হ্যারি কেইনের হাত ধরে ফুটবল যদি সত্যিই ঘরে ফেরে, ইংল্যান্ডের ২৪ বছর বয়সী অধিনায়ক নিজের ঘরে পা রাখার আগেই হয়ত তাকে নাইটহুড দিয়ে দেয়া হবে, নামের আগে বসে যাবে ‘স্যার’ উপাধি। 

১৫ জুলাই মস্কোয় কিলিয়ান এমবাপের পা থেকে যদি ফ্রান্সের জয়সূচক গোলটি আসে, ফরাসিরাও তাকে মাথায় তুলে রাখবে। তাদের মনে আর বিন্দুমাত্র সংশয় থাকবে না যে এমবাপেই এ যুগের ফেনোমেনো, ব্রাজিলের রোনালদো দা লিমার যোগ্য উত্তরসূরী।

কিংবা যদি এডেন হ্যাজার্ডের হাতে ওঠে এবারের বিশ্বকাপ শিরোপা, তাকেও নিশ্চিতভাবেই আর কোনদিনই নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করে সবচেয়ে কড়া বেলজিয়ান বিয়ারের বোতল কিনতে হবে না।

কিন্তু ঠিক এমন কিছু কি অপেক্ষা করে থাকবে লুকা মড্রিচের জন্য, যদি পুরো বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়ে এবারের বিশ্বকাপ ঘরে তোলে ক্রোয়েশিয়া?

সম্ভাবনা খুবই কম। কারণ রিয়াল মাদ্রিদের মধ্যমাঠের সেনানী মড্রিচ বিশ্বব্যাপী যত সমাদৃতই হন না কেন, নিজ দেশেই তার জনপ্রিয়তা আশ্চর্য রকমের কম। এমনকি অনেকে তো তাকে রীতিমত অপছন্দও করে! তার কারণ ক্রোয়েশিয়ান ফুটবলের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের একজন, ডায়নামো জাগরেবের সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা ও ক্রোয়েশিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের সহ-সভাপতি দ্রাকভো মামিচের সাথে তার ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব ও আইনি জটিলতা।

সে কাহিনী অবশ্য এখানে একদমই অপ্রাসঙ্গিক। যে বিষয়টি প্রাসঙ্গিক, তা হলো রাশিয়া বিশ্বকাপে মড্রিচের অতিমানবীয় ফর্ম, যার স্পষ্ট প্রতিফলনের দেখা মিলছে ক্রোয়েশিয়ার দলীয় সাফল্যেও। মাত্র কিছুদিন আগেই রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে চতুর্থ চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতে আসা মড্রিচ এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারকাদের একজন। দলকে ডি গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন হিসেবে রাউন্ড অফ সিক্সটিনে তোলার পেছনে তার অবদান অন্য যে কারও থেকে অনেক অনেক বেশি। নাইজেরিয়ার বিপক্ষে নিজে একটি গোল করেছিলেন তিনি, আর অপর গোলটিরও ছিলেন প্রধান উৎস। এরপর আর্জেন্টিনাকে ৩-০ গোলে হারানোর ম্যাচে তার পা থেকে এসেছিল যে গোলটি, তা দীর্ঘদিন মনে রাখবে গোটা ফুটবল বিশ্ব।

লুকা মড্রিচ, ইভান রাকিটিচ, লিওনেল মেসি, আর্জেন্টিনা, ক্রোয়েশিয়া

এবং তিনি তার দুর্দান্ত ফর্ম অব্যহত রেখেছেন নক আউট পর্বে এসেও, সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন দলকে। এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে তার একমাত্র খামতি বলতে অতিরিক্ত সময়ে ডেনমার্কের বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে গোল করতে ব্যর্থ হওয়া। কিন্তু সেই ব্যর্থতাও পুষিয়ে দিতে খুব বেশি সময় নেননি তিনি। অন্য কেউ হলে হয়ত একটি পেনাল্টি মিসের পর আর দ্বিতীয়বার পেনাল্টি নেয়ার সাহস করত না। অথচ তিনি ঠিকই টাইব্রেকারে দলের হয়ে একটি পেনাল্টি নেন, আর সফলভাবে লক্ষ্যভেদও করেন।

সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে হাতে গোনা যে কয়জন খেলোয়াড় ৫০ কিলোমিটারের বেশি দৌড়েছেন, মড্রিচ তাদের একজন। ৩২ বছর বয়সে এসেও এতটাই ফিট তিনি! এছাড়া মাঝমাঠ থেকে তারচেয়ে বেশিবার বলের দখল জিততে পারেননি আর কোন খেলোয়াড়ই।

তাই মড্রিচের সতীর্থ মারিও মানজুকিচের দৃঢ় বিশ্বাস, এবার গোল্ডেন বল জিততে চলেছেন ক্রোয়েশিয়ার অধিনায়কই। “আমি লুকাকে বেশ অনেক বছর ধরে চিনি, একজন জাতীয় দলের সতীর্থ হিসেবেই শুধু নয়। সে গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে যেসব প্রশংসা পাচ্ছে, সবগুলোরই সে যোগ্য দাবিদার। আজকের অবস্থানে এসে পৌঁছাতে সে প্রচুর খেটেছে। সে আমাদের অধিনায়ক এবং নেতা। আমাদের দল যদি খুব ভালো কোন ফল করে আর সে গোল্ডেন বল পায়, যোগ্য ব্যক্তি হিসেবেই সেটি পাবে সে।”

তবে বিশ্বকাপের মত আসরে দলীয় সাফল্যের চেয়ে বড় কিছু নেই। বিশ্বাস না হলে জিজ্ঞাসা করে দেখুন লিওনেল মেসিকে। ২০১৪ বিশ্বকাপে নিজের জেতা গোল্ডেন বলের বদলে হলেও তিনি নিজের অর্জনের ঝুলিতে একটি বিশ্বকাপ ট্রফি কামনা করবেন। তাই শেষ পর্যন্ত মড্রিচ গোল্ডেন বল জয়ী হন বা না হন, ১৯৯৮ বিশ্বকাপে নিজেদের ইতিহাসের সেরা ফল করা ক্রোয়েশিয়া যদি ইংল্যান্ডকে হারিয়ে প্রথমবারের মত বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠতে চায়, সেখানে তাকেই নিতে হবে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

ইংল্যান্ডকে কীভাবে রুখে দিতে হয়, মড্রিচ তা খুব ভালো করেই জানেন। ২০০৭ সালে ওয়েম্বলিতে এই ক্রোয়েশিয়ার কাছে ৩-২ গোলে হেরেই ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছিল ইংল্যান্ডের ইউরো ২০০৮-এ খেলার স্বপ্ন। আর সেজন্য তারা দায়ী করতে পারে এই মড্রিচকেই। ২১ বছর বয়সী তরুণ মড্রিচের সাথে সেদিন পেরে ওঠেননি স্টিভেন জেরার্ড, ফ্রাঙ্ক ল্যাম্পার্ডরা। সেই থেকে যে শুরু হয়েছে মড্রিচের জয়যাত্রা, তা থামেনি এখনও।

কিন্তু আসন্ন সেমিফাইনাল ম্যাচে ইংল্যান্ড কোচ গ্যারেথ সাউথগেট কি বের করতে পারবেন মড্রিচকে থামানোর কোন উপায়?

রাশিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের প্রথমার্ধে কিছুটা নিষ্প্রভ মনে হয়েছিল মড্রিচ ও ইভান রাকিটিচকে। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে বদলী খেলোয়াড় হিসেবে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার মার্সেলো ব্রোজোভিচকে মাঠে নামানোর পরই পরিবর্তন ঘটে দৃশ্যপটে। মড্রিচ ও রাকিটিভ দু’জনেরই প্রত্যাবর্তন ঘটে তাদের স্বরূপে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে নিশ্চিতভাবেই তাকে শুরু থেকেই খেলাবেন ক্রোয়েশিয়া কোচ জলাকতো দালিচ। তাই সাউথগেটের জন্য কাজটি খুবই কঠিন হয়ে যাবে।

