সিনেমা হলের গলি

যার হাত ধরে পথচলা শুরু ‘মি টু’ মুভমেন্টের!

১৫ অক্টোবর, ২০১৭। অনলাইন জগতের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় দিন। কারণ এই দিনই বিশ্বব্যাপী দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়েছিল ‘মি টু মুভমেন্ট’। আর যার হাত ধরে ব্যাপক প্রচলন ঘটেছিল এই ‘মি টু মুভমেন্ট’ এর, তিনি হলেন অভিনেত্রী অ্যালিসা মিলানো।

মূলত কর্মক্ষেত্রে নারীরা যে ধরণের যৌন নিপীড়ন ও হয়রানির শিকার হয়, তা প্রকাশ্যে নিয়ে এসে অপরাধীদের ন্যায়বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়া করানোই ছিল অ্যালিসার মূল উদ্দেশ্য। এবং এ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই ২০১৭ সালের ১৫ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় দুপর নাগাদ ‘মি টু’ হ্যাশট্যাগ সম্বলিত একটি টুইট করেছিলেন মিলানো। সেখানে তিনি বলেছিলেন, “আপনি যদি কখনও যৌন হয়রানি বা নিপীড়নের শিকার হয়ে থাকেন, তবে এই টুইটের প্রত্যুত্তরে ‘মি টু’ লিখুন।”

এবং সেই টুইটটি এতটাই জনপ্রিয়তা পায় যে, ওইদিন ঘড়ির কাঁটা রাত বারোটা ছোঁয়ার আগেই দুই লক্ষাধিকবার টুইটারে ‘মি টু’ শব্দযুগল ব্যবহৃত হয়। পরদিন তথা ১৬ অক্টোবর ব্যবহৃত হয় আরও পাঁচ লক্ষাধিকবার। শুধু কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি ও নিপীড়নেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ থাকে না। জীবনের কোনো না কোনো এক পর্যায়ে কোনো না কোনোভাবে যৌন নিগ্রহের শিকার হয়েছেন, এমন নারীরা একে একে মুখ খুলতে শুরু করেন।

দেখা যায় এ ধরণের মর্মান্তিক ঘটনার শিকার হওয়া থেকে বাদ যাননি বর্তমানে প্রতিষ্ঠিত অনেক তারকাই। আবার আঙ্গুল উঠতে থাকে বর্তমানে স্বনামধন্য ও প্রতিষ্ঠিত অনেক তারকার দিকেই। এভাবে গোটা বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করে ‘মি টু মুভমেন্ট’। এবং তা টুইটারের গন্ডি পেরিয়ে নোঙর ফেলে আরেক জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও। সেখানে ‘মি টু’ সম্বলিত হ্যাশট্যাগটি প্রথম ২৪ ঘন্টায় প্রায় ৪.৭ মিলিয়ন মানুষ ব্যবহার করে ১২ মিলিয়নেরও বেশি পোস্টে।

পরবর্তীতে প্রকাশিত এক রিপোর্টের মাধ্যমে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ দাবি করে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শতকরা ৪৫ ভাগ ফেসবুক ব্যবহারকারীরই ফ্রেন্ডলিস্টে অন্তত একজন এমন ব্যক্তি আছেন যিনি ‘মি টু’ হ্যাশট্যাগ দিয়ে পোস্ট করেছেন।

অবশ্য বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, শুরুর দিকে ‘মি টু’ মুভমেন্ট’ নিয়ে পশ্চিমাবিশ্বের ঝড় উঠলেও, আশ্চর্য রকমের নীরব ছিল এশিয়ার দেশগুলো। বিশেষ করে আমাদের এই ভারতীয় উপমহাদেশে। তবে সুখবর হলো, দেরিতে হলেও ‘মি টু মুভমেন্ট’ এর ছোঁয়া লেগেছে বলিউডেও। অভিনেত্রী তনুশ্রী দত্ত কর্তৃক বর্ষীয়ান অভিনেতা নানা পাটেকারের নামে আনা যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠার পর থেকেই এ বিষয়ে সরব হয়েছেন বলিউড অভিনেতারা।

