ফুটবল খেলার বিশাল বড় ভক্ত সিফাত উল্লাহ (কাল্পনিক নাম)। তাই আর সবার মত তিনিও বিশ্বকাপ ফুটবল শুরু হতে অনেক আগ্রহ নিয়ে বসেছিলেন টিভি সেটের সামনে। কিন্তু উদ্বোধনী ম্যাচ খেলতে রাশিয়া ও সৌদি আরবের খেলোয়াড়রা মাঠে নামা মাত্রই এক অদ্ভূত বিষাদে ছেয়ে যায় তার মন। মুহূর্তের মধ্যেই তিনি বুঝে যান, এই খেলা উপভোগ করা তার ভাগ্যে নেই।

এর কারণ কী, জানেন? কারণ হলো বর্ণান্ধতা। সিফাত উল্লাহ বর্ণান্ধ। তিনি লাল ও সবুজ রঙ দেখতে পান না। অথচ রাশিয়া ও সৌদি আরব বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে এই দুই রঙের জার্সি পরেই খেলতে নেমেছিল। তাই সিফাত উল্লাহর পক্ষে জার্সি দেখে কোন খেলোয়াড় রাশিয়ার আর কোন খেলোয়াড় সৌদি আরবের, তা নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। তাই খেলা দেখা ইস্তফা দিয়ে মোবাইল হাতে ফেসবুক চালাতে শুরু করে দেন তিনি। এবং ফেসবুকেই বিভিন্ন মানুষের স্ট্যাটাস দেখে জানতে পারেন রাশিয়ার কাছে কীরকম নাস্তানাবুদ হচ্ছে সৌদি আরব।

সিফাত উল্লাহই কিন্তু একমাত্র ব্যক্তি নন, যার জার্সির রঙের কারণে এভাবে বিশ্বকাপ দেখার মজা পুরোটাই মাটি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ঘাঁটলে দেখা যাবে, এরকম লক্ষ লক্ষ সিফাত উল্লাহ খেলা দেখতে না পেরে মনের রাগ, ক্ষোভ, হতাশা সব উজাড় করে দিয়ে বিভিন্ন পোস্ট লিখেছেন। এক হাত নিয়েছেন ফিফাকে।

বস্তুত বর্তমান পৃথিবীর ৩২০ মিলিয়ন মানুষই বর্ণান্ধ। প্রতি ১২ জন পুরুষের মধ্যে একজন, আর প্রতি ২০০ জন নারীর মধ্যে একজন এই সমস্যার শিকার হন। অর্থাৎ নারীদের চেয়ে পুরুষদের ক্ষেত্রেই এই সমস্যা দেখা যায় বেশি।

যেহেতু প্রতি ১২ জন পুরুষের মধ্যে একজন বর্ণান্ধ, তাই গাণিতিক হিসাব অনুযায়ী যেকোনো ১১ খেলোয়াড়ের ফুটবল দলে একজন বর্ণান্ধ খেলোয়াড় থাকার সম্ভাবনা খুবই বেশি। আসলেই কি তেমন কেউ রয়েছে? অনেকেই জানলে অবাক হবেন যে, এই বিশ্বকাপেই খেলেছেন একজন বর্ণান্ধ ফুটবলার! তিনি ডেনমার্কের মিডফিল্ডার থমাস ডেলানি। এতদিন কেউই জানত না যে তিনি একজন বর্ণান্ধ। যেভাবে তার বর্ণান্ধতার কথা জানাজানি হলো, তা যেকোনো অসাধারণ ছোট গল্পের কাহিনীকেও হারাবে!

রাশিয়া বিশ্বকাপ খেলার উদ্দেশে দেশ ছাড়ার জন্য দলের সাথে যোগ দেয়ার মাত্র ৮ মিনিট আগে তিনি একটি ড্যানিশ রেডিও স্টেশনে ফোন করেন, এক বর্ণান্ধ কলারকে সমর্থন জোগানোর লক্ষ্যে। তিনি জানান, ডেনমার্ক ও মেক্সিকোর মধ্যকার এক ম্যাচে নিজের বর্ণান্ধতার কারণে কীরকম বিপাকে পড়তে হয়েছিল তাকে।

শুরুতে অবশ্য নিজের পুরো পরিচয় দেননি তিনি। স্রেফ বলেন, “আমি থমাস!” তারপর তিনি আরজেকে বলেন, “আমি একজন লাল-সবুজ বর্ণান্ধ। আমি বলবো না এটি খুব খারাপ কিছু, কিন্তু এটি হয়ে থাকে। সেদিন মাঠে এ জন্য আমাকে অনেক সমস্যায় পড়তে হয়েছিল। আমি দূর থেকে দেখে একদমই বুঝতে পারছিলাম না যে কে আমার দলের হয়ে খেলে, আর কে বিপক্ষ দলে!”

