবী টবি ক্যাডম্যান সেই ২০১৩ সাল থেকেই নরপিশাচ মঈনুদ্দিনকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে আসছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিকভাবে জাতিসংঘের বেশ কিছু মানবাধিকার সংগঠন, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং এনজিও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের শুরু থেকেই একে প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করে রাজাকার-আলবদরদের বাঁচাতে চেয়েছে। বিভিন্ন লবিং এবং আর্থিক প্রভাবে বর্বর পৈশাচিক এসব যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে মানবাধিকারের ধুয়ো তুলে দাঁড়ানো এসব নির্লজ্জ ওয়ার ক্রাইম অ্যাপোলোজার সংস্থা ও সংগঠনের প্রতিবাদের রেফারেন্স টেনে জামায়াতের দালাল টবি ক্যাডম্যান চৌধুরী মঈনুদ্দিনের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ বাতিলের আবেদন করেছে। ট্যাবলয়েড সানের প্রতিবেদকের কাছে ক্যাডম্যান বেশ জোরের সাথে দাবী করেছে যে, ইন্টারপোলের এই নোটিশটা নাকি রেড নোটিশ সিস্টেমের অপব্যবহার, কারণ তার মক্কেল মঈনুদ্দিন কখনো কোন ধরণের যুদ্ধাপরাধে জড়িত ছিল না। তাই এই রেড নোটিশ অবশ্যই বাতিল হয়ে যাবে।

ভেবে দেখুন একজন যুদ্ধাপরাধীর আইনজীবী কতটা স্পর্ধা হলে এধরনের কথা বলতে পারে! এর দায় ব্রিটিশ সরকার কোনভাবেই এড়াতে পারে না। যেখানে আজ ৭০ বছর পরেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের হলোকাস্টে জড়িত থাকার অপরাধে কিংবা কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে সামান্য গার্ড হবার অপরাধেও জার্মান সেনাদের পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে খুঁজে খুঁজে ধরে এনে বিচারের মুখোমুখি করা হচ্ছে, সেখানে লন্ডনের সাউথগেটে চোখের সামনে ঘুরতে থাকা একজন মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত নরপিশাচ যুদ্ধাপরাধীকে খুঁজে পাচ্ছে না ইন্টারপোল! চোখের সামনে থাকার পরেও গ্রেফতার করে বিচারের মুখোমুখি করছে না! শহীদ বুদ্ধিজীবীদের রক্ত লেগে থাকা হাতে আজ যখন মঈনুদ্দিন আঙ্গুল তুলে বলে, দিজ কোর্ট ইজ রাবিশ, সে নির্দোষ, তখন শহীদদের আত্মারা প্রবল কষ্ট পায়। এই দেশের সুর্যসন্তানদের জীবনপ্রদীপ নিভিয়ে দিয়ে যখন মঈনুদ্দিন ব্রিটেনে আয়েশী জীবনযাপন করে, মুক্ত বাতাসে শ্বাস নেয়, তখন ন্যায়বিচার শব্দটা হাস্যকর হয়ে যায়, এই দেশের এগিয়ে যাওয়া অর্থহীন হয়ে যায়। অনতিবিলম্বে আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে কার্যকরী পদক্ষেপ নেবার দাবী জানাচ্ছি, যেভাবেই হোক গণহত্যার পক্ষাবলম্বনকারী ব্রিটিশ সরকার এবং ইন্টারপোলের সাথে যুক্তি, তথ্য-প্রমাণ ও গণহত্যা এবং বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডের দলিল উপস্থাপনের মাধ্যমে বন্দী বিনিময় চুক্তি করে মঈনুদ্দিনকে দেশে ফিরিয়ে আনার দাবী জানাচ্ছি। এই পুরো প্রক্রিয়াকে বেগবান করতে পারেন আমাদের প্রবাসী ভাই-বোনেরা। এই ব্রিটেনেই ১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের সাফল্যের ভিতটা রচিত হয়েছিল। করেছিলেন দেশপ্রেমিক বাঙালীরা। এই ব্রিটেনেই মুক্তিযুদ্ধের শেষ লড়াইটা লড়তে পারেন তাদের উত্তরসূরীরা। আইন আছে আপনাদের পক্ষে।সামনে আছে ২০১৩ সালের শাহ্‌বাগে গণজাগরণের উদাহরণ! কালকেই সবাই মিলে এক হয়ে মঈনুদ্দিনের বাড়ির সামনে রাস্তাটা দখল করুন, জোর গলায় প্রতিবাদ জানান, ব্রিটিশ সরকারকে লজ্জা দিন একজন নির্লজ্জ যুদ্ধাপরাধী নরপিশাচের পক্ষ নেবার জন্য, দেখবেন আপনাদের যৌক্তিক দাবীর সাথে গলা মেলাবে অসংখ্য মানুষ, সবাই মিলে যেভাবেই হোক ব্রিটিশ সরকারকে বাধ্য করুন গণহত্যাকারীর সাথে তাদের সখ্যতা পরিত্যাগ করতে, বাধ্য করুন মঈনুদ্দিনকে ফিরিয়ে দিয়ে বিচারের মুখোমুখি করতে! এটা আপনাদের জন্মঋণ, এই জমিনের সন্তান হিসেবে একান্ত কর্তব্য! আপনাদের প্রবল চাপে বেগবান হবে মঈনুদ্দিনকে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া, সৃষ্টি হবে ইতিহাস।সেই ইতিহাসের আপনারা হবেন অন্যতম অংশ!

দেশের জন্য এইটুকু দায়িত্ব আপনারা কি পালন করবেন না?

প্রয়োজনীয় তথ্যসুত্রঃ চৌধুরী মঈনউদ্দিন : ভয়ঙ্কর এক খুনীর কথকতা

নিউইয়র্ক টাইমসে ফক্স বাটারফিল্ডের লেখা ‘আ জার্নালিস্ট ইজ লিংকড টু দ্য মার্ডার অব বেঙ্গলিজ’

The 24 most wanted Brits in the world revealed – including suspected terrorists, murderers, paedophiles and drug dealers

Sun tracks down Bangladeshi ‘executioner’ on Interpol’s most wanted list to £1million home in leafy London suburb

এই পুরো লেখাটার তথ্য ও ভিডিও কম্পাইলেশনের সার্বিক কৃতজ্ঞতায় Omi Rahman Pial

 

Comments
Spread the love