মতামতরিডিং রুম

H2O, পাহাড়-পর্বত-সুন্দরবন ‘উইশ’ ও একরাশ হতাশা!

মিস ওয়ার্ল্ডের গ্র‍্যান্ড ফিনালে মানসী চিল্লারকে প্রশ্ন করা হয়েছিল- “আপনার মতে কোন পেশাটির বেতন সর্বোচ্চ হওয়া উচিত এবং কেন?” মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস পড়ুয়া মানসী কি উত্তর দিয়েছিলেন জানেন?

মানসী বলেছিলেন- “আমি স্যালারি বলতে কেবল ক্যাশ টাকা বুঝি না, বরং বুঝি ভালোবাসা আর সম্মানও। সেই স্যালারিটাই আমাদের মায়েদের দেয়া উচিত। আমার মা যেমন আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা এবং সব মায়েরাও যেভাবে তাদের সন্তানের জন্য সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ করেন সেজন্য তাদেরকেই আমার মতে সর্বোচ্চ বেতন (ভালোবাসা ও সম্মান) দেয়া উচিত।”

কি চমৎকার একটা উত্তর, তাই না? চিরাচরিত চিন্তাভাবনার বাইরে গিয়ে ভিন্নরকমের কিছু একটা ভাবা, বা সেটা করে দেখানো- এই গুণগুলো একটা মানুষকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে তোলে। গ্র‍্যান্ড ফিনালে’র বাকি প্রতিযোগীদের চেয়ে যেটা মানসীকে আলাদা করেছিল, যেটা সবাইকে বুঝিয়েছিল, এই মেয়ে বিশেষ কিছু, বাকীদের মতো নয়। বলা বাহুল্য, মিস ওয়ার্ল্ডের মুকুটটা ভারত থেকে আসা মানসীর মাথাতেই উঠেছিল, এবং তিনিই ছিলেন সেটার যোগ্য দাবীদার। 

মিস ওয়ার্ল্ড, মিস ওয়ার্ল্ড মানসী চিল্লার, miss world manushi chhillar

মিস ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগীতায় আদলে আমাদের দেশেও ‘মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ’ নামের অদ্ভুত একটা প্রতিযোগীতা হচ্ছে আমাদের দেশে। মূলত এটা একটা সুন্দরী প্রতিযোগীতা, মানে দৈহিক সৌন্দর্য্যটাই এখানে মূখ্য এবং একমাত্র বিষয়। আর কোন কিছু না থাকলেও চলে। এই প্রতিযোগীতায় যিনি চ্যাম্পিয়ন হন, মিস ওয়ার্ল্ডে তিনিই বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। গতবার যেমন জেসিয়া ইসলাম করেছেন। গতকাল এই প্রতিযোগীতার ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। সেই ফাইনালেও এবছরের মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশকে বেছে নিয়েছেন প্রতিযোগীতার বিচারকেরা। কিন্ত জয়-পরাজয় ছাপিয়ে ফাইনাল রাউন্ডের কয়েকটা ঘটনা নজর কেড়েছে সবার। আর ঘটনাগুলো এমনই অদ্ভুত যে, সেগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হতে সময় লাগেনি খুব বেশি।

এক প্রতিযোগীকে বিচারক জিজ্ঞেস করেছেন, H2O কি? এটা যে পানির রাসায়নিক সংকেত, সেটা বাংলাদেশের স্কুল লেভেলে ক্লাস ফোর বা ফাইভেই পড়ানো হয়। প্রাইমারি স্কুল পাশ করেছে, এমন একটা বাচ্চাও এই প্রশ্নের জবাব হাসিমুখে দিয়ে দিতে পারবে। কিন্ত আমাদের প্রতিযোগী তরুণী ভাবলেন, সোজা রাস্তায় উত্তর না দিয়ে মানসীর মতো একটু ভিন্নরকম কিছু বলবেন। তাই তিনি একটা ভেটকি মেরে জবাব দিলেন, H2O একটা রেস্টুরেন্টের নাম! উত্তরটা মিথ্যে নয় একেবারে, ধানমন্ডিতে এই নামে একটা রেস্টুরেন্ট সত্যি সত্যিই আছে।

যে তরুণী এই উত্তরটা দিয়েছেন, আমি তার নাম জানিনা। তবে কখনও দেখা হলে তার পা ছুঁয়ে সালাম করার খুব ইচ্ছে আমার। পাঠ্যবইয়ে তিনি কোনদিন পানির সংকেত পড়েছিলেন কিনা আমরা জানি না, পড়লেও ভুলে গেছেন। তবে জীবনে কখনওবা হয়তো তিনি H2O নামের সেই রেস্টুরেন্টে খেয়েছিলেন, কিংবা সেটার আশপাশ দিয়ে গিয়েছেন। দুর্দান্ত স্মৃতিশক্তি তার, নামটা পর্যন্ত ভোলেননি! 

মিস ওয়ার্ল্ড, মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ, অন্তর শোবিজ, স্বপন চৌধুরী, অব্যবস্থাপনা

আরেক বিচারক এক প্রতিযোগীর কাছে জানতে চাইলেন, তোমাকে যদি একটা ইচ্ছে পূরণ করতে দেয়া হয়, নিজের জন্যে, পরিবারের জন্যে, কিংবা দেশের জন্যে- সেই ইচ্ছেটা কি হবে? বিচারক ভদ্রমহিলা ইচ্ছে শব্দটা বাংলায় বলেননি, তার পরিবর্তে ‘উইশ'(wish) শব্দটা ব্যবহার করেছিলেন।