আরজে তখন তাকে জিজ্ঞেস করেন, “আপনি কি লাল বা সবুজ কোনো একটি দলের হয়ে খেলে থাকেন?”
উত্তরে তিনি বলেন, “হ্যাঁ, আমি লাল দলের হয়ে খেলি।”
“এবং কোন দলের হয়ে আপনি খেলে থাকেন, থমাস?”
“ড্যানিশ জাতীয় দলের হয়ে!”

ঘটনাটি বেশ নাটকীয়। কিন্তু একই সাথে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণও বটে। শীর্ষস্থানীয় ফুটবলারদের মধ্যে তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি প্রকাশ্যে নিজের বর্ণান্ধতার কথা স্বীকার করেছেন। কিন্তু নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, তার মত এমন বর্ণান্ধ খেলোয়াড় আরও অনেকেই আছেন, কিন্তু লোকলজ্জার ভয়ে কিংবা নিছকই সংকোচের কারণে সে কথা জানতে দিতে চান না।

কিন্তু থমাস যেহেতু নিজ মুখে তা জানিয়েছেন, তাই তার জন্য বিশেষ ব্যবস্থাও নিয়েছে ফিফা। তাদের নিয়ম অনুযায়ী, যেকোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচে একটি দলকে তাদের হোম জার্সি, আর অন্য একটি দলকে তাদের অ্যাওয়ে জার্সি পরে খেলতে হয়। কিন্তু শুধু থমাসের কথা বিবেচনা করে তারা বিশ্বকাপের সি গ্রুপে অস্ট্রেলিয়া-ডেনমার্ক ম্যাচে সে নিয়ম শিথিল করে। অস্ট্রেলিয়ার হোম জার্সি গাঢ় সবুজ হওয়ায়, সেদিন দুই দলই তাদের অ্যাওয়ে জার্সি পরে খেলে। ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত ড্র হয় ১-১ গোলে।

যাই হোক, ফিরে আসি সিফাত উল্লাহ ও তার খেলা দেখার আনন্দ মাটি হওয়ার প্রসঙ্গে। তার মত লাল-সবুজ বর্ণান্ধরা যে শুধু রাশিয়া-সৌদি আরব ম্যাচেই নাজেহাল হয়েছেন, তা কিন্তু নয়। একই রকম পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল জার্মানি ও দক্ষিণ কোরিয়ার ম্যাচেও। এমনকি সেনেগাল ও কলম্বিয়াও খেলেছিল সবুজ ও হলুদ জার্সি পরে, যা দেখে ঠিকঠাক ঠাহর করতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে বর্ণান্ধদের। বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছিল ইংল্যান্ড-সুইডেন ম্যাচে ইংলিশ গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ডের হালকা সবুজ জার্সির কারণেও। এছাড়া দারুণ সমস্যা হয়েছে পেনাল্টি শ্যুট আউটে যাওয়া ম্যাচগুলোর সময়েও। গোল হলে সবুজ বৃত্ত আর মিস হলে লাল বৃত্ত দেখানো হয় টিভির পর্দায়। কিন্তু বর্ণান্ধদের কাছে যে দুইটিই সমান!

বর্ণান্ধরা লাল ও সবুজ ছাড়াও সাধারণত অন্যান্য যে-সকল রঙ আলাদা করতে গিয়ে বিপাকে পড়ে –
* লাল, কমলা, হলুদ, সবুজ ও বাদামী
* লাল ও কালো
* নীল, বেগুনি ও গাঢ় গোলাপি

বর্ণান্ধতার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করা ‘কালার ব্লাইন্ড অ্যাওয়ারনেস’ প্রচন্ড রেগে গিয়েছিল বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে দুই দলকে লাল ও সবুজ রঙের জার্সি পরে খেলতে দেখে। তারা তাদের ফেসবুক পেজে লিখেছিল, “অবিশ্বাস্য! বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই দুই দল খেলছে লাল-সবুজ জার্সিতে। খুবই বিস্ময়কর ব্যাপার, বিশেষত এ কারণে যে বছর তিনেক আগে আমরা ফিফার সাথে এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছিলাম, কিন্তু তারা সেটিকে একদমই আমলে নেয়নি। তবে সুখবর হলো এই বিষয়টি নিয়ে ঝড় উঠেছে টুইটারে। তাই খুব শীঘ্রই আমরা পরিবর্তন দেখতে চলেছি হয়তো!”

