কখনো কখনো আপাতদৃষ্টিতে অতি সূক্ষ্ম ও সামান্য মনে হওয়া অনেক ভুলও ইতিহাসের পাতায় বিশাল বড় পরিবর্তনের আঁচড় কেটে দিতে পারে। ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দুর্ঘটনাবশত হওয়া আবিষ্কার থেকে শুরু করে যুদ্ধের অতি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত, এমনই দশটি ভুলের কথা নিয়ে সাজানো হয়েছে এই প্রতিবেদন, যেগুলো সামগ্রিকভাবে আমূল পরিবর্তন এনেছিল বিশ্ব ইতিহাসে।

১। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তিতে এডউইন রোমেলের স্ত্রীর জন্মদিনের ভূমিকা

কে বলতে পারে কীভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হতো, যদি না এখানে একটি বিশাল ভূমিকা রাখত এডউইন রোমেলের স্ত্রীর জন্মদিন। হ্যাঁ পাঠক, ঠিকই ধরেছেন। আমরা কথা বলছি বিখ্যাত ডি-ডের কথা, যেটি ঘটেছিল ১৯৪৪ সালের ৬ জুন। সবকিছুর শুরু হয়েছিল যখন এডলফ হিটলার তার অপরম বিশ্বাসভাজন জেনারেল এডউইন রোমেলের কাঁধে চাপিয়ে দেন ফ্রান্সের উত্তর দিককার সমুদ্র তীরবর্তী উপকূলে অবস্থিত নরম্যান্ডি বীচ প্রতিরক্ষার। কিন্তু রোমেল, যাকে ডাকা হতো ডেজার্ট ফক্স হিসেবে, অবস্থার স্বরূপ বিচার করতে গিয়ে একেবারেই তালগোল পাকিয়ে ফেলেন। তিনি ভেবেছিলেন প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে মিত্রবাহিনী অন্তত একদিন তো বিলম্ব করবেই বীচে আক্রমন করতে। তাই তিনি একদিনের ছুটি নেন স্ত্রীর জন্মদিন পালন করতে। কিন্তু সেদিনই, অর্থাৎ ৬ জুন, জার্মান বাহিনীকে চমকে দিয়ে অতর্কিতে আক্রমন করে বসে মিত্রশক্তি, এবং নরম্যান্ডি তীরের পাঁচটি বীচই তারা দখল করে নেয়। এদিন অন্তত ৯,০০০ জার্মান সৈন্য মারা যায়। কিন্তু জার্মান সৈন্যদের মধ্যে যারা বেঁচে যায়, তাদের মধ্যে দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে যুদ্ধের ফলাফল ভিন্ন কিছুও হতে পারত যদি সেদিন জেনারেল রোমেল সেদিন সেখানে থাকতেন, এবং জার্মান বাহিনীকে সামনে থেকে নেতৃত্ব ও দিক নির্দেশনা দিতেন। আরও একটি মজার ব্যাপার হলো, খবর পেয়ে রোমেল যখন শেষ মুহূর্তে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন, তখন তার কিছু প্যাঞ্জার ট্যাংকের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এগুলো পেতে আগে স্বয়ং হিটলারের কাছ থেকে অনুমোদন নিতে হতো। ঠিক ওই মুহূর্তে হিটলার ঘুম থাকায় সে অনুমোদন আর নেয়া হয়নি। কারণ কারওই সাহস ছিল না হিটলারকে ঘুম থেকে জাগানোর। আর এই সব ঘটনার সামগ্রিক ফলস্বরূপ মিত্রশক্তির কাছে হার মানতে হয় জার্মানদের, এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তিঘন্টাও বেজে ওঠে।

২। হিরোশিমায় বোমা বিস্ফোরণের পেছনে অনুবাদের ভ্রান্তির বিশেষ ভূমিকা

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রসঙ্গ আসতে বেশ স্বাভাবিকভাবেই চলে আসে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা হিসেবে খ্যাত হিরোশিমা-নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের বিষয়টি। কেমন হয় যদি এখন আপনাদেরকে বলি, গোটা ঘটনাই এড়ানো যেত, স্রেফ যদি মিত্রবাহিনীর কাছে একজন অপেক্ষাকৃত ভালো অনুবাদক থাকত? চলুন বিষয়টি বিশদে জেনে আসি।

