ঘটনাটা গত বিপিএলের। মিরপুরের আউটফিল্ডের সমালোচনা করায় তামিম ইকবালকে পাঁচ লক্ষ টাকা জরিমানা করেছিল বিসিবি। জরিমানার সিদ্ধান্ত জানানোর পরে মিডিয়ার সামনে বোর্ড প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন- “তামিমের সমালোচনার ধরণ বিপদজ্জনক। ওর কথাবার্তা বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য ছিল বিপজ্জনক। এটা আমাদের ক্রিকেটের প্রচুর ক্ষতি করতে পারে বা পারত। এজন্য আমরা মনে করেছি, সহ-অধিনায়ক হিসেবে কথাবার্তা বলায় ওকে আরও অনেক সতর্ক হতে হবে।”

কি ঘটেছিল সেদিন? বিপিএলে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স ও রংপুর রাইডার্সের ম্যাচ শেষে দুই অধিনায়কই সমালোচনা করেছিলেন উইকেট নিয়ে। উইকেট ছিল ভীষণ মন্থর, ছিল অসমান বাউন্স। ৯৭ রানে গুটিয়ে গিয়েছিল রংপুর। সেই রান তাড়ায় কুমিল্লা জিতেছিল শেষ ওভারে। ম্যাচ শেষে রংপুর অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা বলেছিলেন, টি-টোয়েন্টিতে এই ধরনের উইকেট গ্রহণযোগ্য নয়। ম্যাচ শেষে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে তামিম ইকবাল উইকেটকে বলেছিলেন, ‘হরিবল’। পরে সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন টি-টোয়েন্টির জন্য জঘন্য উইকেট এটি।

সমালোচনা করলেও, সেবার মাশরাফিকে শুধু সতর্ক করা হয়েছিল, জরিমানা করেনি বোর্ড। তামিমের ব্যপারে বিরক্তিই প্রকাশ পেয়েছিল নাজমুল হাসান পাপনের কণ্ঠে- “একটা পিচ নিয়ে ক্রিকেটাররা বলতেই পারে যে টি-টোয়েন্টির জন্য আদর্শ নয়। কিন্তু আপনি আউটফিল্ড নিয়ে বলবেন কেন? কিউরেটর নিয়ে বলবেন কেন?”

নাজমুল হাসান পাপন অজুহাত দেখিয়েছিলেন, যেহেতু মিরপুরের উইকেট তিনটে ডিমেরিটাস পয়েন্ট পেয়ে বসে আছে আইসিসির কাছ থেকে,আরেকটা পয়েন্ট পেলেই নিষিদ্ধ হবে এক বছরের জন্যে, সেই মূহুর্তে দেশীয় ক্রিকেটারদের এমন বক্তব্য সেসবে ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্ত একটা ঘরোয়া টি-২০ লীগে কোন ক্রিকেটার উইকেট নিয়ে কি বক্তব্য দিলেন, ডিমেরিটাস পয়েন্ট প্রদানের বেলায় সেসব যে আইসিসি গোনায় ধরে সেটা জানা ছিল না। আম্পায়ার আর ম্যাচ রেফারীর রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই ডিমেরিটাস পয়েন্ট দেয়া হয়, সেটা তো জানা থাকার কথা বোর্ড প্রেসিডেন্টের!

মিরপুরের কিউরেটরের নাম গামিনী ডি সিলভা। উইকেটকে মাইনফিল্ড বানাতে শ্রীলঙ্কান এই ভদ্রলোকের জুড়ি নেই। এই ভদ্রলোকের বা তার কাজের সমালোচনা কেউ করলে সেটা সম্ভবত বিসিবির সহ্য হয় না। রহস্যটা কি কে জানে! তামিম যেমন সমালোচনা করে জরিমানা গুণেছেন, মাশরাফি উইকেটকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে বকা খেয়েছেন। কিন্ত এবার গামিনীর স্বদেশী রোশান সিলভার ব্যপারে কি সিদ্ধান্ত নেবে বিসিবি?

