মনের অন্দরমহলরিডিং রুম

ওদেরও ‘সুন্দরী’, আমাদেরও ‘সুন্দরী’…

মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ নামের একটা সুন্দরী প্রতিযোগিতার গ্র‍্যান্ড ফিনালের কয়েকটা ভিডিও ক্লিপ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুমুল আলোচনা আর সমালোচনা হচ্ছে। সেরা দশ প্রতিযোগীর একজনকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, H2O কী? তিনি খানিকক্ষণ ভেবে জবাব দিয়েছেন, এই নামে ধানমন্ডিতে একটা রেস্টুরন্ট আছে! আরেক প্রতিযোগীকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তাকে একটা ‘উইশ'(Wish) পূরণ করার সুযোগ দিলে তিনি কোন উইশটা পূরণ করতে চাইবেন। সেই প্রতিযোগী উইশ শব্দের মানে না বুঝেই আবোলতাবোল বকে গিয়েছেন!

এই প্রতিযোগিতায় যিনি চ্যাম্পিয়ন হন, তিনি মিস ওয়ার্ল্ডের বৈশ্বিক মঞ্চে বাংলাদেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেন। গতবার করেছিলেন মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশের খেতাব জয়ী জেসিয়া ইসলাম। এই প্রতিযোগিতায় দৈহিক সৌন্দর্য্যটাই মূখ্য এবং একমাত্র বিষয়। আর কোন কিছু না থাকলেও চলে। প্রতিযোগীদের অবস্থা দেখলে তেমনটাই মনে হয়। একটা প্রতিযোগিতার পানির সংকেতকে রেস্টুরেন্টের নাম বানিয়ে দেয়া হয়, আরেক প্রতিযোগী ইংরেজী ‘Wish’ শব্দের মানে বোঝেন না!

শুধু কি প্রতিযোগী? এখানকার বিচারকেরাও তো অদ্ভুত মেধার অধিকারী। বিশিষ্ট উল্কাবিদ খালেদ হোসাইন সুজন এই প্রতিযোগিতার বিচারক হিসেবে ছিলেন এবার, যিনি ইতিপূর্বে ‘শবে কদরের রাতে উল্কাপতন হয় না’ থিওরির জন্ম দিয়েছিলেন, এমনই এক বিউটি কন্টেস্টের মঞ্চে! আর আয়োজকদের কথা বলে তো লাভ নেই। তাদের কথা হচ্ছে, টাকা দিয়ে তারা প্রতিযোগীতার আয়োজন করেছেন, যা হবে সব তাদের ইচ্ছেমতো! এমন প্রতিযোগিতার প্রতিযোগীরা অদ্ভুত প্রতিভাসম্পন্ন হবেন না, তা কি করে হয়! 

একজন তরুণী মিস ওয়ার্ল্ডের মতো একটা প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করবেন, তিনি ফাইনাল রাউন্ড পর্যন্ত এসেছেন মানে সেই প্রতিযোগীর ভেতরে খানিকটা গুণ অবশ্যই আছে। এগুলোই কি সেই গুণের প্রমাণ? উইশ শব্দের অর্থ বুঝতে না পারা, পানির সংকেতকে রেস্টুরেন্টের নামের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা, এরা যাবে বাংলাদেশের হয়ে বিশ্বমঞ্চে প্রতিনিধিত্ব করতে? কি দেখে এদের ফাইনালে তোলা হয়েছিল? গায়ের চামড়া সাদা হলেই কি একটা মানুষ সুন্দর হয়ে যায়? ৩৬-২৪-৩৬ সাইজের বডি শেপ থাকলেই তাকে সুন্দরী প্রতিযোগীতার ফাইনালে জায়গা দেয়া যায়? তার মাথায় মগজের জায়গায় গোবর ঠেসে রাখা আছে কিনা, সেসব কি কেউ পরীক্ষা করে দেখেনি আগে? সুন্দরী প্রতিযোগীতায় চ্যাম্পিয়ন হতে হলে কি শুধু শারীরিক সৌন্দর্য্যটাই মূখ্য? শিক্ষাগত যোগ্যতার কোন বালাই নেই এখানে?

