ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

আনিসুল হক, আপনাকে মনে পড়ে ভীষণ!

নগরীর আকাশে বাতাসে সেদিন ছিল অনেক আঁধার। চারদিকে মানুষের শোক। কারন ঢাকাকে সবুজে বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন যে লোকটি সে লোক নিজেই চলে গেলো না ফেরার দেশে। তিনি আর কেউ নয় নগরপিতা ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আনিসুল হক। আলোর দিশারীর মৃত্যুতে আজো ঢাকা কাঁদে। কাঁদে এই শহরের প্রতিটি বাতাস!

সেদিন ঘুমিয়ে ছিলাম বেলা পর্যন্ত। বেলা পেরিয়ে যখন ঘুম ভাঙ্গল ফেসবুকে দেখি শোকের মাতম। নিউজফিডের যতই নিচে যাচ্ছি দুঃখটা ততই বেড়ে চলছিল। বুকটা কষ্টে ভারী হয়ে আসছিল। এতো ভালো মানুষটা এভাবে চিরতরে হারিয়ে গেলো? মানতেই পারছি না। এক বন্ধুর দেয়া স্ট্যাটাসে তাই কমেন্ট করলাম, সোর্স কি তিনি যে মারা গিয়েছেন? সাথে সাথে আমাকে প্রমান দিলো প্রতিটি টিভি চ্যানেলে ব্রেকিং নিউজ। চিরসবুজ মনের লোকটি আর নেই! উনাকে নিয়ে আরেকবার ব্রেকিং নিউজ দেখেছিলাম যখন তিনি দখলদারদের বিরুদ্ধে রুখে দাড়িয়ে ছিলেন। এতো সৎ সাহসের মানুষ রাজনীতিতে খুব কমই দেখেছি। আমাদের মতো নতুন প্রজন্মের কাছে রাজনীতি মানেই এড়িয়ে যাওয়ার বিষয়। কিন্তু মেয়র পদে যখন উনাকে দেখলাম মনে আশার আলো জ্বলতে শুরু করলো। এইবার আমাদের প্রিয় শহরের কিছু একটা হবে। শহরের উষ্ণতম দিনে তিনি ছিলেন এক যোগ্য প্রদীপ। যে নিজে জ্বলে অন্যকে আলো দিয়ে যায়। কোটি মানুষের মনে তিনি তার ভালো কাজের মাধ্যমেই জায়গা করে নিয়েছিলেন। কারো মনে জায়গা করে নেয়া খুব সহজ বিষয় না এটা বোধহয় আমরা সকলেই জানি। ভাগ্যক্রমে এই মহান ব্যক্তির সঙ্গে আমার দেখা করার সুযোগ হয়েছিলো। সে সুযোগে তাঁর সঙ্গে একটি ছবিও তুলেছিলাম। ছবি তোলার সময় তাঁর দুষ্টামিতে মনেই হয়নি তিনি একজন মেয়র। মনে হয়েছে তিনি আমার বাবার মতই কেউ। এইতো সেই ছবির বয়স একবছর হয়েছে। দুঃখের ব্যাপার হলো ছবিটির একবছর আগে তিনি জীবিত ছিল। আজ একবছর পর একই দিনে তাঁর জানাজা হলো।

স্বপ্নবাজ এক লোক ছিলেন তিনি। জীবনে তাঁর সব স্বপ্নই পূরণ হয়েছে। কিন্তু এর জন্য তাঁকে করতে হয়েছে অনেক যুদ্ধ। মফস্বল শহরে বেড়ে ওঠা আনিসুল হকের জীবন ছিল সংগ্রামে ভরপুর। জীবনে হাত ধরে তুলে ধরার কেউ ছিল না। ঠেকেছে, শিখেছে, এগিয়েছে। এটাই তো চলার পথের সবচাইতে বড় শিক্ষা। জীবন সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেছেন,

জীবনের গল্প বলি। টাকার পেছনে তো আমরা ছুটি, সবাই ছোটে। কিন্ত টাকা দিয়েচরিত্র কেনা যায় না, বিশ্বাস কেনা যায় না, টাকা দিয়ে মর‍্যাল কেনা যায় না, ম্যানার্স কেনা যায় না। টাকা দিয়ে ক্লাসি হওয়া যায় না, টাকা দিয়েইন্টেগ্রিটি ডেভেলপ করা যায় না। টাক দিয়ে প্রেম-ভালোবাসাও কেনা যায় না।সুতরাং, টাকার পেছনে না ছুটে সময়ের পেছনে ছোটো, জীবনের পেছনে ছোটো

জীবন সম্পর্কে নতুন প্রজন্মকে এতো সুন্দর করে কেউ হয়তো আর বোঝাতে পারবে না। তিনি যখন লাকি আকন্দের গানের সুরে কেঁদেছেন তাঁর সঙ্গে আমরাও কেঁদেছি। কে জানতো প্রিয় বন্ধুর সঙ্গে তিনিও আমাদের কাঁদিয়ে চলে যাবেন?

যিনি বলেছিলেন জেলের কয়াদীদের ও দুঃখ আছে। তারাও আমাদের মতই মানুষ। কয়জন মানুষ অন্যের দুঃখ বোঝে? তিনি মিশে গিয়েছিলেন এই নগরীর প্রতিটি বাতাসে। গ্রিন অ্যান্ড ক্লিন ঢাকা তাঁর স্বপ্ন ছিল। এই স্বপ্নকে বাস্তবায়নে সে চেষ্টার কোনো ক্রুটি রাখেননি। খুব অল্প সময়ে ঢাকা শহরের যে পরিবর্তন এনেছিল বিশ্বাস ছিল শক্ত করে ধরে থাকলে পরিবর্তন আসতো আরও অনেক। লোকে বলে ভালো মানুষরা বেশীদিন বাঁচে না। সত্যিই বলে! এই শহরে আনিসুল হকের মতো মানুষের জন্ম বারবার হয় না, হবেও না।

“মানুষ পারে না এমন কিছু নেই, মানুষ কখনো কখনো স্বপ্নের চাইতেও বড়। সেই স্বপ্নকে ধরতে হলে সেই স্বপ্ন দেখতে হবে”। “স্বপ্ন মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে, স্বপ্ন নেই এমন কোনো মানুষ নেই”! বারবার সফলতা পাওয়া স্বপ্নবাজ আনিসুল হক জীবনের কাছে হেরে গেলেন। প্রিয় মানুষের চলে যাওয়া মেনে নেয়া যায় না। তবু বলতেই হয়, প্রিয় নগরপিতা আনিসুল হক, পরপারে দেখা হবে। চিরনিদ্রায় ভালো থাকুন!

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close