পোটসড্যাম ডিক্লেরেশনের পর মিত্রবাহিনীর চাওয়া ছিল যেন জাপানীরা অবিলম্বে আত্মসমর্পণ করে। তাই ওই সময়ে জাপানের সম্রাট কেনটারো সুজুকি মিত্রবাহিনীকে জবাব দিয়ে একটি চিঠি লেখেন, যেখানে ‘মোকুসাতসু’ শব্দটি ছিল। এই শব্দটির বিভিন্ন অর্থ হতে পারে। সুজুকি বোঝাতে চেয়েছিলেন যে তিনি বিষয়টি বিবেচনা করে দেখতেন। কিন্তু মিত্রবাহিনীর অনুবাদক কথাটির একেবারেই ভুল ব্যাখ্যা করে, এবং জানায় যে সুজুকি আত্মসমর্পণের প্রস্তাবকে আমলেই নিচ্ছেন না। এবং এর ফলাফল যে কী ভীষণ ভয়াবহ ছিল তা আর আজ আমাদের কারও অজানা নয়। এই ঘটনার দশদিন পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক জাপানের হিরোশিমায় বিশ্ব ইতিহাসের সর্ব প্রথম পারমাণবিক বোমাটি ফেলা হয়।

৩। টাইটানিক ট্র্যাজেডি ও একটি খোয়া যাওয়া চাবি

আরএমএস টাইটানিকের ডুবে যাওয়া নিঃসন্দেহে ইতিহাসের অন্যতম দুঃখজনক একটি ঘটনা। কিন্তু এই দুর্ঘটনাটি এড়ানো যেত, স্রেফ যদি সামান্য একটি ভুল না হয়ে বসত। এবং সেই ভুলটির সূচনা হয় যখন কোম্পানি সিদ্ধান্ত নেয় একজন শিপ অফিসারকে বদলী করার। তার বদলে নতুন আরেকজন অফিসারকে নিয়োগ দেয়া হয়। এবং এখানেই হয়ে বসে একটি বিশাল ভুল। বদলিকৃত অফিসারের পকেটে ছিল একটি চাবির গোছা, যা দিয়ে বাইনোকুলার রাখা আছে যে বাক্সে সেটির ঢাকনা খোলা যেত। কিন্তু তিনি তার পকেট থেকে চাবির গোছাটি বের করে নতুন অফিসারকে দিতে ভুলে যান। আর তাই ফ্রেড ফ্লিট, যার ওপর দায়িত্ব ছিল আইসবার্গের দিকে নজর রাখার, কিছুতেই বাইনোকুলারগুলোর নাগাল পাচ্ছিলেন না। ফলে বাইনোকুলার ছাড়া তাকে খালি চোখেই নজরদারি করতে হয়, এবং সেকারণেই জাহাজটি আইসবার্গের একদম কাছাকাছি চলে আসার আগে সেটি তার দৃষ্টিগোচরই হয়নি। অথচ সামান্য একটি চাবি যদি যথাসময়ে হাত বদল হতো, তাহলেই এই বিভীষিকাময় ট্র্যাজেডিটা এড়ানো সম্ভব হতো।

৪। একটি ‘রঙ টার্ন’ থেকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূচনা

যদিও ওইসময়ে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশগুলো ইতিমধ্যেই দ্বন্দ্বে লিপ্ত ছিল, কিন্তু ১৯১৮ সালে আর্কডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্ডিনান্ডের হত্যাকান্ডের মাধ্যমেই আনুষ্ঠানিকভাবে বেজে ওঠে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামামা। কিন্তু এত সবকিছু হয়ত হতোই না, যদি না শোফার তার মত পরিবর্তন করত। চলুন জেনে আসি ঠিক কী হয়েছিল।