এবারের বিশ্বকাপ তো বর্ণান্ধদের জন্য খুবই হতাশার মধ্য দিয়ে কাটলো, কিন্তু তারা আশা করছে যে খুব শীঘ্রই বোধোদয় হবে সংস্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। তাই আগামী ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ ২০২০ থেকেই আর এ ধরণের কোন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সম্মুখীন হতে হবে না তাদেরকে। এখন দেখা যাক, উয়েফাও কি ফিফার মত খুবই স্পর্শকাতর এই বিষয়টিতে উদাসীন হয়ে থাকে, নাকি গুরুত্বের সাথে বিষয়টি বিবেচনা করে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করে!

* বর্ণান্ধতা কী?

বর্ণান্ধতা মূলত একটি জন্মগত রোগ। ধারণা করা হয় এটি মানুষের একটি জিনগত বৈশিষ্ট্য, যা সে তার মায়ের দিক থেকে পেয়ে থাকে।

তবে কিছু মানুষ তাদের শারীরিক অবনতির কারণেও এই জটিলতার শিকার হতে পারে। যেমন ডায়াবেটিস বা একাধিক স্ক্লেরোসিসের কারণে। কখনও কখনও আবার হাই ডোজের ওষুধের পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়ায়ও মানুষ বর্ণান্ধ হয়ে যেতে পারে।

* এটি কেন হয়?

মানুষ মূলত রঙ দেখতে পায় তাদের চোখের এক প্রকার নার্ভ সেলের কারণে, যেটিকে বলা হয় কোন। তিন ধরণের কোন হয়ে থাকে, যেগুলো লাল, সবুজ ও নীল আলো গ্রহণ করে থাকে, ফলে এই জাতীয় রঙগুলো দেখতে পায় মানুষ। কিন্তু কোনো কারণে যদি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির চোখের একটি কোনও অচল হয়ে পড়ে, তাহলে ওই নির্দিষ্ট রঙ, এবং ওই রঙ হতে উৎপন্ন অন্যান্য রঙও আর দেখতে পায় না সে ব্যক্তি। আর তখনই ধরে নেয়া হয় যে সে বর্ণান্ধ।

অনেক মানুষই জন্মগতভাবে বর্ণান্ধ। কিন্তু খুব কম মানুষই এই বিষয়টি টের পায়। কেননা ছোটবেলা থেকেই তারা তাদের নিজেদের মত করে বিভিন্ন বস্তুর রঙ দেখে অভ্যস্ত। তাই সেইসব বস্তুর প্রকৃত রঙ যে আলাদা, তা তারা বুঝতে বা জানতে পারে না। কেবলমাত্র ফুটবল খেলা দেখতে গিয়ে কোনো দলের জার্সির রঙ বুঝতে না পেরে, কিংবা ফুলের বাগানে গিয়ে নির্দিষ্ট কোনো রঙের ফুল চিনতে না পেরে, অথবা রঙের বাক্সে কোনটা কোন রঙ চিনতে না পেরেই তাদের বোধগম্য হয় যে তারা আসলে বর্ণান্ধ।

যদি কোনো ব্যক্তির হঠাৎ করে মনে হয় যে সে নির্দিষ্ট কোনো রঙ দেখতে পারছে না বা অসুবিধা বোধ করছে, তাহলে দেরি না করে অতিসত্বর তাদের চোখের ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া উচিৎ।

শেষ করছি একটি মজার তথ্য দিয়ে, যা হয়ত অনেক পাঠককেই অবাক করবে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও কিন্তু বর্ণান্ধ ছিলেন! তাঁর মূল অসুবিধা ছিল লাল রঙটি নিয়ে। তিনি এই রঙ খুব ভাল করে দেখতে পেতেন না। লাল রঙের অংশগুলোকে তাঁর ‘নেগেটিভ স্পেস’ বলে মনে হতো। লাল এবং সবুজকে অনেক সময়ই আলাদা করতে পারতেন না। দৃকবিজ্ঞানে এ বিশেষ অবস্থাকে বলে ‘প্রোটানোপ’।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘প্রোটানোপিয়া’য় আক্রান্ত ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। এটি একটা বংশগত রোগ। রোগটির কোন চিকিৎসা নেই। চিকিৎসার যে খুব বেশি দরকার আছে তাও নয়, কারণ এটি কোনো শারীরিক সমস্যা করে না, কেবল কোনো কোনো রঙকে স্বাভাবিকের চেয়ে ঝাপসা দেখেন রোগীরা।

তথ্যসূত্র: বিবিসি

Comments
Spread the love