মিরপুর, গামিনী ডি সিলভা, শেরে বাংলা, হোম অব ক্রিকেট, বিসিবি, জরিমানা, রোশান সিলভা, তামিম ইকবাল

মিরপুর টেস্টে ধংসস্তুপ হয়ে ওঠা পিচে দারুণ ব্যাটিং করেছেন রোশান, দুটো ইনিংসেই হাঁফ সেঞ্চুরী করেছেন, দ্বিতীয় ইনিংসে তো তাকে আউটই করা যায়নি। শ্রীলঙ্কার জয়ে সবচেয়ে বড় অবদান তার, ম্যাচসেরা হবার পাশাপাশি পেয়েছেন সিরিজসেরার পুরস্কারও। সেই রোশান ডি সিলভা গতকালের খেলা শেষে এসেছিলেন সংবাদ সম্মেলনে, সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মিরপুরের উইকেটকে ধুয়ে দিয়েছেন একপ্রস্থ। বলেছেন-

“মাঝেমধ্যে শ্রীলঙ্কায় আবহাওয়া খুব বাজে হলে, এমন উইকেট পাওয়া যায়। এ ছাড়া আমাদের দেশে যখন রাস্তা বানায়, ঢালাইয়ের জন্যে বালির সঙ্গে কিছু একটা বোধহয় মেশায়; তখন একটা রং হয়। শ্রীলঙ্কার রাস্তায় এমন রং দেখা যায় (মিরপুরের উইকেটের রং)! আমরা এ ধরনের উইকেট কখনো পাইনি।”

শ্রীলঙ্কা উপমহাদেশের বাদবাকী দলগুলোর মতোই স্পিনিং ট্র্যাকে খেলে অভ্যস্ত। স্পিনটাই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। টার্ণিং উইকেটে খেলার অভিজ্ঞতা কম নয় রোশান সিলভার, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তিনি হয়তো নবীন, কিন্ত ক্যারিয়ারে ১১০টা প্রথম শ্রেণীর ম্যাচ খেলে ফেলেছেন এরমধ্যে। শ্রীলঙ্কার ভালো-মন্দ সব রকমের উইকেটেই খেলার অভিজ্ঞতা আছে তার। সেই রোশান যখন এমন উইকেট জীবনে দেখেননি বলে জানান, এরকম অদ্ভুত উপমা দিয়ে উইকেটের চরিত্র বিশ্লেষণ করেন, তখন না হেসে পারা যায় না।

মিরপুরের সবুজ আউটফিল্ড বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে একটা নস্টালজিয়ার নাম, এখন মিরপুরের বাদামী ঘাস দেখলে বিশ্বাস করা কষ্ট, এককালে এগুলোর রঙই ঘন সবুজ ছিল! কুচকুচে কালো উইকেট দেখে গ্রানাইট পাথরের কথা মনে পড়ে, মফস্বল শহরের পিচঢালা রাস্তার এবড়ো-থেবড়ো খানাখন্দের ছবি ভেসে ওঠে মনের পর্দায়। কিন্ত করার কিছুই নেই, মহামতী গামিনি ডি সিলভা আছেন এখানে, মিরপুর সালতানাতের অবিসংবাদিত অধিশ্বর যিনি, এখানে তার কথা, তার ভাবনাই যে শেষ কথা বলে মেনে নেয় বিসিবি!

বিসিবি এখন চাইলে রোশান সিলভাকে জরিমানা করতেই পারে। তার এই বক্তব্যে অনুপ্রাণিত হয়ে আইসিসি যদি শেরে বাংলার উইকেটকে ডিমেরিটাস পয়েন্ট দিয়ে বসে? ম্যাচ ফি’র আড়াই হাজার ডলারও চাইলে বাজেয়াপ্ত করা যেতে পারে। বিসিবির ‘শূন্য’ কোষাগার তাতে ফুলে-ফেঁপেই ওঠার কথা।

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-