তবে এখানে একটি বিষয় জানিয়ে রাখা খুবই প্রয়োজন যে, বছরখানেক আগে অ্যালিসা মিলানোর মাধ্যমে ‘মি টু’ শব্দযুগল জনপ্রিয়তা পেলেও, এর উৎপত্তি কিন্তু আরও এক দশক আগেই। আর যার হাত ধরে প্রথম এই মুভমেন্টের সূচনা ঘটেছিল, তিনি হলেন তারানা বুরকি। তারানা মূলত হারলেমের একজন নারী অধিকার কর্মী। এবং তিনি এই মুভমেন্ট শুরু করেছিলেন বর্ণবাদের ভিত্তিতে নারীদের উপর হওয়া যৌন নির্যাতনের প্রতিবাদস্বরূপ।

২০০৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ‘মি টু মুভমেন্ট’। কিন্তু তারানার মনে এই মুভমেন্টের ধারণা জন্মে আরও নয় বছর আগে, ১৯৯৭ সালে। সেই সময় একজন তরুণ কর্মী হিসেবে তিনি কাজ করতেন কৃষ্ণাঙ্গ শিশুদের নিয়ে, বিশেষ করে যাদের জীবনে যৌন নির্যাতনের অভিজ্ঞতা ঘটেছে।

এই কাজের অংশ হিসেবেই কোনো এক সন্ধ্যায় তিনি একটি ‘অল গার্ল বন্ডিং সেশন’ এর সভাপতিত্ব করেন। সেখানে একদল কিশোরী তার সাথে তাদের জীবনের বিভিন্ন বিভীষিকাময় অধ্যায়ের কথা শেয়ার করে। এবং তিনি সেই সকল কিশোরীর অভিজ্ঞতার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনে, যতটা সম্ভব তাদেরকে সান্ত্বনা দেয়ার ও তাদের মনোবল শক্ত করার চেষ্টা চালান।

কিন্তু সেই সেশনেই হেভেন নামে একটি কিশোরী ছিল, যে কিনা সেদিন সন্ধ্যায় সবার সামনে তারানার কাছে নিজের অভিজ্ঞতার কথা ব্যক্ত করতে পারেনি। হঠাৎ হঠাৎ রেগে উঠত মেয়েটি, আর সবার সাথে প্রচন্ড বাজে ব্যবহার করত। নামের সাথে তার কাজের মিল ছিল না একদমই। দেখলেই বোঝা যেত, মেয়েটি খুব বড় ধরণের মানসিক সমস্যায় ভুগছে।

তো, সেই মেয়েটিই পরের দিন তারানার সাথে প্রাইভেটে কথা বলতে চায়। তারানাও সাতপাঁচ না ভেবে রাজি হয়ে গেলেন হেভেনকে সময় দিতে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে হেভেন যখন তার কাছে এলো, হেভেনের চোখে তিনি এমন এক গভীর দুঃখবোধের চিহ্ন আবিষ্কার করলেন যে অস্বস্তিতে ছেয়ে গেল তার মন, কোনো এক অজানা ভয় গ্রাস করল তাকে। ফলে ওই মুহূর্তে হেভেনের কথা শোনার মত মানসিক শক্তি সঞ্চয় করে উঠতে ব্যর্থ হলেন তিনি। শোনা হলো না হেভেনের কথা।

কিন্তু পিছু ছাড়ল না হেভেন। অনুনয় বিনয় করতে লাগলো, অন্তত একটিবার তার কথা শোনার জন্য। এক পর্যায়ে নিতান্ত বাধ্য হয়েই তারানাকে শুনতে হলো তার কথা। এরপরের মিনিটখানেক তিনি শুনে চললেন কীভাবে হেভেনের ‘সৎ বাবা’, কিংবা তার মায়ের নতুন বয়ফ্রেন্ড, দিনের পর দিন পাশবিক যৌন অত্যাচার চালিয়ে গেছে তার বাড়ন্ত শরীরের উপর। হেভেন পাঁচ মিনিটও বলেছে কি বলেনি, গা ঘিনঘিন করতে লাগল তারানার। ঝিমঝিম করতে লাগল মাথা।