তথাকথিত ‘গর্জিয়াস’ সেই প্রতিযোগী কি উত্তর দিয়েছে জানেন? বলেছেন, তিনি বাংলাদেশের জন্যে ‘উইশ’ করতে চান। কি সেই উইশ? তিনি বাংলা-ইংরেজী মিশিয়ে জগাখিচুড়ি এক ভাষায় বলতে শুরু করলেন-

“বাংলাদেশের একটা লংগেস্ট সি বীচ আছে, সমুদ সৈকত, কক্সবাজারে। নেক্সট বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সুন্দরবন, অনেক বিউটিফুল। নেক্সট আমাদের দেশে অনেক সুন্দর সুন্দর পাহাড় পর্বত রয়েছে, আমি এগুলোকেই উইশ করবো ফার্স্টে…”

তার দেয়া জবাব শুনে প্রশ্নকারী ভদ্রমহোদয়া বেকুব হয়ে গিয়েছিলেন পুরোপুরি। বিচারক তাকে জিজ্ঞেস করলেন, উইশ মানে তিনি বোঝাতে পেরেছেন কিনা। দুই দফা উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়েও দিলেন। সেই প্রতিযোগী তখন ইংরেজী ঝাড়লেন, ‘স্যরি ম্যাম’ বলে। তারপর বললেন, তিনি বুঝতে পারছেন না! তারপর ইংরেজীতে ‘থ্যাংক ইউ’- ও জানালেন!

মিস ওয়ার্ল্ড, মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ, মানুষি চিল্লার, সুন্দরী প্রতিযোগীতা, ডা. সুসানে গীতি

বিশ্বাস করুন, এই ভিডিওটা যতোবার দেখেছি, ততবারই হাসি পেয়েছে। একজন তরুণী মিস ওয়ার্ল্ডের মতো একটা প্রতিযোগীতায় বাংলাদেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করবেন, তিনি ফাইনাল রাউন্ড পর্যন্ত এসেছেন মানে সেই প্রতিযোগীর ভেতরে খানিকটা গুণ অবশ্যই আছে। এগুলোই কি সেই গুণের প্রমাণ? উইশ শব্দের অর্থ বুঝতে না পারা, পানির সংকেতকে রেস্টুরেন্টের নামের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা, এরা যাবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে? কি দেখে এদের ফাইনালে তোলা হয়েছে? গায়ের চামড়া সাদা হলেই কি একটা মানুষ সুন্দর হয়ে যায়? ৩৬-২৪-৩৬ সাইজের বডি শেপ থাকলেই তাকে সুন্দরী প্রতিযোগীতার ফাইনালে জায়গা দেয়া যায়? তার মাথায় মগজের জায়গায় গোবর ঠেসে রাখা আছে কিনা, সেসব কি কেউ পরীক্ষা করে দেখেনি আগে?

মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশের এই প্রতিযোগীতা আর এর আয়োজক অন্তর শোবিজ এর আগেও হাজারটা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানটা সম্ভবত ধরেই নিয়েছে, নেগেটিভ পাবলিসিটি ইজ দ্য বেস্ট পাবলিসিটি। সুতরাং যতো পারো বিতর্ক তৈরি করো। এই ভিডিওগুলো ভাইরাল হবার আগে এবছরের মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ প্রতিযোগীতা নিয়ে কারো কোন মাথাব্যাথাই ছিল না। এমনকি প্রতিযোগীতা যে শুরু হচ্ছে, এটাই জানতো না অনেকে, এমনকি মিডিয়াও না! অভিযোগ আছে, অন্তর শোবিজ কর্তৃপক্ষ নাকি নিজেদের পছন্দমতো প্রতিযোগীদের নিয়েই প্রতিযোগীতার আয়োজন করেছে। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান স্বপন চৌধুরী তো বলেছেন- ‘নিজের টাকায় প্রতিযোগীতার আয়োজন করছি, এত জানানোর কি আছে!’

স্বপন চৌধুরীর নিজের টাকায় আয়োজন করা প্রতিযোগীতার অবস্থা তো নিজের চোখেই দেখলেন সবাই। এটা কি কোন বিউটি কন্টেস্ট, নাকি ব্রেইনলেস বিউটি খোঁজার কন্টেস্ট, সেটাই বোঝা দায়! 

মিস ওয়ার্ল্ড, মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ, মানুষি চিল্লার, সুন্দরী প্রতিযোগীতা, ডা. সুসানে গীতি

মিস ওয়ার্ল্ড থেকে একটু অন্যদিকে যাই। ডা. সুসানে গীতির নাম কয়জন জানেন? এই ভদ্রমহিলা গতকাল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত হয়েছেন। দেশের সাতচল্লিশ বছরের ইতিহাসে তিনিই প্রথম নারী, যিনি সেনাবাহিনীর এই পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। ১৯৮৫ সালে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাশ করা ডা. সুসানে গীতি চিকিৎসক হিসেবে ক্যাপ্টেন পদে যোগ দিয়েছিলেন সেনাবাহিনীতে। এই খবরটা শুনে গর্বে বুক ফুলে উঠেছে! এদেশের নারীরা কতদূর এগিয়ে গেছে!

দুপুরে সেনা কর্মকর্তা সুসানে গীতির এই দারুণ অর্জনের খবরটা শুনলাম। আবার একই দিনে মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ নামের কমেডি শো-তে উইশ আর H2O নিয়ে ভাঁড়ামী দেখলাম। একদিকে ডা. সুসানে গীতিরা যখন সব বাধা বিপত্তি পেছনে ফেলে নারীত্বের শক্তিতে দুনিয়াকে জয় করে সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন, কেউ কেউ তখনও শারিরীক সৌন্দর্য্যটাকে সর্বস্ব ভেবে সেটাকে ব্যবহার করে ওপরে উঠতে চাইছেন! নারীর সাথে নারীর কি অদ্ভুত বৈপরিত্য, তাই না?

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close