শোফারের বিচক্ষণতার কারণেই প্রথম বোমার আক্রমণ থেকে প্রাণে বেঁচেছিলেন ফ্রাঞ্জ ফার্ডিনান্ড। যদিও অনেক সাধারণ মানুষেরই প্রাণহানি ঘটে। তাই আর্কডিউক সিদ্ধান্ত নেন হাসপাতালে গিয়ে বেঁচে যাওয়া মানুষদেরকে দেখে আসবেন। কিন্তু তাঁর শোফার গাড়িটিকে ভুল দিকে নিয়ে যায়, এবং ঠিক সামনে পড়ে যায় গ্যাভ্রিলো প্রিনসিপের, যে কিনা একটি কফি শপে ওঁত পেতে ছিল সঠিক সময় ও সুযোগের অপেক্ষায়। এবং আর্কডিউককে হাতের নাগালে পেয়ে সে সুযোগ হাতছাড়া করেনি সে। পরপর দুইটি গুলি ছোঁড়ে সে। একটিতে প্রাণ হারান ফ্রাঞ্জ ফার্ডিনান্ড, অন্যটিতে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়েন পাশেই বসে থাকা প্রিয়তমা স্ত্রী। এবং ঠিক ওই মুহূর্ত থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়ে যায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ।

৫। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে রাশিয়ার আলাস্কা বিক্রয়

‘অকাজের তুন্দ্রা’! হ্যাঁ, রুশরা ঠিক এই নামেই অভিহিত করত আলাস্কাকে। আর তাই তারা একেবারেই পানির দরে, মাত্র ৭.২ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিময়ে ১৮৬৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এটি বিক্রি করে দেয়। এবং তার কয়েক বছর পর থেকেই শুরু হয় তাদের আফসোস। কেননা ১৯৮০-র দশক থেকেই আলাস্কায় স্বর্ণ উত্তোলন শুরু হয়, এবং খুব শীঘ্রই আলাস্কা পরিণত হয় বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ স্বর্ণখনিতে, যার অবস্থান ঠিক নেভাদার পরই। এবং যেহেতু এই ২০১৭ সালে এসেও ফুরোয়নি আলাস্কার স্বর্ণভাণ্ডার, তাই এ কথা আন্দাজ করতে খুব একটা কষ্ট হয় না যে রুশরা আজও সঙ্গোপনে হাত কামড়ায় তাদের সেই হঠকারি সিদ্ধান্তের!

৬। পেনিসিলিন আবিষ্কার

এটিই আমাদের তালিকার একমাত্র ভুল যা থেকে মঙ্গলজনক কিছু ঘটেছে। আলেকজান্ডার ফ্লেমিং কর্তৃক পেনিসিলিন আবিষ্কার আজও বিবেচিত হয় বিশ্বসভ্যতার ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ব উদ্ভাবনসমূহের একটি হিসেবে। কিন্তু আপনি কি জানতেন, এর পুরোটাই সম্ভব হয়েছে স্রেফ তাঁর নোংরা পরিবেশে কাজ করার ফলে। তাঁর কাজের জায়গাটি অত্যাধিক পরিমাণের নোংরা ছিল বলেই একদিন তিনি সেখানে এক ধরণের ফাঙ্গাস দেখতে পান, যেটির সংস্পর্শে এলে ব্যাকটেরিয়া মারা যায়। এভাবে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার প্রতি ফ্লেমিংয়ের উদাসীনতার কারণেই অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার সম্ভব হয়েছে, এবং এখন পর্যন্ত লক্ষ লক্ষ প্রাণ বেঁচেছে।