আর যেন নিতে পারছিলেন না তিনি। তাই হেভেনের কথার মাঝপথেই তাকে থামিয়ে দিলেন, পাঠিয়ে দিলেন অন্য এক নারী কাউন্সেলরের কাছে। আসলে সেদিন নিজের সাথে যুদ্ধ করতে গিয়ে বারবার পরাস্ত হচ্ছিলেন তিনি। হেভেনের কথা শুনতে গিয়ে বারবার তার চোখে ভেসে উঠছিল তার নিজের ছেলেবেলার কথা। কীভাবে তাকেও সহ্য করে যেতে হয়েছে একই রকম অত্যাচার।

কিন্তু সেদিন মানসিকভাবে যথেষ্ট পরিপক্ব ছিলেন না তিনি। তাই হেভেনের সব কথা শুনে, তাকে ‘মি টু’ বলে সাহস যোগাতে পারেননি। তবে মনের মধ্যে একটি অপরাধবোধ ঠিকই গেড়ে বসেছিল, যা পরবর্তী সময়ে প্রতিনিয়ত তাড়া করে বেড়াতে থাকে তাকে। তিনি নিজে ছেলেবেলায় যে পরিস্থিতির শিকার হয়েছিলেন, আরেকটি বাচ্চা মেয়েও যখন একই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছে, সব জেনেশুনেও তার কোনো সাহায্যে আসতে পারেননি, এই তীব্র অনুশোচনা তাকে কুরে কুরে খেতে থাকে।

তিনি উপলব্ধি করেন, তাকেও এমন একটি কিছু করতে হবে যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো বাচ্চা মেয়ে বা কিশোরী এমন পরিস্থিতির শিকার হলে নিজেকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন না ভাবে, বরং একাধারে সে যেমন সান্ত্বনা পায়, ঠিক তেমনই সাহস সঞ্চয় করতে পারে অপরাধীকে প্রাপ্য শাস্তি প্রদানের। এই মানসিকতা থেকেই ‘জাস্ট বি ইঙ্ক’ নামে মেয়েদের জন্য একটি ইয়ুথ ক্যাম্প স্থাপন করেন তিনি, এবং সেটিরই অংশ হিসেবে ‘মি টু মুভমেন্ট’ শুরু করেন।

তার ভাষ্যমতে, “আমার কাছে এটি কোনো ভাইরাল ক্যাম্পেইন নয়। আমার কাছে এটি একটি মুভমেন্ট। একাধারে একটি সাহসী ঘোষণা প্রদান করা যে ‘আমি লজ্জিত নই’ এবং ‘আমি একা নই’; অন্যদিকে এক উদ্বর্তীর (সারভাইভর) তরফ থেকে আরেক উদ্বর্তীর নিকট বিবৃতি যে, ‘আমি তোমাকে দেখছি, আমি তোমাকে শুনছি, আমি তোমাকে শুনতে পারছি, এবং আমি সবসময় তোমার পাশেই আছি’।

এভাবেই তারানার সেদিনের ছোট্ট একটি ধারণা আজ বিশ্বব্যাপী ভাইরাল হয়ে মহীরূহে পরিণত হয়েছে। ‘মি টু মুভমেন্ট’ এর কথা শুনে এটিকে অনেকের কাছেই হালকা মনে হতে পারে। কিন্তু এটির প্রভাব যে কী ভীষণ পরিমাণ, তা বলে বোঝানো অসম্ভব। বিশ্বব্যাপী লক্ষ লক্ষ নারী আজ এই মুভমেন্টের মাধ্যমে অনুধাবন করতে পেরেছে যে তারা একা নয়, বরং সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে তারা পৃথিবীর যেকোনো বৃহৎ শক্তিকেই মাটিতে নামিয়ে আনতে পারে।

এই মুভমেন্ট তাই নারীদের মধ্যে এক নবজাগরণের সৃষ্টি করেছে। এবং সেই নবজাগরণের স্রষ্টা হিসেবে তারানা বুরকিকে তার প্রাপ্য সম্মানটুকু দিতেই হবে।

আরও পড়ুন-

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close