১৯৯৪ সালে প্রথম ভারতীয় নারী হিসেবে মিস ইউনিভার্সের খেতাব জয় করেছিলেন সুস্মিতা সেন। মাত্র উনিশ বছর বয়সেই তিনি জিতেছিলেন এই সম্মান। তার পরে ঐশ্বরিয়া রাই এবং প্রিয়াঙ্কা চোপড়া জিতেছেন মিস ওয়ার্ল্ডের খেতাব, গতবছর এই খেতাবটা আবারও ভারতে ফিরিয়ে এনেছেন মানসী চিল্লার। ইংল্যান্ড আমেরিকা না যাই, পাশের দেশ ভারত থেকেই একটু ঘুরে আসি চলুন। জেনে আসি, এই দেশটা থেকে যারা মিস ওয়ার্ল্ড বা এমন বৈশ্বিক সৌন্দর্য্যের খেতাব জিতেছিলেন, তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা কেমন ছিল।

মিস ওয়ার্ল্ডের খেতাব জেতার আগে ঐশ্বরিয়া রাই ছিলেন ইঞ্জিনিয়ারিঙের ছাত্রী। যদিও শুরুতে ডাক্তারী পড়তে চেয়েছিলেন তিনি, প্রাণীবিজ্ঞান ছিল তার সবচেয়ে পছন্দের বিষয়। কিন্ত মেডিকেলে সুযোগ পাননি তিনি। তাই স্থাপত্যবিদ্যায় ভর্তি হয়েছিলেন ঐশ্বরিয়া। মহারাষ্ট্র প্রদেশের সবগুলো কলেজ মিলিয়ে স্থাপত্যবিদ্যা বিভাগের টপারদের একজন ছিলেন ঐশ্বরিয়া রাই। বিশ্বসুন্দরী তিনি শুধু গায়ের রঙ বা ফিগার দিয়ে হননি, মাথার জোরটাও তাকে সাহায্য করেছে সেখানে। 

প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার বাবা ছিলেন আর্মি অফিসার, খুব কড়া শাসনে রাখতেন মেয়েকে। পড়ালেখার ভীষণ কড়াকড়ি ছিল বাসায়। সিনেমা দেখো, নাচ শেখো, বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে যাও, কোন সমস্যা নেই। কিন্ত পড়াটা ঠিকঠাক রাখতে হবে, নইলে রক্ষা নেই! হাইস্কুল পাশ করার পরেই মিস ইন্ডিয়া আর মিস ওয়ার্ল্ডের খেতাব জিতেছিলেন প্রিয়াঙ্কা, এসবের ব্যস্ততায় দুটো বছর পড়ার টেবিলে বসতেই পারেননি তিনি। তবে মিস ওয়ার্ল্ড খেতাব জয়ের পরে গ্র‍্যাজুয়েশন শেষ করেছেন, করেছেন মাস্টার্সও।

আর বর্তমান মিস ওয়ার্ল্ড মানসী চিল্লার তো নিজেই মেডিকেলে পড়ছেন, হবু ডাক্তার তিনি। মানসী জানিয়েছেন, ডাক্তারী ছাড়ার কোন ইচ্ছেই নেই তার। মিডিয়াতে হয়তো কাজ করবেন, কিন্ত ডাক্তার হওয়াটা তার জীবনের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য ছিল, এখনও আছে। কোন কিছুর বিনিময়েই নিজের স্বপ্নকে বিসর্জন দিতে চান না তিনি।

মিস ওয়ার্ল্ডের গ্র‍্যান্ড ফিনালে মানসী চিল্লারকে প্রশ্ন করা হয়েছিল- “আপনার মতে কোন পেশাটির বেতন সর্বোচ্চ হওয়া উচিত এবং কেন?”মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস পড়ুয়া মানসী কি উত্তর দিয়েছিলেন জানেন? 