৭। ক্যালিফোর্নিয়ায় এক পথহারা শিকারী শুরু করেছিলেন দাবানল

ক্যালিফোর্নিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দাবানলগুলোর একটি ঘটেছিল এক শিকারীর ভুলের কারণে। স্যান ডিয়েগোর কাছে এক জঙ্গলে সে পথ হারায়। রাত নেমে আসায় গত্যন্তর না দেখে সে একটি ছোট্ট সিদ্ধান্ত নেয়। সেটি হলো, আগুন জ্বালিয়ে আশেপাশের মানুষদের দৃষ্টি আকর্ষণের। আর সেটি করতে গিয়েই তিনি সূচনা ঘটান এমন ভয়াবহ এক দাবানলের, যার ফলে ৩০০,০০০ একর বনভূমিই যে শুধু ধ্বংস হয় তাই নয়, পাশাপাশি পুড়ে ছাই হয় ২,৩২২টি বাড়ি, আর প্রাণ হারায় ১৪ জন মানুষ।

৮। এক বেকারের কারণে লন্ডনের ‘গ্রেট ফায়ার’

আগুনের কথাই যখন উঠল, তাহলে ভুলে গেলে চলবে না লন্ডনের ‘গ্রেট ফায়ার’- এর কথা, যার ফলে তখনকার দিনে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী শহরটির একাংশ হয়ে যায় ভস্মীভূত। আর এর শুরুটি হয়েছিল এক বেকারির মাধ্যমে। কাজ করতে করতে হঠাতই মনোযোগ হারায় সে। আর তার ফলে যে শুধু তার বেকারীটিই পুড়ে ছাই হয় তা না, সাথে জ্বালিয়ে দেয় আরও ১৩,০০০ ঘরবাড়ি।

৯। এক ব্যুরোক্রেটের ভুলের কারণে পতন ঘটে বার্লিন ওয়ালের

এটিকে মোটামুটি একটি হাস্যকর ভুল বলা চলে, যেটি ঘটেছিল পূর্ব জার্মানিতে একটি রাজনৈতিক প্রেস কনফারেন্স চলাকালীন। ওই ব্যুরোক্রেটের কাঁধে দায়িত্ব ছিল স্রেফ সংবাদমাধ্যমকে পূর্ব থেকে পশ্চিম জার্মানি ভ্রমণের ক্ষেত্রে শিথিল হওয়া নতুন নীতিমালা সম্পর্কে সংবাদমাধ্যমকে জানানোর। কিন্তু ভদ্রলোক এতই ব্যস্ত ছিলেন যে তার সময়ই হয়নি অফিসিয়াল পেপারে কী লেখা আছে তা ভালো করে পড়ার। তাই সংবাদমাধ্যমের সামনে তিনি নিজের মনগড়া কথা উত্থাপন করেন যে ভ্রমণের বিধিনিষেধ একেবারেই তুলে ফেলা হয়েছে। আর তার এই ভুলের ফলাফলই হলো বার্লিন ওয়ালের পতন।

১০। বিড়াল মারার ফলে ‘গ্রেট লন্ডন প্লেগ’-এর সংক্রমণ

এই ঘটনাটি ঘটেছিল ‘গ্রেট লন্ডন ফায়ার’-এর ঠিক এক বছর আগে। শহরে ধীরে ধীরে প্লেগ রোগ ছড়িয়ে পড়তে থাকে, আর শহরবাসী মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে যায় যে এটি ছড়াচ্ছে বিড়ালের শরীরের মাধ্যমে। তাই তারা সিদ্ধান্ত নেয় শহর থেকে একেবারেই বিড়াল নিধনের। এবং বাস্তবেও সেটি করা হয়। এক সময় শহরে আর কোন বিড়াল অবশিষ্ট থাকে না। এতে প্লেগ রোগের সংক্রমণ দূর হওয়ার বদলে আরও হীতে বিপরীত হয়। বিড়াল না থাকায় ইঁদুর মারার সবচেয়ে কার্যকরী হাতিয়ারটিই হয়ে পড়ে অনুপস্থিত, আর এর মাধ্যমে বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম বড় ভুলটি রচিত হয়। পরবর্তী সময়ে প্লেগ রোগ মহামারীতে রূপ নেয়, এবং ১৮ মাসে কেড়ে নেয় লক্ষাধিক লন্ডনবাসীর জীবন।

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-