সাউথগেট অবশ্য কিছুটা স্বস্তি পেতে পারেন এখন পর্যন্ত তার নিজের দলের মাঝমাঠের অবস্থা থেকে। জেসে লিংগার্ড ও ডেলে আলীর পেছনে জর্ডান হেন্ডারসন যথেষ্ট কার্যকরী ভূমিকা রেখে চলেছেন। কিন্তু তারপরও মড্রিচের মানের কোন মিডফিল্ডারের সম্মুখীন হতে হয়নি তাদেরকে এখনও। গ্রুপ পর্বের ম্যাচে তারা যখন বেলজিয়ামের মুখোমুখি হয়েছিল, কেভিন ডি ব্রুয়েনকে সে ম্যাচে বিশ্রামে রাখা হয়েছিল। কলম্বিয়ার বিপক্ষে ম্যাচেও ইনজুরির কারণে মাঠের বাইরে ছিলেন হামেস রদ্রিগেজ।

তাই সাউথগেটের এখন বিভ্রান্তিতে ভোগা খুবই স্বাভাবিক যে তিনি কি এতদিন যেভাবে মাঝমাঠ সাজিয়ে এসেছেন, ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ম্যাচেও সেটি অপরিবর্তিত রাখবেন? নাকি দলের রক্ষণকে আরেকটু শক্তিশালী করার চেষ্টা করবেন?

এরিক ডায়ারের এ ম্যাচে খেলা অনেকটাই নিশ্চিত। টটেনহ্যামের খেলা এই ফুটবলার হয়ত কলম্বিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে বদলী খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নেমে খেলার দুরন্ত গতির সাথে মানিয়ে নিতে অনেক বেশি সময় নিয়ে ফেলেছিলেন, কিন্তু তারপরও সাউথগেট বরাবরই ভরসা রাখেন তার ওপর। আর তাই ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের পরিকল্পনায়ও তিনি ‘একটি বড় অংশ’।

ডায়ারকে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে শুরু থেকে খেলানো হলে থ্রি লায়ন্সদের রক্ষণভাগ নিঃসন্দেহে আরও বেশি মজবুত হবে, কিন্তু সেক্ষেত্রে তাদেরকে আক্রমণভাগে কিছুটা ছাড় দিতে হবে অবশ্যই। আলী ও লিংগার্ড দুইজনই এখন পর্যন্ত দারুণ খেলেছেন। সুইডেনের বিপক্ষে ম্যাচের দ্বিতীয় গোলটি এসেছিল আলীর পা থেকে। অন্যদিকে লিংগার্ড বরাবরেরই প্রতিপক্ষের সীমানায় দারুণ এক ত্রাসের নাম। অথচ ডায়ারকে যদি শুরুর একাদশে জায়গা দিতেই হয়, আলী কিংবা লিংগার্ডের মধ্যে যেকোনো একজনকে বাদ দেয়া ছাড়া উপায় নেই সাউথগেটের সামনে।

সব মিলিয়ে টুর্নামেন্টে সম্ভবত প্রথমবারের মত নিজের মনের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হচ্ছে সাউথগেটকে। একদিকে যেমন তিনি চান না দলের উইনিং কম্বিনেশন ভাঙতে, তেমনই অন্যদিকে তাকে এটিও মনে রাখতে হচ্ছে যে প্রতিপক্ষ শিবিরে রয়েছেন মড্রিচ নামের এমন একজন, যার জন্য বিশেষ পরিকল্পনা না এঁটে উপায় নেই। কারণ মড্রিচকে যদি তিনি হেলাফেলা করেন, ওয়েম্বলিতে ঘটা ১১ বছর আগের দুঃসহ স্মৃতি আবারও নতুন রূপে তাড়া করতে পারে তার দলকে!

তাই প্রশ্ন থেকেই যায়, কে থামাবেন মড্রিচকে? তাকে থামানো কি আদৌ সম্ভব?

Comments
Spread the love