অনুপ্রেরণার গল্পগুচ্ছতারুণ্য

‘মহানুভবতার দেয়াল’ ও আমাদের স্বপ্ন দেখার দুঃসাহস!

যখন ছোট ছিলাম, তখন স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হলেই এক মহিলাকে আমাদের বাসায় আসতে দেখতাম। তারা অবস্থাসম্পন্ন ছিলেন না খুব একটা। ওই মহিলার ছেলে বা মেয়ে পড়তো আমার এক ক্লাস নীচে। সন্তানকে বছরের শুরুতে নতুন বই আর ইউনিফর্ম কিনে দেয়ার টাকা হয়তো হাতে থাকতো না সবসময়। তাই অন্য কারো পুরনো বই দিয়েই পড়ার কাজটা চালিয়ে নিতে হতো তাদের। এমন পরিবার, এমন মানুষগুলো আমাদের আশেপাশে অনেক ছিল, এখনও আছে। সরকার এখন বিনামূল্যে বই দিচ্ছে, তাই পুরনো বইয়ের জন্যে এখন হয়তো আর কাউকে আসতে দেখা যায় না সেভাবে। বইয়ের চাহিদা মিটলেও, দরিদ্র‍্য মানুষের অন্যসব চাহিদা তো পূরণ হচ্ছে না সবসময়।

এত লম্বা ভূমিকা কেন টানলাম, সেটা অনেকেই ভাবছেন হয়তো। ভূমিকা শেষ, এবার মূল গল্পটা বলি তাহলে। কিশোরগঞ্জের সদর উপজেলায় দক্ষিণ মকসুদপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় নামের একটা স্কুল আছে। এই স্কুলে কেউ গেলে, একটা জিনিস দেখে বেশ অবাক হবেন। এখানে একটা দেয়ালে বেশকিছু জামা-কাপড় ঝুলছে, আছে পুরনো গাইড বই থেকে শুরু করে পেন্সিল-রাবার-শার্পনার, এরকম আরও অনেক কিছুই।

মহানুভবতার দেয়াল, কিশোরগঞ্জ, দক্ষিণ মকসুদপুর সরকারী প্রথামিক বিদ্যালয়, নাজনীন মিষ্টি

এগুলোর মধ্যে অনেক জিনিসই হয়তো কারো কারো জন্যে অপ্রয়োজনীয়, আবার অনেকের জন্যে ভীষণ দরকারী। দেয়ালের একপাশে লেখা আছে- ‘তোমার যা প্রয়োজন নেই, তা রেখে যাও।’ আবার অন্যপাশে লেখা আছে, ‘তোমার যা দরকারী তা নিয়ে যাও।’ আর এই দেয়ালের নাম দেয়া হয়েছে ‘মহানুভবতার দেয়াল’!

দক্ষিণ মকসুদপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা নাজনীন মিষ্টির উদ্যোগেই চালু হয়েছে এই ‘মহানুভবতার দেয়াল’। বিদ্যালয়ে অবস্থাসম্পন্ন ছাত্র-ছাত্রীরা যেমন আছে, তেমনই আছে অনেক দরিদ্র‍্য ছাত্র-ছাত্রীও, যাদের পরিবারে নূন আনতে পান্তা ফুরোয় অবস্থা, পড়ালেখাটা হয়তো যাদের কাছে বিলাসিতার মতোই ব্যাপার।

শিক্ষার্থীরা যাতে একে অপরের পাশে ছায়ার মতো করে দাঁড়াতে পারে, সেই ভাবনা থেকেই এই উদ্যোগ নেয়া। একটা পেন্সিল বা রাবারের দাম হয়তো এমন কিছুই নয়, কিন্ত এমন অনেক ছাত্র-ছাত্রী আছে, যারা এই টাকাটা খরচ করতেও দশবার ভাবতে বাধ্য হয়। মূলত তাদেরকে সাহায্য করার ভাবনা থেকেই এই কার্যক্রমের সূচনা।

মহানুভবতার দেয়াল, কিশোরগঞ্জ, দক্ষিণ মকসুদপুর সরকারী প্রথামিক বিদ্যালয়, নাজনীন মিষ্টি