মিস ওয়ার্ল্ড, মিস ওয়ার্ল্ড মানসী চিল্লার, miss world manushi chhillar

মানসী বলেছিলেন- “আমি স্যালারি বলতে কেবল ক্যাশ টাকা বুঝি না, বরং বুঝি ভালোবাসা আর সম্মানও। সেই স্যালারিটাই আমাদের মায়েদের দেয়া উচিত। আমার মা যেমন আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা, এবং সব মায়েরাও যেভাবে তাদের সন্তানের জন্য সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ করেন, সেজন্য তাদেরকেই আমার মতে সর্বোচ্চ বেতন (ভালোবাসা ও সম্মান) দেয়া উচিত।”

কি চমৎকার একটা উত্তর, তাই না? চিরাচরিত চিন্তাভাবনার বাইরে গিয়ে ভিন্নরকমের কিছু একটা ভাবা, বা সেটা করে দেখানো- এই গুণগুলো একটা মানুষকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে তোলে। গ্র‍্যান্ড ফিনালে’র বাকি প্রতিযোগীদের চেয়ে যেটা মানসীকে আলাদা করেছিল, যেটা সবাইকে বুঝিয়েছিল, এই মেয়ে বিশেষ কিছু, বাকীদের মতো নয়। বলা বাহুল্য, মিস ওয়ার্ল্ডের মুকুটটা ভারত থেকে আসা মানসীর মাথাতেই উঠেছিল, এবং তিনিই ছিলেন সেটার যোগ্য দাবীদার। 

মানসী চিল্লারেরা অসাধারণ সব উত্তর দিয়ে তাক লাগিয়ে দেন। আর আমাদের সুন্দরী প্রতিযোগীতার সেরা প্রতিযোগীরা পানির সংকেত ভুলে যান, তবে রেস্টুরেন্টের নাম মনে রাখেন। ইংরেজী উইশ শব্দের মানে তারা বুঝে উঠতে পারেন না, তবে ভুলভাল ইংরেজী ঝেড়ে কথা চালিয়ে যান ঠিকই। এদেরকে আপনি বাংলাদেশের বর্তমান আয়তন জিজ্ঞেস করুন, মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর সংখ্যা জিজ্ঞেস করুন, এরা হা করে তাকিয়ে থাকবে। কারণ শারিরীক সৌন্দর্য্য ব্যাপারটাকে এরা এতই গুরুত্ব সহকারে নিয়েছে যে, হয়তো বাকী কোনদিকে মন দেয়ার দরকারই তারা মনে করে না। তাদের কাছে শরীরটাই সেক্সি, ব্রেইনটা নয়। 

আরেকটা প্রশ্ন তুলি। জেসিয়া ইসলাম মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশের খেতাব জিতেছেন এক বছর হয়ে গেছে। চীনে মিস ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগীতায় অংশগ্রহনও করে এসেছেন তিনি। গত এক বছরে বাংলাদেশের মিডিয়ায় তার অবদান কি? প্রেমিকের সঙ্গে বিতর্কিত কিছু ছবি আর ভিডিও আপলোড দেয়া ছাড়া তিনি কোন উল্লেখযোগ্য অবদানটা রেখেছেন? প্রতিযোগিতার মঞ্চে দাঁড়িয়ে যে ‘নারী উন্নয়নে অবদান রাখবো, বাল্যবিবাহ রোধে সচেতনতা সৃষ্টি করবো’ টাইপের ডায়লগগুলো তারা ঝেড়ে এসেছিলেন, সেগুলো কি বঙ্গোপসাগরে ডুবে গেছে?

সুন্দরী প্রতিযোগিতার কনসেপ্টটা নিয়েই আমাদের আপত্তি আছে। তবুও, বৈশ্বিক পর্যায়ে যে প্রতিযোগিতাগুলো হয়, সেগুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ খুব কম। কারন সেখানে শারিরীক সৌন্দর্য্যের চেয়ে বড় করে দেখা হয় শিক্ষাগত যোগ্যতা, উপস্থিত বুদ্ধি বা উপস্থাপনের গুণাবলীকে। নইলে নাইজেরিয়া বা অ্যাঙ্গোলা থেকে আসা প্রতিযোগীরা কখনও মিস ওয়ার্ল্ড হতে পারতেন না। কিন্ত আমাদের দেশে এত যাচাই বাছাই করার সুযোগ কোথায়? এখানে যার চামড়া যতো বেশি ফর্সা, যার ফিগার যতো বেশি সেক্সি, সে ততো বেশি সুন্দরী- এই ফর্মূলা মেনেই বিচার করা হয় বোধহয়। তাই নামে বিউটি কন্টেস্ট হলেও, আদতে এটা ব্রেইনলেস বিউটি বাছাইয়ের কন্টেস্ট ছাড়া আর কিছুই নয়! 

আরও পড়ুন-

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close