সংবাদমাধমকে নাজনীন মিষ্টি বলছিলেন- “একদম খেয়ালি ভাবনা থেকেই এরকম আইডিয়াটা মাথায় এসেছিল। তারপর সহকর্মীদের সাথে সেটা শেয়ার করলাম, তারাও রাজী হলেন। পরে নিজেদের টাকায় কালি আর তুলি কিনে এনে নিজেরাই দেয়ালে কথাগুলো লিখলাম। আর এটার নাম দেয়া হলো মহানুভবতার দেয়াল। স্কুলের ছাত্র-ছাত্রী আর অভিভাবকদের জানানোর পরে তারাও সাধ্যমতো সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। বাচ্চারা সবাই সচেতনতামূলক একটা মনোভাব নিয়ে বেড়ে উঠুক, এটাই আমাদের চাওয়া। আর এরকম মহতী কাজে সবাই এগিয়ে এলেই আমাফের উদ্যোগটা সফল হবে।”

বিদ্যালয়ের নোটিশ বোর্ডের পাশেই হ্যাঙ্গার ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে জামা-কাপড়ের জন্যে। ছাত্রছাত্রীরা এখানে তাদের ব্যবহৃত বা অপ্রয়োজনীয় জামা ও অন্যান্য জিনিস রেখে যাচ্ছে, আবার যাদের এগুলো প্রয়োজন, তারা নিজেদের জিনিস মনে করেই এগুলো নিয়ে যাচ্ছে। এমনকি শিক্ষকেরাও নিজেদের বাসা থেকে অপ্রয়োজনীয় জামা-কাপড় কিংবা অন্যান্য জিনিস নিয়ে এসেছেন দেয়ার জন্যে।

মাত্র গতকালই শুরু হওয়া এই কার্যক্রমের কথা এরই মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে অনলাইনে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এই ঘটনার প্রশংসা করছেন সবাই। টানা কয়েকটা দিন নিরাপদ সড়কের দাবীতে ছাত্র আন্দোলন, ছাত্রদের ওপর হামলা আর অজস্র গুজবের ছড়াছড়িতে কেমন যেন গুমোট হয়ে ছিল চারপাশ, সেখানে নাজনীন মিষ্টির এই উদ্যোগটা স্বস্তির সুবাতাস বয়ে নিয়ে এলো যেন!

মহানুভবতার দেয়াল, কিশোরগঞ্জ, দক্ষিণ মকসুদপুর সরকারী প্রথামিক বিদ্যালয়, নাজনীন মিষ্টি

মহানুভবতার দেয়ালের আই আইডিয়াটা প্রথম দেখা গিয়েছিল ইরানের মাশাদ নামের একটা শহরে। সেখানে শীতার্তদের মাঝে শীতবস্ত্র পৌঁছে দিতে অজ্ঞাত কোন এক ব্যক্তি এমন অভিনব উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সেবারই প্রথম এরকম কিছু দেখেছিল সারাবিশ্বের মানুষ। সেই উদ্যোগের নাম দেয়া হয়েছিল মহানুভবতার দেয়াল। ইরান ও আন্তর্জাতিক অনেক সংবাদমাধ্যমই তখন খবরটা ফলাও করে ছেপেছিল।

২০১৫ সালে বাংলাদেশেও দেখা গিয়েছে মহানুভবতার দেয়াল। তবে সেগুলোও শীতবস্ত্র সংগ্রিহের উদ্দেশ্যেই তৈরি করা হয়েছিল। মাগুরা জেলার শালিখা উপজেলায়, কিংবা লক্ষীপুর জেলার চির আবাবিলে এমন উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল শীতকালকে সামনে রেখে। তবে কিশোরগঞ্জের দক্ষিণ মকসুদপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই মহানুভবতার দেয়াল অনন্য এক দৃষ্টান্ত হয়েই থাকবে আমাদের সবার কাছে।

‘মানুষ মানুষের জন্যে’ কিংবা সকলের তরে সকলে আমরা’ লাইনগুলোর সত্যতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়ার জন্যে প্রধান শিক্ষিকা নাজনীন মিষ্টি কিংবা এই উদ্যোগের সাথে জড়িত সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ। এই মহৎপ্রাণ মানুষগুলোর জন্যেই বারবার আমরা স্বপ্ন দেখার সাহস পাই।

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close